ট্রেড এন্ড কমার্সিয়াল অর্গানিজেশন ইন বেঙ্গল ১৬৫০-১৭২০, উইথ স্পেশাল রেফারেন্স টু দ্য ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি
তৃতীয় অধ্যায়
কোম্পানির ব্যবসায় বিকাশ এবং উন্নয়ন
ব্যবসা করার অধিকার অর্জনে সমস্যা এবং স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক
কোম্পানির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল শাহী আমলাতান্ত্রিক নানান ধরণের কর কর আদায় এড়িয়ে নিরবিচ্ছিন্ন এবং অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য অধিকার কায়েম করা। তার বাণিজ্যকর্মের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল, স্থানীয় বাজার দখল করে বিনাশুল্কে সে সব বাজার থেকে সংগ্রহ করা পণ্য বিদেশের বাজারে বিক্রি করা। কিন্তু কোম্পানির সমস্যা হল, তারা দেখতে পাচ্ছিল, বাংলায় শাসন করতে কেন্দ্রিয় সরকার থেকে আসা প্রশাসকেরা স্থানীয় বিষয় নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না; স্থানীয় সমস্যা সমাধানে এই প্রশাসকদের দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা থাকত না। বদলির চাকরি করা অধিকাংশ শাসকই বাংলা প্রশাসনে সাধারণত খুব কম সময়ের জন্যে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হত। তাই সুশাসনের পরিকল্পনা করার বদলে অধিকাংশ শাসকই যতদিন স্থানীয় প্রশাসনে কাজ করত, সে সময় নিজেদের কুক্ষি ভরার দিকে বেশি নজর দিয়েছে। ফলে স্থানীয় ক্ষমতার সঙ্গে কোম্পানির দ্বন্দ্ব উপস্থিত হলে, সে সব সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পাওয়া যেত না। সাধারণভাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে একটা অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় আমলারা বৈদেশিক কোম্পানিগুলিকে দুধেলা গাই হিসেবে গণ্য করছে (টি রায়চৌধুরী, প্রাগুক্ত, ১৬)।

এই অভিযোগের খুব বেশি ভিত্তি নেই। এই অভিযোগ অতিরঞ্জন হলেও প্রশাসনের দমনমূলক চরিত্র কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না [যদিও এই বইটার প্রায় দেড় দশক পরে লেখা, সুশীল চৌধুরী, প্রস্পারিটি টু ডিক্লাইন বইতে এই অবস্থান বদল করেছেন — অনুবাদক]। কোম্পানির অধিকারের আলোচনা জটিল বেশ জটিল। বাংলায় পদার্পণের পর, কোম্পানির বাংলা ব্যবসার পরিমান খুবই কম ছিল বলে মুঘল আমলারা কোম্পানির ব্যবসাজাত মূল্যের চুঙ্গিকর ছাড় দিত না। এ বিষয় নিয়ে ঝামেলা দেখা দিলে, সে সব সমস্যা মিটিয়ে ফেলা হত বেআইনি অর্থ আদান-প্রদানের মাধ্যমে। অবস্থা জটিল হল কোম্পানির ব্যবসার পরিমান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। বিশেষ করে যখন থেকে ব্যক্তিগত ব্যবসাদারদের জাহাজ বড়ভাবে বাংলার বন্দরে ঢুকতে থাকার পরের সময়ে। বিষয়টা ব্যাপক জটিল আকার ধারণ করত কোম্পানির দুর্ণীতিতে। দেশিয় বণিকেরা নিজেদের পণ্যকে ব্রিটিশ কোম্পানির দস্তক দেখিয়ে বেআইনিভাবে শুল্ক ছাড় চাইলে স্থানীয়্প্রশাসন কোম্পানিকে দুর্নীতিতে জড়িয়ে থাকার অভিযোগ করত, এবং সেই দস্তককে তারা মান্য করত না। কোম্পানির সঙ্গে স্থানীয় শাসকদের আরেকটা ঝামেলা তৈরি হত — প্রতিযোগিতাময় ব্যবসার পরিবেশে, বহু সময় শাসকেরা তাদের মত করে ক্ষমতার নানান হাতিয়ার ব্যবহার করার উদ্যম নিলে। সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে স্থানীয় শাসক, অভিজাতদের একাংশ সমুদ্রপথ এবং রাজপথ বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করেছে এবং সুবার বেশ কিছু বাণিজ্য ক্ষেত্র একচেটিয়াকরণ করে রাখার চেষ্টা করেছে। বৈদেশিক কোম্পানিগুলি চরিত্রের দিক থেকে যেহেতু একচেটিয়া বাণিজ্যে যুক্ত ছিল, সেহেতু বাণীজ্য ক্ষেত্রে দুই স্বার্থের সংঘাত বাধত এবং ইওরোপিয় কোম্পানিগুলো, মুঘল আমলাদের ব্যবসার একচেটিয়াকরণ রোখার চেষ্টা করেছে। এছাড়াও ছাড়ের ধরণ, চরিত্র ইত্যাদির অস্পষ্টতা নিয়ে অনেক সময় বিরুদ্ধপক্ষও তাদের মত করে মানে তৈরি করেছে। ফলে সে সব ক্ষেত্রেও ঝামেলা দেখা দিয়েছে।
কোম্পানি বাংলায় ক্ষমতায় থাকা সুবাদারের থেকে সাধারণত শুল্ক ছাড়ে ব্যবসা করার জন্যে শাহজাহানের থেকে হাসিলকরা একটা হারিয়ে যাওয়া, হয়ত অস্তিত্বহীন পরওয়ানার ওজর দেখিয়ে বার বার ছাড়পত্র চেয়েছে। মূল পরওয়ানাটা সুবাদারের দেখাতে পারত না বলে এলাকাভিত্তিক পরওয়ানা হাসিলকরারা চেষ্টা করত। জোনাথন ত্রেভিষার ১৬৬০ সালে দৌত্যের সময় নবাব মীর জুমলা কোম্পানিকে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের ছাড়পত্র পরওয়ানা দেন (বি এম এড ম্যানু, ২৪০৩৯, ৮; ইএফআই, ১৬৫৫-৬০, ৪১৬; ও সি, ২৬ খণ্ড, ২৮২৭)। একইভাবে ১৭৭২ সালে শায়েস্তা খাঁ শাহ সুজার নিশানের সময়কে বিস্তৃত করেন শুল্কমুক্ত ব্যবসার জন্যে (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ড মিসলেনি, ৩ খণ্ড, ১৫৯, হোম মিসলেনি, ৬২৯ খণ্ড, ৪৩-৪৬; ও সি, ৩০২৯, ২৮ খণ্ড, ২১ জুন, ১৬৬৪)। কিন্তু তিনি যখন ১৬৭৭ সালে বাংলা ছাড়েন, আবার ১৬৭৯ সালে ফিরে আসেন, এর মাঝখানে নতুন নবাব ফিদায়ি খান এবং দেওয়ান সফি খান তাদের এই দাবি আমল দেন নি।

১৬৭৮ সালে ফিদায়ি খানের স্থলভিষিক্ত হওয়া শাহজাদা আজিমের থেকে ব্রিটিশেরা এই অধিকার পুণঃদখল করে। কোম্পানি এই এড হক প্রথা চালানোয় খুব একটা খুশি ছিল না। তারা মনে করত আলাদা আলাদা সুবাদার/নবাবের থেকে শুল্কমুক্ত ব্যবসা অধিকার আদায়ের ব্যবস্থা খুবই খরুচে এবং ঝামেলাদার প্রক্রিয়া। এই ঝামেলার জন্যে কোম্পানি মুঘল দরবার থেকে শাহী ফরমান জোগাড় করার চেষ্টা করেগিয়েছে। কিন্তু তারা কেন্দ্রিয়স্তর থেকে এই ধরণের ফরমান পেয়েছিল কিনা সে সম্বন্ধে, কোম্পানির বাইরে থাকা শাহী আমলাদের মনে যথেষ্ট সন্দেহ থেকেই গিয়েছিল। আগেই বলেছি শাহজাহানের যে ফরমানের বলে কোম্পানি স্থানীয় শাসককে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অধিকার দেওয়ার জন্যে দাবি করত, তা দিয়ে বাংলায় কোনও দিনই তারা শুল্ক ছাড়ের সুযোগ পায় নি। অযোধ্যা (আউধ) এবং আগরা ইত্যাদি অঞ্চলের কিছু হাতেগোনা পণ্য রাহাদারির ছাড়পত্র পেয়েছিল। যখন দেশিয় বিদেশি, সব ধরণের ব্যবসায়ী স্থানীয় সরকারকে বাণিজ্যের জন্যে শুল্ক দিচ্ছে, তখন কেন স্থানীয় শাসকেরা শুধুই ব্রিটিশদের ব্যবসা সুবিধে দেওয়ার জন্যে শুল্ক ছাড় দিতে যাবে, এয় যুক্তির পক্ষে কোম্পানি পক্ষে কোন প্রতিরোধই দাঁড় করাতে পারত না। এমনকি কয়েকজন কোম্পানির কুঠিয়ালও প্রশ্ন তোলে, কোম্পানি কী আদৌ শুল্কছাড় দিয়ে ব্যবসা করার অনুমতি পেয়েছিল?
১৬৬৯ সালে যোসেফ হল, বালেশ্বরের প্রধান কুঠিয়াল লিখলেন, বহুবছর হয়ে গেল, আমরা শুল্ক ছাড় পরওয়ানা থাকার দাবি করে চলেছি। মাননীয় কোম্পানির হাতে এক্ষুণি কী কী অধিকার আছে সে তথ্য জানতে সরকারের কাছে অবিলম্বে দরখাস্ত করা দরকার। …আমি যদিও কোনও কিছুই দেখছি না। অথচ প্রত্যেক বছর নবাব বা প্রশাসকদের পক্ষে পেশকাশ ইত্যাদি পদাধিকারীরা কোম্পানির থেকে কথিত ফরমানটি দেখতে চাইলে কোম্পানির আমলারা যেন অন্ধ হয়ে যেত (ও সি, ৩২৭৫, ৩০ খণ্ড, ২ মে ১৬৬০)। এমনকি ব্রিটিশ কোম্পানির কোর্ট মিনিটে ভারতে কোম্পানির আমলারা ফরমান বিষয়ে যে সব দাবি করছিল তার সত্যতা নিয়ে বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বাংলার ব্যবসা নিয়ে ওঠা নানান প্রশ্নের – বিশেষ করে বটন সংক্রান্ত উত্তর খোঁজা নিয়ে কেন্দ্রিয় কর্তারা একটি কমিটি তৈরি করে দেন। কমিটি তাদের তদন্তের সমীক্ষা ৪ সেপ্ট ১৬৭৪ সালে পেশ করে। সমীক্ষায় স্পষ্ট স্বীকার করে নেওয়া হল এই ফরমানে ব্রিটিশ কোম্পানিকে শুল্ক দিয়েই ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কোম্পানি সেই ফরমানটি কারচুপি করে নকল করে, তাদের যাতে শুল্ক না দিতে হয় সেইভাবে নিজেদের মত করে বানিয়ে নেয় (কোর্ট বুক, ২৯ খণ্ড, ৪ সেপ্ট ১৬৭৪, ৭২; ই বি সেইনসবেরি, সম্পা, কোর্ট মিনিটস অব দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ১৬৭৪-৭৬, ৮১)। ব্রিটিশদের বাংলায় বাণিজ্যাধিকার নিয়ে সব থেকে আকর্ষণীয় মন্তব্য করেছেন বাংলা অঞ্চলের ব্যবসা দেখাশোনা করা জনৈক হিসাবরক্ষক – আমরা বিভিন্ন সময় … প্রচুর ঝামেলা খরচ করে আর বিপুল ঘুষ দিয়ে অধিকার অর্জন করেছি (ফ্যাক্ট্রি রেকর্ডস, ফোর্ট সেন্ট জর্জ, ৩০ খণ্ড, ৪০; ওরমে ম্যানু, ও ভি, ১২, ৩-১০)। (চলবে)