তিনশো পঁয়ষট্টি দিন যে কলকাতাকে দেখছেন পুজোর কটা দিন তার চেহারাটাই বদলে যায়। আলোর রেশনাইয়ে, হোর্ডিংয়ের ঘনঘটায়, মানুষের মেলায় কলকাতা তখন আনন্দনগরী। কলকাতার দুর্গাপুজো বিশ্বের সেরা কার্নিভাল। এ পুজো দেখতে দেশ-বিদেশের মানুষ ছুটে আসেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহর কলকাতা পুজোর সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। কে কাকে টপকে বাজিমাত করবে তা নিয়ে লড়াই শুরু হয়ে যায় অনেক আগে থেকেই। ঐতিহ্যের সঙ্গে থিমের জমজমাট যুদ্ধ, আলো-আঁধারির খেলা ও জাঁকজমক, নানাবিধ পুরস্কার পুজোর আকর্ষণকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
নানাবিধ আয়োজনের মাঝে কলকাতায় রয়েছে বেশ কিছু বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো। যেখানকার পুজো আভিজাত্যর অহংকারে, সাবেকিয়ানার গরিমায়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে মুগ্ধ করবে আপনাকে এক লহমায়। এদের মধ্যে অন্যতম হলো চোরবাগান চ্যাটার্জী বাড়ির দুর্গাপুজো। বনেদি বাড়ির এই পুজোয় একটা আলাদা ব্যাপার থাকে।এই বাড়িতে প্রবেশ করলেই আপনি বুঝতে পারবেন প্রতিটি থামের মধ্যে লুকিয়ে আছে এই বাড়ির প্রাচীন ইতিহাস।

দূর দুরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজন এসো উপস্থিত হন পুজোর এই সময়টায়। কাজের চাপ, মনোমালিন্য, মান অভিমান দূরে সরিয়ে পুজোর কটা দিন চ্যাটার্জি বাড়ি মেতে ওঠে আনন্দের আয়োজনে। বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ থেকে ছোটরা সকলেই লেগে পড়েন দুর্গাপূজার বিভিন্ন আয়োজনে। এত বড় পূজোর আয়োজন সে তো আর কম কথা নয়।
দুর্গাপূজার শুরু হয় ১৮৬০ সালে পরিবারের কর্তা রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে। এ বছর ১৬৬ তম বর্ষ উদযাপন। রামচন্দ্র বাবু ইংরেজ আমলের বিশাল প্রতিপত্তি সম্পন্ন ব্যবসায়ী ছিলেন। সেই প্রতিপত্তি থেকেই তিনি তৈরি করেন উওর কলকাতায় বিশাল প্রাসাদসম রামচন্দ্র ভবন। ব্রিটিশ আছে সেইসময় মধ্য গগনে, বাবুকালচার তখন জমজমাট। আভিজাত্যের প্রকাশ ঘটাতে ও আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে রামচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় শুরু করেন দুর্গাপূজা। স্ত্রী দূর্গাদাসীর পরামর্শে এই বাড়ির দালানে পুজো শুরু করেন রাঢ়ী শ্রেনীর ব্রাহ্মণেরা। প্রায় সাত পুরুষের বেশি সময় ধরে চলে আসছে লালরঙের রামচন্দ্র ভবনের দুর্গাপূজা।

আগে চ্যাটার্জি বাড়ির ঠাকুরদালানেই দুর্গা প্রতিমা তৈরি করা হতো। কিন্তু বর্তমানে কুমারটুলিতে প্রতিমা তৈরি করা হয়। তৈরি করেন প্রখ্যাত অধর পাল। চ্যাটার্জি বাড়ির দুর্গাপূজা যেমন বংশানুক্রমে চলে আসছে, তেমনি প্যান্ডেল এবং প্রতিমা যারা তৈরি করেন তারাও বংশানুক্রমিক ভাবেই এই বাড়ির প্রতিমা ও প্যান্ডেল তৈরি করে আসছেন।
রথযাত্রার দিন বায়না করে আসেন পরিবারের সদস্যরা। কাঠামো পূজা হয় জন্মাষ্টমী তিথিতে। কাঠামো পুজোর দিন একটি লাঠিকে পুজো করা হয়। পরিবার সূত্রে জানা যায় এই লাঠির বয়স পুজো সমান। পরে এই লাঠিটিকে দিয়ে আসা হয় কুমোরটুলিতে।

মহালয়ার পুণ্য তিথিতে দেবীর চক্ষুদান পর্ব এবং দ্বিতীয়ার দিন ঠাকুরদালানে দেবীকে আনা হয়। দুর্লভ টানা একচালের দেবী প্রতিমা এই পুজোর বিশেষ আকর্ষণ। অন্য আকর্ষণ হল মায়ের হাতের উপর রূপোর পদ্ম ও অস্ত্র।
দুর্গাপুজোর শুরুতে বা অতীতে প্রতিমা সম্পূর্ণ ডাকের সাজে সজ্জিত হতো। সময়ের সাথে সাথে এখন মা সজ্জিত হন বেনারসিতে, সঙ্গে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রত্যেককেই বেনারসি পরানো হয়। মায়ের মাথায় থাকে সোনা ও শোলার মুকুট, হাতে এবং অঙ্গে থাকে সাবেকি ঐতিহ্যপূর্ণ গহনা।
প্রাচীণ প্রথা অনুযায়ী ষষ্ঠীর দিন বেলতলায় মা দুর্গা বিশ্রাম নেন। তাই এই বাড়িতে একটি ছোট্ট বেলতলা তৈরি করা হয় এবং মাঝরাতে অলঙ্কার পরে সেই বেলতলা থেকে ঠাকুরকে বরণ করে নিয়ে আসা হয় দালানে। বাড়ির পুরুষেরা সেই সময় ঢাক বাজান।

এই বাড়ির পুজোর বিশেষ আকর্ষণ হল পুরুষদের দ্বারা ভোগ নিবেদন। এই বাড়ির সকল সদস্যরা মা দুর্গাকে মানেন ঘরের মেয়ে উমা হিসেবে। রীতিনীতির সাথে ভক্তি ও ভালোবাসার মেলবন্ধন ঘটে তাদের প্রতিটি উপাসনায়।
পূর্ব-পুরুষদের নির্দেশ অনুসারে উপনয়ন হওয়া বাড়ির ছেলে এবং ভাগ্নেরা মায়ের ভোগ রান্না করে থাকেন। চ্যাটার্জি বাড়ির পূর্বপুরুষদের একটি কূল গ্রন্থ আছে। সেই গ্রন্থ অনুসরণ করে পুজো করা হয়। সপ্তমী অষ্টমী নবমী এবং দশমী তিথিতে কি কি রান্না হবে তা বর্ণিত আছে তাদের সেই প্রাচীন খাতায়।সেই নিয়ম নীতি মেনেই আজও ভোগ রান্না হয়ে আসছে।
সাদাভাত, খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, শুক্ত, আলু পটলের দম, কাটা পোনা মাছ, পায়েস, মিষ্টি, চাটনি ইত্যাদি এই তিনদিন মায়ের ভোগে নিবেদন করা হয়। এছড়াও সপ্তমীর দিন লাউ চিংড়ি, অষ্টমীর দিন শাকের ঘণ্ট, নবমীর দিন ভেটকি ঘণ্ট, চিংড়ি মাছের মালাইকারি নিবেদন করা হয়। অষ্টমীর সন্ধিপূজায় লুচি মিষ্টি বোঁদে তৈরি করা হয়।

এ বাড়িতে পুজোর দিনে আরও একটা বিশেষ নিয়ম রয়েছে। দশমীর দিন পালন করা হয় অরন্ধন যাকে এ বাড়ির লোকেরা বলে দুর্গারন্ধন। নবমীর রাতের রান্নাই খাওয়া হয় দশমীতে। নবমীর রাতে রান্না করা পান্তা ভাত, মুসুর ডাল, ছাচি কুমড়ো, চালতার টকই দশমীর দিন পরিবারের সদস্যরা খেয়ে থাকেন।
নবমীর নিশি রাত পোহালেই আসে দশমীর পালা। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী ঘরের মেয়ে উমাকে বিদায় জানানোর সময় পরিবারের প্রতিটি সদস্য একটি বিশেষ গানের মাধ্যমে বিদায় জানান।
“ভজিতে তোমারে শিখি নাই কভু, ডাকি শুধু তোমায় মা বলে” — এই বিদায় সঙ্গীতে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সমস্ত সদস্যরা কন্ঠ মেলান। চ্যাটার্জি বাড়ির ঐতিহ্যের মেলবন্ধন এমনই যেখানে প্রাচীন ধারাকে নবীন প্রজন্ম শ্রদ্ধার সাথে পালন করে আসছেন।
পথনির্দেশ : চিত্তরঞ্জন এভিনিউয়ের রামমন্দির বাস স্ট্যান্ড থেকে এসপ্ল্যানেডের দিকে এগোলে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট। সেখান দিয়ে সামান্য হেঁটে গেলে ডান দিকে পরবে রামচন্দ্র ভবন। ১২০ নং মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের এই বাড়িতেই হয় চ্যাটার্জ্জী বাড়ির আদি বনেদি পুজো।