রাজা যাদবরাম রায়ের কিশোরনগর গড়ের সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি প্রাচীন দূর্গাপুজো জৌলুশ হারালেও হারায়নি ইতিহাসের ঐতিহ্য। ইতিহাসের ঐতিহ্য আজও অমলিন। ঐতিহ্যের চিরাচরিত নিয়ম মেনে আজও পুজোর সময় আতস কাঁচে সূর্যের আলো ফেলে দেবী দূর্গার হোমাগ্নি জ্বালানো হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী পূর্ব মেদিনীপুরের মহকুমা শহর কাঁথির কিশোরনগর গড়ের জমিদার রাজা যাদবরাম রায় এই দূর্গাপুজো শুরু করেছিলেন প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে। সেই পুজোকে ঘিরে নানান কিংবদন্তী আজও আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
কিশোরনগর গড়ের দূর্গাপুজো হয় পশ্চিমমুখী ঘটে। কিংবদন্তী নরোত্তম বর নামে এক মাঝির গলায় চন্ডীমঙ্গল গান শোনার জন্যই স্বয়ং দেবী দূর্গা পশ্চিমমুখী হয়েছিলেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কিশোরনগর গড়ের দুর্গাপুজোর ঘট পশ্চিমমুখো করেই মায়ের পুজো হয়ে আসছে। রাজা যাদবরাম রায়ের কিশোরনগর গড়ের দূর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে নানান কিংবদন্তী ও কাহিনি রয়েছে। সেইসব কাহিনি কিশোরনগর গড়ের বর্তমান প্রজন্মের কথাতে জানা যায়, রাজা যাদবরাম রায়ের কিশোরনগর গড়ের দৃর্গাপুজো শুরু হয়েছে তখন বেশ কয়েক বছর। সেই সময় একবার দুর্গাপঞ্চমীর গভীর রাতে দেবী নিজে কিশোরনগর থেকে ছ’মাইল দুরে মশাগাঁ গ্রামের খালের ঘাটে এক যোড়শীর বেশে উপস্থিত হলেন। ঘাটের খেয়া পারাপারের মাঝি নরোত্তম বর গভীর রাতে খেয়া পারাপারের যাত্রী না থাকায় খেয়াতেই তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাঝিকে ঘুম থেকে ডেকে ষোড়শী বলেন, — ‘আমি কিশোরনগরের রাজ বাড়িতে দুর্গোৎসব দেখতে যাব। আমাকে ওপারে নিয়ে চলো।’

গভীর রাতে একা এক ষোড়শীকে খেয়া করে ওপারে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন মাঝি নরোত্তম বর। কিন্তু ষোড়শী বারবার আকুতি মিনতি করতে থাকলে অনিচ্ছা স্বত্বেও মাঝি নরোত্তম বর ষোড়শীকে খেয়া পার করে দেন। খেয়া পার করে দেওয়ার জন্য নরোত্তম ষোড়শীর কাছে পারানির কড়ি চাইলে ষোড়শী বলেন, ‘আমার কাছে পারানির কড়ি নেই। তার বদলে আমার সঙ্গে থাকা এই পুঁথিটা নাও।’ নিরক্ষর নরোত্তম বলে উঠেন, ‘মূর্খ আমি,পুঁথি আমার কোন কাজে লাগবে?’ ষোড়শী বলেন,’ এই পুঁথি নিয়ে তুমি কিশোরনগর গড়ের দূর্গামন্দিরে বসে গান গাইবে। গান গাইলেই তুমি পারিতোষিক পাবে।’ সেই মতো কিশোরনগর গড়ের দূর্গাপুজোয় মাঝি নরোত্তম বর চন্ডীমঙ্গল গাইতে এলেন। কিন্তু রাজা যাদবরাম জাত্যাভিমানে নরোত্তমকে মন্দিরে ঢুকতে না দিলে মনের দুঃখে নরোত্তম মন্দিরের পেছনে পশ্চিমদিকে বসে চন্ডীমঙ্গল গাইতে শুরু করেন। ঠিক তখনই দেবীর পুজোর ঘট পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম মুখে ঘুরে যায় আপনা আপনি। ভুল ভাঙে রাজা যাদবরামের। পরে ষোড়শীর কথামত নরোত্তম বর জানান, মশাগাঁ খালে দেবীর সাতটি খড়গ আছে বলে ষোড়শী তাকে জানিয়েছে। তখন কিশোরনগর রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে মশাগাঁ খালে ডুবুরী নামিয়ে সাতটি খড়গ ও একটি তাম্রপট পান। সেই থেকে পশ্চিমমুখী ঘটে ই দেবীদূর্গার আরাধনা হয়ে আসছে কিশোরনগর গড়ের পুজোয়।

নরোত্তম বরের বংশধরেরা আজও প্রতিবছর দুর্গাপুজোয় কিশোরনগর গড়ে আসেন পুজোয় চন্ডীমঙ্গল গান করতে। আগে খাল থেকে পাওয়া খড়গ দিয়ে দেবীর পুজোয় মহিষ বলি হলেও ১৩৪৯ সালের ভয়াবহ বন্যার পর মহিষ বলি ও এর কিছুদিন পরে বারংবার আঘাত করেও ছাগ বলি না হওয়ায় ছাগবলি বন্ধ করে দেওয়া হয় গড়ের রাজ পরিবারের পক্ষ থেকে। আজও অবশ্য মশাগাঁর খালের পাওয়া তাম্রপট পুজোর কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছু ই বদলে গেছে গড়ের পুজোয়। গড়ের নাটমন্দির,ঝাড়লন্ঠন, নহবত খানা আগেই হারিয়ে গিয়েছে। শুধু আজও পুরনো আটচালা মন্দিরে পঞ্চমুন্ডির আসনেই দেবী আরাধনা হয়ে আসছে। মহাষষ্ঠীর দিন থেকে দশমী পর্যন্ত কিশোরনগর গড়ে মেলা বসে। যা সাধারণ মানুষের কাছে ‘গড়ের মেলা’ হিসেবে পরিচিত। গোটা পূর্ব মেদিনীপুর জেলা ও জেলার বাইরে থেকে অগনিত মানুষের সমাগম ঘটে কিশোরনগর গড়ের দুর্গাপুজোয়।
সত্যিই অসাধারণ তথ্যপূর্ণ লেখা। নীল দুর্গা পূজার এত বিশেষত্ব ও ভিন্নধর্মী রীতি সম্পর্কে জানতে খুব ভালো লাগলো। আমাদের সংস্কৃতির এই ধরণের ঐতিহ্যই বাংলার গর্ব। ????✨