ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কার্তিক মাসের পূর্ণিমায় বৃন্দাবনে রাধা-সহ সখীদের সঙ্গে নিয়ে মেতেছিলেন রাসলীলায়। ‘রাস’ শব্দটি এসেছে ‘রস’ থেকে। ‘রস’ মানে আনন্দ, দিব্য অনুভূতি, দিব্য প্রেম, কোলাহল, বিলাস, ক্রীড়া। লীলা অর্থ নৃত্য। অনেকে মনে করেন, ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার মহামিলনই রাস। শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত উৎসব হচ্ছে রাস। জানা যায়, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পরবর্তী কালপর্বে এই উৎসব মহোৎসবে পরিণত হয়। মথুরা, বৃন্দাবন, নদীয়া জেলার শান্তিপুর ও নবদ্বীপে রাস উৎসবের বিশালতা দেখা যায়।
বাংলাদেশের সুন্দরবনের দুবলার চরে ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসব কার্তিকের শুক্লপক্ষের ভরা পূর্ণিমায় প্রতিবছর নভেম্বর মাসে সাগর যখন উছলে ওঠে, চাঁদের আলোয় সাগর-দুহিতা দুবলার চরের আলোর কোলে রাসমেলা অনুষ্ঠিত হয় প্রতি বছর। মানুষের কোলাহলে মেতে ওঠা এই রাসমেলাকে সুন্দরবনের দুবলার রাসমেলা নামে অভিহিত। শ্রীমদ্ভগবতের একটি বিশেষ অংশ হলো রাসলীলা। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কার্তিক মাসের এই পূর্ণিমায়ই বৃন্দাবনে রাধা-সহ সখীদের সঙ্গে নিয়ে মেতেছিলেন রাসলীলায়। বাংলাদেশের সুন্দরবনের দুবলার চর ছাড়াও কুয়াকাটার কলাপাড়ায়, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে মণিপুরি হিন্দু সম্প্রদায়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস উদযাপন করা হয়।

দুবলার চরের এই রাস উৎসব শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের মধ্যে একটি অন্যতম উৎসব। কারণ সুন্দরবন আজ ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, আর রাসমেলা শতাব্দীর প্রাচীন উৎসব। রাসপূজার স্থান ‘দুবলার চর’ বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের অন্তর্গত কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে একটি চর। আমাদের দেশের উৎসবগুলো সাধারণত লোকালয়ে পালন করা হয়। তবে সুন্দরবনের রাসমেলা ব্যতিক্রম, কারণ দুর্গম সুন্দরবন এলাকায় এই উৎসব পালিত হয় বলে ইচ্ছা থাকলেও সবার পক্ষে এই উৎসবে যোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।

সুন্দরবনের রাস পূর্ণিমায় বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এখানে রাসপূজার সঙ্গে সঙ্গে পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত হয়। বন এবং সাগর সঙ্গমে এ রকম বৈচিত্র্যময় উৎসব খুঁজে পাওয়া বিরল। দুবলার চরের এই রাস উৎসব শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নয়, বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের মধ্যে একটি অন্যতম উৎসব। কারণ সুন্দরবন আজ ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, আর রাসমেলা শতাব্দীর প্রাচীন উৎসব। রাসপূজার স্থান ‘দুবলার চর’ বাগেরহাট জেলার শরণখোলা থানার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের অন্তর্গত কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে একটি চর। আমাদের দেশের উৎসবগুলো সাধারণত লোকালয়ে পালন করা হয়। তবে সুন্দরবনের রাসমেলা ব্যতিক্রম, কারণ দুর্গম সুন্দরবন এলাকায় এই উৎসব পালিত হয় বলে ইচ্ছা থাকলেও সবার পক্ষে এই উৎসবে যোগ দেওয়া হয়ে ওঠে না।
সুন্দরবনের দুবলার চরের রাসমেলা বা রাস উৎসবের সঠিক ইতিহাস জানা না গেলেও ধারণা করা হয়, ১৯২৩ সালে হরিভজন নামে এক সাধু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে এই মেলার বা পূজার প্রচলন করেন। এই সাধু ২৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে সুন্দরবনের গাছের ফলমূল খেয়ে অলৌকিকভাবে জীবনযাপন করতেন। অন্য আরেকটি মত প্রচলিত আছে, শ্রীকৃষ্ণ কোনো এক পূর্ণিমা তিথিতে পাপ মোচন ও পুণ্য লাভের আশায় দুবলার চরের আলোর কোলে বঙ্গোসাগরের সঙ্গমে পুণ্যস্নান করেছিলেন। সেই থেকে শুরু হয় রাসমেলার। আবার কারো কারো মতে, শারদীয় দুর্গোৎসবের পর পূর্ণিমার রাতে বৃন্দাবনবাসী গোপীদের সঙ্গে নিয়ে দুবলার চরে রাসনৃত্যে মেতেছিলেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। সেই থেকে দুবলার চরে পালিত হচ্ছে রাসমেলা—এ রকম নানা মত এ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে।

সুন্দরবনের রাসমেলাকে এখন আর মেলা বলা ঠিক হবে না। কারণ সুন্দরবন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হওয়ায় ও কভিড-১৯-এর কারণে গত বছর রাসপূজা উপলক্ষে পুণ্যার্থীদের কেনাকাটার জন্য সীমিত কয়েকটি দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান বসার অনুমতি দেওয়া হয়নি, এমনকি কীর্তনও বন্ধ ছিল। পুণ্যার্থীদের প্রত্যাশা, আগামী বছরগুলোতে সীমিত পরিসরে হলেও আরো কিছু দোকান বসার ও কীর্তনের অনুমতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রদান করবে। রাসমেলায় এখন শুধু সনাতন সম্প্রদায়ের লোকদের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। আগের মতো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অনুমতি দিলে রাসমেলার ব্যাপকতা ও প্রচার বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে—এ আশা সুধীজনদের। রাস উৎসবে আগতদের জন্য ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন, দুবলার চরের শুঁটকিপল্লী, জেলেপল্লীসহ বঙ্গোপসাগরে একই স্থানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার সুযোগ রয়েছে।

শত বছরের ঐতিহ্যের রাসপূজা বা পুণ্যস্নানের জন্য সুন্দরবনে অনেক পাকা ইমারত থাকলেও স্থায়ী কোনো মন্দির এখনো গড়ে ওঠেনি। অস্থায়ী মন্দিরে বর্তমানে রাসপূজার কাজ চলছে। তাই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাণের দাবি, একটি স্থায়ী পাকা রাস মন্দির স্থাপনের। ২০২২ সালে রাসপূজা ও পুণ্যস্নানের সময় হচ্ছে নভেম্বরের ৬, ৭ ও ৮ তারিখ। বরাবরের মতো পুণ্যার্থীরা নির্ধারিত পাঁচটি রুট দিয়ে বন বিভাগের প্রয়োজনীয় কিছু নির্দেশনা মেনে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে পারবে।
প্রকৃতির এক দারুণ পরিবেশ হচ্ছে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গমে দুবলার চরে রাস উৎসব। পুণ্যার্থীরা পূজা দিয়ে পুণ্যস্নান করে পুণ্য লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমণের স্বাদ নিতে পারবে। আমাদের বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি না করে আরো সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে রাসপূজা ও পুণ্যস্নানের শত বছরের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।