কুষ্টিয়ার খোকসার ঐহিত্যবাহী রটন্তি কালীপূজা ও উপলক্ষ্যে পক্ষকালব্যাপী মেলা গড়াই নদীর তীরে শুরু হয়েছে। এখানে ২০ জানুয়ারি মাঝ রাতে (ইংরেজি মতে ২১ জানুয়ারি) রটন্তী কালী পুজো হয়েছে। চতুর্দশী তিথিতে এই পুজো হয়। প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এ পূজা ও মেলাকে ঘিরে হিন্দু সম্প্রদায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আনন্দ উল্লাস সৃষ্টি হয়েছে। পূজা ও মেলার সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছিল।
কালীপূজাকে ঘিরে মন্দির প্রাঙ্গণে গ্রামীণ মেলায় বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা তাদের পসরা সাজিয়ে বসেছে। দেশ-বিদেশ বিশেষ করে পশ্চিমবাংলা থেকে আগত হাজার হাজার ভক্তের পদচারণায় মেলা প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে উঠেছে।
কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা সদরের প্রশাসন এই পূজা এবং মেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত আছে।
মেলায় দর্শনার্থীদের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ সর্তকতা রক্ষা করা হবে বলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

খোকসার ঐতিহ্যবাহী কালীপূজা কবে শুরু হয়েছে তার সঠিক ইতিহাস নেই। তবে পূজারী শ্রী প্রবোধ কুমার ভট্টাচার্যের সপ্তদশ ঊর্ধ্বতন পুরুষ রামাদেব তর্কালংকার এ পূজার প্রথম পূজারী ছিলেন। এ থেকে অনুমান করা হয় খোকসার কালীপূজার বয়স প্রায় সাড়ে পাঁচশ বছর।
কথিত আছে, একদা আত্মপ্রচার বিমুখ তান্ত্রিকসাধু গড়াই নদীর তীরে খোকসার জনমানব শূন্য জঙ্গালাকীর্ণ স্থানে এ কালীপূজা আরম্ভ করেন বলে লোক মুখে শোনা যায়। জনৈক জমিদার পুত্রকে সর্প দংশন করলে চিকিৎসার জন্য এই সাধকের কাছে নিয়ে আসা হয়। রোগীকে কালীর পদতলে শুইয়ে দিয়ে সাধনার মাধ্যমে জমিদার পুত্রকে সুস্থ করে তোলেন সাধু।
এরপর জমিদার তান্ত্রিক সাধুর নির্দেশে সাড়ে সাত হাত দীর্ঘ কালী মূর্তি নির্মাণ করে মাঘি আমাবশ্যা তিথিতে এখানে প্রথম কালীপূজা আরম্ভ করেন। আর সেই থেকে খোকসার রটন্তি কালীপূজার সূত্রপাত। বার্ষিক পূজা মন্দিরে প্রতি বছর মাঘি আমাবশ্যার তিথিতে সাড়ে সাত হাত লম্বা কালী মূর্তি মাটি ও খড় দিয়ে তৈরী করা হয়। কালীমূর্তি পূজান্তে বিসর্জন দেয়া হয়।
প্রসঙ্গতা বলতে হয়, বংশ পরম্পরায় স্থানীয় প্রতিমা শিল্পী সুকুমার বিশ্বাস, নিমাই বিশ্বাস ও তাদের তিন সহযোগী প্রতিমা তৈরীর কাজ করে আসছে। কালী পূজা উপলক্ষ্যে মন্দির প্রাঙ্গণে পক্ষকাল ব্যাপী মেলার আয়োজন করা হয়। এ মেলায় দেশ বিদেশ থেকে আসা প্রায় অর্ধ লক্ষ মানুষের সমাগম ঘটে।
এখানে নির্মাণ করা হয়েছে নাট মন্দির। বার্ষিক পূজা ও মেলায় আগত পূজার্থী এবং দর্শনার্থীদের সাময়িক বিশ্রামাগার ও পূজা কমিটির কার্যলয়। মন্দিরের সম্মুখে ভাগে রাস্তা এবং পশ্চিমে গড়াই নদী পর্যন্ত বিস্তৃত মাঠ। এটাই মেলাপ্রাঙ্গন। প্রতি বছর একই তিথিতে প্রচলিত নিয়মে এ পূজা হয়ে আসছে।

মহিষ বলির শেষে পাংশার জমিদার ভৈরবনাথ ও শিলাইদহের জমিদার ঠাকুরের সম্মানে জোড়া পাঁঠা বলি দেওয়া হতো। কালীপূজা ও মেলা প্রাঙ্গনে বিনোদনের জন্য সার্কাস, নাগোর দোলার পাশা পাশি গ্রামীণ মেলায় দোকানীরা তাদের পসরা সাঁজিয়ে বসে। প্রতিবারের মতো এবারও একইভাবে জমজমাট মেলা বসেছে।
কালীপূজা শুরুতেই ক্রোধের প্রতীক মহিষ ও পাঁঠা বলির প্রথা চালু হয়। প্রথম দিকে পাঁঠা বলির সংখ্যা ছিল অনির্ধারিত। বার্ষিক পূজার দিনে প্রথম প্রহরে চন্ডি পাঁঠান্তে একটি পাঁঠা বলি দেয়া হতো। দিনের শেষ প্রহরে দেবিকে আসনে তোলার পর নড়াইলের জমিদার রতন বাবুদের পাঁচ শরিকের জন্য পাঁচটা পাঁঠা বলি, অতঃপর নলডাঙ্গার রাজা প্রেরিত মহিষ বলি হত। এরপর শিলাইদহের জমিদারী ষ্টেট-এর সন্মানে জোড়া পাঁঠা বলি হত। মাঘি সপ্তমীর পূজা ও মেলা পর্যন্ত চলতো ভক্তদের মানতের জন্য আনা পাঁঠা বলি। ক্রোধের পথিক মহিষ ও পাঁঠা বলির এ প্রথা সেই রাজা জমিদারী আমলের আদলেই আজও প্রচলিত রয়েছে।
এখনো এলাকার ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষজন বিপদ থেকে মুক্তি পাবার উদ্দেশ্যে এই পূজায় পাঁঠা বলি দেয়ার মানত করে।

এই পূজা শুরুর আগে প্রতি বছরই একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে এক জোড়া কবুতর কালী মায়ের দুই কাঁধে এসে বসে থাকে। প্রতিমা বিসর্জনের আগে ওই কবুতর দুটি উড়ে চলে যায়। এ থেকে এলাকাবাসীর মনে খোকসার রটন্তি কালী পূজার মাহাত্ম্য গেঁথে থাকে। এই পূজা শুরু হওয়ার আগ থেকে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। পূজার সময় এলাকার প্রতি বাড়িতেই আত্মীয়-স্বজনরা আসে।
এই মেলার আরও বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে কাঁসা-পিতলের তৈজস পাত্র, লোহার কর্মকারের তৈরি দ্রব্য সামগ্রী — দা, কুড়াল, বটি, ইত্যাদি ছাড়াও বাঁশ, বেত, কাঠের হরেক রকমের সরঞ্জাম ও আসবাবপত্র পাওয়া যায়।
দূর দূরান্ত থেকে বিভিন্ন রকমের প্রসার সাজিয়ে দোকানিরা এখানে এক পক্ষ কালব্যাপী তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেন। এই পূজাকে কেন্দ্র করে এলাকায় অর্থনৈতিক শ্রী বৃদ্ধি ঘটে বলে জানা যায়।
কুষ্টিয়া টু রাজবাড়ী হাইওয়ের মাঝামাঝি খোকসা বাস স্ট্যান্ড থেকে কয়েকশো গজ দুরে খোকসা কালী মন্দির। তাছাড়াও দর্শনা টু গোয়ালন্দ রেলওয়ে মাঝামাঝি খোকসা রেলস্টেশন হওয়ায় এই রেল স্টেশনে নেমে একটু গেলেই এই কালী মন্দির।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।