শিবপুরী কাশী নগরীতে নতুন এসেছেন একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট। যেমন তিনি রাশভারী, তেমনি তিনি শাসনকার্যে দারুণ কড়া। কাশীর মহিমা সম্পর্কে সাহেব অনেকের মুখেই অনেক কাহিনি শুনেছেন—তাই এই সুপ্রাচীন নগরী সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ খুবই বেশি।
সেদিন তিনি নগর-পরিক্রমায় বেরিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এসে হাজির হয়েছেন দশাশ্বমেধ ঘাটে। হঠাৎ তাঁর চোখে পড়ল বিশালদেহী একজন নগ্ন মানুষ। সকলেই তাঁকে সচল বিশ্বনাথ বলে জানেন ও মানেন। তিনি তাঁর ইচ্ছেমতো কাশীতে ঘুরে বেড়ান—ভক্তরা তাঁকে শিবজ্ঞানে প্রণাম করেন। সকলেই তাঁকে ‘তৈলঙ্গস্বামী’ নামেই চেনেন। কিন্তু এই নতুন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট তো তাঁকে চেনেন না। তিনি এই উলঙ্গ সন্ন্যাসীকে দেখে রীতিমত ক্রুদ্ধ হলেন। তাঁর রাজত্বে এমন অশিষ্ট অনাচার তিনি কীভাবে সহ্য করেন?
রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে সেই ম্যাজিস্ট্রেট আদেশ দিলেন, ‘এই অসভ্য লোকটাকে এখনই গ্রেপ্তার করে ফাটকে পুরে দাও।’ যেমন আদেশ তেমন কাজ। সন্ন্যাসীকে তখনই ধরে এনে হাজতে বন্দি করে রাখা হলো। কাশীর অনেক গণ্যমান্য মানুষ বিভ্রান্ত ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটকে বোঝালেন, ‘সাহেব, এমন কর্ম করবেন না। ইনিই সাক্ষাৎ শিব।’ কিন্তু ক্ষমতাগর্বী ইংরেজ শাসক এসব অনুরোধে বিন্দুমাত্রও কর্ণপাত করলেন না।
পরদিন ভোরবেলা এই অদ্ভুত মানুষটিকে জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে হাজির হলেন হাজতের সামনে। সেখানে গিয়ে তো তাঁর চক্ষু চড়কগাছ। এমন দৃশ্য দেখা তো দূরের কথা, তিনি কল্পনাও করতে পারেননি। তিনি দেখলেন হাজতে বন্দি সেই বিস্ময়কর মানুষ আর হাজতের ভিতরে নেই। তিনি ততক্ষণে হাজতের বাইরে বেরিয়ে এসে বারান্দায় এতটাই নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন—যেন তাঁর কিছুই হয়নি। ম্যাজিস্ট্রেট একবার হাজতের দিকে তাকালেন, দেখলেন হাজতের দরজায় ইয়া বড়ো বড়ো দুটো তালা যথারীতি ঝুলছে—প্রহরীরাও যথারীতি পাহারা দিয়ে চলেছে। তবে এটা কেমন করে ঘটল? ম্যাজিস্ট্রেট বিস্তর ভাবনাচিন্তা করেও কোনও কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রথমেই রক্তচক্ষু হয়ে তিনি প্রহরীদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, কিন্তু কেউই কিছু বলতে পারলেন না। সকলের কাছেই এটা এক অলৌকিক ঘটনা। ওসব কথা বিশ্বাস না করে ম্যাজিস্ট্রেট নিজেই লোহার দরজা, হাজতের দেওয়াল, দরজা বন্ধ-তালা ও তার চাবি ইত্যাদি ব্যাপারে বারবার তন্নতন্ন করে অনুসন্ধান করলেন। কিন্তু বহু কসরৎ করেও কোনও কিছুই হদিশ করতে পারলেন না।

তাহলে এই রহস্যময় কয়েদি হাজতের বাইরে এলেন কীভাবে? ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের যুক্তি-বুদ্ধি সব যেন কেমন গুলিয়ে গেল। এবার তিনি গিয়ে দাঁড়ালেন তৈলঙ্গস্বামীর মুখোমুখি, গম্ভীরস্বরে প্রশ্ন করলেন—যোগী, আমার কাছে কিছু গোপন করার চেষ্টা করো না—সত্যি কথা বলো কী করে তুমি হাজতের বাইরে এলে?
এক রহস্যময় হাসিতে তৈলঙ্গস্বামী উদ্ভাসিত হয়ে উঠলেন, সহজ সরলভাবে বললেন, সারারাত ওই লোহার ঘরেই ছিলাম, কিন্তু সকালে আমার একটু বাইরে আসার ইচ্ছে হলো—আর ইচ্ছে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম—কোনও বাধা কোথাও পেলাম না।
এসব কথা ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বাস করলেন না। তিনি মনে মনে স্থিরনিশ্চয় হলেন যে, রক্ষীদের যোগসাজসেই এই যোগী বন্ধ হাজতের বাইরে চলে এসেছিল। তাই এবার আর তিনি কোনও ঝুঁকি নিলেন না। তৈলঙ্গস্বামীকে আবার হাজতে ঢুকিয়ে দিলেন এবং নিজের হাতে হাজতের লৌহকপাটে একটার জায়গায় দুটো তালা ঝুলিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, হাজতের চাবি জোড়া রেখে দিলেন নিজের কাছে। তারপর যথারীতি চলে গেলেন নিজের এজলাসে।
একটু পরেই ঘটল এক অদ্ভুত কাণ্ড। এজলাসে নিজের আসনে বসে ম্যাজিস্ট্রেট বিস্ফারিত নয়নে দেখলেন, এবার আর হাজতের বাইরে নয়, তাঁরই আদালত কক্ষের এককোণে দাঁড়িয়ে আছেন বিশালদেহী উলঙ্গ সন্ন্যাসী। ইংরেজ সাহেব নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না— ভাবছেন, এটা কী করে সম্ভব হলো। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন, হাজতের চাবি যথাস্থানেই আছে। এ যে একেবারেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের যখন দিশেহারা অবস্থা, ওদিকে তৈলঙ্গস্বামীর চোখে-মুখে তখন দুষ্টুমিভরা হাসি।
মহাযোগী তৈলঙ্গস্বামী এবার ধীর পদক্ষেপে সাহেবের সামনে এসে দাঁড়ালেন, শান্তস্বরে বললেন, ‘সাহেব, তুমি অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই শুধু জড় ও জড়ের শক্তিই বোঝো। এই বিশ্বসংসারের মধ্যেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এক মহাচৈতন্যলোক—তার খবর তোমার মোটেই জানা নেই। সেই চৈতন্যলোকের সঙ্গে যাঁর যোগাযোগ সাধিত হয়েছে, কোনও বন্ধনই তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।’
এবার সাহেবেরও চৈতন্য হলো। তিনি আদেশ দিলেন, এই যোগীপুরুষের স্বেচ্ছাবিহারকে কেউই যেন বাধা না দেয়। শেষের দিকে তৈলঙ্গস্বামী পঞ্চগঙ্গার ঘাটে বসেই দিন কাটাতেন। কাছেই ছিল মঙ্গল ভট্ট নামে এক মারাঠি ভক্ত ব্রাহ্মণের ছোট্ট একটা বাসা। প্রায় সাত বছর সাধ্যসাধনার পর মঙ্গল ভট্ট নিজের বাসায় এই মহাযোগীকে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।
সপ্তদশ শতকের প্রথম ভাগে অন্ধ্রপ্রদেশের ভিজিয়ানাগ্রাম অঞ্চলে হোলিয়া নামক এক সম্ভ্রান্ত জনপদ ছিল। এই গ্রামেই বাস করতেন নরসিংহ রাও। তাঁর পত্নীর নাম বিদ্যাবতী। বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত শিবলিঙ্গ। ১৬০৭ সালে বিদ্যাবতীর কোল আলো করে জন্ম নিল এক দেবশিশু—নাম শিবরাম। এই শিবরাম ভগীরথস্বামীর কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করে হলেন গণপতি সরস্বতী। কিন্তু সেই নাম আজ আর কারওর স্মরণে নেই। সাধনার সুদীর্ঘ ধারায় অবগাহন করে ১৮৪৪ সালের মাঘ মাসে তিনি এসে উপনীত হলেন শিবপুরী কাশীতে। তেলঙ্গ দেশ থেকে আগত এই সন্ন্যাসীকে কাশীর মানুষ তৈলঙ্গস্বামী নামেই অভিহিত করতে থাকেন এবং ওই নামেই তিনি সর্বত্র পরিচিত হন। তাঁকে সকলেই ‘সচল বিশ্বনাথ’ বলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। কাশীতে যে সকল দর্শনার্থী আসতেন, তাঁরা সকলেই বিশ্বনাথ, অন্নপূর্ণা, দুর্গামন্দির, দশাশ্বমেধ ও মণিকর্ণিকা ঘাট দর্শন করেই ছুটতেন ‘সচল বিশ্বনাথ’কে দর্শন করতে। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণও দু-বার তাঁকে দর্শন করতে আসেন।
সেবার উজ্জয়িনীর মহারাজা কাশীধামে এসেছেন। একদিন ব্যাস কাশী ও রামনগর দর্শন করে তিনি নৌকায় এপারে ফিরছেন। হঠাৎ তিনি বজরায় বসে দেখলেন, এক বিশাল দেহী সন্ন্যাসী গঙ্গার জলে ভেসে বেড়াচ্ছেন। মহারাজার সঙ্গীদের মধ্যে কেউ কেউ তৈলঙ্গস্বামীকে চিনতেন। তাঁরা মহারাজাকে ভাসমান সন্ন্যাসীর পরিচয়ও বললেন। তারপরই মহারাজা দেখলেন, সেই ভাসমান সন্ন্যাসী তাঁদের দিকেই ভাসতে ভাসতে আসছেন। ইতিমধ্যেই মহারাজাও সন্ন্যাসী সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছেন। তাই সকলে তাঁকে ধরাধরি করে বজরায় তুললেন। মহারাজা এবং তাঁর সঙ্গীরা তৈলঙ্গস্বামীকে প্রণাম নিবেদন করলেন।
ঠিক তখনই ঘটল বিপত্তিটা। তৈলঙ্গস্বামী ঠিক একটি সরল শিশুর মতোই একটা আচরণ করে বসলেন। তিনি মহারাজার কোমরে ঝোলানো মহামূল্যবান তরবারিটা নিয়ে খেলা করতে করতে আচমকা সেটাকে গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করলেন। কেউ কিছু বোঝার আগেই কাণ্ডটা ঘটে গেল। এই ঘটনায় মহারাজা ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন, কিন্তু মহাযোগী রহস্যময় হাসিতে বজরার উপর লুটিয়ে পড়লেন।
উজ্জয়িনীরাজের ওই তরবারি কোনও সাধারণ তরবারি ছিল না। ইংরেজ সরকার বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবে এই তরবারি মহারাজাকে দিয়েছিলেন। এমন এক তরবারি এভাবে হারিয়ে যাওয়ায় মহারাজা এতটাই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন যে, সকলের সব অনুরোধ অগ্রাহ্য করে তিনি সন্ন্যাসীকে কঠোর শাস্তি দিতে উদ্যত হলেন।
ইতিমধ্যে বজরা কাশীর ঘাটে এসে ভিড়েছে। মহারাজা তখনও তর্জন-গর্জন করে এই নাঙ্গা সাধুকে শাস্তি দেওয়ার হুমকি দিয়ে চলেছেন। তৈলঙ্গস্বামীর কিন্তু কোনও ভাবান্তর নেই। তিনি একেবারেই নির্বিকার। তারপর তিনি একটু হেসে তীরবর্তী গঙ্গার জলে নিজের হাতটা ডুবিয়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হাতে উঠে এসেছে দুটো তরবারি—দুটোই ঠিক মহারাজার তরবারির মতোই।
যোগীবর এবার মহারাজকে বললেন, ‘মহারাজ, আপনি চিনে নিন—কোনটা আপনার।’ মহারাজ পড়লেন মহা সমস্যায়—দুটোই যে একরকম। তখন যোগীবর বললেন, ‘মূর্খ, তুমি নিজের জিনিসটাই চিনে নিতে পারছ না। যে বস্তু তোমার নয়, তোমার সঙ্গে যাবে না—তারজন্য এত ক্রোধ?’ এবার তৈলঙ্গস্বামীই মহারাজের তরবারিটা তাঁর হাতে তুলে দিলেন। অপরটা নিক্ষেপ করলেন গঙ্গাগর্ভে।
কাশীর এই ‘সচল শিব’ জগতের এক বিস্ময়কর সাধক ১৮৮৭ সালের পৌষমাসে কাশীতেই নরলীলা সাঙ্গ করেন।