আজকের কলকাতায় ট্রাম থাকবে কি থাকবে না এ নিয়ে যথেষ্ট জল্পনা-কল্পনা চলেছে। যদিও পরিবহণ মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন সরকার ট্রাম তুলে দেবার পক্ষপাতি নয়। কারণ ‘কলকাতার নস্টালজিয়া’-র মধ্যে ট্রাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শতাধিক বছর পিছনে তাকালে দেখা যাবে কলকাতায় যেদিন ট্রামের উদ্ভাবন হয়েছিল, সেদিনও জল্পনা-কল্পনার অন্ত ছিল না। ১৮৬৭ সাল থেকে বাংলা সরকার ও ভারত সরকারের মধ্যে অনেক জল্পনা-কল্পনা, অনেক তোড়জোড়ের পর ট্রাম চালানোর অনুমতি পেল Justice of peace (১৮৬৭ সালে কলকাতার মিউনিসিপ্যালিটির ভার ছিল কয়েকজন ব্যক্তির হাতে, তাঁদের বলা হতো Justice of peace)-এর মনোনীত কমিটি। তারপরও চলল নানান রকম প্ল্যান-প্রোগ্রাম। অবশেষে সাব্যস্ত হলো — ট্রামগাড়ি টানবে ঘোড়ায়।
১৮৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে লাইন বসানো হলো। শিয়ালদা স্টেশন থেকে আরম্ভ হয়ে এই লাইন বৈঠকখানা রোড (সার্কুলার রোড), বৌবাজার স্ট্রিট ধরে গিয়ে ডালহৌসি স্কোয়ারে পৌঁছে, কাস্টমসের ভিতর দিয়ে স্ট্র্যান্ড রোডে পড়ে ওই রোড ধরে উত্তরে গিয়ে আর্মেনিয়ান ঘাটে শেষ হয়েছিল। এই লাইনে প্রথম গাড়ি চলে ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ সাল। যদিও ব্যবস্থাপনায় ঠিক হয়েছিল এ গাড়ি মাল বহন করবে, কিন্তু প্রথম দিন থেকেই দেখা গেল এ গাড়ি যাত্রী বহন করছে। ব্যবস্থাপনাটি জাস্টিস মনোনীত কমিটির হাতে থাকলেও ট্রামলাইন তৈরির খরচ জুগিয়েছিল বাংলা গভর্নমেন্ট। প্রতি মাসে ৫০০ টাকা লোকসান দিয়ে ৯ মাস পরে ২১ নভেম্বর ১৮৭৩ সালে এই ট্রাম উঠিয়ে দেওয়া হলো। ১৮৭৩ সালের ডিসেম্বর মাসে জাস্টিসরা ঠিক করলেন তাঁর ম্যাক অ্যালিস্টার নামে এক সাহেবকে গাড়ি-লাইন সবসুদ্ধ এক পয়সাও লাভ না রেখে পড়তা দামে বিক্রি করে দেবেন। কিন্তু বাংলার সরকার আপত্তি করায় শেষ পর্যন্ত লাইন ও গাড়িগুলো Dillwyn, Alfred Parish এবং Rabinson Souttar নামে তিনজন ইংরেজকে বিক্রি করে দেওয়া হয় বেশকিছু মুনাফা রেখে।

এই ঘটনার ৫ বছর পরে ১৮৭৮ সালে সারা কলকাতায় নিয়মিত ভাবে ট্রাম চালানোর প্রস্তাব কয়েকটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আসে। তার মধ্যে মিস্টার সৌটার ও প্যারিস ভ্রাতৃদ্বয়ের প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই তিনজনকে শহরময় ট্রাম চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। অনুমতি পেয়ে তাঁরা তাঁদের প্রস্তাব কাজে পরিণত করবার জন্য একটা সিন্ডিকেট বা কোম্পানি গঠন করেন। কোম্পানিটির নাম দেন — ক্যালকাটা ট্রামওয়েজ কোম্পানি। ১৮৭৯ সালে এই কোম্পানিকে তাঁরা তাঁদের ১৮৭৩ সালে কেনা ট্রামলাইন, গাড়ি ও অধিকার মাইল-পিছু ৪ হাজার পাউন্ড দরে বিক্রি করে দেয়। ১৮৭৯ সালের ২ অক্টোবর কলকাতা কর্পোরেশন ও কলকাতা ট্রামওয়েজ কোম্পানির মধ্যে এক চুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুসারে ট্রাম কোম্পানিকে প্রথমে ৮টি অঞ্চলে, পরে কর্পোরেশন ও গভর্নমেন্ট অনুমোদিত অন্যান্য অঞ্চলে একক ও জোড়া লাইন তৈরি ও রক্ষা করবার অধিকার দেওয়া হয়। ওই ৮টি অঞ্চল হলো —
১) শিয়ালদা স্টেশন থেকে বৌবাজার হয়ে ডালহৌসি স্কোয়ার। ২) চৌরঙ্গী রোড। ৩) চিৎপুর রোড। ৪) ধর্মতলা স্ট্রিট। ৫) স্ট্র্যান্ড রোড। ৬) শ্যামবাজার। ৭) খিদিরপুর। ৮) ওয়েলেসলি স্ট্রিট।

চুক্তির দ্বিতীয় শর্ত ছিল, কোম্পানি সময়ে সময়ে গাড়ির ভাড়া বেঁধে দিতে পারবে। কোম্পানি কলকাতা কর্পোরেশনকে পথের ভাড়া বাবদ দেবে একটা লাইনের জন্য ২ হাজার টাকা ও জোড়া লাইনের জন্য বছরে ৩ হাজার টাকা। চুক্তির ২২ বছর পরে (১৯০১ সালে) এই ভাড়া বেড়ে হবে যথাক্রমে ৩ ও ৪ হাজার টাকা। ২১ বছর শেষে (১৯০০ সালে) কর্পোরেশনের সমস্ত লাইন কিনে নেবার অধিকার থাকবে, আর যদি কিনে না নেয় তবে সে অধিকার বর্তাবে ৭ বছর অন্তর। শিয়ালদা-বৌবাজার প্রথম ট্রাম চলে পরীক্ষামূলক ভাবে ১৮৮০ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে। এবং সরকারিভাবে ১৮৮০ সালের ১ নভেম্বর থেকে। শিয়ালদা-বৌবাজার-ডালহৌসি হেয়ার স্ট্রিট লাইনে চলে একই সালের ১৯ নভেম্বর থেকে। তারপর খোলাহয় চিৎপুর লাইন। ১৮৮৪ সালে চিৎপুর সমেত বাকি ৬টি লাইনে ট্রাম চালু হয়।
শিয়ালদা-বৌবাজার ছিল প্রথম আঞ্চলিক ট্রাম লাইন। এটি শেষ হতো ডালহৌসি স্কোয়ারে নয়, ক্লাইভ স্ট্রিটের বেশ খানিকটা ভেতরে গিয়ে। ক্লাইভ স্ট্রিট তৎকালীন সময় ছিল সরু রাস্তা, তার ওপর ট্রামলাইন ছিল রাস্তার একপাশে নয়, ঠিক মাঝখানে। তাতে পথচারীদের যাওয়া-আসার ও যানবাহন চলাচলের খুবই অসুবিধা হতো। এই অবস্থা প্রায় ১৩ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৯৩ সাল পর্যন্ত বর্তমান ছিল। ১৮৯৩ সালে কর্পোরেশন এই লাইন প্রথমে রাস্তার একধারে সরিয়ে নিয়ে যায় ও পরে নতুন চীনাবাজার পর্যন্ত লাইনটিকে সরিয়ে নিয়ে এসে শেষ করে।

প্রথমে ট্রাম লাইন চওড়া ছিল ৩ ফুট ৩/৮ ইঞ্চি। ১৯০২ সালে কোম্পানি সব লাইন চওড়া করে দেয়। তখন ট্রাম লাইন চওড়ায় হয় ৪ ফুট সাড়ে ৮ ইঞ্চি। এখন ট্রামের কন্ডাক্টর ও ড্রাইভাররা যে খাকি পোশাক পড়ে গত দেড়শো বছর আগে তারা তা পড়ত না। তার পরিবর্তে মাথায় লাল পাগড়ি বাঁধত। সেই সময় ট্রামের একটি বিশেষ রং ছিল তাকে বলা হতো সি.টি.সি গ্রে। এক একটি ট্রামগাড়ি টানতে মোটা মোটা হাড়ওয়ালা একজোড়া ওয়েলার ঘোড়া রাখা হতো। তাদের ঘাড়ে ও মাথায় শোলার টুপি পরানো থাকত ও দুটো কান পাশের ছিদ্র দিয়ে টুপির ভিতর দিয়ে বেরিয়ে আসত।
১৮৯৩ সালে কলকাতার ৬টি ডিপোতে ট্রাম কোম্পানির সমস্ত ঘোড়াকে রাখা হতো। এই ৬টি ট্রামডিপো ছিল শ্যামাপুকুর, চিৎপুর, শিয়ালদা, কলিঙ্গা, ভবানীপুর ও খিদিরপুরে। ১৯০১ সাল পর্যন্ত ঘোড়ায় টানা ট্রামের যুগে ছিল একখানা করে গাড়ি। এক-এক দিকে ৫টি করে দুদিকে মোট দশটি খোলা দরজা থাকত এক-একটি গাড়িতে। ঢুকেই বেঞ্চিতে সামনাসামনি বসবার জায়গা ছিল— দুদিক দিয়ে ওঠা-নামা করা যেত। কালীঘাট লাইনের গাড়িগুলো আকারে একটু ছোট ছিল। সেগুলোর চারটি করে দরজা থাকত ও সেগুলোকে টানত একটি করে ঘোড়া। ১৯০৮-০৯ সালের আগে ট্রামস্টপ ছিল না, তার পরিবর্তে কতকগুলি স্টেশন ছিল। সেখানে ট্রামযাত্রীরা নেমে জলযোগ করতে পারত ও সেখানে ঘোড়া বদল করা হতো। বড় রাস্তায় এ-রকম এক মাইল অন্তর অন্তর স্টেশন বা ঘোড়া বদলের আস্তাবল ছিল। ট্রামগুলো টানবার জন্য যে ঘোড়াগুলো ব্যবহার করা হতো সেগুলি ছিল ঠাণ্ডা দেশের। তাদের একেই কলকাতার গরম সহ্য হতো না, তার ওপর মানুষ বোঝাই ভারি ভারি গাড়িগুলো টানতে হতো। ফলে ১৮৮১ সালে অনেক ঘোড়া সর্দ্দিগর্মিতে মারা যায়।

১৮৮২ সালের মে মাসে ট্রাম কোম্পানিকে চৌরঙ্গী লাইনে একমাসের জন্য স্ট্রিম ইঞ্জিন দ্বারা ট্রামগাড়ি চালাবার অনুমতি দেওয়া হয় পরীক্ষামূলকভাবে। এই একমাসের মধ্যে দুটি দুর্ঘটনা ঘটে, যদিও তাতে কোনও মানুষ মারা যাননি বা জখম হননি। একমাস পরে বাসিন্দারা চাইলে আরও ১১ মাসে স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে এই লাইনে গাড়ি চালাতে দেওয়া হয়। পরে স্টিম ইঞ্জিন দিয়ে গাড়ি গাড়ি চালানো বন্ধ করে দেওয়া হয়, কারণ এই লাইন কলকাতা মিউনিসিপ্যালিটির বাইরে ছিল। শুধুমাত্র প্রতি বছব দুর্গাপুজোর সময় কোম্পানি বিশেষ অনুমতি পেত চৌরঙ্গী রোডে বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালাবার। ১৮৮৩ সালে খিদিরপুর লাইনেও কিছুদিন বাষ্পীয় ইঞ্জিন দিয়ে ট্রামগাড়ি চালানো হয়েছিল। ১৮৯০-৯১ সালে ট্রাম কোম্পানির কর্মচারীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ২৫০ জন ও ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ১ হাজার।
১৮৯৯ সালে কলকাতা কর্পোরেশন ও ট্রাম কোম্পানির মধ্যে চুক্তি হয় যে ওই বছরের মধ্যেই কোম্পানি লাইনের প্রয়োজনীয় রদবদল করতে এবং ১৯০২ সালের ৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎশক্তি দিয়ে গাড়ি চালাবে। কোম্পানি ১৯০২ সালের ২৭ মার্চ খিদিরপুর লাইনে প্রথম বৈদ্যুতিক ট্রাম চালায় এবং ওই সালের ১৯ নভেম্বরের মধ্যেই সবকটি পুরাতন লাইনেই অশ্বশক্তির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক শক্তি প্রবর্তিত করে। এর পর ট্রাম কোম্পানি খুব দ্রুত গতিতেই ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে টালিগঞ্জ, বেলগাছিয়া, বাগবাজার, হ্যারিসন রোড, লোয়ার সার্কুলার রোড, আলিপুর ও বেহালা লাইন তৈরি করে ফেলে। তারপর দিন যত গেছে লাইনের সংখ্যাও তত বেড়েছিল। ট্রামগুলো প্রথম শ্রেণী ও দ্বিতীয় শ্রেণী নিয়ে ঘুরে বেড়াত লাইনগুলির ওপর দিয়ে। দ্বিতীয় শ্রেণীর থেকে প্রথম শ্রেণীর ভাড়া কিছুটা বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে এই শ্রেণী বিভাগ উঠে গেছে।এখনতো শীতাতপ নিয়ন্ত্রীত ট্রামও শহরে দেখা যায়।

বর্তমানে কম সংখ্যায় হলেও যে ট্রামগুলি আছে — তা অত্যন্ত আধুনিক। বলার অপেক্ষা রাখে না এখনও পর্যন্ত শহর কলকাতায় অন্যান্য গণপরিবহণের মধ্যে ট্রামের ভাড়া সব থেকে লোভনীয় পথচারীদের কাছে। কিন্তু তার গতি এখনও কম। পড়শি হাওড়া শহরে বৈদ্যুতিক ট্রাম চলাচল শুরু হয় ১৯০৫ সালে। ১৯৪৩ সালে দুই শহরের মধ্যে ট্রাম রুট চালু করা হয়। ধাপে ধাপে কলকাতা ও হাওড়ায় শাখা-প্রশাখা মেলতে থাকে ট্রামের নেটওয়ার্ক। এক সময় বাবাঘাটের গঙ্গার ধার দিয়েও ট্রাম চলত। হাইকোর্ট চত্বরে ছিল ট্রাম ডিপো। যদিও সেসব আজ ইতিহাস। শহর কলকাতায় ২০১৬ সালে ২৫টি ট্রাম রুট ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫টি রুটে ট্রাম চলত। আর এখন মাত্র ৩টি রুটে ট্রাম চলে। যদিও আশার আলো পরিবহন মন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম বন্ধ হয়ে যাওয়া ট্রাম রুটগুলি চালু করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছেন।