রবিবার প্রতীক্ষার অবসান। আরামবাগের পুরশুড়ার সৌভিক পাখিরা ও জয়দেব পরামানিক অবশেষে বাড়ি ফিরলেন। উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা সুড়ঙ্গে টানা ১৭দিন তাঁরা আটকে ছিলেন। রবিবার সকালে দুই যুবক গ্রামে ফিরতেই কার্যত উৎসব শুরু হয়ে যায়। বাবা-মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। বাসিন্দারা মালা পরিয়ে, বাতাসা ছিটিয়ে দু-জনকে বরণ করেন। সুড়ঙ্গে আটকা পড়েও তাঁরা হার মানেননি। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁদের অদম্য লড়াইকে কুর্নিশ জানান গ্রামবাসী। তাঁদের নামে জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয় গ্রাম। হরিণাখালি ও নিমডাঙি গ্রামে এদিন সকাল থেকেই ছিল উৎসবের মেজাজ। হবে নাই বা কেন, গ্রামের ছেলেরা ঘরে ফিরেছে যে। সৌভিক ও জয়দেব এদিন পুরশুড়ার তোকিপুর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই পরিবারের লোকজন ও পাড়া প্রতিবেশীরা মালা পরিয়ে স্বাগত জানান। গ্রামে ঢোকার সময় দু’জনের নামে জয়ধ্বনি দিয়ে এলাকার বাসিন্দারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। সন্তানকে কাছে পেয়ে আনন্দের বাঁধ ভাঙে সৌভিক ও জয়দেবের বাবা-মায়েদের। দু-জনের বাড়িতে সকাল থেকে পাড়া প্রতিবেশীদের ভিড় উপচে পড়ে। নিমডাঙি গ্রামের মানুষজন জয়দেবকে দেখতে দলে দলে ভিড় জমান। বয়স্ক মহিলারা মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করেন। অল্পবয়সিরা জয়দেবের নামে ঘন ঘন জয়ধ্বনি দেয়। বাবা তাপস পরামানিক তখন ছেলের পছন্দের খাবার আলু ভাজা, বেগুন ভাজা, খাসির মাংস রান্না করতে নিজেই রান্না ঘরে ঢুকে পড়েন। জয়দেবের মা তপতী পরামানিক বলেন, ১৭দিন ধরে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কেটেছে। মনে হতো বুকের উপর পাথর চাপা আছে। ছেলেকে কাছে পেয়ে এখন সব কষ্ট দূর হয়ে গিয়েছে। এখন চাই ছেলে কিছুদিন বাড়িতে থাকুক। জয়দেব বলেন, ভালো কাজ পেলে রাজ্যে থাকব। না হলে যেখানে কাজ করি, সেখানেই ফিরে যাব। তবে কিছুদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে চাই।
এদিকে হরিণাখালি গ্রামে সৌভিকের ছিল একই চিত্র। গ্রামের ছেলে ফিরতেই এলাকার বাসিন্দাদের আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায়। মা লক্ষ্মী পাখিরা ঘরে ঢোকার আগে স্থানীয় মন্দিরে ছেলেকে নিয়ে পুজো দিতে যান। তিনি বলেন, ছেলে কিছুদিন বাড়িতে থাকুক, এটাই চাই। রাজ্য সরকার ছেলের কাজের ব্যবস্থা করে দিক। তাহলে ঝুঁকি নিয়ে আর বাইরে কাজ করতে যেতে হবে না। মায়ের পাশে বসে সৌভিক বলেন, বাড়িতে ফিরতে পেরে ভালো লাগছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছুদিন কাটাতে চাই। সুড়ঙ্গে আটকে থাকার দিনগুলি আমাদের বদলে দিয়েছে। ভিতরে যখন আটকে ছিলাম তখন জানতাম, দেরি হলেও বেরতে পারব। তবে বাবা-মা দুর্ভাবনায় যেন ভেঙে না পড়েন, তার জন্য চিন্তা হতো। সারা দেশের মানুষ আমাদের জন্য চিন্তা করছিল জানতে পেরে অবাক হয়ে গিয়েছি। মানুষের এত ভালোবাসা, স্নেহ পেয়ে ভালো লাগছে। স্থানীয় মান্নাপাড়ার বাসিন্দা উত্তম মাজি বলেন, এদিন সৌভিকের জন্য সকাল থেকে অপেক্ষা করেছিলাম। এলাকার দু’টো ছেলে সুস্থভাবে বাড়ি ফিরে এসেছে। আজ গ্রামবাসীদের উৎসবের দিন।
উল্লেখ্য, উত্তরকাশীর অভিশপ্ত টানেলে ১৭ দিন আটকে ছিলেন ৪১ জন শ্রমিক। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় দীর্ঘদিন আটকে থাকার জেরে শরীরের পাশাপাশি তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ফলে পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই উদ্ধার হওয়ার পর শ্রমিকদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেল্থ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেসের ডা. দিনাকরণ ডির মতে মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে কয়েক মাস লেগে যেতে পারে। তাঁর কথায়, ৪১ জন শ্রমিকের মধ্যে অনেককেই ইনসমনিয়া (অনিদ্রা), দুঃস্বপ্ন, সুড়ঙ্গ ভেঙে পড়ার আতঙ্ক, উদ্বেগের মতো পোস্ট ট্রমাটিক ডিসঅর্ডারে ভুগতে পারে। এই সমস্যা ৩ থেকে ৬ মাস স্থায়ী হতে পারে।
প্রসঙ্গত, আটক শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভেবে তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলেছেন উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা। সুড়ঙ্গের মধ্যে ২ কিলোমিটার মতো ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখানে আলাদা আলাদা জায়গায় তাঁদের হাঁটতে, বিশ্রাম নিতে, কাজকর্ম করতে হয়েছিল।
অবসাদ এড়াতে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে, যোগ অভ্যাস, হাল্কা শারীরিক কসরত ও ক্যারাম খেলতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ডা. দিনাকরণের কথায়, অন্তত একবছর নিয়মিতভাবে তাঁদের শরীর ও মনের পরীক্ষা করা জরুরি। কারণ এতদিনের ধকল শ্রমিকদের কারও কারও চরিত্রের পরিবর্তন করে দিতে পারে। উত্তরকাশী জেলার শীর্ষ মেডিক্যাল আধিকারিক আরসিএস পানওয়ার বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্ববধানে প্রত্যেকের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা খতিয়ে দেখতে হবে।