গ্রাম পার্বতীপুর। বাসিন্দা মূলত মুসলান সম্প্রদায়। অথচ তাঁদের বাদ দিয়ে দুর্গাপ্রতিমার কথা ভাবাই যায় না। কারণ তাঁদের হাতেই তৈরি করা চুল ওঠে রাজ্যের প্রায় সর্বত্র পুজিত হওয়া দুর্গা প্রতিমা ও তাঁর ছেলে মেয়েদের মাথায়। কলকাতা থেকে প্রায় ৭০ মাইল দূরে হাওড়ার ডোমজুড় এলাকায় পার্বতীপুর গ্রাম। এখানকার শেখপাড়া, মল্লিকপাড়ার প্রায় ১০০টি সংখ্যালঘু মুসলিম পরিবারের রুটিরুজি আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রয়েছে শারদোৎসবের সঙ্গে। প্রতিমা ও মূর্তিতে ব্যবহৃত চুল তৈরি করেন তাঁরা। এবার করোনার কারণে শারদোৎবে নিয়ে নানা অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে রয়েছে। অনেক বড় বড় বাজেটের পুজো নম নম করে পুজো করার কথা ভাবছে। অনেকেই এই পরিস্থিতিতে পুজোর কথা ভাবতে পারছে না এখনও। এর যেমন প্রভাব পড়েছে মৃৎশিল্পীদের উপর, তেমনই জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তা ঘিরে ধরেছে পার্বতীপুরের মফিজুদ্দিন, ইব্রাহিমদের।

প্রতি বছর প্রায় তিরিশ হাজার প্রতিমার চুল হাওড়ার এই ছোট্ট গ্রাম থেকেই মৃৎশিল্পীদের কাছে সরবরাহ করা হয়। এই চুল তৈরির প্রধান উপাদান হল পাট। গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়বে রাস্তার দু’ধারে বাঁশে, মাটিতে বস্তার উপর শুকোচ্ছে সারি সারি কালো কুচকুচে চুল। এই পার্বতীপুরেরই শেখপাড়ায় বাস ৬০-৭০ ঘর মুসলমান পরিবারের। তাঁরা এই চুল বানান। পুজোর সময় যত দুর্গা প্রতিমা দেখে আমরা তারিফ করি, সেই সব প্রতিমার মাথায় কালো কুচকুচে কোঁকড়ানো চুল তৈরি করেছেন সম্ভবত এই শেখপাড়ার ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাসিন্দারা। শুধু দুর্গাই নয়, কালী, জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী প্রতিমার মাথায়ও শোভা পায় এই মুসলিম ভাইদের হাতে তৈরি চুল।

পঞ্চাশ বছরের উপর হয়ে গেল প্রতিমার চুল তৈরি করেই পেট চালায় এই গ্রাম। পরিচয় হলো রসিদ আলির সঙ্গে প্রায় ২৫ বছর হলো এই কাজ করছেন রসিদ। তার আগে প্রায় ৪৫ বছর ধরে এই কাজ করতেন তাঁর বাবা, দাদারা। প্রচুর খাটুনির কাজ এটি। বিস্তারিত পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে তৈরি করতে হয় এই কৃত্রিম চুল। প্রথমে পাট কিনে সেটা হাঁড়ির মধ্যে চুবিয়ে কালো রং করতে হয়। তারপর মান অনুসারে উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন— অনুসারে তিন ভাগে ভাগ করা হয় এই পাট। এর পর আঁশবঁটি দিয়ে সেই পাট কাটার পালা। তারপর চিরুনির মতো লোহার পেরেকে আঁচড়ে আঁচড়ে ছাড়ানো হয় জট। এর পর দ্বিতীয়বার আবার রং করা হয়। অবশেষে পাটকাঠিতে জড়িয়ে রোদে শুকোতে দিতে হয়। পাটকাঠিতে জড়ানোর অন্যতম কারণ, চুল যাতে কোঁকড়া হয়। এই কোঁকড়া চুলই আমরা দেখি প্রতিমার মাথায়।

গ্রামে মুসলিম পরিবার ছাড়াও কিছু অল্প হিন্দু পরিবার আছেন, যাঁরা এই কাজে হাত লাগান। কারিগর শেখ নুর হোসেন জানালেন, ২৫ বছর হলো এই কাজের এত চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। দুর্গাপুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো ও সরস্বতীপুজো — মূলত এই চারটি পুজোর সময় বেশি কাজ হয় পার্বতীপুরে। তবে চাহিদা বাড়ায় এখন সারা বছরই কম-বেশি কাজ চলতে থাকে। কিন্তু করোনা ও বর্ষার বিদায় বিলম্বিত হওয়ায় এই শিল্পেও মন্দা দেখা দিয়েছে। বর্ষার জন্য পাট শুকতে দেরি হচ্ছে।

চুলগুলি বিক্রি হয় গ্রস হিসেবে। এক আঁটিতে থাকে ১২ পিস চুল। আর এইরকম ১২ আঁটি নিয়ে তৈরি হয় এক গ্রস। এই এক গ্রস চুল তৈরির জন্য পাট কাটতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘন্টা। এই চুল যায় কলকাতার কুমোরটুলি ও বড়বাজারে। সেখান থেকে চুল যায় বিহার, উত্তরপ্রদেশ এমনকী বাংলাদেশেও।

এই কাজের সঙ্গে যুক্ত বেশিরভাগ মানুষ-ই অল্প শিক্ষিত। সাহায্যের অভাবে কঠিন সময়ে সবাই ধারেই মাল কেনা-বেচা করে। রোজগারের অনেকটা অংশ মহাজনকে দিয়ে দিতে হয়। সরকারি লোন পেলে ব্যবসার অনেক সুবিধা হতো বলে মত অধিকাংশ শিল্পীর। গরমকালে বেশি দাম দিয়ে পাট কিনতে হয় তাঁদের। প্রতিনিয়ত নানা অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের। মফিজুদ্দিনের কথায়, হিন্দু-ভাইদের শারদোৎসব মানে আমাদের ঘরেও নতুন জামাকাপড়, একটু ভালো খাওয়া-দাওয়া। খুশির আবহ গড়ে ওঠে গোটা গ্রামে। কারণ শেখপাড়া, মল্লিকপাড়ার ঘরে ঘরে টাকার জোগান আসে এই সময়ে। তবে এটা মানতেই হবে যে, এই অচিনপুরের আজানেই আছেন দেবী পার্বতী।
সুন্দর লেখা। অনেক অজানা বিষয় জানা হলো
বেশ।মা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল কে আনন্দ দেন।