| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ্য — রামমোহন: ব্রিস্টলে সূর্য ডোবার পালা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়

Reporter
মোহন গঙ্গোপাধ্যায় / ৫৪৬ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

ভারত পথিক। আধুনিক নবজাগরণের স্রষ্টা যে নামেই অভিহিত করা হোক না কেন তিনি আজও ভারতীয় মননে চির শ্বাশত। ২৭ সেপ্টেম্বর এই মনীষির প্রয়াণ দিবস। শেষ ক’টা দিন কীভাবে কাটিয়ে ছিলেন তা জানতে ইচ্ছে করে অনেকেরই। শেষের কথা বলতে গেলে যেটা ভাবনায় আসে তা হল — দিনান্তের সূর্য এবার একটু বিশ্রাম চায় পশ্চিমের প্রান্তে। ঠিক সে সময় রামমোহনের বন্ধুরা ব্রিস্টলে গিয়ে হাওয়া বদল করে কিছুদিন বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিলেন। পরিশ্রান্ত, অসুস্থ রামমোহনকে ব্রিস্টলে আমন্ত্রণ জানালেন তাঁর গুণগ্রাহী প্রিয় বন্ধু রেভারেন্ড ডাঃ কার্পেন্টার। তিনি ছিলেন মিস ক্যাসেলের অভিভাবক। মিস ক্যাসেলের বাবা মাইকেল ক্যাসেল ব্রিস্টলের একজন স্বনামধন্য বণিক ছিলেন। তিনি ডাঃ কার্পেন্টারের উপাসকমণ্ডলীর একজন সভ্য ছিলেন। অল্প বয়সেই তাঁর মৃত্যু হল এবং তার অল্প দিনের মধ্যে তাঁর স্ত্রীরও মৃত্যু হল। এই পরিস্থিতিতে কার্পেন্টারের উপর তাঁদের একমাত্র সন্তান মিস ক্যাসেলের তত্ত্বাবধানের ভার পড়ল। স্টেপলটোন গ্রোভে মিস ক্যাসেলের একটি বড়ো বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতেই রামমোহনের থাকার ব্যবস্থা হল। সেখানে মিস ক্যাসেল এবং তাঁর মাসি মিস কিডেল বাস করতেন। তাঁরাই রামমোহনের দায়িত্ব নিলেন। তাঁদের সঙ্গে থাকলেন ডেভিড হেয়ারের বোন মিস হেয়ার। রামমোহনের আগেই এখানে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁর পালিত পুত্র রাজারাম। এছাড়া রামমোহনের দুই ভৃত্য রামহরি ও রামরতন তো থাকলেনই। এখানে এসে রামমোহন অনেকটাই শান্তি পেলেন, কিন্তু শরীর সারার নাম নেই। ডাঃ কার্পেন্টার তাঁকে দেখার জন্য নিয়মিত আসতেন তবে রামমোহনের চিকিৎসার মূল দায়িত্ব ছিল সেই এলাকার বিখ্যাত ডাক্তার এস্টলিনের উপর। এখানে এসেও ব্যস্ততা কমল না রামমোহনের। কার্পেন্টার যেখানে আচার্য হিসাবে ছিলেন সেই উপাসনালয়ে দুটি রবিবার তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন। তাছাড়া স্টেপলটনগ্রোভের বাড়িতে বহু মানুষ নিয়মিত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। ১১ সেপ্টেম্বর এই বাড়িতে রামমোহনের সঙ্গে কথোপকথনের জন্য বহু সুপণ্ডিত মানুষ আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন। তাঁরা রামমোহনের অসাধারণ জ্ঞান, প্রতিভা ও তর্কশক্তি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এদিন প্রায় তিন ঘন্টা ধরে সবার সব প্রশ্নের যুক্তিসংগত উত্তর দিয়েছিলেন তিনি। এই সভায় সুপ্রসিদ্ধ প্রাবন্ধিক রেভারেন্ড জন ফস্টরও উপস্থিত ছিলেন। স্টেপলটনগ্রোভে রামমোহনের পাশের বাড়িতেই তিনি থাকতেন। কিন্তু প্রথমত রামমোহন সম্পর্কে তাঁর ভালো ধারণা ছিল না। অর্থাৎ তিনি তাঁকে কোনো কারণে অপছন্দ করতেন। তাঁর নিজের জীবন চরিতে এই প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে আমার প্রবল কুসংস্কার ছিল। তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু যখন মিস ক্যাসেলের বাড়িতে আসলেন, তখন না গিয়ে থাকতে পারলাম না। তাঁর সঙ্গে বসে কথাবার্তা শুরু করতে আধ ঘন্টার মধ্যেই সব কুসংস্কার কেটে গেল। তিনি অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও মনোরম মানুষ ছিলেন। তিনি যে বুদ্ধিমান ও সুপণ্ডিত তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরল, বন্ধুভাবাপন্ন এবং সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। অনেক লোকের সঙ্গে একত্রে দুটি সন্ধ্যা তাঁকে আমি পেয়েছিলাম। শেষ দিন ভারতীয় দার্শনিকদের কয়েকটি মত বিষয়ে এবং হিন্দুদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও নৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে তাঁর সঙ্গে বিশেষভাবে আমার কথোপকথন হয়েছিল।’ ডাঃ কার্পেন্টার লিখেছেন, ‘১৭ সেপ্টেম্বর সকালে আমার সঙ্গে তাঁর এই জীবনের শেষ দেখা হয়েছিল। সকালে তাঁর প্রাতঃরাসে আসতে দেরি হয়েছিল। তাঁকে দেখে আমার মনে হল, আগের দিনের পরিশ্রম ও উৎসাহে তিনি শ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। আমি ব্যগ্রভাবে তাঁকে সেদিন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য অনুরোধ করলাম। তাঁর সম্পূর্ণ বিশ্রাম নেওয়ার দিন যে সমাগত তা তিনি নিজে ছাড়া আমরা কেউ ভাবতেও পারিনি। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে এবং এসটলিন সাহেবের মায়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ-আলোচনা করেছিলেন।’ ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে জ্বর শুরু হল। ডাঃ এসটলিন ওষুধ দিলেন, কিন্তু জ্বর বাড়তেই থাকল। ডাঃ প্রিচার্ড ও ডাঃ ক্যারিককে ডাকা হল, তবু সেই জ্বরের আর উপশম হল না। নাড়ি ক্রমেই ক্ষীণ হতে শুরু করল। শ্বাসকষ্ট ও প্রচণ্ড মাথার যন্ত্রণা শুরু হল। ডেভিড হেয়ার সাহেবের বোন মিস হেয়ার রাত্রি দিন তাঁর সেবা করতে লাগলেন। এমনকি মিস ক্যাসেল প্রাণপাত সেবা করতে লাগলেন, কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। এই সময়ের বর্ণনায় সেখানে থাকা মিস কালেট লিখেছেন, ‘রাজা যতক্ষণ জেগে থাকতেন প্রায় সব সময়ই তিনি উপাসনায় কাটাতেন। তাঁর মনে কী কষ্ট হচ্ছিল, কী কথা বলার জন্য তিনি ব্যাকুল ছিলেন তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। তাঁর মুখ থেকে শুধু একটা শব্দ উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর অতি প্রিয় “ও” শব্দটি। বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মধ্যে উদার ও পবিত্র মানসিকতা জাগ্রত করার জন্য যে মানুষটি শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে সংগ্রাম করে গেছেন, আজ সবাই কাছে থাকলেও তিনি নিঃসঙ্গ। মহামরণের পথে তিল তিল করে এগিয়ে যাওয়ার সময় পরম ব্রহ্মের কাছে নিজেকে সমর্পণ করার জন্য উপাসনাই তাঁর এক মাত্র পথ ছিল। খুব দ্রুত তিনি সংজ্ঞা হারাতে লাগলেন। কথা বলার মতো শক্তি তাঁর ছিল না। যখনই কিছুক্ষণের জন্য তিনি সংজ্ঞা ফিরে পাচ্ছিলেন তখনই তিনি চার পাশে বন্ধুদের তাঁকে সেবা করার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছিলেন।’ এই সময় রামমোহনের চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন ডাঃ এস্টলিন, ডাঃ কার্পেন্টার তো ছিলেনই আর ছিলেন প্রখ্যাত ডাঃ প্রিচার্ড ও ডাঃ ক্যারিক। তবুও কোনো চিকিৎসাতেই সারা দিচ্ছিলেন না তিনি। ডাঃ এস্টলিনের দিনলিপিতে রামমোহনের মৃত্যুশয্যার বিবরণ পাওয়া গেছে। মিস কার্পেন্টার তাঁর ‘দ্য লাস্ট ডেজ ইন ইংল্যান্ড অফ রাজা রামমোহন রয়’ গ্রন্থে তা প্রকাশ করেছেন। আমরা তার সারমর্ম এখানে অনুবাদ করে দিলাম।

ডা. এসটলিন সাহেবের দিনলিপি সোমবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে আমি রামমোহন রায়কে দেখতে গেলাম। তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত হৃদয়ছোঁয়া কথাবার্তা হল। তিনি স্পষ্টভাবে বললেন যে, তিনি খ্রিস্টের জীবনে ঈশ্বর বিশ্বাস করেন। তাঁর বিবেচনায় খ্রিস্ট ধর্মের আন্তরিক প্রমাণ, নতুন বাইবেলের ঐতিহাসিক প্রমাণ অপেক্ষা প্রবলতর। হিন্দুস্থানী ভাষা থেকে অনুবাদিত একটি মোটা পুস্তিকা তিনি আমাকে দিলেন। অধ্যাপক “লি” বলেন যে, রামমোহন রায় খ্রিস্ট ধর্মের ঐশিক উৎপত্তি অস্বীকার করেন, সেই কথা আমি তাঁকে জানালাম। তিনি বললেন যে, তিনি যিশু খ্রিস্টের ঈশ্বরত্ব অস্বীকার করেছেন কিন্তু তাঁর জীবনে ঈশ্বর নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অস্বীকার করেননি।

বুধবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ ডাক্তার কার্পেন্টারের সঙ্গে স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে আহার করতে গেলাম। সেখানে ডাঃ জেরার্ড, ডাঃ সিমন্স, মিঃ ফস্টর, মিঃ ব্রুস, মিঃ ওয়ার্সলি, মিঃ স্পল্যান্ড প্রমুখের সঙ্গে দেখা হল। খাওয়ার সময় অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কথোপকথন করছিলেন রামমোহন। যে মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ভাবনার দ্বারা রামমোহন ধর্ম সম্পর্কে তাঁর বর্তমান চিন্তাধারায় এসেছেন তার ব্যাখ্যা করলেন। বৃহস্পতিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ গত রাতে এখানেই ঘুমিয়েছিলাম। প্রাতরাসের সময় অনেক আন্তরিক কথাবার্তা হয়েছিল। আমি রামমোহনের কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ার কাফ্রিদের বিবরণ দিচ্ছিলাম। তাদের সম্পর্কে ইতিমধ্যে খ্রিস্টান মিশনারিদের কাছে তিনি জেনেছিলেন তাই আমার বক্তব্যে তাঁর আগ্রহ ছিল না। মিস কিডেল, মিস ক্যাসেল, রাজা ও আমি তাঁদের গাড়িতে ব্রিস্টল শহরে এলাম। আমার পোষা মৌমাছি দেখবার জন্য তিনি ৪৭ নং পার্কস্ট্রিট ভবনে নামলেন। সেগুলি দেখে তিনি খুশি হলেন।

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ দুপুর ২টায় সমস্ত রোগী দেখলাম। ৪টার সময় ফ্রেঞ্চে গেলাম। সেখানে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ ছিল। রাজা, মিস ক্যাসেল, ডাঃ জেরার্ড, ডবলিনবাসী ক্যারি সাহেব, মিঃ ব্রুস, জে কোটস্ প্রমুখ সেখানে ছিলেন। রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। রিফর্ম পাশের সময় হুইগ- দল যেরকম ব্যবহার করেছিলেন রাজা রামমোহন রায় তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন।

শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ আমি স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে গেলাম। সেখানে ডাঃ কার্পেন্টারের সঙ্গে দেখা হল। রাজা খুব খুশিমনে কথাবার্তা বললেন। সেখানেই খাওয়াদাওয়া হল। রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ মিস কিডেলের গাড়িতে রাজা উপাসনালয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে ও মেরিকে সেই গাড়িতে তুলে নিলেন। আমি রাজাকে ‘Physical History of Man’ নামে ডাঃ পিচার্ড-এর একটি বই দিলাম। সেটি আমি তাঁর কাছ থেকে রামমোহনের পড়ার জন্য চেয়ে এনেছিলাম। মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ রামমোহন রায়কে দেখতে আমার মা আজ সন্ধ্যায় দু-এক দিনের জন্য স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে গেলেন। বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ আমি আমার মাকে দেখার জন্য ঘোড়ায় চড়ে স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে গেলাম। দেখলাম, সূর্য ডোবার পালা রাজার দুঃখ হয়েছে। তিনি আমাকে দেখে খুশি হলেন। আমি তাঁর জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করলাম। রাত্রি আটটার সময় রাজার গাড়ি আবার আমাকে নিতে এল। দেখলাম, তিনি আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন, কিন্তু এখনও অল্প জ্বর আছে। জন হেয়ার এবং মিস হেয়ার সেখানে ছিলেন। তাঁরা সেখানেই রামমোহন রায়ের সঙ্গে থাকছেন। আমিও থেকে গেলাম। শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ রাজা আগের চেয়ে ভালো নাই। রাজার গাড়িতে দুইটার সময় বাড়ি ফিরে এলাম। পুনরায় সেখানে গেলাম। রাজার খুব মাথার যন্ত্রণা হচ্ছিল। ওষুধ দিতে তা কিছুটা কমল। সন্ধ্যায় তিনি ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চোখ খোলা ছিল। এগারোটার সময় তাঁর ঘুম ভাঙল। আমি দেখলাম, তাঁর হাত-পায়ের পাতা ক্রমশ অত্যন্ত ঠান্ডা হয়ে আসছে। তাঁর নাড়ি একশো ত্রিশ এবং দুর্বল; ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছিল। গরম জল, কিছুটা সুরা এবং গরম সেঁক দিতে একটু উপকার হল। কিন্তু তাঁর অস্থিরতা বেড়ে গেল। একবার বিছানায়, একবার সোফায় বার বার স্থান পরিবর্তন করে শুতে এবং ছটফট করতে লাগলেন। আমি আজ তাঁকে অনুরোধ করলাম, তিনি যেন মিস হেয়ারকে সর্বদা কাছে থাকার অনুমতি দেন। তিনি প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না। আমি বললাম, এদেশের প্রথা অনুসারে তা কোনো দোষের কাজ নয়। তাতে তিনি সম্মত হলেন। আমি মিস হেয়ারকে রাজার কাছে থাকতে বললাম। আমি যেভাবে রাজার সেবা করছিলাম তাতে তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আজ রাতে আমি রাজার জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ছিলাম। মাকে বললাম, যদি রাজা এর চেয়ে ভালো না থাকেন তবে আমার প্রস্তাব ডাঃ প্রিচার্ড সাহেব যেন তাঁকে একবার দেখেন। শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ মিস হেয়ার রাজার কাছে বসেছিলেন। রাতে তিনি কেমন ছিলেন সে কথা তাঁর কাছ থেকে জেনেছিলাম। আমি সকালে তাঁকে দেখলাম, তাঁর নাড়ি আগের চেয়ে ভালো। তিনি আগের চেয়ে ভালো আছেন। তবে জিহ্বার অবস্থা ভালো নয়। মিস কিডেল প্রস্তাব করলেন, ডাঃ প্রিচার্ডকে আনিয়ে দেখানো হোক। আমি খুশি হয়ে তাতে সম্মতি দিলাম। ব্রিস্টলে গিয়ে কিছু রোগী দেখলাম। সন্ধ্যা পাঁচটার সময় ডাঃ প্রিচার্ডকে সঙ্গে নিয়ে স্টেপলটনগ্রোভ ভবনে গেলাম। ডাঃ প্রিচার্ডকে আনার কথা রাজাকে অগে শোনানো হয়নি। প্রিচার্ড আসাতে রাজা অসন্তোষ প্রকাশ করলেন। এখানে হেয়ার সাহেবের সঙ্গে দেখা হল। তিনি অবশ্য পিচার্ডকে আনার ব্যাপারটি অনুমোদন করলেন। আমি এগারোটার সময় শুয়ে পড়লাম। মিস হেয়ার রাজার শয্যার পাশে বসে থাকলেন। রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ খুব সকাল পর্যন্ত রাজা অত্যন্ত অস্থির ছিলেন। সকালে ঘুমিয়েছিলেন। চোখ বড়ো করে খোলা ছিল। সাড়ে এগারোটার সময় প্রিচার্ড এলেন। আমি তাঁর সঙ্গে ভিতরে গেলাম। হেয়ার সাহেবও বাইরে এলেন। সন্ধ্যায় রাজা আগের চেয়ে ভালো ছিলেন। তিনি বললেন, যখন প্রিচার্ড, হেয়ার এবং আমি তাঁর কাছে আছি, তখন যদি তাঁর মৃত্যু উপস্থিত হয়, তাহলেও এই সন্তোষ থাকবে যে, ব্রিস্টলে চিকিৎসা সম্পর্কে যতদূর ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তা তাঁর পক্ষে করা গেছে। মেরি এবং আমার মা মিস ক্যাসেলের গাড়িতে উপাসনালয়ে ঘুরে এলেন। মিস হেয়ার অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে রাজার সেবা করছিলেন। রাজার উপর তাঁর প্রভাব খুব খাটত। আমার চেয়েও অতি সহজে তিনি রাজাকে ওষুধ খাওয়াতে পারেন। রাজা তাঁকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। তিনিও রাজাকে পিতার মতো শ্রদ্ধা-ভক্তি করেন। সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ আমি ভোর পাঁচটার একটু আগে ঘুম থেকে উঠলাম। রাজা রাতে বড়ো অস্থির ছিলেন। মাঝে মাঝে চোখ খুলে ঘুমাচ্ছিলেন। সমস্ত দিন খুব যন্ত্রণা পেয়েছেন। কেউ কাছে আছে কি না সেটাও বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু তাঁকে যখন সচেতন করা হত, তখন তাঁর পুরো আত্মসংযম থাকত। রাজাকে এই অবস্থায় দেখে কী ঘটবে সে বিষয়ে আমার খুব ভয় হচ্ছিল। তবুও তাঁর আরোগ্য এবং মৃত্যু উভয়ই সম্ভব বলে মনে হচ্ছিল। সকালে মিস হেয়ার বললেন, অন্য কোনো ডাক্তার এনে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করা উচিৎ। আমিও সেই অনুরোধ করলাম। হেয়ার সাহেব বিবেচনা করলেন যে, প্রয়োজন না হলেও রামমোহনের মতো এরকম একজন খ্যাতনামা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির জন্য আরো চিকিৎসক আনিয়ে পরামর্শ গ্রহণ করা উচিৎ। প্রধানত হেয়ার সাহেবের পরামর্শে ডাঃ ক্যারিকে আনা হল। তিনি সন্ধ্যেবেলা প্রিচার্ডের সঙ্গে এলেন। সমস্ত শরীরযন্ত্রের মধ্যে মস্তিষ্কই সবচেয়ে বেশি রোগাক্রান্ত বলে মন হল। তবে রাতে রাজা কিছুটা ভালো ছিলেন। আমি তাঁর সেবা করছিলাম বলে তিনি আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। অত্যন্ত স্নেহের সঙ্গে তিনি আমার দিকে তাকালেন। এবং সর্বদা আমার হাত ধরে থাকলেন। সকালে গরম জলে তাঁর দেহ পরিস্কার করে দিয়েছিলাম। মনে হল রাত্রে কিছুটা ভালো ছিলেন। মঙ্গলবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ হেয়ার সাহেব, মিস হেয়ার এবং বালক রাজারাম রাজার পাশে বসে তাঁর সেবা করছিলেন। এগারোটার সময় চলে গিয়েছিলাম। পাঁচটার পর আবার ফিরে এলাম। গত রাত্রির চেয়ে রাজার নাড়ি কিছুটা ভালো। মোটামুটি তিনি আগের চেয়ে মন্দ নাই। ক্যারিক ও প্রিচার্ড দুইটার সময় এলেন। দিনের বেলা অনেকটা স্থির ছিলেন এবং অনেকটা শান্তভাবে ঘুমাচ্ছিলেন। কিন্তু চোখ খোলা ছিল। সন্ধ্যায় ও রাত্রে অবস্থা খারাপের দিকে ছিল। ২৬ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার গত রাতে অধিকাংশ সময় হেয়ার সাহেব তাঁর সেবা করেছিলেন। রাত তিনটে চারটে নাগাদ তিনি আমাকে খবর দিলেন যে, রাজার নাড়ি কখনও ক্ষীণ, কখনও দ্রুত। এতে তিনি খুবই উদ্বিগ্ন। রাতে রাজা ভালো করে ঘুমোতেই পারেননি। ডা. ক্যারিক এগারোটার সময় এলেন। প্রিচার্ড আসার আগেই মিস হেয়ার আমাদের রোগীর ঘরে ডেকে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, রোগীর ধনুষ্টংকার হয়েছে, মুখ বেঁকে যাচ্ছে। একঘন্টা থেকে দুঘন্টা কমবেশি এরকম চলল। আমরা যে তাঁর ঘরে আছি সেটা তিনি অনুভব করতে পারেননি। অথচ সেদিন সকালেই যখন আমি তাঁর কাছে গিয়েছি, তিনি আমাকে দেখে মৃদু হেসেছেন এবং সস্নেহে করমর্দন করেছেন। আমরা তাঁর মাথার চুল কেটে মাথায় ঠাণ্ডা জল ঢালতে লাগলাম। ধনুষ্টংকার থেমে গেলে মনে হল তিনি ঘুমাচ্ছেন। কিন্তু চোখ দুটি তখনও খোলা। দেখে মনে হল, চোখের মণি ছোটো হয়ে গেছে। বাঁ হাত এবং পা অবশ হয়ে গেছে। আমরা ঠিক করলাম, সন্ধেবেলা ডাঃ বার্নাডকে ডেকে আনা হবে। সমস্ত দিন এখানে উদ্বেগের মধ্যে কাটালাম। বিকেলে রাজার শরীর কিছুটা গরম হল এবং নাড়ির গতি বাড়ল। কিন্তু সাড়ে ছটার সময় আবার ধনুষ্টংকার শুরু হল। কয়েক ঘন্টা ধরে অনেক চেষ্টা করে সামান্য কিছু খাবার খাওয়ানো সম্ভব হল। রাজা অত্যন্ত দুর্বল, কিন্তু তাঁর শরীরের পুষ্টির জন্য আর কিছু খাবার খাওয়ানো সম্ভব হল না। সকালে রাজা আমার দিকে একবার তাকিয়ে ধন্যবাদ জানালেন। তারপর থেকে আর জ্ঞান ছিল না। ডাঃ বার্নাড আসতে পারলেন না। প্রিচার্ড এবং ক্যারিক রাজাকে মুমূর্ষু অবস্থায় রেখে সূর্য ডোবার পালার মাঝে রাজাকে দেখে আসছিলেন। কুমারী হেয়ার, জন হেয়ার চলে গেলেন। মধ্যরাত্রির আগে কেউই ঘুমোতে যায়নি। কিডেল অনেকটা সময় রাজার ও রাজারাম সর্বক্ষণ রাজার কাছে ছিলেন, কেউই রোগীর ঘরের বাইরে আসেননি, আমার মা মাঝে মাঝে রোগীর কাছে যাচ্ছিলেন।

অবশেষে এল সেই দিন ২৭ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৩ । শুক্রবার । প্রতি মুহর্তে রাজার অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তাঁর নিশ্বাস দ্রুত অথচ ক্ষীণ হচ্ছিল। তাঁর নাড়ি প্রায় অনুভব করা যাচ্ছিল না। তিনি ডান হাত ক্রমাগত নাড়ছিলেন এবং তাঁর মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে বাঁ হাত নেড়েছিলেন। সেদিন ছিল সুন্দর জ্যোৎস্নার রাত্রি। মিস হেয়ার, মিস কিডেল এবং আমি জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখলাম গ্রামীন পরিবেশে রাত্রির শান্ত নিস্তব্ধতা। এক দিকে এই শান্ত নীরবতার দৃশ্য, আর অপরদিকে এই অসাধারণ পুরুষের প্রয়াণ হচ্ছে। এই মুহূর্তের কথা আমি কখনোই ভুলব না। মিস হেয়ার সব আশা ছেড়ে দিয়ে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। এতদিনের সেবা ও যাবতীয় পরিচর্যা সবই নিষ্ফল। তিনি পাশের একটি চেয়ারে বসে নিঃশব্দে কাঁদছেন। বালক রাজারাম বোধহয় বুঝতে পারেননি, তাই রাজার হাত ধরে বসে আছে। রাত প্রায় দেড়টার সময় আমাদের শ্রদ্ধেয় বন্ধুর দেহ থেকে দ্রুত জীবনস্রোত চলে যাচ্ছিল। তাঁর চার পাশের সকলের পক্ষে তা অভিনিবিষ্ট হয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। মিস কিডেল যাতে ভেঙে না পড়েন সে জন্য আমি পোশাক না বদলিয়েই শয়ন করলাম। রাত আড়াইটার সময় হেয়ার সাহেব আমার ঘরে এসে বললেন, ‘সব শেষ’। রাজার চিবুক ধরে হাঁটু গেড়ে তাঁর পাশে বসেছিলেন মিস হেয়ার, বালক রাজারাম, মিস কিডেল, হেয়ার সাহেব, আমার মা, মিস ক্যাসেল, রামহরি এবং দু-একজন ভৃত্য। রাত দুটো বেজে পঁচিশ মিনিটের সময় রাজা রামমোহন রায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। রাজার শেষ সময়ে হেয়ার সাহেবের ইচ্ছায় ব্রাহ্মণদের প্রচলিত সংস্কার অনুযায়ী কিছু মন্ত্র পড়ে প্রার্থনা করলেন। স্ত্রীলোকেরা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে আমরা রাজার দেহ মাদুরের উপর সোজা করে শুইয়ে দিলাম। জনৈক এক ভাস্কর (মার্বেল পাথরের মিস্ত্রী) একজন ইতালীয়বাসীর সঙ্গে এলেন। তিনি রাজার মাথা ও মুখের প্রতিমূর্তি নিলেন। হেয়ার সাহেব এবং আমি ব্রিস্টল নগরে গেলাম। রাজার দেহ পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করে এলাম। শনিবার রাজার দেহ পোস্টমর্টেম হল। পরীক্ষায় জানা গেল, তাঁর মস্তিষ্কের প্রদাহ হয়েছিল। মাথায় জলের মতো কিছু তরল পদার্থ ছিল এবং তা পুঁজের মতো আস্তরণ দিয়ে ঢাকা ছিল। মাথার খুলির সঙ্গে মস্তিষ্ক জুড়ে গিয়েছিল। সম্ভবত সেটা পূর্ববর্তী কোনো রোগের ফল। বুক এবং পেটে কোনো অসুখ ছিল না। জ্বরের জন্য জীবনীশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। আর মস্তিষ্কে প্রদাহ হলেও সাধারণভাবে তার যে পরিমাণ বাহ্য চিহ্ন প্রকাশ পায়, তা আদৌ ছিল না।” ৬১ বছর ৪ মাস ৫দিন বয়সে লোকান্তরিত হলেন রাজা রামমোহন রায়। পুবের আকাশ আলো করে যে জ্যোতিষ্ক একদিন আবির্ভূত হয়েছিলেন, সারা জগৎ প্রদক্ষিণ করে শেষে অস্তমিত হলেন পশ্চিমের আকাশে। রামমোহনের শেষ ইচ্ছে ছিল, যদি তিনি ইংল্যান্ডে মারা যান তাহলে বহুজনের ভিড়ে কবরখানায় সমাধিস্থ না করে আলাদা কোনো জায়গায় নির্জন বৃক্ষরাজি দিয়ে ঘেরা একখণ্ড জমি কিনে সেখানে যেন তাঁকে সমাধিস্ত করা হয়। লোকালয় থেকে দূরে সেখানে নিস্তব্ধতা ভাঙার জন্য কেবল পাখ – পাখালির ডাক আর পাতার মর্মর ধ্বনি ছাড়া অন্য কোনো কোলাহল না থাকে। সেই মতোই মিস ক্যাসেলের প্রস্তাব অনুযায়ী স্টেপলটনগ্রোভে তাঁর বাগানে রামমোহনকে সমাধিস্থ করা হয়। ১৮ অক্টোবর শুক্রবার বেলা ২টায় নিঃশব্দে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হল। একটি কফিনের মধ্যে তাঁর দেহ বয়ে আনা হল। তাঁর দেহে কোনো আচ্ছাদন দেওয়া হয়নি, কোনো ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান হয়নি। শুধু রামরত্ন এবং রামহরি শব্দ করে কাঁদছিলেন। শেষ সময়ে দেখা গেল, যে রামমোহনকে সবাই ধর্ম বিদ্বেষী বলে, সংস্কারহীন বলে গালমন্দ করত তাঁর শরীরে সযত্নে রাখা ছিল তাঁর যজ্ঞ-উপবীত, যা তিনি কখনও পরিত্যাগ করেননি। এই শেষকৃত্য সম্পর্কে মিঃ সিলিনের মা লিখেছেন, ‘সেই দৃশ্যটি সবার মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। দুই দিকে সারি সারি গাছের মধ্যে দিয়ে আমরা সমাধিস্থলে পৌঁছালাম। সমাধিস্থলের চারদিকে আমরা দাঁড়ালাম। সকলের চোখ কফিনের মধ্যে রাজার সুন্দর শান্ত বিরল-প্রতিভার মুখমণ্ডলের দিকে। রাজা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। পাছে আমাদের গুঞ্জনে তাঁর চির-বিশ্রামের কোনো ব্যাঘাত ঘটে, সেজন্য সকলেই তাঁদের কান্না চেপে রেখেছেন। কেবল রাজার দুজন ভৃত্য শেষবারের মতো তাঁদের প্রভুর দিকে তাকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।’ পরে এই জায়গা নিয়ে সমস্যা তৈরি হলে ১৮৩৪ এর ২৯ মে রামমোহনের বন্ধু প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ব্রিস্টলের আর্নোস ভেলে স্থায়ীভাবে শবাধারটি স্থানান্তরিত করেন এবং সেখানে অপূর্ব একটি স্মৃতি মন্দির স্থাপন করেন। পরবর্তীকালে কায়বা গ্রামের অনুপ রায় এবং রাধানগর পল্লিসমিতির উদ্যোগে সেই সমাধি মন্দিরের অনুকরণে একটি সমাধি মন্দির নির্মিত হয়েছে রাধানগরে। এই রকম আর একটি সমাধিমন্দির হরিনাভিতেও নির্মাণ করা হয়েছে। প্রয়াণ দিবসেএই মহামানবকে সশ্রদ্ধচিত্তে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করতেই হয়।

তথ্য সূত্র : যুগস্রষ্টা রামমোহন — দেবাশিস শেঠ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev