ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ
মহারাষ্ট্রের নাসিক শহর থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে ত্রিম্বক শহর। ত্রিম্বক থেকে নয় কিলোমিটার দূরে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের দশম জ্যোতির্লিঙ্গ ত্র্যম্বকেশ্বর। এখানে শিবের সঙ্গে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুকেও পুজো করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এখানকার শিবের জ্যোতির্লিঙ্গকে বলেন ত্রিম্বকেশ। ত্রিম্বকেশ্বর শহরের ব্রহ্মগিরি পাহাড় থেকে গোদাবরীর উৎপত্তি এবং এটি ভগবান গণেশের জন্মস্থান, যাকে ত্রি-সন্ধ্যাগায়ত্রীর স্থানও বলা হয়। সমুদ্রতল থেকে ৩ হাজার ফুট উচ্চতায় মন্দিরটি রয়েছে তিনটি পাহাড় ব্রহ্মগিরি, নীলগিরি ও কালাগিরির মধ্যে। নাসিক রোড স্টেশন থেকে ত্র্যম্বকেশ্বর পর্যন্ত সুন্দর ঝাঁ চকচকে রাস্তাটি নির্মিত হয় ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে।
বিশাল মন্দির চত্বর দেখলে চমক লেগে যায়। প্রাচীন মন্দিরের ভিত্তিকে অবলম্বন করে বালাজি-বাজিরাও অষ্টদশ শতকে পঞ্চচূড়া বিশিষ্ট এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। তখনকার দিনে এটি তৈরি করতে প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছিল এবং সময় লেগেছিল ৩১ বছর। এখানে গোদাবরী নদীর উৎসস্থলও রয়েছে।

রামায়নি যুগে নাসিকের নাম ছিল পঞ্চবটি। বনবাসের সময় রাম সীতা ও লক্ষণ এই মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পঞ্চবটিতে থাকতেন। সেই যুগে খরস্রোতা গোদাবরী ছিল সুন্দরী ছিপছিপে। স্রোতবতীর ডান দিকে আধুনিক শহর নাসিক, বাম তটে মর্যাদা পুরুষ রামচন্দ্র, ভ্রাতা লক্ষণ এবং জানকীর পদধুলিপূত পঞ্চবটির মনোরম তপোবন। পবিত্র গোদাবরী দুই ভাগে ভাগ করেছে পৌরাণিক শহর নাসিককে।
রামায়নি যুগে লঙ্কেশ্বর রাবণ এই অঞ্চলের অধিকার দিয়েছিলেন আদরের বোন শূপর্ণাখাকে। তার সেনাপতি ছিল খর ও দূষণ। পিতৃসত্য পালনের জন্য রামচন্দ্র যখন এখানে বসবাস করছিলেন, তখন একদিন শূপর্ণাখা এসে লক্ষণকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। এ কথায় ক্রুদ্ধ হলেন লক্ষণ। বাকবিতন্ডায় ক্ষিপ্ত হয়ে রাবণের আদুরে বোনের নাসিকাটি কেটে দিলেন তিনি। শূপর্ণাখার নাসিকা কর্তন থেকেই এই স্থানের নাম হয়েছে নাসিক।

মুঘল আমলের গুলসানাবাদই এই আমলের নাসিক। এককালে অরণ্যময় নাসিক এখন সবুজ ছায়া শীতল চরণভূমি। এই স্থানটিকে আরো রূপ লাবণ্যে ভরিয়ে তুলেছে এখান থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ-পশ্চিমে বিচ্ছিন্ন তিন পাহাড়ে হীনযান বৌদ্ধগুহা, যে গুহাগুলি পান্ডুলেনা গুহা নামে প্রসিদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিস্টাব্দ দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নির্মিত মোট ২১টি গুহা অমলিন রয়েছে আজও সেই কালের সাক্ষী হয়ে।
গোদাবরী এখানে দক্ষিণবাহিনী। মেখল কন্যা নর্মদা আর কাশির গঙ্গার মতই চির পবিত্র এর অমৃতধারা।
তাই গোদাবরী প্রসিদ্ধ দক্ষিণের গঙ্গা নামে। গোদাবরী উৎস ব্রহ্মগিরি পর্বতে যেতে গেলে প্রায় ৭৫০ সিঁড়ি ভাঙতে হয়। পথে কপিলমুনির গুহা, গোরক্ষনাথ গুহা ইত্যাদি দর্শন করা যাবে।
কথিত আছে, ব্রহ্মগিরি পর্বত থেকে গোদাবরী উৎপত্তি মাত্রই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়। কিন্তু তা সম্ভব হলো না। গৌতম মুনির আশ্রম তখন ব্রহ্মগিরির গঙ্গার তীরে, মুনিবর গোদাবরীর মানসিকতা উপলব্ধি করে মন্ত্রপুত কুশের একটি আধার তৈরি করে তারই মধ্যে আবদ্ধ করলেন গোদাবরীকে। পুণ্যতোয়া গোদাবরী রয়ে গেলেন ব্রহ্মগিরি পর্বতে। আজকের কুশাবর্তঘাট গৌতম মুনিরই সৃষ্টি, যে পবিত্র ঘাটে পুরাকালে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র পিতা দশরথের উদ্দেশ্যে পারলৌকিক ক্রিয়াদি সুসম্পন্ন করেছিলেন।

আবার অনেকেই বলেন, গৌতমুনির প্রার্থনায় গোদাবরীর মর্তে আগমন। তাই গোদাবরীর আরেক নাম গৌতমী। গোদাবরীর মান ভাঙানো এবং তাকে শিবশক্তির প্রভাবযুক্ত করার জন্য শিব এখানে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে অবস্থান করছেন।
গোদাবরীর উৎসমুখটি কুন্ডের আকারে বাধানো। কাছেই আছে গৌতম মুনির গুহা এবং গোদাবরীর মন্দির। গোমুখে গোদাবরী নির্গত হয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তারপর পাহাড়ের ভিতর গিয়ে আবার প্রকাশ পাচ্ছে গঙ্গাদ্বারে এবং সেখান থেকে নির্গত হয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি শিবলিঙ্গ কে স্নান করিয়ে সমতলে নামছে গোদাবরী। গোদাবরীর উৎসের কাছাকাছি এক জায়গায় পাহাড়ের গায়ে ফসিল হয়ে যাওয়া শিবের জটার দাগ দেখা যায়। এমনকি এ নিয়ে চমৎকার কাহিনীও আছে।
৭১২ ফুট উঁচু গ্রানাইট পাথরে বিরাট ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির। এই মন্দিরটির আকৃতির সঙ্গে সোমনাথ ও দ্বারকাধিশ মন্দিরের সাদৃশ্য রয়েছে। পূর্বাভিমুখী মন্দিরের চারিদিকে উঁচু পাথরের দেওয়াল। পাঁচটি গোপুরাম বিশিষ্ট মন্দির। কারুকার্যময় মন্দিরের দেওয়াল, রয়েছে পাঁচটি দ্বার। পাঁচটি সোনার কলস শোভিত মন্দিরের শিখর ও ধ্বজাও সোনার।

মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে গনেশ এবং পরে পাথরের শিব বাহন নন্দীকে অতিক্রম করে ঢুকতে হয় ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরে। চাতালের এক পাশে রয়েছে লম্বা কালো পাথরের দীপস্তম্ভ। গর্ভমন্দিরে জ্যোতির্লিঙ্গ আকারে বেশ ছোট। বিরাট গৌরীপটের মধ্যে সামান্য উঁচু তিন ভাগে বিভক্ত শিবলিঙ্গ ত্র্যম্বকেশ্বর লিঙ্গের উপর ঝুলানো একটি কলস তাতে তীর্থযাত্রীদের ঢেলে দেওয়া গোদাবরীর জলে সদা সর্বদা হয়ে চলেছে মহাদেবের জলাভিষেক।
ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির ভোর সাড়ে পাঁচটায় খোলে বন্ধ হয়েযায় রাত নটায়, সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে হয় সন্ধ্যাপুজো। এখানে জ্যোতির্লিঙ্গকে বেনারসি শাড়ি দিয়ে ঢেকে রত্নখচিত পঞ্চমুখ সোনার মুকুট পড়ানো হয়। পিছনে থাকে রুপোর চেলি। কথিত আছে পাণ্ডবদের আমলে তৈরি এই সোনার মুকুট।
প্রতি সোমবার এবং বিশেষ বিশেষ তিথিপর্ব যেমন শিবরাত্রি, কার্তিক পূর্ণিমায় এখানে বিশেষ পূজা ও বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। ত্রিম্বকেশ্বর মন্দির নারায়ণ নাগবলী পূজা, কালসর্পযোগ পূজা, ত্রিপিন্ডি শ্রাদ্ধ পূজা, কুম্ভবিভা, মহামৃত্যুঞ্জয় জপ এবং রুদ্রাভিষেকের মতো আচার-অনুষ্ঠানের জন্য বিখ্যাত ।

আনুমানিক প্রায় ৫০০ বছর আগে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য সন্ন্যাসজীবনে দাক্ষিণাত্য ভ্রমণ কালে এসেছিলেন ত্র্যম্বকেশ্বরে। ত্র্যম্বকেশ্বর দর্শনের পর পঞ্চবটি দর্শন করে তিনি চলে গিয়েছিলেন দমন নগরীতে। গোদাবরী তীরে পঞ্চবটীতে ‘লক্ষণ রেখা’ রূপী খাল প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। এছাড়াও এখানে সোমেশ্বর মন্দির, সুন্দর নারায়ণ মন্দির, কপিলেশ্বর, রামকালা, গণপতি, দত্তাত্রেয়, বালাজি, উমা মহেশ্বর, নীলকণ্ঠস্বর, পঞ্চরত্নেশ্বর, মুরলিধর এমন হাজারো মন্দির রয়েছে।
অসংখ্য মঠ-মন্দিরে জমজমাট গোদাবরীর দুই তট। রামঘাট সংলগ্ন রামকুন্ড এখানকার পরম পবিত্র তীর্থ। কথিত আছে, মহর্ষি গৌতম স্ত্রী অহল্যাকে নিয়ে বাস করতেন এখানেই। তাঁরই সৃষ্টি এই কুণ্ড। এই কুণ্ডের জল অক্ষয় এবং কোনদিন তাই শেষ হবে না।

শত শত বছর ধরে পশ্চিম ভারতের বারাণসী বলে প্রসিদ্ধ নাসিক। ভারতের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম শৈবতীর্থ ত্র্যম্বকেশ্বরের পবিত্র ভূমির উপর দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায় মন্ত্রোচ্চারণ হয় —
ব্রহ্মাদি শিখরোৎপন্নে ত্রিকন্টকং বিরাজিতে।
গৌতমং প্রার্থিতং গঙ্গে গোদাবরী নমস্তুতে।।
Anek kichu arjon korlam
শ্রাবণে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ নিয়ে লেখার ভাবনার জন্য অভিনন্দন জানাই, প্রতিটি লেখন অত্যন্ত যত্ন সহকারে যথা সম্ভব তথ্য সমৃদ্ধ করে উপস্থাপন করার দু:সাহস প্রশংশনীয়। ভীষণ সুন্দর প্রতিটি রচনা, সামগ্রিক ভাবে প্রকাশিত করা হলে খুব ভালো হতো।