তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে সকালের দিকে টুইট করে ছাত্র পরিষদের সব সদস্যকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি তিনি বার্তা দিয়েছিলেন, ‘আমরা সবাই তোমাদের সাফল্য আর দলের প্রতি তোমাদের অবদানে গর্বিত। আজকের দিনে আমি সব ছাত্রদের কাছে আবেদন জানাব, গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চাইছে যেসব শক্তি তার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইয়ে যোগ দিতে।’
করোনা পরিস্থিতিতে এখন ভার্চুয়াল মাধ্যমেই জনসংযোগের একটা বড় কাজ চালাচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলি। এর আগে অতিমারীর কালে ২১ জুলাইয়ের শহিদ সভাও ভার্চুয়ালি করেছে তৃণমূল। টুইটে এদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে আমাদের ছাত্র পরিষদের প্রাণবন্ত সদস্যদের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনাদের কৃতিত্ব এবং দলে অমূল্য অবদানের জন্য আমরা গর্বিত! গণতান্ত্রিক চেতনাকে ভাঙার চেষ্টা করছে যে শক্তি, তার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সব শিক্ষার্থীদের আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’ তিনি পড়ুয়াদের একজোট হওয়ার বার্তাও দেন। ছাত্রযুবদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাই পথ দেখাক। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিক তৃণমূল ছাত্র পরিষদ। সারা দেশে যোগাযোগ গড়ে তুলুক ছাত্রছাত্রীরা।’’
ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এই সরকার কি করেছে তার খতিয়ানও তিনি তুলে ধরেন ‘সবুজ সাথী’ থেকে ১০ লক্ষ টাকার ‘স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড’-সহ নানা প্রকল্পের কথা উল্লেখ করে। মমতা বলেন, ‘‘এই সরকার দানবিক, অমানবিক। সারা দেশেই পড়ুয়াদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, শিক্ষার্থীরা আমাদের ভবিষ্যৎ। রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণে আরও জোর দিতে হবে আমাদের।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পকেটে একটা নেংটি ইঁদুর ঢুকিয়ে রেখেছো। ওটা তোমার নিজের পকেটই কেটে দেবে। ইডি একটা কাগজ পাঠাবে, আমি বস্তা ভরে কাগজ পাঠাব। এমন প্রতিহিংসাপরায়ণ রাজনীতি কখনও দেখিনি। আমরা এমন রাজনীতি করি না। তোমার দলের বিরুদ্ধে কতটা পদক্ষেপ করেছ? উত্তরপ্রদেশে হাথরসের ঘটনায় মানবাধিকার কমিশন পাঠিয়েছ? সিবিআই-তে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু বিজেপি নেতাকে নিয়ে গ্রামে গ্রামে কেন যাবে? মানবাধিকার কমিশন কি শুধু বাংলার জন্য? ত্রিপুরার জন্য নয়? ওখানে রোজ মারছে আমাদের কর্মীদের। সব কমিশনকে রাজনৈতিক করে দিয়েছে। প্রত্যেকে বিজেপি-র সদস্য।’’
তৃতীয়বার বাংলার মসনদে বসার পর এটাই প্রথম দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন তৃণমূলের। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসে এদিন দলের ছাত্র প্রতিনিধিদের দলনেত্রী নতুন ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি লক্ষ্য করছি, গত ১০-১৫ বছরে ছাত্র রাজনীতিতে সেই ভাবে কেউ এগিয়ে আসছে না। ছাত্র যৌবনদের চাই, রাজনীতির নতুন সমীকরণ হোক। রাজনীতি মানুষের সেবার জায়গা হোক, মানবিকতার জায়গা হোক, সভ্যতার জায়গা হোক, প্রাণের জায়গা হোক, সংস্কৃতির জায়গা হোক, সম্মানের জায়গা হোক, দোয়ার জায়গা হোক। আর তা ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ছাড়া সম্ভব নয়। রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণে জোর দিতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা ভবিষ্যতের সম্পদ। তাঁরা কোনও বাধা মানে না। লোকের কাছে মাথা নত করতে জানে না। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘বাঁধ ভেঙে দাও, বাঁধ ভেঙে দাও’।’
তৃণমূল সুপ্রিমোর ভার্চুয়াল এই বক্তৃতা গোটা রাজ্যে বড়ো পর্দায় সম্প্রচার করা হয়েছে। জেলায়-জেলায় বড়া পর্দায় দলনেত্রীর ভাষণ শুনেছেন হাজার হাজার মানুষ। রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের খতিয়ান তুলে ধরে মমতা বলেন, ‘‘সবুজ সাথী প্রকল্পে ১ কোটির বেশি সাইকেল দেওয়া হয়েছে। আরও দেওয়া হবে। ১০ লক্ষ টাকার স্টুডেন্ট ক্রেডিট কার্ড দেওয়া শুরু হয়েছে। শোধ করা যাবে ৪০ বছরে। এ রাজ্যে স্কুল, কলেজে অনেক নিয়োগ হয়েছে। দেশের তুলনায় এ রাজ্যে বেকারত্ব অনেক কম। এ রাজ্যে বেকারত্ব ৪৫ শতাংশ কমেছে। দেউচা পাচামির প্রকল্পে অনেক বিনিয়োগ হবে। তাজপুরে গভীর বন্দর হচ্ছে। রঘুনাথপুরে জঙ্গলসুন্দরে শিল্পনগরী হচ্ছে। লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান হবে। আইটি-তে বিপুল কর্মসংস্থান হবে। বানতলায় লেদার কমপ্লেক্সে অনেক কর্মসংস্থান হবে। রাজ্যে ৬৮টি ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক, বিশ্ববাংলা হাব-সহ বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। রাজ্যে ২ লক্ষ ১০ হাজারের বেশি আইটি কর্মী রয়েছেন। ডেটা রিসার্টচ সেন্টার তৈরি হলে ওই ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান আরও বাড়বে। উৎকর্ষ বাংলায় ৬ লক্ষ বেকার যুবক যুবতীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অনেকে চাকরি পেয়েছেন।’’
জানা গিয়েছে, এদিন ভার্চুয়ালি ভাষণের ফাঁকেই দলের ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথাও বলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। একুশের ভোটে বাংলায় পদ্ম শিবিরকে জোর ধাক্কা দিয়েছে জোড়াফুল। বঙ্গে এই বিপুল সাফল্যের পর জাতীয়স্তরের রাজনীতিতেও গুরুত্ব আরও বেড়েছে তৃণমূলের। দেশের রাজনীতিবিদদের একাংশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই মোদী-বিরোধী প্রধান মুখ হিসেবে তুলে ধরে ময়দানে নেমেছেন। তৃণমূলও কেন্দ্রের একাধিক নীতির বিরুদ্ধে রাজ্যের পাশাপাশি সোচ্চার হচ্ছে দিল্লিতে। মোদী-বিরোধী জোটকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে একের পর এক কৌশল নিচ্ছে বিরোধীরা। এই উদ্যোগে তৃণমূলকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেখা যাচ্ছে।
ছাত্র-যুবদের উদ্দেশ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের ছোটবেলার কথা স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘বাবা বেঁচে থাকতে বুঝিনি। বাবা-মা না থাকার লাঞ্ছনা-বঞ্চনা সহ্য করতে হয়েছে। কষ্ট করে পড়াশোনা করেছি। টিউশন করে খাতায় লিখে এই জায়গায় পৌঁছেছি। শিক্ষাক্ষেত্রে আমাদের সরকার আসার পর ১০ গুণ বেশি টাকা বাড়িয়েছে। বিনা পয়সায় স্কুল ব্যাগ, জুতো, বই-খাতা দেওয়া হচ্ছে। সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী, ১০ লক্ষ টাকার স্টুডেন্ট কার্ড, মোবাইল-ট্যাব দিচ্ছি।’
দেশ ও রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েই এদিন দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নয়া বার্তা দিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। পরিস্থিতি অনুযায়ী কীভাবে দলের কাজ চলবে তা নিয়ে দলনেত্রী ছাত্র নেতা-নেত্রীরা লড়াইয়ের কথা বলেন। অন্যদিকে এদিন করোনাবিধি মেনে মহাজাতি সদনে কংগ্রসের ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবস পালন হয়।