এক মাস আগে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব হাতে পেয়ে ডা. মানিক সাহা নির্বাচনী এবং নির্বাচনোত্তর হিংসা বন্ধের বার্তা দিয়েছিলে। আর এক মাস পর উপনির্বাচনের যখন আর তিন দিন বাকি রাজ্যে বিজেপি আমলের পুরানো ঐতিহ্য ফিরে এলো। মাঝরাতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে অচেতন কংগ্রেসের প্রার্থী সুদীপ রায় বর্মন। আক্রান্ত হলেন রাজনীতিতে যাকে হাতে ধরে তুলে এনেছিলেন, বিজেপির মন্ত্রী সুশান্ত চৌধুরীর সামনে। ঘটনাটি রবিবার রাতে। আর সেদিন দুপুরেই সিপিএম সাংবাদিক সম্মেলন করে জানিয়েছিলেন, বিজেপি ভোট লুটের ছক আঁটছে। তারা নির্বাচন কমিশনে ছয় দফা দাবি জানিয়ে ভোট নির্বিঘ্ন করার জন্য বলেছেন। এক কথায় কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল কংগ্রেস সবাই ভোটে হিংসা এবং ভোট লুটের আশঙ্কায় রয়েছে।সে দিক থেকে কেবল তিপ্রা মথা এ সব অভিযোগ অনুযোগের ধার ধারে না। সুরমা কেন্দ্রে দলের প্রচারে মথার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অনিমেষ দেব্বর্মা মাত্র দু দিন আগে বিজেপিকে হুমকি দিয়ে বলে রেখেছে, কোনও একটি বুথে যদি ওরা নিগম, পুর ভোটের কায়দায় ভোট লুট করতে আসে তাহলে বাদবাকি কোন বুথ থেকে বিজেপির পোলিং এজেন্টদের বাড়ি ফিরতে হবেনা।
চারটি বিধানসভায় উপনির্বাচন হচ্ছে ২৩ জুনে। এর মধ্যে সুরমা একটি। এই কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক আশিস দাস কালীঘাটে এসে মাথা কামিয়ে বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসে গিয়েছিলেন। আবার তৃণমূল কংগ্রেসও ছেড়েছেন বিধায়ক পদ যাওয়ার পর রাজ্য নেতাদের সঙ্গে মনোমালিন্যে। এই কেন্দ্রটি তপশীল জাতি সংরক্ষিত। সিপিএমের বরাবরের এই আসনে তাঁদের প্রাক্তন বিধায়ককেই এখানে টিকিট দেওয়া হয়েছে। লড়াই তাই মথা আর সিপিএমের মধ্যেই হবে। কংগ্রেস এই কেন্দ্রে মথাকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে। মথার প্রতাপে বিজেপি এখানে অনেকটাই রক্ষনাত্মক, তাই তারা তিন নম্বরে চলে যেতে পারে অবলীলায়। মথা এই কেন্দ্রে একজন চা বাগানের ঝাড়খন্ডি শ্রমিক পরিবারের সদস্যকে প্রার্থী করে নিজেদের অসামম্প্রদায়িক হিসাবে প্রতিপন্ন করতে চাইছে। দেখা যাচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী ভোটারেরাও এই কেন্দ্রে মথাকে বিশ্বাস করতে চাইছে। হয়তো বিজেপির প্রতি বিতৃষ্ণাই এর মূল কারন। হয়তো তারা ধরে নিয়েছেন বিজেপি মোকাবিলায় সিপিএমের চেয়ে মথাই এই সময়এর বাঘা তেঁতুল।
এখানে আশিস দাসের অনুরাগী যারা তৃণমূলে গিয়েছিলেন তারা এখনো পতাকা ধরে রয়েছেন এবং বিজেপির আক্রমণের শিকার। তাঁদের কথা ভেবে বারবার সুরমা যাচ্ছেন তৃণমূলের সর্ব্বভারতীয় নেতৃত্ব। যাচ্ছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও।প্রসঙ্গত, পুর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস যে একটি ওয়ার্ডে জয় পেয়েছিল সেটি এই ধলাই জেলাতেই। উত্তর ত্রিপুরায় একটি আসন যুবরাজনগরে ভোট হচ্ছে। কারন এই কেন্দ্রে সিপিএমের ২৫ বছরের বিধায়ক এবং প্রাক্তন বিধানসভা অধ্যক্ষ রমেন্দ্র নাথের মৃত্যু। সিপিএমের বরাবরের গড় এই কেন্দ্রে কংগ্রেস তুলনামূলক দুর্বল প্রার্থী রেখে অন্য বার্তা দিয়েছে। লড়াই এখানে সিপিএমের সঙ্গে বিজেপির। প্রার্থী নিয়ে এই কেন্দ্রে বিজেপির অসন্তোষ লুকোচাপা নেই। গত সপ্তাহে সিপিএম প্রার্থীর ডোর টু ডোর প্রচারে পেছন থেকে এক বাইক আরোহী এসে প্রার্থীকে ধাক্কা মেরে বিজেপির একটি অফিসে ঢুকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দলেবলে সবাই বিজেপি অফিস ঘেরাও করে। জনা দুয়েককে চড়চাপড় মারা হয়েছে বলেও পরে থানায় অভিযোগ জানায় বিজেপি। সেই অভিযোগ মূলে পুলিশ সিপিএমের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছে। সিপিএমের প্রার্থীর মতে, প্রশাসন কাজে লাগিয়ে উপনির্বাচনের ভোট করতে চাইছে বিজেপি। এ সব ছাড়া এদের আর পথ নেই। ভোটে সন্ত্রাসের আশঙ্কা প্রথম থেকেই করে আসছে সব দল।

আর রবিবার সুদীপ রায় বর্মনের ওপর আক্রমণ সেই আশঙ্কাকে সত্য প্রমান করলো। আগরতলায় এই সময়ে বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেসের এক ঝাক নেতানেত্রী রয়েছেন প্রচারে। কংগ্রেসের দীপা মুন্সি এসেছেন। বিপ্লব দেবকে দুধের বাটি থেকে মাছি সরানোর মতো সরিয়ে দেওয়ার পর ত্রিপুরায় উপনির্বাচনের ভোট দেখার জন্য দিল্লি যে চার পর্যবেক্ষক পাঠিয়েছে সেই দলের নেতা কৈলাস বর্গীয় তো তাবু গেড়েই রয়েছেন। আসছেন যাচ্ছেন হিমন্ত বিশ্ব শর্মার মতন তারকা প্রচারক। বাদ পড়ছেন না লকেট চ্যাটার্জির মতন অভিনেতা নেতারাও।
তৃণমূল শেষমুহূর্তে শত্রুঘ্ন সিনহাকে পাঠিয়েছে। কিন্তু যে পুরভোটের ২০ বা ২২ শতাংশ ভোট পুঁজি করে তৃণমূল কংগ্রেস উপনির্বাচনের ভোটকে পাখির চোখ করেছে সেই লক্ষ্যভেদ কি আদৌ সম্ভব? মনে রাখা দরকার পুরভোটের সময়ে সুদীপ বাবুরা বিজেপি ছাড়েন নি। আগরতলা-সহ সারা রাজ্যে যারা তৃণমূলের প্রার্থী হয়েছিলেন তাঁদের ৮০ ভাগই ছিল সুদীপের লোকজন। সুদীপ সঙ্গী বিধায়ক আশিস সাহার ঘরের মানুষ ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকেও প্রার্থী করা হল। স্বাভাবিক ভাবেই সুদীপবাবু আশিসবাবুরা বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেসে চলে আসার পর তারা কংগ্রেসেই চলে এসেছেন। বিজেপিতে থেকে তৃণমূল সেজে থাকার আর দরকার হচ্ছে না। সেদিক থেকে আগরতলার দুইটি বিধানসভার উপনির্বাচনের ভোটে অর্থাৎ ৬ নম্বর আগরতলা বা ৮ নম্বর বড়দোয়ালি কেন্দ্রে মূল লড়াই হবে কংগ্রেস, বিজেপিতে। বামেরা কৌশলগত ভাবে নিজেদের দুর্বল প্রার্থী রেখেও চাইবে কংগ্রেস জিতুক, কারন এই আসন দু-টি বরাবর কংগ্রেসেরই। যদি ভোটার ভোট দিতে পারে এই দুটি আসনের মধ্যে ৬ আগরতলায় সুদীপ রায় বর্মনের জয় নিশ্চিত। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ডা. আশোক সিনহা দলের ভেতরেই সর্বসম্মত নয়।
তুলনায় ৮ বড়দোয়ালিতে আশিস সাহার বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ডা. মানিক সাহা যেহেতু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পক্ষে লড়াই অপেক্ষাকৃত সহজ। এই হিসাবেও ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস লড়াই করছে চতুর্থ স্থানের স্থানের জন্য, তাঁর ২০ বা ২২ শতাংশ ভোট এই ভোটেও ধরে রাখার জন্য। সুদীপ রায় বর্মনের ওপর এই হামলার ঘটনায় অনুমান করা সম্ভব ভোটে প্রথম দ্বিতীয় স্থান নিয়ে গোলমাল আছে, তবুও তৃণমূলের অবস্থান একই থাকবে। সিপিএম, কংগ্রেসের মতে মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগ যদি যথাযথ হয় তাহলে চার আসনেই হারবে বিজেপি। তাই তারা হিংসার পথে যাচ্ছে। বাইক বাহিনী, প্রশাসন কাজে লাগিয়ে ভোট লুট করতে চাইছে।