১৯৭৭ সালের লোকসভা ভোটের কথা মনে পড়ে। তখন, কিশোর বয়স থেকেই, বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী ছিলাম আমরাও। ঘনঘোর অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থায় মধ্যে হঠাৎই ১৯৭৭ সালের ১৮ জানুয়ারি খবর হয়েছিল, ইমারজেন্সির কঠোর অগণতান্ত্রিক বিধি শিথিল করা হচ্ছে, ভোটে যাচ্ছে দেশ। পরের দিন ইন্দিরা নিজে দেশবাসীর উদ্দেশে বেতার ভাষণে লোকসভা নির্বাচনের ঘোষণা করে দেন। সম্ভবত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তথা ইন্দিরা কংগ্রেসের সর্বময় নেত্রী ইন্দিরা গান্ধিকে তাঁর পরামর্শদাতারা বুঝিয়েছিলেন, ভোট হলে জিতে যাবে শাসক দল। জরুরি অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের উপর পরানো হয়েছিল নিষ্ঠুর লাগাম, বিরোধী নেতারা অনেকেই কারাগারে, সমালোচনামূলক টু-শব্দ করারও পরিস্থিতি ছিল না। অথচ সারা দেশে ইন্দিরা বিরোধী তীব্র মনোভাব তখন প্রায় দাবানলের চেহারা নিয়েছে। ছাই চাপা আগুনের মতো সে বিক্ষোভের খবর পাননি ইন্দিরা। ইতিমধ্যে লোকসভার মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন ইন্দিরা। ১৯৭৬ সালে ভোট হবার কথা ছিল। কিন্তু সে বছর ভোট করা হলো না। ১৯৭৭-এ ভোট করাবার অন্য একটা বাধ্যবাধকতাও ছিল। সে-বছরের ২১ মার্চ শেষ হয়ে যাচ্ছিল জরুরি অবস্থার মেয়াদ। সেই অবস্থায় ইন্দিরার সামনে দুটি রাস্তা খোলা ছিল। জরুরি অবস্থা এবং লোকসভার মেয়াদ আরও বাড়ানো বা এক-কথায় আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারতে গণতন্ত্রের সমাপ্তি ঘোষণা। বিকল্প ছিল ভোটে যাবার রাস্তা। জয় নিশ্চিত বুঝে দ্বিতীয় রাস্তাটিই নিয়েছিলেন নেহেরু কন্যা ইন্দিরা।
পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতি চলছিল ১৯৭১ সাল থেকেই। ১৯৭২ সালে রাজ্য বিধানসভা ভোটে কংগ্রেস বিপুল ভাবে জেতে, কিন্তু সে ভোটে বহু জায়গাতেই সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারেননি। রিগিংয়ের অভিযোগ তুলে সিপিআইএম-সহ বামপন্থীরা বিধানসভা বয়কট করেছিল। হঠাৎই লোকসভা ভোট এসে যাওয়ায় ইন্দিরা বিরোধী দলগুলো জোট বাঁধে। সর্বভারতীয় ভিত্তিতে জাতীয় কংগ্রেস (সংগঠন), ভারতীয় জনসংঘ, পিএসপি এবং ভারতীয় লোকদল মিলিয়ে জনতা পার্টি গড়ে উঠেছিল। সিপিআইএম এই জোটে যোগ না দিলেও ঠিক করেছিল, তারা যতটা সম্ভব জনতা পার্টির সঙ্গে আসন সমঝোতা করবে। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গেও বাম-জনতা সমঝোতা অনুযায়ী ভোট হয়, কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়। সিপিআইএম চেয়েছিল এই সমঝোতা টিকিয়ে রাখতে। লোকসভা ভোটের তিন মাসের মধ্যে ১৯৭৭-এর জুন মাসে রাজ্যে বিধানসভা ভোট হয়েছিল। তখনকার বাস্তবতা অনুযায়ী বামপন্থীরাই ছিল এ রাজ্যে সবচেয়ে বড় শক্তি। তা সত্ত্বেও তৎকালীন সিপিআইএম নেতৃত্ব জনতা পার্টিকে অর্ধেকের বেশি আসন ছাড়তে রাজি ছিলেন। সে সময়ে সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক ছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত। দূরদর্শী এই নেতা জনতা পার্টিকে ৫৫-৫৬ শতাংশ আসন ছাড়তে রাজি ছিলেন। বাম-জনতা সমঝোতা ভোটে জিতলে মুখ্যমন্ত্রীর কুরসিও জনতাকে ছাড়তে রাজি ছিলেন জ্যোতি বসু-প্রমোদ দাশগুপ্তরা। এ নিয়ে তাঁদেরকে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল। কিন্তু জনতা পার্টির নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র সেন ৭০ শতাংশ আসন চেয়ে গোঁ ধরে বসেছিলেন। ফলশ্রুতিতে সমঝোতা ভেঙে যায়, সিপিআইএম-এর নেতৃত্বে বামজোট বিপুল ভাবে জেতে, শুরু হয় রাজ্যে বামফ্রন্টের শাসন। বড় শত্রু চিহ্নিত করা, তার বিরুদ্ধে জোট গড়ার ব্যাপারে সিপিআইএম-এর প্রথম দিকের নেতারা বারবারই মুন্সিয়ানার পরিচয় দেখিয়েছেন। ১৯৬৭ সাল থেকেই তার সুফল ঘরে তুলছিল সিপিআইএম, ১৯৭৭-এ সে প্রক্রিয়াই পূর্ণতা পায়।
এ দেশে সবথেকে বড় বামদল সিপিআইএম-এর সে যুগের নেতারা কালের নিয়মেই প্রয়াত হয়েছেন। বর্তমান প্রজন্মের নেতারা মূল শত্রুকে চিহ্নিত করার ব্যাপারে বারবারই অপরিণামদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, যে ধারা সদ্য অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনেও সমান ভাবেই প্রবাহিত। সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপিকে প্রধান বিপদ বলে স্বীকার করে নিয়েও এ রাজ্যে যে কোন বিবেচনায় তৃণমূল-বিজেপিকে একই সারিতে রেখে আক্রমণে গেলেন বামেরা, তা বোঝা দায়। যাই হোক, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট-পর্ব এখন অতীত। সামনে আসছে নানা রাজ্যে বিধানসভা ভোট। বছর দেড়েক বাদে ২০২৩ সালের প্রথম দিকে ভোট রয়েছে ত্রিপুরাতেও। বিজেপিকে হারাতে ইতিমধ্যেই সে রাজ্যে সক্রিয় হয়েছে তৃণমূল। বিপদের গন্ধ পেয়ে বিজেপিও ঝাঁপিয়ে পড়েছে হিংস্র আক্রমণ নামিয়ে। তৃণমূল নেতারা সে রাজ্যে বাম নেতাদের সঙ্গেও দেখা করেছেন। ত্রিপুরায় পিডিএস নেতা অজয় বিশ্বাসের সঙ্গে দেখা করেছেন তৃণমূলের নেতা কুণাল ঘোষ। তৃণমূল নেতাদের মুখে বাম নেতাদের সম্পর্কে প্রশংসার বাণীও শোনা গিয়েছে ত্রিপুরার মাটিতে। পিডিএস নেতা সমীর পূততুণ্ড জানালেন, ‘বিজেপির বিরুদ্ধে ব্যাপক ঐক্যই এই সময়ের চাহিদা, ত্রিপুরায় তেমন ঐক্য গড়ে উঠলে পিডিএস তার অংশ হিসেবে নিজেদের ভূমিকা পালন করতে চায়। এটা সব পক্ষের কাছেই পরিষ্কার করে দিতে চাই আমরা।’ সিপিআইএমএল লিবারেশন দলের নেতাদেরও মত এমনই। কিন্তু ত্রিপুরা রাজ্যে সবথেকে বড় বাম দল সিপিআইএম। তারা কি এমন বৃহৎ ব্যাপক ঐক্য চায়? তৃণমূলের উপর আক্রমণের নিন্দা করেছেন সিপিআইএম নেতা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার। কিন্তু বিজেপি বিরোধী জোট-বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি। ত্রিপুরা রাজ্যে তৃণমূল অন্যতম বিজেপি বিরোধী দল, সিপিআইএম-ও তাই। সিপিআইএম-এর সর্বভারতীয় অবস্থান— দেশে বিজেপিই প্রধান বিপদ। তাহলে দ্বিধা কেন? ব্যাপক বিজেপি বিরোধী জোট গড়ার কাজে সিপিআইএম-কেই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে ত্রিপুরায়। সে কাজে ব্যর্থ হলে সিপিআইএম ত্রিপুরা রাজ্যেও প্রাসঙ্গিকতা হারাবার ঝুঁকির সামনে দাঁড়াতে পারে।