ত্রিপুরায় পদ্মবন উপড়ে ঘাসফুল ফোটাতে মরিয়া তৃণমূল। উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের এখনও অনেক দেরি কিন্তু আগেভাগেই কোমর বেঁধে ময়দানে নেমে পড়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। বস্তুত ত্রিপুরায় সংগঠন বৃদ্ধি করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তৃণমূল। তার জেরে বিজেপির সঙ্গে পদে পদে সংঘাত বাঁধছে। এমনকী তৃণমূলের নেতানেত্রীদের হামলার মুখেও পড়তে হয়েছে। বাধ্য হয়ে বিপ্লব দেবের কৌশলী পদক্ষেপ নেয়। তাতে তৃণমূলের আন্দলন কর্মসূচি পালন সাময়িক ভাবে হলেও কিছুটা থমকে ছিল। তবে বৃহস্পতিবার ত্রিপুরা উচ্চ আদালতের রায়ে স্বস্তিতে ফিরলো তৃণমূল কংগ্রেস অন্যদিকে বড় ধাক্কা খেল ত্রিপুরার বিপ্লব দেব সরকার। এদিন ত্রিপুরা উচ্চ আদালতের তরফে জানানো হল, খোয়াই কাণ্ড মামলায় নতুন করে কাউকে আর নোটিশ দেওয়া হবে না। গোটা বিষয় নিয়ে পুজোর পরেই আলোচনা হবে৷ বলাই বাহুল্য, আদালতের এই রায়ে ব্যাকফুটে যেতে হল বিপ্লব দেবের সরকারকে।
তৃণমূলের যুব নেতারা ত্রিপুরায় সংগঠনের কাজে ঝাপিয়ে পড়ার পর বিজেপি তাদের বাধা দেয়। তৃণমূলের নেত্রীদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করে পুলিশ। ওই যুব নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ত্রিপুরায় গিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কুণাল ঘোষ, দোলা সেন, ব্রাত্য বসু এবং সুবল ভৌমিক। খোয়াই থানা তাঁদের আটক করে। ত্রিপুরা পুলিশ দাবি করে, তৃণমূল নেতারা পুলিশের সঙ্গে অভব্য আচরণ করেছে, প্রশাসনিক কাজে বাধা দিয়েছে। এই অভিযোগ জানিয়ে খোয়াই থানার আইসি মামলা দায়ের করেন। তৃণমূল ওই মামলার যৌক্তিকতা নিয়ে ত্রিপুরা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে।
উল্লেখ্য, তৃণমূল খোয়াই থানায় সরকারি কাজে বাধা দিচ্ছে- এই অভিযোগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ তৃণমূল নেতাদের আন্দোলনকে নিশানা করা হয়েছিল। তৃণমূল নেতৃত্ব ওই অভিযোগকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েই ত্রিপুরা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে জানায়, অভিষেক-সহ তৃণমূল নেতাদের মিথ্যে মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে। সেই মামলায় ত্রিপুরার বিপ্লব দেবের সরকারের তরফেও আদালতে জানানো হয়েছিল যে, তদন্ত শেষ হয়ে গিয়েছে। সম্প্রতি ফের তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষকে থানায় ডেকে ১০ দিনের মধ্যে হাজিরা দিতে বলা হয়৷ কুণাল জানিয়েছিলেন ৩ দিনের মধ্যে হাজিরা দেবেন৷ রবিবার রাতে খোয়াই থানার আইও-কে ফোন করেন তৃণমূলের মুখপাত্র জানান, কুণাল মঙ্গলবার হাজিরা দিতে যাবেন। কথা মতো, মঙ্গলবার সকালে আগরতলা থানায় যান কুণাল ঘোষ। কিন্তু সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
তৃণমূল ওই ঘটনার প্রেক্ষিতেই ফের একবার আদালতের দারস্থ হয়। তারপরই বৃহস্পতিবার ত্রিপুরা হাই কোর্ট সাফ জানিয়ে দেয়, পুজোর পরই এই বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। তার আগে নতুন করে কাউকে নোটিশ পাঠানো যাবে না। কার্যত ত্রিপুরা হাইকোর্ট এই মামলার প্রয়োজনীয়তা নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। বিপ্লব দেবের সরকার তৃণমূল কংগ্রেসকে শায়েস্তা করতেই ত্রিপুরার পুলিশ–প্রশাসনকেই কাজে লাগিয়েছিল। কিন্তু সেটাই এবার ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এল। কারণ বিপ্লব দেবের পুলিশ প্রশাসন ত্রিপুরা হাইকোর্টের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস নেতাদের নোটিশ দিতে চেয়েছিল। যেটা এদিন খারিজ করে দিয়েছে আদালত।
সেপ্টেম্বর মাসেই ত্রিপুরায় রোড শো করার কথা ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কিন্তু ত্রিপুরা পুলিশ কিছুতেই অনুমতি দেয়নি। প্রায় তিনবার ত্রিপুরা পুলিশের কাছে মিছিল করার অনুমতি চেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। প্রতিবারই বিপ্লব দেবের পুলিশ সেটি খারিজ করে দেয়। রাজ্যে মহামারী আইন বলবৎ রয়েছে দাবি করে সেই আবেদন খারিজ করে দেন তাঁরা।
প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যেই বিপ্লব দেবের সরকার আগামী ৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাজ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছে। তাই সেখানে কোনও মিটিং, মিছিল, সভা–সমাবেশ করা যাবে না। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মিছিল-সমাবেশ আটকাতেই যে এই পদক্ষেপ করেছে তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু ত্রিপুরা হাইকোর্ট সরকারের সেই পদক্ষেপে ধাক্কা দিয়ে দিল। আদালত গোটা বিষয়টি পিছিয়ে দিল দুর্গাপুজো পর্যন্ত। তার আগে বিজেপি শাসিত ত্রিপুরায় কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রে তৃণমূলকে কিছুটা হলেও পিছু হঠতে হয়। তৃণমূল ত্রিপুরায় তাদের কর্মসূচি স্থগিত করে। মঙ্গলবার রাতে টুইট করে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সেকথা জানিয়েও ছিল। গত ২২ সেপ্টেম্বর, বুধবার ত্রিপুরায় মিছিল করার পরিকল্পনা নিয়েছিল তৃণমূল। করোনার কারণ দেখিয়ে সেই মিছিলেরও অনুমতি দেয়নি বিপ্লব দেবের প্রশাসন। বাধ্য হয়ে তৃণমূল কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে যায়। বুধবার ত্রিপুরায় অভিষেকের কর্মসূচি স্থগিত হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরায় তৃণমূল সরকার গড়তে আত্মবিশ্বাসী। তাঁর মতে, তিনি যাতে ত্রিপুরাতে অভিষেক পা না রাখতে পারেন সেজন্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছে বিপ্লব দেবের প্রশাসন। কেন এত ভয়? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ত্রিপুরার মাটিতে তৃণমূলের জায়গা শক্ত হওয়া শুরু হতেই ভয় পেয়েছে বিপ্লব দেবের সরকার। সেই কারনে তৃণমূলের মিছিল সমাবেশ বন্ধ করতে লেগে যায় বিপ্লব দেবের সরকার।