পদত্যাগের পর সপ্তাহকাল ধরে নানান সরকারি মঞ্চে গিয়ে বিপ্লব দেব বুঝিয়েছেন, তিনি যা ছিলেন তাই আছেন। ত্রিপুরাতেই থাকছেন। ত্রিপুরার মানুষদের ছেড়ে কোথাও যাবেন না। কিন্তু শেষ অবধি তাঁকে যেতেই হল। কোথায় গেলেন কেউ জানেন না গত সপ্তাহকাল ধরে। মুখ্যমন্ত্রীর পদ চলে যাওয়ার পর তাঁর গতিবিধিতে বিরোধী দলগুলি বলতে শুরু করলো, রাজ্যে সমান্তরাল প্রশাসন চলছে। গাড়ি বাড়ি, হেলিকপ্টার, সরকারি মঞ্চের অপব্যবহার চলছে। মামলার হুমকি দিলেন, বিজেপির প্রাক্তন মন্ত্রী, কংগ্রেসের সুদীপ রায় বর্মন। এর পরেই তাঁর নীরব প্রস্থান। বিধায়ক বিপ্লব কুমার দেব বিমানে কলকাতায় নেমে হায়দরাবাদের বিমানে চড়েছিলেন, এর পর আর খবর নেই।
আর তারই পথ অনুসরন করে রাজ্য ছাড়লেন তাঁর ওএসডি সঞ্জয় মিশ্র। বিপ্লব দেব তাঁকে তুলে এনেছিলেন দিল্লি থেকে। যাবার সময় নিয়ে যান নি, একাই ফিরলেন। সরকারিভাবে দেখানো হল, ওএসডি সঞ্জয় মিশ্র উত্তরাখন্ড যাচ্ছেন। তাঁর ট্যুর প্রোগ্রাম সোসাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই, সবাই বলতে শুরু করেছে ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে ধ্যান করতে হিমালয় যাচ্ছেন। গত চার বছর ত্রিপুরার মিডিয়া সংক্রান্ত বিষয় দেখতেন সঞ্জয় মিশ্র। বলা হয়ে থাকে ত্রিপুরার কোনও নির্মান থেকে শুরু করে যে কোনও আউটসোর্সিং এর বরাত কারা পাবে তাঁর সবই স্থির করে গেছেন এই ব্যক্তি। যারা পেতেন তাঁদের সবাই আস্তো উত্তর ভারত থেকে। আবার আরএসএসের শ্রমিক কর্মচারী সংগঠন বিএমএসের পালটা হিসাবে রাজ্যে বিবেকানন্দ বিচার মঞ্চ গঠন করেছিলেন।
ত্রিপুরায় এখনো বিজেপির শাসন চলছে। তাঁর পরও সাধারন মানুষ কেউ কেউ সরবে অনেকেই নীরবে শ্রীলঙ্কার রাজাপক্ষে বিরোধীদের মতন মানসিক তৃপ্তির কথা জানাচ্ছেন। বিপ্লব দেব জমানার কুকর্মগুলি নিয়ে সরব সবাই। আবার বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহা যা বলছেন তাতে অবাক হচ্ছেন বিজেপির অন্দরের লোকজনও। প্রশ্ন আসে, বিজেপির সর্বময় কর্তারা বা সঙ্ঘের লোকজন কি এটাই চেয়েছিলেন? বিপ্লব জমানায় তিতিবিরক্ত মানুষের জন্য একটা খোলা হাওয়া এনে দিয়ে ২০২৩ সালের বিধানসভার নির্বাচনে যাওয়া, যাতে স্বভাবগতভাবে স্মৃতিশক্তিতে দুর্বল এই দেশের জনগন বিজেপিকেই আবার ভোট দেয়! এই পরীক্ষা তাঁদের সফল হয়েছিল উত্তরাখন্ডে। তাঁদের উদ্দেশ্য ত্রিপুরাতেও প্রথম পর্যায়ে সফল বলা যায়। মানুষ হাফ ছেড়েছেন। এবার তাহলে কি ২০২৩ সালের ভোটে সাধারন মানুষ বিপ্লবরাজ ভুলে আবার বিজেপিকেই ভোট দেবেন? এই প্রশ্নে সন্দেহ থেকেই যাবে শেষ অবধি। আপাতত জানা যায় উপনির্বাচনে জয়ের পরই রাজ্যসভার সদস্য পদে পদত্যাগ করবেন ডা. মানিক সাহা।

রাজ্যে রাম জমানায়ও ত্রিশ শতাংশের কিছু বেশি ভোট অক্ষত রয়েছে সিপিএমের হাতে। সাংগঠনিক ক্ষমতাহীন বিজেপি তিন শতাংশ থেকে ২০১৮ সালে বেড়ে ৪২ শতাংশ হয়েছিল মূলত কংগ্রেসের ভোট উজাড় করে। বিপ্লবের শাসনে সর্বোপরি সুদীপ রায় বর্মনেরা কংগ্রেসে ফিরে যাবার পর কংগ্রেসের ভোট নিজ জায়গায় ফিরে আসছে তাতে সন্দেহ নেই। তথাপিও আজকের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা যেহেতু কংগ্রেস ঘরানার এবং বাম বিরোধী হিসাবে পরিচিত তাই জুন মাসের উপনির্বাচনে বাম বিরোধী ভোটে বিভাজন অবশ্যম্ভাবী। কংগ্রেস বিজেপির পর এইবার তৃণমূল কংগ্রেসও যদি প্রার্থী দেয় তাহলে তিন ভাগ হতে পারে। এই অনুমান কি মুখ্যমন্ত্রী সাহাও করছেন? রাজধানী আগরতলার বড়দোয়ালি কেন্দ্রে তিনি প্রার্থী হবেন। এই কেন্দ্রেই তিনি ভোটার। বরাবরের কংগ্রেসের আসন হিসাবে পরিচিত এই আসনে কংগ্রেসের প্রার্থী হবেন সুদীপ রায় বর্মনের সঙ্গী আশিস কুমার সাহা। তাঁর বিজেপি ত্যাগের কারনেই এই আসনটি ফাঁকা হয়েছিল। তিনিও এই কেন্দ্রেরই ভোটার এবং একই পাড়ায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিবেশী।
এই রকম পরিস্থিতিতে নিজের জয় নিশ্চিত করতে হলে জীবনে এই প্রথম মানুষের ভোটের জন্য নির্বাচনে প্রার্থী মানিক সাহার জন্য বামেদের ভোটও দরকার পড়বে। এই কারনেই হোক কিংবা ২০২৩ নির্বাচনে দলীয় কৌশল মেনে মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা এক রকম সিপিএম ভজনা করছেন। উত্তর ত্রিপুরায় ধর্মনগরে যুবরাজ নগর বিধানসভা কেন্দ্রে দলীয় সম্বর্ধনা নিলেন তিনি। কর্মীদের বললেন, সিপিএম ২৫ বছর শাসনে ছিল, কারন তারা সুশৃঙ্খল ছিল। তাঁদের কাছ থেকে এইটি শিক্ষণীয়। প্রথম দিন থেকেই বলে চলেছেন, ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গের এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টাতে হবে। ভোট এলে বা ভোটের পরে বিরোধীদের ওপর হামলা, নির্যাতন কেন হবে? কর্মীদের বলছেন, বিরোধীদের সঙ্গে প্রতিশোধ মানসিকতা নয় সদ্ভাব রাখুন। বয়স্কদের থেকে পরামর্শ নিন। মুখ্যমন্ত্রী মানিকের এই ধরনের রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে দাঁড়িয়ে অন্য মানিক, বিরোধী দলনেতা মানিক সরকারও রাজনৈতিক সৌজন্যতায় বললেন, বিজেপির মুখ বদলের রাজনীতিতে আজ যিনি মুখ্যমন্ত্রী তাঁর পরিবারের সঙ্গে আমাদের পার্টির যোগাযোগ অনেক পুরানো। মুখ্যমন্ত্রীর বড় ভাই বিশিষ্ট ব্যবসায়ী প্রয়াত চানমোহন সাহাকে আমাদের সরকারের সময়ে আগরতলা পুরসভায় মনোনীত কাউন্সিলার করা হয়েছিল।
দুই মানিকের রাজনৈতিক এই শিষ্টাচার যখন দেখছেন মানুষ তখন ভারতের নির্বাচন কমিশন চার বিধানসভা কেন্দ্রে উপ নির্বাচন ঘোষনা করলো ২৩ জুন। ডা. মানিক সাহার মুখ্যমন্ত্রিত্বের ৪২ দিনের মাথায় উপনির্বাচনের ভোট হবে। বাকি তিনটি আসনের মধ্যে ৬ আগরতলা কেন্দ্রে দলত্যাগী বিধায়ক, প্রাক্তন মন্ত্রী সু্দীপ রায় বর্মনের বিরুদ্ধে জুতসই প্রার্থী খুঁজছে বিজেপি। ধলাই জেলায় সুরমা তপশিল সংরক্ষিত আসনটি শূন্য রয়েছে কালীঘাটে মাথা মুন্ডনকারী বিজেপি বিধায়ক আশিস দাসের বহিস্কারের পর। এই কেন্দ্রে তিপ্রা মথা বাঙ্গালী প্রার্থী দিয়ে তাঁদের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র প্রকাশের ভাবনা চিন্তা করছে বলে জানা যাচ্ছে। চতুর্থ আসনটি উত্তর ত্রিপুরা জেলায়, যুবরাজনগর। এই আসনটি বরাবর সিপিএমের। ২০১৮তে প্রাক্তন অধ্যক্ষ রমেন্দ্র নাথ জিতেছিলেন এই কেন্দ্রে। ছয় মাস আগে রোগভোগে তাঁর মৃত্যু হয়। অর্থাৎ যে চারটি আসনে উপভোট হচ্ছে তাঁর মধ্যে এই আসনটিই শুধু ছিল সিপিএমের।
বেশ সুন্দর রিপোর্টিং।শুধু জানা গেলোনা তিনি কোথায়!