গত কয়েকদিন ধরেই ত্রিপুরা উত্তপ্ত পুর নির্বাচন ঘিরে। এই প্রথম বাংলার বাইরে অন্য রাজ্য দখল করতে ঝাঁপ দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাংলায় তৃতীয়বার ফিরে আসার পর থেকেই তারা ত্রিপুরাকে পাখির চোখ করে। ২০২৩-এ ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচন তার আগে পুরভোট তৃণমূলের কংগ্রেসের অ্যাসিড টেস্ট।
বৃহস্পতিবার আগরতলা-সহ ত্রিপুরার ১৩টি পুর এলাকার ২২২টি আসনে ভোট ছিল। সেই ভোটের প্রচার চলাকালীন ত্রিপুরায় ব্যাপক হিংসাত্মক ঘটনার অভিযোগ ওঠে। অশান্তির প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত ত্রিপুরা সরকারের কাছে রিপোর্ট চেয়ে পাঠায়। ত্রিপুরা সরকার হিংসা ঠেকাতে কী কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তা সুপ্রিম কোর্ট জানাতে চায়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশও দেওয়া হয় সুপ্রিম কোর্টের তরফে।
ত্রিপুরায় পুর ভোট যে শান্তিপূর্ণ হবে না সেই আঁচ আগেই পেয়েছিল কমিশন। যে কারণে রাজ্য নির্বাচন কমিশন পুরভোটের একদিন আগে ২০টি থানার ৬৪৪টি বুথের মধ্যে ৩৭০টি বুথকে অতিসংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করে। ২৭৪টি বুথ চিহ্নিত হয় সংবেদনশীল হিসেবে। এরপর অবশ্য আগরতলার সবক’টি বুথই সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কমিশন আগরতলা সেনসিবিলিটি ম্যাপিংয়ের পরই হাইকোর্টের নির্দেশে ওই ঘোষণা করে।

প্রসঙ্গত, গত ৫ বছরে এই প্রথম পুরভোট হচ্ছে ত্রিপুরায়। ইতিমধ্যে ত্রিপুরার শাসক দল বিজেপিই ত্রিপুরার ২০টি পুরসভার ৩৩৪টি আসনের মধ্যে ১১২টি আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে গিয়েছে। কোনও লড়াই ছাড়াই বিজেপির দখলে চলে গিয়েছে ৭টি পুরসভাও। বাকি ২২২টি আসনের জন্য ভোট ছিল বৃহস্পতিবার। এই কেন্দ্র গুলির জন্য মোট ৭৮৫ জন প্রার্থী লড়াই করেন।
ত্রিপুরা পুর নির্বাচনের প্রচারে নেমে বারংবার বাধা পাওয়ায় তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে গত সপ্তাহেই সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানো হয়। তারা আদালতকে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু আদালতের তরফে সেই আর্জি খারিজ করে বলা হয়েছিল, “গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোয় নির্বাচন স্থগিত রাখাটা একটি চরম পদক্ষেপ। যদি অন্য আর কোনও উপায় না থাকে, একমাত্র তাহলেই একেবারে শেষ উপায় হওয়া উচিত এটি।” কিন্তু গোটা ভোট প্রক্রিয়া যাতে নির্বিঘ্নে সম্পূর্ণ হয়, ভোটগ্রহণ পর্ব থেকে শুরু করে ফল ঘোষণা যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়, তার জন্য উচ্চ আদালত ত্রিপুরা পুলিশকে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর নির্দেশও দেয়।
কিন্তু ত্রিপুরা পুরভোট প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণভাবে মেটা তো দূরের কথা, চরম আশান্তি এবং হিংসাত্মক ঘটনাবলিতে ভরে গেল। যার আঁচ মিলেছিল আগের রাতেই। বুধবার রাত থেকেই ত্রিপুরার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নানা ধরণের অশান্তির খবর আসছিল। অভিযোগ, বিরোধী দলের একাধিক প্রার্থীর বাড়িতে হামলা চালায় শাসক দলের কর্মী ও সমর্থকরা। কোথাও পতাকা-ফেস্টুন ছিঁড়ে দেওয়া হয়, আবার কোথাও বিরোধী দলগুলির এজেন্টদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগের খবরও পাওয়া যায়। সেই অশান্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পউছায় বৃহস্পতিবার সকালে ত্রিপুরায় পুরভোট শুরু হওয়ার পর।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অশান্তির মাত্রা ভয়ঙ্কর আকার নেয়। আগরতলায় ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী তপন বিশ্বাস এতটাই আক্রান্ত হয়েছেন যে মারধরের চোটে তাঁর ২টি চোখই নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে আসঙ্কা করা হচ্ছে। এই ঘটনার আগেও সকাল বেলায় ৫ নম্বর ওয়ার্ডে লিটন বর্মন নামে এক তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ। এছাড়া সকালবেলা ভোট শুরু হতেই বুথে বুথে অশান্তির ছবি ধরা পড়ে। বেশ কয়েকটি বুথ থেকে তৃণমূল কংগ্রেসের পোলিং এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। ভোটারদের ভোট দানেও বাধা দিয়ে একাধিক জায়গায় প্রকাশ্যে ভোট লুঠ চলেছে বলেও অভিযোগ করেছেন তৃণমূল কংগ্রেস। পাশাপাশি এক মহিলা ভোটারের হয়ে ভোট দিয়ে দিচ্ছেন বিজেপি কর্মী এমন ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে।
উল্লেখ্য, ত্রিপুরা পুরভোটের দুদিন আগে বিজেপি বিধায়ক সুদীপ পায় বর্মন অভিযোগ করেছিলেন পুরভোট প্রহসনে পরিণত করা হয়েছে। বিস্ফোরক সুদীপ পুরভোটের দিনও বিপ্লবদেব সরকারকে তীব্র নিশানা করে প্রকাশ্যে অভিযোগ করে বলেছেন ত্রিপুরায় গণতন্ত্র বিপন্ন। অন্যদিকে তৃণমূল প্রথম থেকেই বিজেপি তথা বিপ্লব দেব সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে এসেছে। এদিন ভোটের পর তারা ফের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তৃণমূলের দাবি, এদিন পুরভোটে যা হয়েছে, তা ভোটের নামে প্রহসন। অন্যদিকে ত্রিপুরার বামেরাও সরব। সিপিএমের অভিযোগ, নিয়ম থাকা সত্ত্বেও তাদের দলের পোলিং এজেন্টদের বুথে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বুথের ভিতরে সাংবাদিকদের ঢুকতেও বাধা দেওয়া হয়েছে। সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, তাঁরা পুলিশ এবং রাজ্য নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জানাতে ফোন করেছিলেন। অভিযোগ, সেই ফোনও ধরা হয়নি। বামেদের বক্তব্য, ত্রিপুরার বিজেপি সরকার পুরভোটের দিন গণতন্ত্রকে কলঙ্কিত করেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছে।