ফের ত্রিপুরায় গেরুয়া ঝড়। পুরভোটে ৯৯ শতাংশ আসন নিজেদের পকেটে ভরলো বিজেপি। আগরতলা পুরনিগম থেকে শুরু করে অন্যান্য পুরসভাগুলিতেও বিজেপির জয়জয়কার। মাত্র একটি আসন দখল করতে পেরেছে তৃণমূল কংগ্রেস। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে আগরতলা পুরসভার নির্বাচনে বেশ কয়েকটি আসনে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে ঘাসফুল শিবির। বামেদের হাত থেকে ছিটকে গিয়েছে আগরতলা পুরসভা।
ত্রিপুরায় প্রথম বার নির্বাচনে অংশ নিয়ে আগরতলাকে পাখির চোখ করেছিল ঘাসফুল শিবির। শাসক দলের সঙ্গে তৃণমূলের সংঘাতের জেরে বেশ কিছুদিন ধরে আগরতলা হয়ে উঠেছিল ত্রিপুরা পুরভোটের ভরকেন্দ্র। আর ত্রিপুরার পুরভোট মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের কাছে হয়ে ওঠেছিল প্রেস্টিজের লড়াই। লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত জিতল বিজেপি-ই। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মাত্র সাত মাসে তৃণমূলের উত্থানকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
একুশের বাংলা বিধানসভা জয়ের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরাকে তার পরবর্তী টার্গেট করেছেন। বাংলার শাসকদল বিপ্লবের গেরুয়া রাজ্যে ঘাসফুল ফোটানোর লক্ষ্যে গত সাত মাস ধরে কসরত করে যাচ্ছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সব প্রচেষ্ঠাই বৃথা। ত্রিপুরা পুরভোটে আগরতলা পুরনিগমের নির্বাচন থেকে শুরু করে অন্যান্য পুরসভাতে বিজেপি প্রায় সিংহভাগ আসনে তাঁদের অগ্রগমন বজায় রাখল। বিধানসভা ভোটে বাংলার মানুষ দু’হাত ভরে তৃণমূলকে আশীর্বাদ করলেও প্রতিবেশী রাজ্যবাসী অন্তত পুরভোট কার্পণ্য দেখালো। বোঝা গেল এখনও ত্রিপুরাতে ঘাসফুলের জমি শক্তপোক্ত হয়নি।
তবে ঘাসফুল আমবাসা পুর পরিষদের একটি আসনে জয়ী হয়েছে। প্রথমবার ভিনরাজ্যের পুরসভা ভোটে লড়াই করে কোনও আসনে জয়যুক্ত হল তৃণমূল। আমবাসা পুরনিগমে একটি আসন পেয়েছে সিপিএমও। বাকি আসনগুলি বিজেপির দখলে গিয়েছে। কংগ্রেস কোনও খাতা খুলতে পারেনি।
তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, ত্রিপুরায় তৃণমূল সংগঠনের বয়স আড়াই মাসও হয়নি। তা স্বত্বেও সেখানে খাতা খুলতে পারা গিয়েছে, এটা সহজ কথা নয়। তাছাড়া পুরভোট ঘিরে তৃণমূল কর্মীদের উপর একাধিকবার হামলা হয়েছে। একাধিক মামলাও করা হয়েছে। ভোটের দিন পর্যন্ত সন্ত্রাস চালিয়েছে বিজেপি। ভোটারদের ভয় দেখানো হয়েছে। তার পরেও টিএমসিকে ত্রিপুরার শাসকদল ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিকূল পরিবেশে তৃণমূল লড়াই চালিয়েছে। সেই লড়াইয়ের ফলেই খাতা খুলতে সমর্থ হয়েছে তারা।
অন্যদিকে ত্রিপুরার শাসকদল জানিয়েছে, টিএমসিকে তারা বিরোধী শক্তি হিসেবে মনে করেনি। ত্রিপুরায় এতকাল বামেরাই বিরোধী শক্তি ছিল। পুরভোটের পরেও তারাই বিরোধী শক্তি। যদিও আগরতলা পুরসভার ভোটে বিরোধী শক্তি হিসেবে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে তৃণমূল। একমাত্র আগরতলাতেই তারা সবক’টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল।
সাম্প্রতিক কালের নির্বাচনগুলির ভিত্তিতে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একটা বড় অংশ মনে করেন, গোটাদেশে মূলত হিন্দু ভোটের জোরে বিজেপি তাদের জয় ছিনিয়ে আনে। তার মানে যে সমস্ত অঞ্চলে মুসলিম ভোট বেশি, সেখানে বিজেপি বিরোধী হাওয়া তোলা গেলে সেখান থেকে বিজেপির প্রায় জেতা আসনও কেড়ে নেওয়া সম্ভব। ঠিক এমন চিন্তা ভাবনা থেকেই ঘাসফুল শিবির ত্রিপুরার সোনামুড়া, মেলাঘর এলাকা দুটিকে নিশানা করেছিল। উল্লেখ্য, তৃণমূল সোনামুড়া থেকেই পুরভোটের প্রচার শুরু করেছিল। দু’টি পুরুসভাতেই ১৩টি করে আসন। আর এলাকাদুটিই মুসলিম অধ্যূষিত। কিন্তু দেখা গেল যে মুসলিম অধ্যূষিত আসনে জয়ের স্বপ্ন দেখে তৃণমূল ভোটের জন্য বেশি সময় দিয়েছিল তা আখেরে কাজে আসেনি। কারন সেখানেও জিতেছে বিজেপি।
অর্থাৎ বাংলার মতো ত্রিপুরাতে ঘাসফুল শিবির যে পরিকল্পনা নিয়েছিল, মুসলিম ভোট ব্যাঙ্ককে সম্বল করে ভোট তরণী পার হওয়া সেই ভাবনা কার্যত অসার হয়ে গেল। কেবল তাই নয় একদা যে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক মানিক সরকারের নেতৃত্বাধীন বামেদের দখলে ছিল, সেই ভোটব্যাঙ্ককেও ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল তৃণমূল। কিন্তু তৃণমূলের পরিকল্পনা কোনও কাজে লাগলোনা। বাস্তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি ফুটে উঠলো৷ সাফল্য তো দূরের কথা, একটি আসনেও তৃণমূল প্রার্থীরা জিততে পারলো না। ১৩ টি আসনেই জয় ছিনিয়ে নিল বিজেপি।
বিজেপির তুমুল জয়ের পরও লক্ষ্যনীয় বিষয় হল ত্রিপুরার বেশ কিছু ওয়ার্ডে উল্লেখযোগ্যভাবে তৃণমূল দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। বাকি ক্ষেত্রে অবশ্য বামেরাই দ্বিতীয় স্থানে। অন্যদিকে কংগ্রেসের হাল শোচনীয়। কংগ্রেস বহু ক্ষেত্রে চতুর্থস্থানে নেমে গিয়েছে। আগরতলায় ২৬টি ওয়ার্ডে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসছে তৃণমূল, ৯টি ওয়ার্ডে বামেরা দ্বিতীয় স্থানে। মাত্র কয়েক মাসের চেষ্টায় একটি দলের পক্ষে পুরভোটে সফল ভাবে নির্বাচনে লড়া এবং ২০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে প্রধান বিরোধীর ভূমিকায় উঠে আসা উল্লেখ করার মতোই।