আগামী ২৫ নভেম্বর দেশের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় পৌরসভা নির্বাচন। আগরতলা পৌর করপোরেশন এবং রাজ্যের বিভিন্ন পৌরসভার নির্বাচন ঘিরে ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ত্রিপুরার রাজনৈতিক অঙ্গন। ২০২৩ সালে ত্রিপুরায় বিধানসভা নির্বাচন, তার আগে সে রাজ্যের পুর নির্বাচন তৃনমুলের কাছে অ্যাসিড টেস্ট। অন্যদিকে সে রাজ্যের শাসক দল বিজেপি এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়তে নারাজ। সেই কারণে ত্রিপুরার পৌরসভা নির্বাচনের লড়াইটা এই মুহুর্তে হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যেকার লড়াই। এই অবস্থায় সায়নী ঘোষকে গ্রেফতারের ঘটনায় ত্রিপুরার রাজনৈতিক পারদ আরও চড়েছে।
প্রসঙ্গত, ত্রিপুরায় পৌরসভা নির্বাচনে আগরতলা পৌর করপোরেশন-সহ সে রাজ্যের বিভিন্ন পৌরসভায় বিজেপি ৩৩৪টি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিলেও তৃণমূল প্রার্থী দিয়েছে ১২৫টি ওয়ার্ডে। অন্যদিকে আগরতলা পৌর করপোরেশনের ৫১টি ওয়ার্ডেই বিজেপির সমানসংখ্যক প্রার্থী দিয়েছে তৃণমূল। ত্রিপুরায় একটানা ২০ বছর ক্ষমতায় ছিল বাম দল। এরপর ২০১৮ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাম দলকে হারিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসে। বাংলায় তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এসেই তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ত্রিপুরাকে পাখির চোখ করেন। তারপর থেকেই ত্রিপুরার রাজ্য রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সায়নী ঘোষের ঘটনায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আগরতলা পৌঁছেই বিপ্লব দেবের নাম ধরে বিজেপিকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি জানান, ত্রিপুরাতে নৈরাজ্যের সরকার চলছে। এরপরেই অভিষেকের প্রশ্ন, ত্রিপুরায় তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি শক্ত হয়েছে মাত্র কয়েক দিন। আর তারপর থেকেই বিজেপি ভয় পেয়ে তৃণমূলের নেতা কর্মীদের ওপর আক্রমণ চালাতে শুরু করেছে। এখনই যদি এত ভয় পায় তাহলে বছর পেরলে বিজেপির কি অবস্থা হবে?
ত্রিপুরার বামশিবিরও রবিবার সায়নী ঘোষের উপর হামলা ও থানার বাইরে তৃণমূল নেতা কর্মীদের ওপরও হামলার তীব্র নিন্দা করে। বামেদের ভূমিকা নিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের ধন্যবাদ জানান, সেই সঙ্গে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সিপিএমকে মাঠে নেমে লড়াই করার আহ্বান জানান। এরপরেই সিপিএম ও কংগ্রেসের উদ্দেশে অভিষেক বলেন, বিজেপিকে হারানোর ক্ষমতা সিপিএমের নেই, এমনকি কংগ্রেসেরও বিজেপিকে হারানোর ক্ষমতা নেই। যদি সেই ক্ষমতা তাদের থাকত তাহলে সিপিএম বা কংগ্রেস বাড়িতে বসে থাকত না। বিরোধী দলের কাজ হল গঠনমূলক বিরোধিতা করে রাজ্যের শাসক দলের আসল চেহাড়াটা মানুষের সামনে নিয়ে আসা। কিন্তু ত্রিপুরায় সিপিএম বা কংগ্রেস সেই কাজটা করেনি। যদি তা হত তাহলে তৃণমূলকে সমস্ত জায়গাতে পৌঁছাতে হত না। এরপরেই অভিষেক বিজেপিকে হারাতে ত্রিপুরার সমস্ত দলকে একজোট হওয়ার বার্তা দেন। বিশেষ করে ত্রিপুরার কংগ্রেস এবং সিপিএমকে। এরপররেই অভিষেক ত্রিপুরাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, যদি আসল পরিবর্তন চান তাহলে তৃণমূলকে ভোট দিন। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর পরামর্শ, বিজেপি জিন্দাবাদ বলে ভোট দিতে যাবেন আর তৃণমূলকে গিয়ে ভোট দেবেন।
এদিকে ত্রিপুরায় পুরভোটের দুদিন আগে বিজেপি বিধায়ক সুদীপ রায় বর্মন বিজেপির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বলেন, সন্ত্রাস চলছে রাজ্যে। একথার অর্থ তিনি ঘুরিয়ে বিপ্লব দেবের সরকারের বিরুদ্ধেই তোপ দেগে দিলেন। তিনি এও জানান, ত্রিপুরা রাজ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকেও জানানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে সুদীপের মন্তব্যকে স্বাগত জানিয়ে বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে তৃণমূলের নেতা মন্ত্রী। মঙ্গলবার ত্রিপুরায় সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁরা বলেন, সুদীপ রায় বর্মন যে কথা বলেছেন, বিজেপির ক্ষমতা থাকলে তাঁকে বহিষ্কার করে দেখাক, তখন বোঝা যাবে বিজেপির কত হিম্মত। একদিকে বিজেপির বিধায়কের দলের বিরুদ্ধেই বিস্ফোরক মন্তব্য অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের চ্যালেঞ্জ- এতে পুর ভোটের আগে বিপ্লব দেব সরকার ত্রিপুরায় যথেষ্ট অস্বস্তিতে পড়লো।
আগরতলায় সাংবাদিক বৈঠকে যদিও সুদীপ রায় বর্মন বলেন, রাজ্যে সিপিএমের গুণ্ডারা বিজেপিতে ঢুকে বদনাম করছে। কিন্তু তিনি আসলে ঘুরিয়ে বিজেপিই যে সন্ত্রাস করছে সে কথাই বলেছেন। ত্রিপুরা বিজেপির বর্তমান নেতৃত্বকে তিনি শিশুসুলভ বলে কটাক্ষ করলে, তাঁর মন্তব্যকে হাতিয়ার করে তৃণমূল নেতৃত্ব ত্রিপুরার বিজেপি সরকার তথা বিপ্লব দেবকে রীতিমতো কটাক্ষ করেন। এমনকি তাঁরা বলেন, ত্রিপুরায় বিজেপি এখন হার্মাদ-বজ্জাতের দল। এরপরেই তারা বিপ্লবকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন এই বলে- ক্ষমতা থাকলে সুদীপ রায় বর্মনকে বহিষ্কার করুক বিজেপি।
তৃণমূলের তরফে ত্রিপুরাবাসীর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, বিজেপি বাংলায় পর্যুদস্ত হওয়ার পর ত্রিপুরাতেও হারতে চলেছে, সেই কারণে তারা ভয় পাচ্ছে। তৃণমূল ত্রিপুরাতে সুষ্ঠু ভোটের ব্যবস্থা করতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানোর পর সুপ্রিম কোর্ট বিপ্লব দেব সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে নিরাপত্তার জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতেও ত্রিপুরার বিপ্লব দেবের সরকার যথেষ্ঠ কোনঠাসা বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।