বাংলা বিজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের পাখির চোখ এখন ত্রিপুরা। বছর দেড়েক পরেই সে রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। তৃণমূল সেখানে সংগঠন ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করে দিয়েছে। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ব্রাত্য বসু, মলয় ঘটক, কাকলি ঘোষদস্তিদার, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সমীর চক্রবর্তী এবং কুণাল ঘোষকে নিয়ে একটি টিম তৈরি করা হয়েছে। তাঁরা প্রতি মাসে এখানে প্রচার করতে আসবেন। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার ত্রিপুরার মহারাজা প্রদ্যোৎ কিশোর মাণিক্য দেববর্মনের সঙ্গে বৈঠক করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক কুণাল ঘোষ। প্রসঙ্গত, প্রদ্যোৎ শুধুমাত্র মহারাজা নন, তিনি জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় অন্যতম প্রধান মুখও বটে। উত্তর পূর্বের এই রাজ্যের ৬০ আসনের মধ্যে ২০টি উপজাতি প্রভাবিত। তাই ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সঙ্গে কুণালের বৈঠক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। প্রদ্যোৎ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি হলেও এখন জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় অন্যতম প্রধান মুখ। বৃহস্পতিবারের ওই সাক্ষাৎ ঘিরে ত্রিপুরায় জল্পনা বাড়ছে।
ওদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরের পরেই ত্রিপুরায় তৎপর হয়ে উঠেছে কংগ্রেস। এআইসিসি’র সাধারণ সম্পাদক অবিনাশ পাণ্ডে এবং ছত্তিশগড়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিএস সিং দেও তড়িঘড়ি ত্রিপুরা এসে ব্লক সভাপতিদের সঙ্গে বৈঠক সেরে গেলেন। জানা গিয়েছে বৈঠক হয়েছে তৃণমূলের সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা নিয়ে। কর্মীদের কংগ্রেস ছেড়ে যেতে বারণ করা হয়েছে। প্রদ্যোত মাণিক্য দলের অবস্থান নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ডিসেম্বর মাসে সফর করবেন রাহুল গান্ধী। এর পরেই এদিন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সম্পাদক ত্রিপুরায় পৌঁছলে বিপ্লবের রাজ্যে জল্পনা ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে- তবে কী কংগ্রেস–তৃণমূল জোট হচ্ছে নাকি প্রদ্যোত মাণিক্য দলের সঙ্গে?
প্রসঙ্গত; আইপ্যাকের ২৩ জন আধিকারিককে হোটেল–বন্দি করে রাখার পর তাঁদের ছাড়াতে আদালতে সওয়াল করেন ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি পীযূষ বিশ্বাস। এরপরও ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন সুবল ভৌমিক–সহ কয়েকজন। এছাড়াও তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কংগ্রেসের বহু হেভিওয়েট নেতারা। তারপরই ত্রিপুরার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি পীযূষ বিশ্বাসকে ফোন করে বিস্তারিত জানতে চেয়েছেন সোনিয়া গান্ধীর ঘনিষ্ঠ নেতা কে সি বেনুগোপাল। ইতিমধ্যেই প্রশান্ত কিশোরের সঙ্গে সোনিয়া–রাহুলের বৈঠক হয়েছে। রাজধানীতে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক হয়। তাইরাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের মনেও ঘুরপাক খাচ্ছে একই প্রশ্ন।
তবে এটা ঘটনা ত্রিপুরার এই মুহুর্তে তৃণমূল যতটা হাওয়া গরম করতে পেরেছে, বাকি বিরোধীরা সেই তুলনায় কিছুই নয়। এআইসিসি’র পক্ষ থেকে দুই প্রতিনিধি ত্রিপুরায় এসে বৈঠক বা তৃণমূলের সক্রিয়তা নিয়ে বিজেপি যতই কটাক্ষ করুক না কেন, বিপ্লব দেবের রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছেন। তার মধ্যে কংগ্রেস তৃণমূল যদি হাত মেলায়, বিজেপির তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
উল্লেখ্য, মুকুল-জমানায় (২০১৮) ত্রিপুরায় তৃণমূল কংগ্রেস তৈরি হয়েছিল কংগ্রেস ভেঙেই। সেই সময় একের পর এক কংগ্রেস বিধায়ক তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। অবশ্য পরে তৃণমূলে মোহভঙ্গ হওয়ায় সেই বিধায়কেরা গেরুয়া শিবিরে যোগ দেন। ফলে, ত্রিপুরার আগের বিধানসভা নির্বাচনের সময় তৃণমূলের সংগঠন সে অর্থে ছিল না বললেই চলে। তখন তৃণমূল কংগ্রেসের হাত ধরার চেষ্টা করলে ত্রিপুরা প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি বীরজিৎ সিংহ ততটা উতসাহ দেখান নি। কিন্তু এবার ত্রিপুরা নিয়ে তৃণমূল তৎপর হয়ে ওঠায় কংগ্রেস চিন্তায় পড়েছে। বাংলার মতো ত্রিপুরাতেও কংগ্রেস নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে না তো। সাত তাড়াতাড়ি তাই দিল্লির প্রতিনিধিদল ত্রিপুরায় পৌঁছে যায়। সেখানে কংগ্রেসের সাংগঠনিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিজেপির পাশাপাশি তৃণমূলকে ঠেকাতে নাকি তৃণমূলকে সঙ্গে নিয়ে কোন রণকৌশলে হাঁটবে তাই নিয়ে আলোচনা হল তা নিয়ে জল্পনা চলছে।
তবে বাংলার পর ত্রিপুরায় গুরুত্ব বাড়ছে তৃণমূলের। মমতা বাংলার বাইরে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে প্রথমে ত্রিপুরার দিকে নজর দিয়েছে। বাম সরকারের পতন ঘটিয়ে ত্রিপুরায় ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস এখন সেই গেরুয়া ঝড়কে থামাতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। পূর্বের রাজ্যগুলির দিকেই বিশেষ নজর দিতে শুরু করেছেন তিনি। ইতিমধ্যেই অসমের এক বিধায়কের সঙ্গে কথা বলেছে তৃণমূল। যদিও অসমে ভোট হয়ে গিয়েছে। বিজেপি ফের ক্ষমতায় ফিরেছে। আর ত্রিপুরায় ভোট আসন্ন। হাতে যে সময় রয়েছে তাকে পুরোদস্তুর কাজে লাগাতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস।তাই ঘনঘন তৃণমূল নেতাদের ত্রিপুরা সফর শুরু হয়েছে।তৃণমূলের সক্রিয়তা দেখে চিন্তিত কংগ্রেস ত্রিপুরায় প্রতিনিধি পাঠায়। তাদের সফরের পরেই ত্রিপুরার রাজনীতিতে কংগ্রেস-তৃণমূল কাছাকাছি আসা নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে।
উল্লেখ্য, তৃণমূল কংগ্রেস ত্রিপুরার আগামী নির্বাচনে ফ্যাক্টর হতে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রদ্যোতের সঙ্গে কুণালের সাক্ষাৎ ঘিরে ত্রিপুরায় নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের গুঞ্জন শুরু হয়েছে। বলাই বাহুল্য এখানে জোট করে জনজাতির ভোট নিজের ঝুলিতে টানতে চাইবে পাশাপাশি বাঙালি আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপির ভোটব্যাংকে থাবা বসাতে চাইবে তৃণমূল।