বৃহস্পতিবার জনসংখ্যায় মাত্র ৪০ লাখ মানুষের ত্রিপুরায় ভোট। দেশের লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে উত্তর পূর্বের এই রাজ্যের হিস্যা মাত্র ২টি। আগামীকালের ভোটে ৬০ আসনের মধ্য ৩১ আসন যে রাজনৈতিক দল ঝোলায় ভরতে পারবে, তারাই দখল করবে রাজ্যের ক্ষমতা। প্রসঙ্গত, এর আগে এই রাজ্যে বিধানসভার ১১টি নির্বাচনে বামপন্থীরা সাতবার এবং কংগ্রেস ও বিজেপি একবার করে জিতেছে। এক সময় ত্রিপুরার নির্বাচন মানেই ছিল বামপন্থী বনাম কংগ্রেসের লড়াই। পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার পর ত্রিপুরা ছিল বামেদের তৃতীয় দুর্গ। তখন তাদের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল কংগ্রেস। কিন্তু গত নির্বাচন থেকে কংগ্রেস ও সিপিএম উভয়ে তাদের পুরোনো জায়গা হারানোয় বিজেপি নতুন শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। এমনকি বিজেপি কংগ্রেস প্রার্থীদের একটা বড় অংশও কেড়ে নেয়। পাশাপাশি গত পাঁচ বছর বিজেপির শাসনের মধ্যেই ত্রিপুরায় নতুন শক্তি হিসেবে মাথা তুলেছে ‘তিপ্রা মথা’। এই দলটি একান্ত ভাবেই ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক দল।
এবার ত্রিপুরা নির্বাচনের অন্যতম আকর্ষণ ভোটে তিপ্রা মথার অংশগ্রহণ। ফলে এবারের ভোট হবে ত্রিমুখী। জোর জল্পনা তিপ্রা মথা বিজেপি ও সিপিএমের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তারা সরকার গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। তিপ্রা মথা বৃহত্তর ‘তিপ্রাল্যান্ড’ চায়। ত্রিপুরার বাঙালিরা আবার সেটা চায় না। বাঙালিরাই ত্রিপুরা রাজ্যে সংখ্যাগুরু, প্রায় ৭০ শতাংশ। বাকিটা জনগোষ্ঠী, তারা এক-তৃতীয়াংশ হলেও রাজ্যজুড়ে ত্রিপুরা বা ত্রিপুরীদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব কম নয়। কিন্তু একসময় জনগোষ্ঠীর গেরিলারা বাঙালিদের তাড়াতে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল। তাই বিজেপির পাঁচ বছরের শাসনের অনাচার ও হিংসার হিসাব নিকাশ ছাড়াও তিপ্রাল্যান্ড ঘিরে দ্বন্দ্বের কথাও এসেছে নির্বাচনী প্রচারে। তিপ্রা মথার মূল চমক ত্রিপুরার রাজপরিবারের সদস্য তথা তিপ্রা মথার প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মা। তিনি নিজে ভোটযুদ্ধে লড়ছেন না। এমনকি দলের প্রথম সারির নেতাদেরও মনোনয়ন দেননি। উপজাতি সংরক্ষিত ২০টি আসনের বাইরে তপশিলী জাতি সংরক্ষিত এবং সাধারণ আসন মিলিয়ে ৪২টিতে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে তিনি হেলিকপ্টার নিয়ে রাজ্যের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে গ্রেটার তিপ্রাল্যান্ডের দাবিতে প্রচার করেছেন।
নির্বাচন প্রচারে লাল-হলুদ রঙের পোশাকে উজ্জ্বল তিপ্রা মোথা দলের কর্মী-সমর্থকদের স্বতঃস্ফূর্ত ‘বুবাগ্রা’ ধ্বনিতে অনেকেরই মনে হয়েছে যেন ফিরে এসেছে ৭৫ বছর আগের রাজতন্ত্র। প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালের আগে কয়েক শতাব্দী ধরে ত্রিপুরা রাজ্যের শাসন ক্ষমতা ছিল প্রদ্যোৎ মাণিক্যের পূর্বপুরুষদের হাতে। দেশ স্বাধীন হলে ত্রিপুরার রাজ পরিবার ত্রিপুরাকে ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। এরপর গত কয়েক দশকে পৃথক তিপ্রাসা রাজ্যের দাবিতে বহুবার অশান্ত হয়েছে ত্রিপুরা। গত শতকের আটের দশকে পৃথক তিপ্রাসা রাজ্যের দাবি তুলেছিল ত্রিপুরা ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্স। সেবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ত্রিপুরার একটা বড় অংশে উপজাতিদের স্বায়ত্বশাসনের অধিকার দিয়ে সামাল দিয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ থেকে ২০০৪ বারেবারে ত্রিপুরা অশান্ত হয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯৬-এর ১২ ডিসেম্বর ২৭ জন বাঙালি হত্যা উত্তর পূর্ব এই রাজ্যের সবথেকে হিংস্র ঘটনা।
ভোটের আগে ত্রিপুরার উপজাতি সম্প্রদায় ফের একবার পৃথক তিপ্রাসা রাজ্য গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ত্রিপুরা ন্যাশনাল ভলান্টিয়ার্সের প্রাক্তন প্রধান বিজয় কুমার রাংখল, অল ত্রিপুরা টাইগার ফোর্সের প্রাক্তন প্রধান রঞ্জিত দেববর্মা সকলেই ‘বুবাগ্রা’ বা রাজাকে চাইছেন। তবে কি এর আগে যেভাবে উপজাতি বনাম বাঙালি, মণিপুরী বা মুসলিমদের সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়েছে ত্রিপুরা, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে? সম্প্রতি প্রদ্যোত মানিক্য দেববর্মা আদিবাসী সমাজকে একত্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা পেতে তিপ্রা মথা নামের দলটি মারফত সাড়া জাগিয়েছেন। ৬০ আসনের বিধানসভা ভোটে অন্তত ২০টি আসনে ত্রিপুরাদের ব্যাপক উপস্থিতি। আসনগুলি ট্রাইবালদের জন্য সংরক্ষিত। প্রদ্যোত মানিক্যের লক্ষ্য এই ২০ আসন। তিনি জানেন বাকি ৪০ আসন ভাগাভাগি হবে বিজেপি, সিপিএম, কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে। কিন্তু ভাগাভাগির পর যার হাতে ২০টি আসন এমনকি সরকার গঠনের সুযোগ চলে আসতে পারে।
একথা ঠিক স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও ত্রিপুরায় উপজাতিদের সমস্যার সমাধান হয়নি। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ত্রিপুরার উপজাতিদের বসবাসের এলাকা নিয়ে বৃহত্তর তিপ্রাল্যান্ড গঠনের দাবি তুলেছেন প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য। তিনি উপজাতিদের বড় অংশের সমর্থন আদায় করেছেন। গত এপ্রিল মাসে স্বশাসিত জেলা পরিষদের নির্বাচনে ২৮টি আসনের মধ্যে ১৮টি আসনে জয়লাভ করে তিপ্রা মোথা। উল্লেখ্য, উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত ২০টি আসন ছাড়াও পাঁচ-ছটি এমন আসন রয়েছে যেখানে উপজাতি ভোটের প্রভাব রয়েছে। অনেকেই নির্বাচনের দু-দিন আগে তিপ্রা মথার প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মাণিক্য দেববর্মার ভোট রাজনীতি থেকে অবসরের কথা ঘোষণা করায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিস্মিত। কিন্তু বুঝতে হবে এটা আসলে রাজার একটা রণনীতি।