দুই দেশের সীমানায় রাতারাতি কাঁটাতারের বেড়া পড়ে। বন্দুক হাতে সীমান্তরক্ষীরা পাহারা দেয়। দেশভাগের মনখারাপ ফিকে হতে হতে মিলিয়ে যায়। তবু ভাষা-সংস্কৃতির বন্ধন কোথাও বেঁধে রাখে দেশছাড়া, ঘরছাড়া মানুষগুলোকে। তিনদিকে বাংলাদেশ ঘেরা ত্রিপুরার মানুষের মুখে একই দ্যাশের ভাষা। আইসেন বইসেন, করত্যাসেন, খামু, যামু। টাটকা পদ্মার ইলিশের সুঘ্রাণ নিয়ে তাদের চিরাচরিত উল্লাস। কুমিল্লা, নোয়াখালী, ত্রিপুরা নিয়ে যে প্রাচীন সমতট অঞ্চল, তার সাংস্কৃতিক অভিন্নতা এখনো প্রবহমান এই ছোটো পাহাড়ি রাজ্যটিতে।

শীতের কুয়াশা ঢাকা রোদ্দুরের মত কিছুটা যেন অবহেলিত রাজ্যটি। পাহাড়, নদী, বিস্তীর্ণ বনভূমি, সরল মানুষ, তার ইতিহাস, সংগ্রাম অনেকটাই ঢাকা পড়ে আছে অনাদরের ধুলোয়।
সেই অনাদর আর অবহেলাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে গেলে অবশ্য পাওয়া যায় অনেকখানি। আমাদের একসপ্তাহের ত্রিপুরা ভ্রমণে এই উপলব্ধির শরিক অনেকেই।

ছ’শ বছর ধরে ছোটো একটি রাজতন্ত্রের অধীনে ছিল রাজ্যটি। সেই দেব বর্মণ বংশের রাজারা ত্রিপুরার শিক্ষা, সমাজসংস্কার, উন্নয়নে, প্রজা কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করতে ভোলেন নি। উদয়পুর ছিল তাঁদের প্রাচীন রাজধানী। রাজ প্রাসাদের ভগ্নাবশেষে এখন অতীত গৌরবের দীর্ঘশ্বাস। সেখানেই আছে রাজকুলদেবী ভুবনেশ্বরীর মন্দির। সতীপীঠ ত্রিপুরেশ্বরী। শক্তিপুজোয় প্রাণ যায় সেখানে অগণিত ছাগশিশুর।
রবীন্দ্রনাথ এই প্রেক্ষাপটে লিখলেন বিসর্জন কাব্যনাটক।
“নিষেধ করেছি বলি / সেই অভিমানে বিরূপ হয়েছে মাতা, / মা তোদের এমনি মা বটে !”

রাজারা শাক্ত হলেও বলির রক্তে হয়তো রাণী গুণবতী দেবীর বিতৃষ্ণা এসেছিল (বিসর্জনের কাহিনী অন্য কথা বলে)। রাজা গোবিন্দমাণিক্য স্ত্রী গুণবতীদেবীর ইচ্ছেয় তৈরি করালেন বিষ্ণুমন্দির। পোড়ামাটির, আটচালার সেই মন্দির উৎসর্গ হল রাণী গুণবতীর নামে। রাণীর নাম জানল উৎসাহী পর্যটক। অজ্ঞাত হয়ে রইল মন্দিরের কারিগর। মন্দিরের গায়ে কারুকাজ করা শিল্পীরা।

ছবিমুড়ার ঘন জঙ্গলেও অজানা শিল্পীরা পাথর কুঁদে বিশালাকার মুর্তি গড়েছেন। সেখানকার দুর্গম পাহাড়ের গায়ে কারা, কখন বিশালাকার দেবদেবীর মূর্তি গড়েছেন জানা যায়নি। জামাতিয়া উপজাতিদের এই দেবদেবীরা পুরোপুরি আমাদের চেনা দেবদেবীর মত নয়। পাহাড়জঙ্গলের মতই তারা রহস্যময়। হয়তো কিছু শিল্প এখনো অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। গোমতী নদী বয়ে চলেছে সেই গা ছমছমে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সূর্যের আলো সেখানে লুকোচুরি খেলে বড়গাছের ফাঁকে ফাঁকে। পাহাড়ের গুহা পাহারা দেয় বিষাক্ত সাপ।

নামগোত্রহীন শিল্পীদের করা মূর্তিরা রয়ে গেছে ঊনকোটির রঘুনন্দন পাহাড় ঘিরে। মূর্তি ঘিরে অনেক লোককথা। তবে ইতিহাস নীরব এই পাথুরে ভাস্কর্যের সময়কাল নিয়ে। অন্য দেবদেবীর সঙ্গে বিশালাকায় মহাদেবের প্রাধান্য বেশি থাকায় এর নাম শৈবতীর্থ ঊনকোটি।
নতুন রাজধানী আগরতলায় বৃটিশ, মুঘল, রোমান স্থাপত্যে তৈরি হয়েছে ত্রিপুরার উজ্জয়ন্ত প্রাসাদ। এটি সযত্নে সংরক্ষিত। ভিতরের মিউজিয়াম ত্রিপুরার ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি, সংগ্রামের কাহিনী ছাড়াও উত্তরপূর্বের অন্যরাজ্য গুলির পরিচয় সাজিয়ে রেখেছে।

রুদ্রসাগর লেকের ওপর মাণিক্য রাজাদের গরমের আরাম নীরমহল। মুঘল আর হিন্দুস্থাপত্যের অসাধারণ কারিগরিতে সৃষ্টি এ রাজ প্রাসাদ। জাফরি কাটা ঝরোকায় হ্রদের ঠান্ডা বাতাস চলাচল করে এদিক থেকে ওদিকে। সূর্যাস্তের আলোয় জলে প্রাসাদের ছায়া পড়ে। উড়ে চলে দেশি বিদেশি জলপাখি। ডিঙি বেয়ে চলে মাঝি। প্রাসাদের খোলা অলিন্দে অস্তরাগের ছবি দেখে হয়তো কোনো নিঃসঙ্গ রাণীর
“প্রাণ কান্দে কান্দে প্রাণ/কান্দেরে প্রাণ কান্দে/নয়ন ঝরেঝরে নয়ন ঝরেরে নয়ন ঝরে/পোড়া মন রে বুঝাইলে বুঝে না”।

রাজা ভালোবেসেছিলেন সেই কবেই একবার! তারপর তাঁর জীবনে এসেছে কত কত নারী! রাজার সেই ‘সকৃৎকৃত প্রণয়ে’র কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বিষাদময়ী মণিপুরী রাজকন্যা (রাজা বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য দশজন মণিপুরী কন্যাকে বিয়ে করেন বলে জানা যায়)।

ত্রিপুরার পাহাড় জঙ্গল রাণীর এই মনখারাপের খবর রাখেনা। অরণ্যশোভিত এরাজ্যে স্বাধীন ভাবে বেড়ে ওঠে বাঁশ বেতের বন। পাহাড়ের ঢালে অজস্র সারি সারি সুপুরি। কাশফুলের মত দেখতে ফুলঝাড়ু গাছ। কলাগাছের ঝাড়। আরো কত অজস্র ওষধি। জঙ্গলের ঝুপসি গাছে লুকিয়ে থাকে চশমাপড়া বাঁদরের দল। হাতির পাল। নাম না জানা পাখি, সরীসৃপ। পাহাড়ের ঢালে ঝুম চাষ হয়। ধানের খেত, চা-রাবারের বাগান, অজানা সবজি জুঙ্গতা দেখে আমরা উল্লসিত হই।

এই জঙ্গল নদী পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে অরণ্যচারী সহজ সরল মানুষ। শাশ্বত বসন্তের জাম্পুই পাহাড় ভাগ করে নিয়েছে মিজোপাহাড়ের সীমানা। পাহাড় সকালসন্ধ্যে এখানে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের রাঙা আলোয় সেজে ওঠে। জাম্পুইয়ের পাহাড়ি গ্রামে ত্রিপুরার লুসাই উপজাতিদের সঙ্গে মিজোরামের উপজাতি মানুষের বসবাস। রবিবারে গীর্জাঘরে তারা একসঙ্গে মিলেমিশে প্রার্থনা করে। বাঁশ, বেতের ঝুড়ি তৈরি করে। মেয়েরা তাঁতে বোনে তাদের উজ্জ্বল রঙের পোশাক পাছরা আর রিয়া। আমরা সে পোশাকে আগ্রহ দেখাতেই তারা আমাদের পরিয়ে দেয় নিজেদের রঙবেরঙের পোশাক, গয়না। আমরা মেয়ের দল আনন্দে উদ্বেল হই। সে গ্রামের মেয়ে ঝরঝরে ইংরেজিতে বলে সে হায়দ্রাবাদের আই টিতে কর্মরতা।পুনেতে উচ্চশিক্ষা নিয়েছে। আমাদের সঙ্গে সাগ্রহে ছবি তোলে। গোটা গ্রাম যেন আন্তরিকতায়, ভালোবাসায় আমাদের বরণ করে নেয়। আমরা ভুলে যাই বিচ্ছিন্নতা বলে একটা কঠিন শব্দ অভিধানে লেখা আছে!
আহা কি আন্তরিক।
তোমাদের সঙ্গে এই ভ্রমণ আন্তরিকতর হয়ে উঠেছিল।