যে দেশগুলি অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে তাদের মধ্যে অন্যতম ইউক্রেন আর রাশিয়া। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ওই দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে তার প্রভাব পড়তে শুরু করে সারা দুনিয়ায়। বুধবারও এ দেশের সর্বত্র পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম ৮০ পয়সা বেড়েছে। গত ২২ মার্চ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৮৪ পয়সা করে দাম বেড়ে ১৬ দিনে পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম মোট ১০ টাকা বেড়েছে। কলকাতায় এখন পেট্রোলের দাম লিটার প্রতি ১১৫ টাকা ১২ পয়সা, ডিজেলের নতুন দাম ৯৯ টাকা ৮৩ পয়সা।
পাশাপাশি কিছুদিন আগে থেকেই নতুন এক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে কারণ, কমতে শুরু করেছে দেশের পেট্রোলিয়ামের স্টক। যেখানে সব দেশেই প্রায় তিন মাস অর্থাৎ ৯০ দিনের জন্য পেট্রোলিয়াম মজুদ থাকা দরকার, সেখানে ভারতের পেট্রোল-ডিজেল মিলিয়ে রয়েছে মোট ৭৪ দিনের তেল।
প্রসঙ্গত, ২২ মার্চ-এর আগে সাড়ে চার মাস পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধির বিরতি ছিল। তার আগে ২০২১-এর অক্সোবর ও নভেম্বর পর্যন্ত একটানা পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বেড়েছিল। মাঝে ৪ নভেম্বরের পর থেকে দামবৃদ্ধির বিরতি ছিল। পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের পর ২২ মার্চ থেকে আবার বাড়তে শুরু করেছে দাম। সেই সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ছিল ব্যারেল পিছু ৮২ টাকা। তবে মার্চের শুরুর দিকে সেই দাম ১১৭ ডলারে পৌঁছে গিয়েছিল। তবে তেল সংস্থাগুলি তখনও দেশের তেলের দাম বাড়ায়নি। তবে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচনের ফল প্রকাশের কয়েকদিন পর থেকেই এবার তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের ব্যারেল প্রতি দাম ছিল ৪২ মার্কিন ডলার। সেই দাম ২০২২ এর মার্চ মাসের প্রথম তিন সপ্তাহের মধ্যেই বেড়ে দাঁড়ায় ব্যারেলপ্রতি ১১১ মার্কিন ডলারে। লক্ষ্যনীয় ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিন পর্যন্ত পেট্রোল-ডিজেলের দাম কিন্তু আর বাড়েনি বরং ২০২১ সালের এপ্রিল মাসের ১৫ তারিখে পেট্রোলের দাম ১৬ পয়সা এবং ডিজেলের দাম ১৪ পয়সা কামানো হয়েছিল। শুধু তাই নয় ওই বছর ৩০শে মার্চ পেট্রোলের দাম কমানো হয়েছিল ২২ পয়সা এবং ডিজেলের দাম কমানো হয়েছিল ২৩ পয়সা।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীয় সড়ক ও পরিবহণ মন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রী দুজনেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করেছেন। সংসদে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন বলেন, ‘আমরা কোনও বাড়তি বোঝা আনিনি। তেলের দামের সঙ্গে নির্বাচনের কোনও সম্পর্ক নেই। যদি তেল সংস্থাগুলো মনে করে যে তারা বেশি দামে তেল আমদানি করছে তাহলে আমাদের সেই বোঝা বহন করতে হবে।’ পরিবহণ মন্ত্রী নীতিন গড়করি বলেন, ‘দেশের ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল আমদানি করা হয় অন্য দেশ থেকে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধের আবহে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। আমরা এই বিষয়ে কিছুই করতে পারব না।’
জ্বালানির দাম বাড়ায় তেল কোম্পানিগুলি। সাম্প্রতিক কালে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। আমেরিকা এবং নরওয়ের মধ্যবর্তী উত্তর সাগর থেকে তোলা অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেল প্রতি ৪৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১১৮.৫০ ডলার। তার আগে ব্যারেলপ্রতি অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৮১.৬ ডলার। সাধারণভাবে পেট্রোল-ডিজেলের দাম ১৫ দিনের গড় দামের হিসেবে নির্ধারিত হয়। তেল সংস্থাগুলোও ৪ নভেম্বর থেকে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ায়নি। ওই সময় কেন্দ্রীয় সরকারও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ১০ টাকা করে কমিয়েছিল। তবে পেট্রোল-ডিজেলের দামের উপর কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকার শুল্ক চাপায়। তারপরে ঠিক হয় বাজারে ওই সব পণ্যের দাম।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে পাল্লা দিতে এর পরও পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ার সম্ভবনা আছে। কত বাড়তে পারে? বিশেষজ্ঞদের একদল বলছেন, এখনও লিটার প্রতি ১৯ টাকা দাম বাড়ানো হতে পারে কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩৭ টাকা বেড়েছে। তার মানে বুধবারের দাম বৃদ্ধিই শেষ নয়। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে সামনের দিন আরও ৫৭ পয়সা করে লিটারপ্রতি দাম বাড়তে পাড়ে আর পেট্রোপণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সমাজের সর্বস্তরে পড়বে।