পুরনো দিনের বাড়ি। সংস্কার হয়নি। জানালা-দরজাগুলো নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। পাশের অন্যান্য বাড়িগুলো থেকে অনেকটাই বদলে গেছে। সহজেই চোখে পড়ে সকলের এই বাড়িটার দিকে। সকাল-সন্ধে হাজার হাজার মানুষের গঙ্গার ঘাটে যাবার সহজ পথ বাড়িটার পাশ দিয়েই। এই পথটির একটা নামও আছে। অন্নদা নিয়োগী লেন। বাগবাজার। দুটি চোখ সারাক্ষণ কি যেন খুঁজে বেড়ায় এরই মাঝে। কাঁপা কাঁপা দুটি হাত জানলার রডে থাকে। মাথার ঘোমটাটা এখনও অটুট আছে। সকাল থেকে সন্ধে গঙ্গার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করতে থাকে। সে দিনটা ছিল রবিবার। কাজের ছুটি থাকায় লোকজনও কম ছিল। রোজকার মত বৃদ্ধাটি জানলার ধারে এসে বসেছিল। ছোট্ট লেনের রাস্তায় এক বৃদ্ধকে দেখতে পেয়ে হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে উঠল, ও দাদা সকালেই কোথায় যাচ্ছেন? বৃদ্ধ অবাক! কোনোদিন তো জিজ্ঞাসা করেনি ওই বৃদ্ধা। রোজই দেখা হয়। বৃদ্ধ নিজেকে সামলে নিয়ে বলে ওঠে, রোজকার মত আজও গঙ্গায় স্নান করতে যাচ্ছি। আপনি যাবেন? বৃদ্ধ বলে ওঠে।
বৃদ্ধা বলে, না আপনি স্নান করে আসুন।
বৃদ্ধ আর কথা না বাড়িয়ে গঙ্গার দিকে পা বাড়ায়।
বৃদ্ধা আবার বলে ওঠেন, ও দাদা স্নান করে ফিরে আসার সময়ে দেখবেন তো আমার খেয়া এসেছে নাকি?
বৃদ্ধ কোনো কিছু না বুঝেই বলে ওঠেন, ঠিক আছে দেখে নেব। বলে হাঁটতে শুরু করেন। ভাবতে থাকেন বুড়ো হলে মাথার ঠিক থাকে না। বুড়ির হয়ত মাথাটা ঠিক নেই। ভাবতে ভাবতে বৃদ্ধ গঙ্গায় পৌঁছে যায়।
এদিকে বৃদ্ধা তখনও জানালায় বসে আছেন। বেলাও হয়েছে। তখনও সকালের জলখাবার পেটে পড়েনি। পিছন থেকে অরিজিৎ বলে ওঠে, ঠাকুমা জলখাবার খাবে না? এদিকে ঘুরে বোসো। মা জলখাবার আনছে। রোজ নাতি-ঠাকুমা এক সঙ্গে জলখাবার খায়। আজও ব্যতিক্রম ঘটল না। নাতিকে নিয়ে রুটি, আলুভাজা আর মিষ্টি খেতে খেতে বলল, জানিস অরি,আমার খেয়া এসে গেছে, এবার পাড়ি দেব।
ছোট্ট অরি কিছু বুঝতে না পেরে বলে ওঠে — আমাকে সঙ্গে নেবে?
ঠাকুমা বলে ওঠে, দূর পাগল! তোর খেয়া আসতে অনেক… অনেক দেরি।
না, আমি তোমার সঙ্গে যাব। বলে ওঠে অরি।
ঠাকুমা বলে না, তোর এখন অনেক কাজ বাকি। কাজ শেষ করতে অনেক-অনেক দিন লাগবে। তারপর যাবি। আর এ খেয়াতে তো একজনের বেশি ধরে না। অরি বলে ওঠে, আমি তো ছোট, ঠিক ধরে যাবে দেখ। ঠাকুমা বলে, না রে পাগল! মাঝনদীতে ডুবে যাবে।
অরি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে, না বাবা, আমি যাব না। সাঁতার জানি না, ডুবে গেলে কি হবে! তার চেয়ে বরং ঠাকুমা একটা গল্প বল না?
শুনবি একটা গল্প। মজার গল্প। অরি অনেকদিন ঠাকুমার মুখে গল্প শোনেনি, তাই বলে উঠল , তুমি এখনই বল।
ঠাকুমা বলল, শোন তবে। একটা ছোট্ট মেয়ে। নাম তার তুলসী।
অরি বলে উঠল, ঠাকুমা তুলসী তো গাছের নাম। এই গাছের পাতা তো মা পুজো করে, আবার সকালে খালি পেটে খায় দেখি। আবার আমাকেও খাওয়ায়। ঠিক বলেছিস। এ তুলসীর পরিধিও ঠিক ততটাই। শোন তারপর। এক পাগলহারা নদী মুন্ডেশ্বরী। তার ধারে ছোট একটা গ্ৰাম। নাম তার নারায়ণপুর। সবুজ গাছ-গাছালি খেতের মাঝখানে তুলসীর বাড়ি। তুলসীর বাবা হেমচন্দ্র ঘোষ ছিলেন চাষী। তার চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে ছিল। ছোট মেয়ের নাম ছিল তুলসী।
অরি বলল, ঠাকুমা অনেক ভাইবোন, তাই না? কিন্তু আমি তো মাত্র একা। আমার কোনো ভাইও নেই, বোনও নেই। ঘরে একলা একলা খেলতে হয়।
ঠাকুমা বলল — হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস।
অরি বলল — ঠাকুমা, তুলসীর দাদা, দিদিদের কী নাম ছিল? ঠাকুমা বলল — তুলসীর চার দাদার নাম ধবল, সুবল, সুফল আর বিফল। দিদিরা ছিলেন মন্দিরা, গীতা, সুন্দরী ও তাপসী। বাবা চাষ করতেন। সৎ এবং সম্পন্ন চাষী। দান-ধ্যানে মন ছিল। কখনও ভিখিরিদের ফেরাতেন না। তুলসী এগুলি সব দেখত। তুলসী নিজেও কোনো ভিখিরি এলে ছুটে যেত তার কাছে। খাবার দিত। পয়সা দিত। ভিখিরিরাও তুলসীকে ভালবাসতো। বাড়িতে এলেই ভিখিরিরা আগে তুলসীর খোঁজ করত। তুলসী একদিন দেখল গ্রামে লোকেরা আলোচনা করছে স্কুল নিয়ে। গ্রামে স্কুল হবে। কোনো প্রাইমারি স্কুল নেই। সরকার জায়গা খুঁজছে। কেউ সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে আসছে না। ১১ বছরের তুলসী তার মেজদা সুবলকে বলল, দাদা আমাদের বড় রাস্তার ধারে যে ৬ বিঘা জমি আছে দিয়ে দাও না। স্কুল হলে আর গ্রামের ছেলেমেয়েদের দশ মাইল হেঁটে দূরে পড়তে যেতে হবে না। সুবল দেখল বোন ঠিক কথা বলেছে। তাই কালক্ষেপ না করে প্রাইমারি স্কুলের জন্য ওই ৬ বিঘা দান করল। ঠাকুমা বলল, জানিস অরি, তখন অনেকে বিদ্রূপ করেছিল তুলসীকে। খেতে পায় না সুবল ঘোষ, তারা আবার জমিদান করছে। জানিস এখন সেই স্কুল অনেক বড় হয়েছে। শ’য়ে শ’য়ে ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে। কত ছেলেময়ে এখান থেকে পড়ে এখন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর হয়েছে। অরি বলে উঠল, তাই নাকি ঠাকুমা!
ঠাকুমা বলে হ্যাঁ। এরপর কি হল জানিস?
অরি বলে কী?
তুলসীর বিয়ে হয়ে গেল। সুন্দর একটা ছেলের সঙ্গে। তুলসীর বয়স তখন কত জানিস?
অরি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল কত?
ঠাকুমা বলল, তুলসীর তখন ১২ বছর পূর্ণ হয়নি। তখনও তিন মাস কম।
সে কী ঠাকুমা! ছোটবেলায় বিয়ে? বলল অরি।
ঠাকুমা বলল, যেদিন তুলসি বাপের বাড়ি ছেড়ে লালপাড় বেনারসি শাড়ি পরে, ঘোমটা দিয়ে স্বামী নরেন ঘোষের বাড়িতে গেল, সেদিন পাড়ার সকলের চোখে জল। ছোট মেয়ে তুলসীর কি হবে! তবে নরেন্দ্র খুব ভাল ছেলে ছিল। গোমস্তার চাকরি করত। নারায়ণপুরের মস্ত বড় পাকা বাড়িতে তুলসী যেন রাজরানী হয়ে গেল। সকলে ভালবাসত তুলসীকে। তুলসীও সকলকে আপন করে নিল।
অরি বলল, ঠাকুমা আমার কবে বিয়ে হবে? তুলসীর মতো একটা মেয়ে দেখ না — আমিও বিয়ে করব।
ঠাকুমা বলল — তুই বড়ো হয়েছিস। বিয়ে করবি, তাতে কি হয়েছে।
অরি বলে, আমার কি ভালো লাগছে তুলসীকে।
ঠাকুমা বলল — ঠিক আছে দাদুভাই, তুলসীর মতো একটা দিদুভাই খুঁজে আনব। ঠাকুমার কথা শুনে অরির কি আনন্দ।
তারপর ঠাকুমা বলল — তুলসীর তারপর কি হল জান? তুলসী আরও বড় হল। বিশাল জমি জায়গা। লোকজন-আত্মীয় পরিজন। সবই সামলাতে হয়। কিন্তু তুলসীর মন পড়ে থাকে সেবায়। কিভাবে মানুষের সেবা করা যায়। ভালো লাগে না বিষয় আশয়। মনে হয় সব যেন গন্ডোগোলে ব্যাপার। তুলসীর যখন বয়স ৪০। কোনো ছেলেপুলে হয়নি। স্বামী হঠাৎ নিউমোনিয়া রোগে আক্রান্ত হলেন। স্বামীর পাশে থেকে সেবা করতে লাগলেন। ডাক্তার, বদ্যি, কবিরাজ সবই ডাকা হল। গ্রামে কোনো বড় হাসপাতাল নেই যে স্বামীকে ভর্তি করবে। একদিন ঠিক করল যত কষ্টই হোক স্বামীকে নিয়ে কলকাতায় চলে যাবে চিকিৎসার জন্য। সব ঠিকঠাক। নরেন্দ্রনাথ উঠতে পারছে না। কথা বলার শক্তি নেই। আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে। একদিন সকলকে ছেড়ে চলে গেলেন নরেন। তুলসী একা হয়ে গেলেন। বিশাল ঘরের কোণে একাকীত্বের জ্বালায় আঘাতকে চেপে রেখে দিন কাটতে লাগল তুলসীর।
অরি দেখল, ঠাকুমার চোখে জল।
বলল, ঠাকুমা তোমার চোখে জল কেন? সে তো তুলসীর ঘটনা।
ঠাকুমা বলল — ঠিক বলেছিস। তাড়াতাড়ি জল মুছে আবার বলল — জানিস তুলসীর তারপর কি হল?
অরি বলল — কী হল!
তুলসীর মন এমনিতেই ছটফট করত সেবার জন্য। এ সময় নারায়পুরে একটি হাসপাতাল গড়ার জন্য সরকার একটি জায়গা খুঁজছে। কোনো সহৃদয় ব্যক্তি এগিয়ে এলে খুশি হবেন সরকারি কর্তা ব্যক্তিরা। আশপাশের বিশটা গ্রামের চিকিৎসার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। বহু লোক চিকিৎসার অভাবে মারা যাচ্ছেন। তুলসী দেখল, স্বামী মারা গেছেন রোগে। আর যাতে কেউ না মারা যান, সে জন্য একটা হাসপাতাল গড়ে তোলা দরকার। ভাবতে ভাবতে মাথায় ঘোমটা দিয়ে রাস্তায় এলেন। দেখলেন অর্থপিপাসু, ধনী জমিদারবাবুদের সরকারি অফিসাররা জিজ্ঞাসা করছেন হাসপাতাল গড়ার জন্য জমি দান করবেন কিনা? সকলের উত্তর — কি করে সম্ভব? খাজনা দিতেই আমরা অস্থির। আর কিছু নেই। চলবে কি করে। আমরা পারব না। তুলসী দেখল এরা কখনই চায় না। তাই নিজে সরকারি অফিসারদের জানিয়ে দিলেন, হাসপাতাল হবে। তার জন্য যা জমি লাগবে আমি দেব। দেব কিছু টাকাও। স্থানীয় সমাজসেবীদের ডেকে পাঠালেন। শান্তিমোহন রায়, জিতেন্দ্র ভট্টাচার্য, বিশ্বনাথ পাল, অর্জুন কুন্ডু তুলসীর কথা শুনে অবাক হলেন। তুলসী আবার একি কথা বলেন! শেষ পর্যন্ত তুলসী স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে ২৮ বিঘা জমি হাসপাতাল হওয়ার জন্য দান করলেন। আর জমানো নগদ ২৪ হাজার টাকা। হাসপাতালের ভিত্তি স্থাপন হল। হাসপাতালের ভবন তৈরি করতে গিয়ে আরও টাকা কম পড়ল। তুলসী নিজের গয়না যা ছিল বিক্রি করে নগদ আরও ২৬ হাজার টাকা দিলেন। হল হাসপাতাল।
অরি বলল ঠাকুমা — তুলসী সব দিয়ে দিল।
হ্যাঁরে, সব।
অরি বলল — তাহলে তুলসী খাবে কি?
ঠাকুমা বলল — যে জমিটুকু ছিল সরকার তা খাস জমি বলে অধিগ্ৰহণ করে নিল। তাই তুলসির ভিটে সংলগ্ন যে জমি আর পুকুর ছিল তার আয় থেকে ভাইপোরা তুলসিকে মাসে হাজার টাকা দিত। এর থেকে তুলসির চলে যায়। আর কিছু টাকা পায় বড়বাজারে স্বামীর একটা ছানার ব্যবসা ছিল, যেটা থেকেও মাসে ৫০০ টাকা। অতএব ডাল-ভাত খেলে তুলসীর চলে যায়।
অরি বলল, তুলসী এরকম করল কেন? সব দিয়েই দিল কেন?
ঠাকুমা বলল — তুলসী চায় মানুষের কল্যাণ। সে নিজে কষ্টে থাকবে তবু ভালো। অপরের দুঃখ-কষ্ট সে একেবারে দেখতে পারে না। আবার সে রামকৃষ্ণের মন্ত্রে দীক্ষিত। তাই তুলসীর কাছে টাকা মাটি, মাটি টাকা মনে হয়েছে।
অরি বলল — এখন তুলসী কেমন আছে?
ঠাকুমা বলল — শুনবি?
অরি বলল — বল না ঠাকুমা, তারপর।
ঠাকুমা বলল — তুলসীর বয়স হয়েছে। দেখতে দেখতে ৯০ বছর। দুটি চোখে দেখতে পায় না। কানে কম শোনে। কাঁপা কাঁপা গলায় কথা বলে। দুবেলা খেতে পায় না। কেউ আর তাকে দেখতে আসে না। ঘরের একটি খাটে বসে দূরের আকাশ দেখে। আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর কলকল ধ্বনি শোনে। কেউ খেতে দিয়ে যায়, খেতে না দিলে জোটে না।
অরি বলল — তুলসীকে এখন কেউ দেখে না! সরকারের লোক কেন আসে না? যদি কেউ না আসে আমি দেখব। তুমি তুলসীকে বল না। আমি তার কাছে যাব।
ঠাকুমা বলে — হাসপাতাল বড় হয়েছে। শ’য়ে শ’য়ে রোগী আসছে। ভালো হচ্ছে। কিন্তু কি জানিস অরি, কেউ মনে রাখে না তুলসীর কথা। হাসপাতালের কোথাও তুলসীর নামটুকু পর্যন্ত লেখা হয়নি। নতুন ভবন হয়েছে। নেতা-মন্ত্রী এসেছে। ধূমধাম করে উদ্বোধন হয়েছে। তুলসির কথা কারও মনে পড়েনি।
অরি বলে, ঠাকুমা আজকের সমাজের নিয়মই এটা।
ঠাকুমা বলে ওঠে, সংসারের নিয়মই এটা। যারা দেয় তারা কিছুই পায় না। তাই তুলসি নীরবেই থাকতে চায়। সে কর্ম করে, ফলের আশা করে না। এরা কেবল সৃষ্টি করতে জানে। ধ্বংসের কথা মাথায় আসে না।
অরি বলল, ঠাকুমা এসব মানুষ যদি আর জন্মগ্ৰহণ না করে, তাহলে কি হবে?
ঠাকুমা বলে, দূর পাগল! পৃথিবীতে এসব মানুষকে ঈশ্বরই পাঠাবেন। যুগে যুগে এক এক করে আবির্ভাব ঘটবে মানুষকে রক্ষা করার জন্য। এরা সাধারন নয়। এরা অনন্য। এরা অনন্যা।
অরি বলে, তুলসির এখন কি হবে?
ঠাকুমা বলে, নীরবে ঈশ্বরকে পাথেয় করে দিন কাটাচ্ছে। বলতে বলতে ঠাকুমার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। অরি বলে ওঠে, তুমি তুলসির জন্য কাঁদছো? তুলসী ঠিক বেঁচে থাকবে। সকলের মধ্যে। সকলের মাঝে।
তুলসি এখন কার কাছে আছে?
ঠাকুমা বলল, তুলসী এখন তার ভাগনের কাছে আছে। খুব কষ্ট করে।
কেউ তার খোঁজ নেয় না। নীরবে, নিঃশব্দে ঈশ্বরকে পাথেয় করে দিন কাটাচ্ছে। বলতে বলতে ঠাকুমার চোখে জল আসে।
অরি বলে ওঠে — ঠাকুমা তুমি তুলসীর জন্য কাঁদছ কেন? আমি জানি তোমার জীবনটাও তুলসীর মতো। ঠাকুমা বলে না দাদুভাই। আমি কেবল তুলসীর কথা ভাবি।
অরি বলল — ঠাকুমা সেই তুলসীকে একবার দেখতে যাবে?
ঠাকুমা বলল — দূর বোকা! এতো গল্পের তুলসী।
অরি বলল — তাহলে তুলসী এখন কি করছে।।
ঠাকুমা বলল — এখন খেয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। কাউকে দেখতে পেলেই বলছে আমার খেয়া নদী ঘাটে বাঁধা আছে কিনা একবার দেখে আসতে। খেয়া পেলেই পাড়ি দেবে।
অরি বলল, ঠাকুমা আমার মন খারাপ করছে। তুমি একটা এবার সাত সমুদ্র তের নদী পারের রাজপুত্রের গল্প বল। সে তুলসীর পাশে দাঁড়াবে। তুলসীর খোঁজ নেবে। আর আদর-ভালোবাসায় তার সমস্ত দুঃখ মুছিয়ে দেবে।
ঠাকুমা বলল — অরি সেই সাত সমুদ্র তের নদীও নেই। আর রাজপুত্রও নেই। সব দূষণে ভরে গেছে সমুদ্র-নদী। স্বার্থের বেড়াজালে ঘেরা পড়ে আছে রাজপুত্র। উদ্ধার করার কেউ নেই। বলতে বলতে কখন অরির মা মৌসুমী শাশুড়ি মায়ের পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
মৌসুমী বলল — এতক্ষণ সব শুনলাম। মা তোমার বয়স হয়েছে। চল স্নান করে নেবে। বেলা হয়েছে দুপুরের খাবারটা সেরে নেবে। অরিও মায়ের কথায় সায় দিয়ে ঠাকুমাকে তুলে ধরে। বলে চলে ঠাকুমা, বেলা যে যায়।
ঠাকুমা বলে, ঠিক বলেছিস — আর সময় নেই। বেলা যে যায়। খেয়া অপেক্ষা করছে। চল যাই। অরি ঠাকুমার পিছন পিছন চলে। মনে মনে ভাবতে থাকে তুলসির কথা। এ তুমি কেমন তুমি।
এতক্ষণ যে হৃদয় মর্মস্পর্শী গল্পটা লিখলাম, এর পিছনে মহিয়সী নারী তুলসি ঘোষ স্মরণে-মননে থাকলেও তাঁকে উপযুক্ত সম্মান থেকে আজও বঞ্চিত করা হয়েছে। হুগলির প্রান্তিক গ্ৰাম দক্ষিণ নারায়ণপুরে আরামবাগ ব্লক হাসপাতাল গড়ে উঠেছে তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। অথচ হাসপাতালের কোথাও তাঁর নামটুকু লিখে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করা হয়নি। অথচ প্রতিদিন শয়ে শয়ে রোগীর চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু আছে সুষ্ঠভাবে।
পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত।