রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। যেখানে হাজির স্বয়ং দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সেই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে হাজির হলেন ৭৭ বছর বয়সী এক আদিবাসী বৃদ্ধা। যার খালি পা। পরনে নিজ আদিবাসী গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক। হাতে-গলায় একরাশ উলোঝুলো গয়না। সবারই নজর ঘুরে যায় তাঁকে দেখতে। তিনি কিন্তু সাবলীল ভঙ্গিতে পুরস্কার গ্রহণের আগে খানিকটা থেমে প্রধানমন্ত্রীর নমস্কারের প্রত্যভিবাদনও জানান।
গত সোমবার রাষ্ট্রপতি ভবনে সর্বোচ্চ নাগরিক পুরস্কার তুলে দেন রাষ্ট্রপতি। তিনি ছাড়াও ১০২ জন কে দেওয়া হয়েছে পুরস্কার। তার মধ্যে ১০ জন পদ্মভূষণ এবং ৭ জনকে পদ্মবিভূষণ পুরস্কার দেওয়া হয়। তবে অত কিছুর মধ্যে ওই আদিবাসী মহিলাই উল্লেখযোগ্য। যে কারণে এই মুহুর্তে গোটা দুনিয়ায় তিনিই সবথেকে চর্চিত।
রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ, তার আগে অতিথির আসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী ও অন্যদের অভিবাদনের ছবি ভাইরাল হওয়াতে গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর তুলসীকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে হইচই শুরু হওয়ার অনুষ্ঠানস্থলে অতিথির আসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি-সহ অন্যদের অভিবাদন জানান তিনি। তাঁরাও তাঁকে অভিবাদন জানান। এই দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই হইচই শুরু হয়ে যায়। অনেকের মন্তব্য, তার মানে এখন এই সম্মান তাঁরাও পাওয়া শুরু করলেন যারা সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চাইছেন, কারও বক্তব্য, দেখে খুবই ভালো লাগছে।

গত সোমবার রাষ্ট্রপতি যে আদিবাসী বৃদ্ধার হাতে পদ্মশ্রী সম্মান তুলে দিয়েছেন তাঁর নাম তুলসী গৌড়া। বয়স ৭২। সারা জীবন ধরে তিনি পরিবেশ রক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করার স্বীকৃতি স্বরূপ এই সম্মান পেলেন।আর আসমুদ্র হিমাচল হইচই শুরু করলো তাঁর চিরাচরিত পোশাক, খালি পায়ে নিজস্ব ছন্দে লাল কার্পেটের ওপর দিয়ে হেঁটে আসা নিয়ে। কিন্তু তুলসী গৌড়ার আসল পরিচয় গত ষাট বছরের বেশি সময়কাল ধরে তিনি প্রায় নিঃশব্দে পরিবেশ রক্ষার কাজ করে চলেছেন মন প্রাণ দিয়ে। সেই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় উৎসাহিত করেছেন আরও বহুজনকে।
৩০ হাজারেরও বেশি সন্তানের মা তিনি। সেই সন্তানেরা সবাই গাছপালা। কিন্তু তুলসী গৌড়া কোনও দিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ধারকাছ দিয়ে যাওয়ারও সুযোগ পাননি। আর যাবেনই বা কীভাবে। একে চরম দরিদ্র পরিবারের তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ওপর মাত্র দু’বছর বয়সে তাঁর বাবা মারা যান। দু-বেলা পেট ভরানোর মতো খাওয়া জোটাতেই হিমশিম খেতে হয় তাঁর মাকে। অবশেষে তুলসীর মা স্থানীয় এক নার্সারিতে কাজ পেয়েছিলেন। কিন্তু তাতে তুলসীর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বরং অভাবের তাড়না মেটাতে তিনিও সেই ছোটবেলা থেকেই সেই নার্সারিতে মায়ের সঙ্গে দিনমজুর হিসাবে কাজ শুরু করে দেন। পরবর্তীকালে সেই অভিঙ্গতায় বনবিভাগের নার্সারিতে কাজ জুটে যায়। সেখানেও কয়েক বছর দিনমজুরের কাজ করেন।
প্রথাগত কোনও শিক্ষাই তো তিনি পাননি। অথচ ছোটবেলা থেকেই গাছকে অপত্য স্নেহ ভালবাসা দিয়ে পালন করতে করতে তিনি শিখে ফেললেন, কোন গাছটার কতটা জল দরকার, কোন গাছটার কি সমস্যা, কোন গাছটা চারা তৈরীর জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, কোন গাছের কি কি গুনাগুন, কোন বীজগুলি কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে ইত্যাদি। এজন্য তাঁকে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ফরেস্ট’ বা অরণ্যের বিশ্বকোষ, অনেকে আবার ‘বনদেবী’ নামেই চেনেন। কেবল তাই নয়, গাছ সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞান হার মানায় বিরাট বিরাট উদ্ভিদ বিজ্ঞানীকে।

শুধুমাত্র কি বন সংরক্ষণ, তুলসী কাজ করে চলেছেন নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধেও। তাঁর এলাকা কর্নাটকের হালাক্কি আদিবাসী সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষের যেখানে বাস, সেখানে একবার এক মহিলাকে বন্দুক দেখিয়ে নির্যাতন করা হলে, তিনি প্রাণের মায়া না করে রুখে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন। এমনকি তিনি অপরাধীর শাস্তির দাবিতে থানাতেও গিয়েছিলেন।
সারা জীবন তুলসী গাছের চারা তৈরির জন্য মাতৃ উদ্ভিদ বা মাদার প্ল্যান্ট নির্বাচন, চারা তৈরি, বীজ সংরক্ষণ, বৃক্ষ রোপন, শুখা মরসুমে গাছে জল দেওয়া, গাছেদের রক্ষণাবেক্ষণ সহ বহু কাজ করতেন। তুলসী ৭০ বছর বয়সে বন বিভাগ থেকে অবসর নিয়েও থেমে থাকেন নি। আজও তিনি তাঁর সন্তানদের যত্ন করে চলেছেন। আধুনিক সমাজ যখন উন্নয়নের দোহাই পেড়ে নির্মমভাবে বন জঙ্গল সাফ করে পৃথিবী ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছে, সেই সময় তুলসী আধুনিক সমাজ থেকে বহু দূরে থেকে কাজ করে চলেছেন পরিবেশ এবং বন সংরক্ষণ নিয়ে।