ডিএ নিয়ে আমাদের মতো মানুষের কথা বলা মানে অনধিকার চর্চা। শিক্ষক, অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের বিষয়, তাঁরাই এসব নিয়ে ভালো বুঝবেন, ভালো বলবেন। রাজ্যে ডিএ নিয়ে যা হচ্ছে, এড়িয়ে যেতে চাইলেও কিছু বিষয় সামনে এসে যায়। স্বাধীনভাবে শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারি সংগঠনগুলি শুধু আন্দোলন, ধর্মঘট করছে না, তাদের সাথে রাজনৈতিক দলগুলো ফায়দা তুলতে আন্দোলনে নেমেছে। রাজ্য সরকারকে বিব্রত করার সবরকম পন্থা করে যাচ্ছে তারা। বিশেষত সিপিএম বিজেপি সবচাইতে হিংসাত্মক আন্দোলনের রাস্তায় চলছে, ধর্মঘটকে সফল করতে রাস্তায় নেমেছে। ডিএ সমস্যাটা কি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই?
গত শনিবার পশ্চিমবঙ্গের এক সাংবাদিককে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের এক শীর্ষকর্তা, যিনি আবার অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের প্রিয়, পশ্চিমবঙ্গের ডিএ ধর্মঘট নিয়ে বলেন, “আপনাদের রাজ্যে তো সরকারি কর্মচারীরা বকেয়া ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন করছেন! ওঁদের অন্তত পেনশনের দাবিতে আন্দোলন করতে হচ্ছে না! পেনশনের তুলনায় ডিএ-র দাবি মেটানো অনেক সহজ। বাকি সব রাজ্য তো পেনশন নিয়ে জেরবার।” মুখ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে পেনশন দিতে খরচ হয় বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য রাজ্যে কি এখন অবসরের পর পেনশন দেওয়া হয়? উত্তরটা বোধহয়, না।
ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন ও ধর্মঘটকে সফল করতে গলা ফাটাচ্ছে বিজেপি, সিপিএম ও কংগ্রেস। শুধু ডিএ নয়, এই তিন রাজনৈতিক দল যেসব রাজ্যে ক্ষমতায় আছে, সরকারি কর্মীদের বেতন, পেনশন, ডিএ দিতে জেরবার। সিপিএম এই রাজ্যে বকেয়া ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন করছে, অথচ বামশাসিত কেরলে গত দু’বছর ধরে চার কিস্তি ডিএ দিতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারকে দোষারোপ করা হচ্ছে নিয়োগ-দুর্নীতি, মেলা-খেলা, লক্ষ্মী ভান্ডার ও অন্যান্য প্রকল্পে দেদার টাকা খরচের জন্য। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, তাহলে অন্যান্য রাজ্যগুলোর হাল খারাপ কেন? কেন ডিএ, পেনশন বন্ধ? এর উত্তর কি হবে আমরা জানি না। না জেনেও জানি না বলতে হবে! একেই বলে ভোট-রাজনীতি!

পেনশনের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ এখনও একটি ব্যতিক্রমী রাজ্য। কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের পুরনো পেনশন আর নতুন পেনশনের একটি গেরো আছে। অটলবিহারী বাজপেয়ী সরকার ২০০৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের পুরনো পেনশন প্রকল্প তুলে দেয়। চালু করে নতুন পেনশন প্রকল্প। পুরনো পেনশন প্রকল্পে ২০ বছর চাকুরির পর অবসর নিলে শেষ পাওয়া মূল বেতনের ৫০ শতাংশ পেনশন পাওয়া যেত। এখানে পেনশনের প্রাপ্ত টাকা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনও ঝুঁকি ছিল না। নতুন পেনশন প্রকল্পে চাকরিরত অবস্থায় মূল বেতন থেকে ১৪ শতাংশ টাকা কেটে নিয়ে পেনশন তহবিলে জমা করা হয়। সেই তহবিলে সরকার জমা করে ১০ শতাংশ। পেনশন তহবিলের এই টাকা লগ্নি হয় শেয়ার বাজারে। প্রাপ্য পেনশনের টাকা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হতে পারে। ১০, ৫ শতাংশও হতে পারে। কোনও নিশ্চয়তা নেই। কেন্দ্র সরকারের দেখাদেখি রাজ্যগুলোও এই নিয়ম চালু করে। পশ্চিমবঙ্গের বাম সরকার কেন্দ্র সরকারের নতুন পেনশন প্রকল্প চালু করেনি। তৃণমূল সরকারও বামফ্রন্টের রেখে যাওয়া নিয়মানুযায়ী পেনশন দিয়ে আসছে। অবসরের পর শিক্ষক বা অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের পেনশন পাওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কোনও অনিশ্চয়তার জায়গা নেই। কেরলসহ অন্যান্য রাজ্যগুলিতে পুরনো পেনশন প্রকল্প চালুর দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চলচে। পশ্চিমবঙ্গের চাকুরীজীবিদের এই আন্দোলন করতে হয় না। অবসরের পর নিশ্চিন্ত এবং স্বচ্ছন্দ পেনশন-জীবন— এই রাজ্যে, পশ্চিমবঙ্গে।
একটি তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেটের ১৬ শতাংশ খরচ হয় শুধু বেতন ও পেনশন দিতে। রাজ্যগুলো তার ব্যতিক্রম নয়। পুরনো পেনশন প্রকল্প ফিরিয়ে আনলে রাজকোষে বিপুল পরিমাণ খরচের বোঝা চাপবে তাতে সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও পুরনো পেনশন প্রকল্পের বিপুল বোঝা বাম আমল থেকে তৃণমূল আমলের পশ্চিমবঙ্গ টেনে যাচ্ছে। রাজনীতিতে ভোট ও ক্ষমতা বড় বালাই। বিজেপি, কংগ্রেস, সিপিএম সব এক পংক্তিতে। কেরলে ডিএ বন্ধ থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে ডিএ-র দাবিতে আন্দোলন, ধর্মঘট করতে হবে সিপিএমকে। রাজনীতির আজব খেলা!
লেখাটির মধ্যে নতুন কথা কিছু নেই, শুধু তথ্যগুলো সাজানো হয়েছে। সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা