২০০৭ সাল ২৫ জানুয়ারী।
তখন বামফ্রন্ট সরকারের বয়স তিরিশ বছর হয়ে গেছে।
জ্যোতি বসু তখন একজন লিজেন্ড পার্সোনালিটি। তিনি তখন আর পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী নন একজন সাধারণ মানুষ।
শুধু পশ্চিমবাংলার আনাচে কানাচে নয় বিশ্বর দরবারেও বহুল চর্চিত নাম।
আমার মাস্টার মশাই বিশ্বজীবন মজুমদার। তিনি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তখন সল্টলেক পৌরসভার চেয়ারম্যান। কিন্তু আমার সঙ্গে সেই ছাত্র-শিক্ষকের মধুর সম্বন্ধ।
আমি তখন একটা ডিজিটাল লাইব্রেরী তৈরি করছি। নাম বাংলালাইব্রেরী রিসার্চ অর্গানাইজেসন। আমার এই বাংলালাইব্রেরীর ব্যাপারেও তিনি যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। প্রতিটা মুহূর্ত আমাকে উৎসাহিত করেছেন। বার বার বলতেন — ‘তুই একটা ভালো কাজ করছিস। তোর এই বিশাল কর্মযজ্ঞে আমি হয়তো সেইভাবে তোকে সাহায্য করতে পারবো না। তবে আমি তোর পাশে আছি’।
দীর্ঘদিনের সেই সম্পর্কের দাবিতে একদিন গেলাম স্যারের কাছে। স্যার আমি একটা এনজিওর সঙ্গে যুক্ত। তবে আমরা কোন ডোনেসন সেইভাবে নিই না। আপনার কাছে একটা সাহায্য চাইবো।
স্যার হাসলেন।
ডোনেসন ছাড়া কোন সংস্থা চলে নাকি।
চলে স্যার। মনের ইচ্ছেয় চলে। তবে আমরা সেইরকম নামজাদা অর্গানাইজেসন নই।
তোর কি কথা, বল শুনি।
আপনি একটা ছোটদের জন্য বই লিখে দিন না।
স্যার আমার কথা শুনে জোড়ে হেসে উঠলেন।
আমার লেখার সময় কোথায়। তুই তো দেখছিস।
তবু সময় করে আপনাকে লিখে দিতে হবে।
স্যার কিছুতেই রাজি হলেন না। আমিও নাছোড়বান্দা। শেষে উনি রাজি হলেন। একদিন ফোনে ডাকলেন তুই আয়।
গেলাম।
বল কাকে নিয়ে লিখতে হবে।
ম্যাক্সিম গোর্কিকে নিয়ে। ওনার ছোটবেলা, ছোটদের মতো করে।
স্যার শুনে হেসে বললেন, লেখা-জোখার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন কাজ ছোটদের মনের মতো করে লেখা।
আমি হাসছি।
তুই হাসছিস। তোদের মতো পাগলের পাল্লায় পরলে আমার সব যাবে।
স্যারের কথা মতো আমি ইন্টারনেট ঘেঁটে সমস্ত তথ্য স্যারকে জোগাড় করে দিলাম।
একমাস, দু-মাস, তিনমাস হয়েগেল স্যার কোন উচ্চবাচ্য করেন না। সমানে খোঁচা লাগাতে শুরু করলাম। শেষে একবছর বাদে বললেন তুই পর্শুদিন সকালে একবার আমার বাড়ি আয়।
গেলাম। স্যার আমার হাতে লেখার স্ক্রিপ্ট তুলে দিলেন।
মহা খুশী।
আমাকে একবার ফাইন্যাল প্রুফটা দেখাবি।
ঠিক আছে স্যার।
চলে এলাম।
কম্পোজ হলো। বইয়ের নাম দেওয়া হলো আমি তোমাদেরি গোর্কি।
বই ছাপা হলো। বইমেলায় প্রকাশ পাবে। সেবার বইমেলা হয়েছিল সল্টলেকে। স্যারকে গিয়ে ধরলাম। স্যার আর একটা অনুরোধ আপনাকে রাখতে হবে।
আবার!
বইটা জ্যোতিবাবুকে দিয়ে উদ্বোধন করাতে চাই।
স্যারতো শুনেই হো হো করে হেসে উঠলেন।
ওরে ওনার শরীর ভালো নয়। এখন বিরক্ত করা ঠিক নয়। আমি পর্শুদিন গেছিলাম। উনি বললেন, ওনার দাঁতে ব্যাথা। ঠিক মতো কথা বলতে পারছেন না।
আমি নাছোড় বান্দা।
শেষে স্যার বললেন, ঠিক আছে, দেখি যদি ওনাকে পাই। তবে কথা দিতে পারছি না।
স্যারকে বই-এর ছাপা কপি দিয়ে এলাম।
সকালে স্যারকে দিয়ে এসেছি। বিকেলে স্যার ফোন করলেন।
আমি ধরেই স্যারকে বললাম, বলুন স্যার।
শোন ওনার সেক্রেটারির সঙ্গে কথা হলো। কাল সকালের দিকে উনি ফাঁকা আছেন দশটা থেকে এগারোটা। তোরা এর মধ্যে এ্যারেঞ্জমেন্ট করতে পারবি।
নিশ্চই করতে পারবো স্যার।
তাহলে আমি কথা দিলাম।
হ্যাঁ স্যার।
বুকের ভেতরটা দুরু দুরু করতে শুরু করলো।
কোনদিন সাক্ষাতে ওনাকে দেখি নি। যা কিছু টিভির পর্দায়। অনেক কিছু ওনার সম্বন্ধে শুনেছি। ভালো খারাপ সব।
আবার স্যারের ফোন পেলাম।
হ্যাঁ স্যার বলুন।
শোন, পাঁচ ছজনের বেশি ওখানে যাওয়া যাবে না।
ঠিক আছে, তাই হবে স্যার।
আমি এসে আমার অর্গানাইজেসনের সেক্রেটারিকে বলতে তিনি মাথায় হাত দিয়ে বসলেন।
হবে কি করে। মিনিমাম পনেরোজনতো হয়েই যাচ্ছে।
আপনি এক কাজ করুণ স্যারকে একবার ফোন করুণ।
না করা যাবে না। তার থেকে বরং চলুন গিয়ে হাজির হই। তাড়িয়েতো দিতে পারবে না। দিলে দেবে।
ব্যাপারটা ভাল হবে না। সক্রেটারি বললেন।
দুর ভালো খারাপ। ওইরকম একজন মানুষের কাছে পৌঁছতে পারছি এই যথেষ্ট।
আমার কথা মেনে নিলেন।
বাড়ি ফিরলাম। ভীষণ ভালো লাগছিল। আমার সত্যিকারের মানুষ দেখা সার্থক হবে। ভালো খারাপ নিয়েই মানুষ, কিন্তু উনি আর সাধারণ মানুষ নেই। উনি এখন একটা মিথ। রূপকথার নায়ক। আমি সেই নায়কের সন্ধানে।

সকাল দশটায় ইন্দিরা ভবনের গেটে এলাম আমরা সবাই।
হাই সিকুরিটি জোন। তবে স্যার আছেন। অতএব অসুবিধে হলো না। গাড়ি সমেত ভেতরে ঢুকে পরলাম।
ওনার আপ্তসহায়ক বেরিয়ে এলেন।
আমাদের নিয়ে ইন্দিরা ভবনের ভেতরে গেলেন। বাইরের ঘরে আমরা সবাই বসলাম।
মিনিট দুয়েক পরই উনি ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। একবারে সাধারণ একটা মানুষ।
আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। একবারে খোলামেলা পরিবেশে।
রাশভারি দেমাকী মানুষটাকে ভীষণ ছেলে মানুষ মনে হলো।
আমার নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় হেসে বললেন, বাবা দুই জ্যোতি এক সঙ্গে।
লোভ সামলাতে পারলাম না পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বসলাম।
মিথকে ছোঁয়ার আনন্দে তখন আমি মুহ্যামান। এতো কাছ থেকে ওনাকে দেখবো এটা কল্পনা করতে পারি নি।
স্যারের লেখা বই গোর্কির ওপর ওনাকে বলতে বললাম। উনি বললেন। আরো অনেক গল্প করলেন আমাদের সঙ্গে। এমন অনেক কথা বলে ফেললেন রাজনীতি বিদ হিসাবে কখনো তাঁর মুখ থেকে কোন দিন সেই কথা শুনি নি। বলতে গেলে আত্ম সমালোচনা। একবারে শেষে এসে ফিরে দেখা।
আমি তখন ওনার মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে। মনে মনে ভাবছি এই মানুষটাকে নিয়ে কতো লোকে কতো কথা বলে। কতো খারাপ খারাপ কথা লোকের মুখে শুনেছি। কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
তখন যেন মনে হচ্ছে। উনি এসব করতে পারেন না। ওনার অধস্তন যারা রয়েছে তারাই এসব কাজ করেছে। উনি তা নিজের বলে স্বীকার করে নিয়েছেন।
অনুষ্ঠান শেষে বেরিয়ে এলাম।
স্যারের গাড়িতে করে আসছি। একবারে কোন কথা বলছি না।
স্যার বললেন তুই এত চুপচাপ হয়েগেলি।
স্যারের মুখের দিকে তাকালাম।
ঠিক মেলাতে পারছিস না।
হেসে ফেললাম।
জানিস এই পৃথিবীতে কোন মানুষ পরিপূর্ণ নয়। আমিও নয়, তুইও নস। ওনার ক্ষেত্রেও তাই।
চন্দ্রগুপ্ত, চানক্যর জীবনী কজন পরে। ইতিহাস তাদের কর্মকে ধরে রেখেছে।
বিধান রায়ের পর বাংলায় এতো বড়ো মাপের মানুষ আর আসে নি।
উনি একজন গুড এ্যাডমিনিস্ট্রেটর। দুদিন পরে ইতিহাস তারই মূল্যায়ণ করবে।
ছবি আর লেখা দুটোই এককথায় অপূর্ব।
স্যার আপনার লেখা গুলো অসাধারণ। একটা প্রশ্নের যদি একটু উত্তর দিতেন যে আপনার কাজলদিঘী উপন্যাসটা আর কেনো লেখেন নি আমার জানা মতে আমার মতো হাজার মানুষ এই উপন্যাসের ভক্ত এবং এটার শেষ জানতে চায়। যদি একটু বলতে এইটা কি আর লিখবেন না?
অসাধারণ স্মৃতিচারণ। খুব ভালো লাগলো।
দারুন লেখা ও ছবি। মন ছুঁয়ে যাওয়া স্মৃতি। খুব ভালো লাগলো।
হ্যাঁ, জ্যোতি বসুকে অনেকটা অন্যভাবে দেখা গেল। নবীন জ্যোতির চঞ্চলতা, আবেগের সরল প্রকাশও অন্য মাত্রা পেয়েছে। বেশ ভালো লেখা।