| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

দুই প্রান্তের দুই সাহিত্যিক যাঁরা দুজনেই নির্বাসিত : অশোক মজুমদার

Reporter
অশোক মজুমদার / ৬৯৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৪

বিশ্বে এই দুজন মানুষ একবারই মিলিত হন তাও এই কলকাতায়…. এ ছবি আমারই তোলা।

ছবিওয়ালার আজকের ছবি তোলার গল্পে আমি নিজেই নিজের ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে চারদিন আগেই ফেসবুকে আপনাদের জানিয়েছিলাম, আমার তোলা এমন একটা ছবি আছে যা পৃথিবীর আর কারোর কাছে নেই।

তারপর আপনাদের কমেন্টে….”অপেক্ষায় থাকলাম, অপেক্ষায় রইলাম” ….. মনে হল আমার চেয়ে আপনারাই বোধহয় বেশি উত্তেজিত। সন্মানিত আমি। আমার সাংবাদিকতার ফেলে আসা উপাখ্যানের গল্প আজও আপনাদের শোনার আগ্রহ দেখে সত্যি খুব ভালো লাগে।

সলমান রুশদির উপরে যেদিন আক্রমণ হয় সেই দিন থেকেই এই ছবিটার কথা ভেবে আসছি। ব্যক্তিগতভাবে বহু জায়গায় খোঁজ তো নিয়েছিই এছাড়া বর্তমান সময়ে কিছু খোঁজার সবথেকে ভরসাযোগ্য প্ল্যাটফর্ম গুগুল সার্চ করেও রুশদি আর তসলিমার একসাথে কোনো ছবি দেখতে পাইনি।

এই দুই প্রান্তের সাহিত্যক যারা দুজনেই আজ নির্বাসিত স্ব স্ব জগৎ থেকে ….একবারই তারা কিছুক্ষন মুখোমুখী হয়েছিলেন। আর সেই সাক্ষাতের ছবি শুধু এক্সক্লুসিভ না পুরো ঘটনাটা নাটকের স্ক্রিপ্টের মত আমারই সাজানো।

সেই গল্পে পরে আসছি……..

দু-দিন আগে সলমন রুশদির ঘটনার জন্য তসলিমাকে ফোন করলাম। আপনাদের জানিয়ে রাখি তসলিমার সাথে কলকাতায় থাকাকালীন এবং এখন দিল্লিতে থাকলেও আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ আছে। আমি দিল্লিতে গেলে তসলিমার বাড়ি যাই।

তসলিমা ভীষণ খাওয়াতে ভালোবাসে। মাছ মাংস সহ নানান পদ। নিজেই রান্না করে। কলকাতায় যখন থাকতো প্রায়দিন দুপুরে ও আর আমি একসাথে খেতাম। তার সাথে নানান গল্প। সত্যি ওর কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়াটা আমার কাছে খুব দুঃখের। সারা পৃথিবী ঘোরা মেয়েটি কিন্তু এখনও কলকাতাতেই থাকতে চায়।

যাইহোক, তসলিমার কাছে জানতে চাইলাম সলমান রুশদির সাথে ওর কতবার দেখা হয়েছে?

উত্তরে আমায় বললো, “তুমি একটা পাজি। বদমাশ জানোনা যেন? একবারই দেখা হয়েছে। আর সেই ছবি তোমারই তোলা।”

আমি জানতে চাইলাম, “রুশদির ঘটনা নিয়ে তুমি কিছু ভাবছো? কারণ তুমিও তো লেখার জন্য কোতোল ফতোয়ার ভিতরে আছো?”

তসলিমা সরাসরি বলল, “আমি তো টুইট করেছি। এটা তো খুব নিন্দনীয়। আমার তো নিজেরই এখন ভয় করছে। সন্ত্রাসবাদীরা পারে না এমন কোন কিছু নেই। এতদিন পর দেখলে কি কান্ড করে বসলো!! রুশদি যেন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সত্যি বলতে, আমি ব্যক্তিগতভাবে সলমন রুশদিকে মনে করি খুব অহংকারী এবং পুরুষতান্ত্রিক লেখক। আমার কোনদিনই ইচ্ছে করেনি সলমান রুশদির সাথে নিজে থেকে যোগাযোগ করার। একমাত্র তুমি খুব কায়দা করে ছবিটা তুলেছিলে আর আমি পরে বুঝতেও পেরেছিলাম যে তুমি জানতে সলমান ওই দিন ওখানে আসতে পারে!!”

এবার মূল ঘটনায় আসি….

এ গল্প যখন লিখছি….ভাবছি আর হয়তো কোন সম্ভাবনাই নেই সলমান রুশদি এবং তসলিমাকে একসাথে কখনো আবার দেখার!! অথচ পৃথিবীতে এই দুজন মানুষ তাদের লেখার জন্য কোন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সারা পৃথিবী জুড়ে ফতোয়া জারি করে রেখেছে যে এদের কোতল করার!!

ভাবলে অবাক লাগে, সারাজীবন এরা আমার আপনার সাধারণ মানুষের মতো জীবন ধারণ করতে পারলো না। কত ঘৃনা পুষে রাখার নিদর্শন এটাই যে, এতদিন পরও আমরা দেখলাম সলমন রুশদির উপর হামলা করতে। অবাক হয়ে ভাবি, লেখক তার দৃষ্টিকোণে যা লেখে সেটা কারো পছন্দ নাও হতে পারে কিন্তু তাই বলে মৃত্যুর ফতোয়া!!

এই যে তসলিমা ১৫ই আগস্ট স্বাধীনতা উপলক্ষে বাড়ির ছাদে পতাকা তুলে পোস্ট করেও পরে ডিলিট করে দেয়। কারণ এই স্বাধীনতার পতাকা দেখে যদি সন্ত্রাসবাদীরা বাড়িটাকে চিহ্নিত করে ফেলেন। আর কথায় কথায় বলেও ফেললো — “ওরা যে কোনো দিন আমায় মেরে ফেলতে পারে। ওদের ফতোয়া যে কি জিনিষ আমি দিনের পর দিন বুঝছি। তার ওপর আমায় নিয়ে রাজনৈতিক দল ছাড়াও একাংশ সাহিত্যিক আছে যারা আমার প্রিয় শহর কলকাতা পর্যন্ত ছাড়া করলো। বেচেঁ আছি শুধু বাংলা ছাড়া বিশ্বে বহু মানুষ আমার লেখা পড়ে, ভালোবাসে।”

বহুবার ওর বাড়ি যাতায়াতের ফলে জানি যে তসলিমার ফ্ল্যাটের নিচে একটা ছোট সিআরপিএফ ক্যাম্প আছে। আর একেবারে দরজার সামনে তিনজন সিআরপিএফ বসে থাকেন। পুলিশ নিয়ে চলা ফেরা একজন মহিলার পক্ষে কি দুস্কর এ গল্প আপনাদের একদিন শোনাবো। কলকাতা দিল্লি দু জায়গাতেই আমি পুলিশি নিরাপত্তা দেখেছি।

আজ ছবির গল্পটিই বলি আপনাদের….

১১ই সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় (সাদা বাড়ির কালো গ্রিল) কলকাতার পাতায় তসলিমা নাসরিন ও সলমান রুশদির এই ছবিটি প্রকাশিত হয়। কিন্তু কি করে ওদের দুজনের দেখা করিয়ে আমি ছবিটা তুললাম তা এখনও ভাবলে খুব আশ্চর্য্য লাগে। কারণ ওদের দুজনের কাছেও তার আগে কোনো ধারণা ছিলো না ওদের দেখা হতে পারে। আমার কাছেও নয়।

তসলিমা নাসরিনের সাথে আমার যোগাযোগ ছিলো বন্ধুর মতো। সেসব কথা আমি একদিন শোনাবো। তসলিমার প্রথম প্রথম কলকাতা থাকার সময় ছবি তোলার সূত্রেই আমার সাথে ওর যোগাযোগ। আনন্দ পাবলিশার্স এর বাদলদা, সুবীরদাও আমায় অনেক সাহায্য করেছেন।

তসলিমার অদ্ভুত অদ্ভুত আবদার ছিলো। একবার ওর রাতেই শ্মশান দেখার ইচ্ছে হলো। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ওর নাছোড়বান্দা আবদারে কেওড়াতলা শ্মশানে যেতেই হলো। সেদিন সাহিত্যিক সুনীলদার জন্মদিনের পার্টি ছিলো। ওখান থেকেই আমরা অনেক রাতে কেওড়াতলা শ্মশান যাই। সাথে আমি ও বিখ্যাত পরিচালক গৌতম হালদার।

সেই রাতে শ্মশানের লম্বা লাইন ছিল শবদেহের। বৃষ্টিও হচ্ছিল। গৌতমদার গাড়িতেই গেছিলাম আমরা তিনজন। তসলিমা গাড়ি থেকে নেমে মুখ ঢেকে শ্মশানে ঘুরতে লাগলো। আমরা একটু গার্ড করে দূরে দূরে ওকে দেখে যাচ্ছি। পুলিশ তো আছেই।

হঠাৎই আমার কানে এলো, “আরে এটা তসলিমা নাসরিন না?”

কিছু শ্মশানযাত্রীর ভিতরে বেশ শোরগোল পরে গেলো। তসলিমাকে দেখার জন্য গুঞ্জন। আমরা তড়িঘড়ি ওকে টেনে নিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে পালিয়ে বাঁচলাম।

তসলিমা মাঝে মাঝে আমায় বলতো, “অশোক আমি কোনদিন স্বভুমি যাইনি। একদিন নিয়ে চলো।”

আমি বলতাম, “ঠিক আছে একদিন যাব।”

তারপর থেকে যখনই তসলিমার সঙ্গে দেখা হয় ওর আবদার শুনতে হতো, “ঐ অশোক কবে যাব আমরা স্বভূমি?”

আমিও, “দাঁড়াও দাঁড়াও সময় মত ঠিক হবে।”….এই বলে যেতাম।

একদিন খবরের কাগজে দেখলাম সলমন রুশদি কলকাতায় এসেছেন। সেদিনই আমার মাথায় ওদের দুজনের ছবি তোলার ভাবনা এসেছিলো। কিন্তু রুশদির সঙ্গে কি করে সাক্ষাৎ করবো ?

তসলিমা তো তখন ঘরের মেয়ে কিন্তু রুশদিকে চিনিও না তাছাড়া তাজ বেঙ্গল হোটেলে কড়া নিরাপত্তা। এমন কি রুশদি কোথায় যাবে কি করবে তাও কেউ জানে না। দিন রাত ভাবতাম যদি ছবিটা তুলতে পারি তাহলে একদিন না একদিন এ ছবির মূল্যায়ন হবে। এর গুরুত্ব আমার কাছে অনেক।

মনে পড়ছে না কোন একটা সূত্র থেকে (কাগজ কিংবা পুলিশও হতে পারে) জানতে পারলাম সলমন রুশদি স্বভূমিতে এক সাহিত্য আলোচনায় পরদিন থাকতে পারেন? যদিও তা কনফার্ম নয়।

সঙ্গে সঙ্গে মনে পরে গেলো, তসলিমাও তো অনেকদিন ধরে বলে আসছিল স্বভূমি যাবার কথা। ফোনে ওকে বললাম, “আমি কাল ফ্রী আছি চলো স্বভূমি যাই।”

ও বললো, “তোমার প্রেসের গাড়িতেই যাবো। প্রেস দেখে আমায় অনেকেই বুঝতে পারবে না। পুলিশদের স্কট আর নেবো না।’

তসলিমা তো পেলাম এদিকে মনের ভিতরে এক উত্তেজনা শুরু হলো, রুশদি আসবে তো ?

দুপুরে তসলিমার বাড়িতেই খেয়ে বিকাল তিনটের সময় ওকে নিয়ে রওনা দিলাম স্বভূমির দিকে। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছিল। আবহাওয়াটা বেশ ভালো। ওখানে পৌঁছে তসলিমা নিজের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু স্টলে গিয়ে না কিনলেও সব জিনিস দেখছে। কিছু কেনাকাটিও করল। আমরা চা খেলাম। বললো জায়গাটা বেশ ভালো। কিন্তু আমার মাথায় তখন একচিন্তা, “রুশদি আসবে তো?”

যারা স্বভূমি গেছেন তারা জানেন যে গেট দিয়ে ঢুকে অনেকটা সিঁড়ি এঁকেবেঁকে স্বভূমির মূল জায়গায় যেতে হয়। সেখানেও উঁচুনিচু সিঁড়ি ভেঙে নানান স্টল। আগে ওটা ধাপা ছিল (জঞ্জাল ফেলা হতো) হর্ষ নেওটিয়ার বাবা তখনকার শ্রদ্ধেয় মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর থেকে এক টাকায় কিনে স্বভূমি করেন।

এদিকে সন্ধ্যা হয়ে আসছে আমি সারাক্ষণ ওই সিঁড়িগুলোর দিকেই তাকিয়ে যাচ্ছি।

আমাকে এত অন্যমনস্ক দেখে তসলিমা একবার তো বলেই ফেললো, “এই অশোক তুমি করো কি? চলো আমি এবার কাপড়ের দোকানগুলোতে যাই। দেখি যদি কিছু কেনা যায়।”

এদিকে আমি কিন্তু ওকে খুব একটা ভেতরে নিয়ে যাচ্ছি না। কাছাকাছি ঘুরছি।

বললাম, “বেশী দূরে যাবে না। আমি একটু বসলাম পা ব্যাথা করছে।”

আসল কথা হচ্ছে, অন্ধকার হয়ে এসেছে, আমায় ওই লাইটে রুশদিকে দেখতে হবে তো!! একবার হলে ঢুকে পড়লে আমার ছবি তোলা কঠিন হয়ে যাবে।

নানান কিছু ভাবছি। হঠাৎ দেখি গোটা চার পাঁচেক সিকিউরিটি রুশদিকে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে আসছে। সঙ্গে সঙ্গে আমার ডাইনে বাঁয়ে তাকিয়ে দেখি তসলিমা নেই। সে তখন অনেকটা পিছনে এক জায়গায় দোকান থেকে কি সব কিনছে!! আমি দ্রুত গিয়ে ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে এলাম।

তসলিমা বললো আরে, “করো কি?”

আমি বললাম, “সলমান রুশদিকে দেখলাম।”

ও বললো, “হ্যাঁ আমি জানি তো ও কলকাতায় এসেছে।”

বললাম, “স্বভূমি এসেছে দেখা করবে না? চলো না…”

দেখলাম ওর কোনো গরজ নেই। উল্টে আমায় বললো, “তুমি যাও ছবি তোলো।”

বলেই গুম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলো….

আরে এতো দেখছি মহাবিপদ। বুঝলাম, তসলিমা যাবে না। কি মনে হলো, আমি তরতর করে কিছু সিঁড়ি বেয়ে নেমে একবারে রুশদির সামনে।

সরাসরি বললাম, “মিস্টার রুশদি ইউ নো তসলিমা নাসরিন ?”

রুশদি বললেন, “ইয়েস অফকোর্স।”

তারপরেই রুশদিকে বললাম, “লুক দেয়ার সি ইজ।”

আমার কথা শুনে রুশদি তসলিমার দিকে এগিয়ে গেলেন। তসলিমাও রুশদি এগিয়ে আসতে দেখেই নিজেও এগিয়ে এলেন। কিন্তু জায়গাটায় খুব একটা আলো নেই। আমি আন্দাজ করেই ক্যামেরায় ক্লিক করলাম। সাদা কালো ছবিটা দেখলেই বুঝতে পারবেন।

“হ্যাল্লো তসলিমা হাও আর ইউ”…..বলেই তসলিমার সাথে হ্যান্ডশেক করে রুশদি বললেন…”হিয়ার আই হ্যাভ সাম ওফ মাই লিটারেরি ওয়ার্ডস। ডু কাম এন্ড ব্রাউজ।”

গোটা ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে আমি কি তুললাম জানিনা। এরপরই রুশদি হলের ভেতরে ঢুকে গেলেন।

তসলিমাকে বললাম, “চলোনা ভেতরে যাই।”

তসলিমা বলল, “না। আমি কেন যাব? ওরা কি আমায় ইনভাইট করেছে?”

বললাম, “কেন রুশদি তো বললেন যেতে। আরে তুমি ঢুকলে ওরাও বর্তে যাবে।”….বলেই প্রায় হাত ধরে তসলিমাকে নিয়ে হলে ঢুকে পড়লাম। কর্তৃপক্ষরা তসলিমাকে দেখেই সামনের চেয়ারে নিয়ে গিয়ে বসালো।

কিন্তু কিছুক্ষন পর লক্ষ্য করলাম তসলিমার মন নেই ওখানে বসার। বা ওদের কথা শোনার। কিন্তু আমি চাইছিলাম একটু গুছিয়ে কিছু ছবি যাতে তোলা যায়। অন্ধকারে কি যে তুললাম। আর একটা সুযোগ যদি পাওয়া যায়।

হঠাৎ করে দেখি তসলিমা সিট ছেড়ে রুশদির কাছে গিয়ে কি একটা বলছে। তারপরেই বেরিয়ে এলো। আমার কথা শোনা তো দূরে থাক। আমি খুব দ্রুত ওই মুহূর্তটা ক্লিক করলাম। এখানে সেই ছবিও আছে। এবার মনে ভীষন শান্তি এলো।

বেরিয়ে আর একবার চা খেয়ে তসলিমাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গাড়িতে উঠে তসলিমাকে বললাম, “আমাকে আনন্দবাজারে নামিয়ে তুমি ক্যামাক স্ট্রিট (তসলিমার বাড়ি) চলে যাও। রাস্তায় কোনো কাজ থাকলে করে নিও। তাড়াহুড়ো নেই।”

লক্ষ্য করলাম, গাড়িতে ও একটু চুপ ছিল। আমি তো কতক্ষনে অফিস পৌঁছবো সেই ভাবছি।

হটাৎ তসলিমা বলে উঠলো, “আচ্ছা অশোক তুমি জানতা না যে এখানে সলমান রুশদি আসবে?”

আমি চুপ করে থাকলাম। অফিস নামার সময় পিঠে আলতো করে চাটি মেরে বলল, “তুমি খুব পাজি বদমাইশ। আমি সব বুঝেছি।”

গল্পটা এখানেই শেষ। তারপর কেটে গেছে কত বছর!! তসলিমা-রুশদি দুজনেই নির্বাসিত পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। আজও ভাবলে অবাক লাগে….শুধুমাত্র একটা ছবি তোলা থাকলো পৃথিবীর এমন দুজন লেখক লেখিকার যাদের মাথায় মৃত্যু ফতোয়া….যে ছবি আজ একটা ইতিহাস।

যাইহোক, সলমান রুশদি সুস্থ হয়ে আবার লেখালেখি করবেন আপনাদের সাথে আমিও এই প্রার্থনা করছি।

তসলিমা নাসরিনকেও বলেছি সাবধানে থাকতে। উত্তরে ও সেদিন বললো, “তুমি মমতাকে বলো আমি শেষ জীবন কলকাতায় থাকতে চাই। ব্যবস্থা করে দাও।”

বললাম, “সে ক্ষমতা আমার নেই।”

তসলিমা, রুশদির বিরুদ্ধে ফতোয়া জারিকে আমি এখনও ধিক্কার জানাই। এগুলো সুস্থ সমাজের কাজ নয়। আমাদের আসলে এখনও বহু পথ বাকি মনের জানলা খুলতে!!

আমি খুবই সাধারণ একজন মানুষ। জীবনের কোন বাঁকে ছবিওয়ালা হয়ে গেছি তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা আমি জানিনা। মুহূর্তের সঙ্গে ভালোবাসা হয়েছে। মুহূর্তের থেকে পেয়েওছি অনেককিছু। তারই মধ্যে কিছু কিছু ছবির মুহূর্ত খুবই মনের কাছে। সেইরকমই ছবি এইটা। ছবিওয়ালা তার জীবনের সামান্য কর্মকাণ্ডের মধ্যে এই ছবির জন্য সত্যিই গর্বিত।

স্বল্প সময়ের ছবি তোলার গল্পগুলো রূপকথার মতো নিজের কাছেই লাগে এখন। আজকাল ছবি তুলতে ইচ্ছা করেনা। বার বার একই ছবির রিপিটেশনও আর ভালো লাগে না। কিন্তু পুরোনো ছবির গল্প শুনিয়ে আনন্দ পাই। এভাবেই দিন যদি যায় যাক না….

ধন্যবাদ।।

২০.০৮.২০২২

কভার ছবি : তসলিমা নাসরিন ও সলমন রুশদি। দু-জনেই মৌলবাদী ফতোয়ার শিকার। এর আগে চিঠিতে বার্তা বিনিময় হলেও দু-জনের দেখা হল এই প্রথম।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev