সবার লেখা সাহিত্য হয় না। কারণ সবাই ধ্যানে বসে না। লেখা যার ধ্যান, তার হাতেই সাহিত্য। লেখা মানে তো তাহাকে ডাকা, কমলকুমার যেমন বলেন— লিখতে লিখতে, নিজেকে দেখতে দেখতে, নিজের ভেতর ঢুকতে ঢুকতে একটা সময় অন্তর অনন্ত হয়ে যায়। তারপর মাথায় খুলে যায় হাজার দুয়ার। তারপর, ভেতরেই হঠাৎ কথা বলতে শুরু করেন কারা। হাত-পা নারেন। হাঁটাচলা করেন। তারা সবাই ভেতরেই ছিলেন এতদিন৷ মন শান্ত হওয়ার পর, ধ্যানে বসে তাদের দেখা পেলাম। স্মৃতির সাথে, আত্মার সাথে আমার যোগাযোগ হল। সেখান থেকেই আমি গণস্মৃতি আর আত্মার কথা বলতে শুরু করলাম, লেখকের/ শিল্পীর যা কাজ।
আজকের প্রজন্ম অমিয়ভূষণ, উদয়ন ঘোষদের চেনে না। চিনলে অবশ্য এমন প্রজন্ম বা এমন শিল্প-সমাজ কিছুই তৈরি হত না। ‘অবনী বনাম শান্তনু’, ‘স্বপনের ম্যাজিক রিয়েলিটি’, ‘আদালত ও জীবনের বউ’ লেখাগুলি ফিরে পড়ছিলাম। ‘জারি বোবাযুদ্ধ’ পত্রিকার লালাদা (প্রচেতা ঘোষ) আর তাপস ঘোষ না থাকলে আমার এই পাঠ সম্ভব ছিল না। পড়তে পড়তে দেখছিলাম বারবার ব্যক্তিমনের অন্তর্জালে ঢুকে সমাজ-নৈতিকতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলছেন উদয়নবাবু। যুগ যুগ ধরে চার দেওয়ালে আটকে থাকার বিপক্ষে বিধ্বংসী যুদ্ধ ঘোষণাই করছেন ধর্ম আর রাজনীতি দিয়ে। চেয়েছেন, টব ফেটে বেরোক শেকড়। সেখানে ‘অবনী, ‘শান্তনু’, ‘স্বপন’-রা নাম মাত্র। তাঁদের আড়ালে খেলে যাচ্ছে বিশ্বায়িত লারেলাপ্পা, ফাঁপা অন্তঃসারশুন্য আত্মাবিহীন একটা দশক-যা হয়তো আশি-নব্বই। সন্দীপনের জগতের সাথে এসব লেখার কি আশ্চর্য মিল! সে কারণেই কি সন্দীপনের ‘এক যে ছিল দেওয়াল’-এর সাথে উদয়নের ‘দুই কন্যা’ একসাথে ছেপে ছিল অপ্রকাশ? ক্রমশ ধ্বসে যাওয়া মূল্যবোধের কথাই ধারাবাহিক লিখে গেছেন অমিয়ভূষণ-উদয়নরা। সুবিমল-দীপক যে সারির সামনে শাবল হাতে দাঁড়িয়ে। কলকাতা শহর আর শহরতলির মাটি নড়ে যাচ্ছিল ক্রমশ, ধর্মতলার শহীদ মিনার আর আসানসোলের কোলিয়ারি বেল্টের তপতপে চুল্লি ফাটিয়ে আত্মা নড়বর করছিল, বাদল সরকার অমল-কমল-বিমলদের যেভাবে দেখেছিলেন-যেভাবে দেখেছিলেন ইন্টারভিউ ছবিতে মৃণাল সেন তাঁর নায়ককে-সেভাবেই চামড়া তুলে আত্মা নিয়ে চুলচেরা গবেষণা চালাচ্ছিলেন এসব লেখকরা। তাঁরা বাজার ধরেননি। তাঁদের বাবু দরকার ছিল না। কারণ তাঁরা জানতেন, তাঁরা আন্তর্জাতিক। সময় একদিন ধ্বংস হবে, তাও জানতেন তাঁরা। এবং সে অভ্যুত্থানের সময় লড়াইয়ের অস্ত্র হিসেবে কাজে লাগবে এইসব আন্ডারগ্রাউন্ড লেখাপত্র, সংবেদনের জন্য, আত্মার পুনঃস্থাপনের জন্য। কারণ, এসব লেখার গভীর অরণ্যে আজও লেখা আছে, কেন, সত্তর দশককে মুক্তির দশক বলা হয়। এসব লেখা পাঠে ও পুনর্পাঠে খুলে যায় সত্যের দরজা, আজকের শিল্প-সাহিত্য কিস্যু না। ডিলডো-র নামান্তর। সংগমের শক্তিও নেই। আছে কিছু নকল চকচকে সেলিব্রিটিদের ফিল্মফেয়ার এওয়ার্ড..

লেখা তাঁর কাছে ছেলেখেলা না, সুখের খুকু খুকু ব্যবস্থা না, বরং বিপদজনক ঝুঁকি অনেকদিন আগেই বলেছিলেন নবারুণ। প্রচলিত চিন্তা-ব্যবস্থার বদল ঘটানোই লেখকের কাজ বলে মনে করেন সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়। অমিয়ভূষণ যেমন বলছেন, মানুষের অবচেতনের ট্রমা থেকে আমরা ঘুমে বা যৌনতায় পালাই, আর পালাই বলেই লিখি, লিখে একটা বিকল্প জগত বিনির্মাণ করি। ধ্যানও তো আসলে এক ধরণের বিনির্মাণ। আমি আত্মস্থ হচ্ছি তাই দেখা পাচ্ছি আমার মনের মানুষের। আসলে, এই যে আইসোলেশান, বন্দি, ঘর বা কারাগার। সমাজ বা রাষ্ট্রের বা নিজের প্রয়োজনে। অরবিন্দ, গ্রামশি হোক বা সুচিত্রা সেন। এ এমন এক দশা-যা মানুষকে হ্যালুসিনেশনে নিয়ে যায়। তবু কীভাবে এ অবস্থায় মানুষ অতি-মানুষ হয়ে ওঠেন? লিখে ফেলেন মহাকাব্য, জেলের ডাইরি বা বলে ফেলেন ম্যাক্সিম বা সত্যবচন জীবনের? তখন ব্রহ্মের সাথে তার মোলাকাত, মিলন। বন্দি অবস্থায় শ্রী অরবিন্দকে উল্লাসকররা প্রশ্ন করেন, আপনি রোজ স্নান করেন না, থাকেন ওই ছোট কুঠুরিতে, তাও এত চকচকে চামড়া, চুল? অরবিন্দ জানান, ধ্যানে থাকলে, শরীর থেকে অতিরিক্ত ফ্যাট বেরিয়ে যায়।
এই ফ্যাট নানা ভাবে বেরোয়। তারপর বিশ্বরূপ দর্শন হয়। কখনও গ্রামশি লিখে ফেলেন, প্রিজন নোটবুক। কখনও হিকমত লেখেন কবিতাগুচ্ছ। অরবিন্দের মধ্যে মহাভাব জেগে ওঠে। রেগে ওঠেন জুলিয়াস ফুচিক। রাষ্ট্র, সমাজ-যারা বন্দি রাখেন, তারা এর নাগাল পান না। মদন তাঁতি রোজ অকারণেই তাঁত বুনতেন। নাহলে পায়ের মাংস সচল থাকবে না। বৌদ্ধ সন্ন্যাসী যেমন নিজেকে সব সময় ব্যস্ত রাখেন কোনও না কোনও কাজে। লেখক বা গায়কের বা সাধকের ধ্যানও তেমন। পুজো। রোজ তাকে আহ্বান জানাতে বসতে হয়। একদিন লেগে যায় ‘সা’। বন্দির ভেতর থেকেই উঠে আসে। শাসক আঁচ পান না। সাধক নিজেও কি অনুমান করতে পারেন? পারেন না। লেগে যায় হঠাৎ। তারপর তানসেন দেখেন, ঝড়জল ঝরছে। অনর্গল। ধানখেতে। বিজয়ার বাদ্য বাজছে। রবিশংকর বাজাতে বাজাতে, মানুষ থেকে ঈশ্বর হয়ে উঠছেন। মুছে যাচ্ছে তাঁর সমস্ত পাপ। রবি ঠাকুর লিখছেন, মেয়েরা এতদিন কয়লার মত মাটির নীচে বন্দি ছিল। দলিত। একদিন জেগে উঠবে। তখন তাদের শক্তি কয়লার মত, চাপে থাকতে থাকতে পেকে যাবে। ভয়ংকর হবে। ডস্টয়ভস্কি লিখে ফেলবেন তারপর বঞ্চিত ও নিপীড়িতদের আত্মজীবনী। নোটস ফ্রম দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড।

উদয়ন ঘোষ
উদয়ন ঘোষ
‘আমাদের আশপাশেই তো কত লোক আত্মহত্যা করে বিখ্যাত হওয়াকেই লোভনীয় মনে করল। উদয়ন নিশ্চুপ থেকেছেন, কঠিন অন্তরালে দীর্ঘদিন। একবার ৩ বছর। কিন্তু আত্মহনন করেননি। ৩ বছর পর কথা বলতে শুরু করে যিনি ঐ ইরেক্ট কন্ঠস্বরে কথা বলতে পারেন, তার সামনে আমাদের মাথা নুইয়ে আসে। শুধু শ্রদ্ধায় নয়, তাঁর প্রবল পরাক্রমে।
আমরা বুঝি এই সেই লেখক যিনি তাঁর লেখাগুলি আমৃত্যু না লিখলেও কিছু যায় আসে না। কারণ তাঁর কাছে তাঁর শ্রেষ্ঠতম লেখাটিও অনুশীলন মাত্র। সেই লেখাটির জন্য আমাদের তাই কোনও অপেক্ষা নেই। শুধু প্রাপ্তি আছে।’—তাপস ঘোষ, প্রচেতা ঘোষ (জারি বোবাযুদ্ধ)
আমার সব সময়েই মনে হয়েছে, শিল্পে বস্তুত লেখালেখিতে সত্তর দশক যে আন্তর্জাতিকতা ও আধুনিকতা স্পর্শ করেছিল, পরের দশকগুলি তা পারেনি। তাই সত্তরের পর যদি কেউ বেশিরভাগ বাংলা লেখা না পড়েন, তাহলে তাঁর বিরাট কোনও অসুবিধে হবে না। সেই সত্তরেরই লেখক উদয়ন ঘোষ। ধারাবাহিক ভাবে তাঁর লেখাগুলি আরেকবার পড়লাম। আধুনিকতার খোঁজের জন্যেই পড়লাম। ‘স্বপনের ম্যাজিক রিয়ালিটি’, ‘দুই কন্যা’, ‘কনকলতা’, ‘আদালত ও জীবনের বউ’, ‘আসানসোলের লক্ষ্মী’। আগেই বলেছি, আমার এই পাঠের জন্য সম্পূর্ণ কার্টেসি প্রাপ্য ‘জারি বোবাযুদ্ধ’ পত্রিকার লালাদা (প্রচেতা ঘোষ) আর তাপস ঘোষের। তাঁরাই একমাত্র ধারাবাহিক ছেপে গেছেন উদয়ন, শুধু উদয়নই বা কেন, সুবিমল মিশ্র-অমিয়ভূষণ-দেবেশ-সন্দীপন-সঞ্জয়। পন্যসাহিত্য বিরোধিতার অন্যতম কাগজ গত তিন দশকের জারি বোবাযুদ্ধ। তো, উদয়নের লেখাতেও ঘুরেফিরে আসছিল এই আধুনিকতা। কতগুলি চিহ্ন-কতগুলি নাম বারবার ঘুরেফিরে আসছিল এসব লেখায়। এমনকি প্লটও কখনও কখনও প্রায় এক। উদয়ন এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘আমার কাছে নকশালবাড়ির ঘটনা ও চরিত্র সমগ্র নকশালবাড়ির ইতিহাসের কতগুলো অনু-পরমাণুর বিস্ফোরণ মাত্র। কিন্তু তারই মধ্যে আমি যে সমগ্রকে দেখবার চেষ্টা করেছি, মানে মেজর ইস্যু যে এসে যাচ্ছে মাইনর পয়েন্টে, তার ফলে আমি সমগ্রর সাথে জড়িয়ে পড়ছি। এটা একটা শৈল্পিক প্রসেস।’
উদয়নের লেখায় ফিরে ফিরে আসে একটাই চিন্তা, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আমরা পলিগ্যামি থেকে মনোগ্যামি হয়েছি। তাই, বারবার, যৌনতা তথা ব্যক্তি আখ্যান দিয়েই রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন তিনি। কখনও তাই স্বাধীন বলে, ‘একটা যুদ্ধে নেমেছি আমরা। অসম যুদ্ধ। আমরা ভেঙে গুঁড়িয়ে ফেলব সেই হাতগুলো যা আমাদের যুগ যুগ ধরে আটকে রেখেছে ঘরের চার দেওয়ালেত মধ্যে। আমরা ঝলসে ফেলব সেই দৃষ্টিগুলি, যা আমাদের নোংরা ইঙ্গিত করেছে বারবার। ধর্ম আর সংস্কৃতির নামে দাবিয়ে রাখার দিন শেষ। আমরা জ্বলে উঠব সূর্যের মত।’ এভাবেই বারবার সমাজের অনু-পরমানুর ভেতর সেঁধিয়ে থাকা বিধ্বংসী ট্র্যাজেডির ম্যানিফস্টো লেখেন তিনি। তাই গ্রিক ট্র্যাজেডির মতোই বোনের প্রেমিককে ছিনিয়ে নেয় দিদি, পরপুরুষের সাথে জড়িয়ে পড়ে মা-মাসি; সমাজের প্রচলিত মুদ্রাগুলি ভাঙতে ভাঙতে বিকল্প যৌনতা ও রাজনীতির পরিসর গড়ে তোলেন উদয়ন, সেখানে মেয়েদের তেরো বছর বয়স পেরোতেই পিরিয়ডে শুরু হলেই বন্দী করে মায়েরা বলে দাদার ঘরে না যেতে, সেখানে মেয়েদের একটু একটু করে বড় হওয়া যেন-বা ধারাবাহিক কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ানো, অভিশাপ, সেখানে আসানসোলের প্রচণ্ড জলকষ্টের মধ্যেও কুয়োতলার শুষ্কতা ঢাকতে জলের অপচয় করে স্বামী সোহাগী স্ত্রী। সেই জল আসছে ৫০০ ফুট নীচ থেকে, জলের খনির অফুরন্ত ভাণ্ডার থেকে। তবু তা অপচয় করে সমস্ত ঘরের ট্যাপকল খুলে, কারণ তা এক ধরণের আত্মরতি সেই স্ত্রীর। স্বামী সোহাগে না পাওয়া সুপ্রিমেসি সে তাই এভাবে খোঁজে। মনে পড়ে যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়র কেরানির বৌ গল্পটি এ প্রসঙ্গে।
উদয়ন আসলে ভাষা নির্মাণ জটিলতার কোলাজে একটা দার্শনিক অভিজ্ঞতায় নিয়ে যান পাঠককে। সেখানে লৌকিক-অলৌকিকের দোলাচলে যৌনতাও ম্যাজিক্যাল। জাদু আর গদ্যকবিতা সেখানে একাকার। ক্রমশই গল্পের ভেতরে গল্প, গদ্যের ভেতরে গদ্য, প্রতিটি অংশের ভেতরেই প্রতিটি অংশ, বাস্তব জগতের অনেক নাম ঘুরেফিরে সেখানে আসে কাল্পনিকতায়, সমকালীন অন্যের টেক্সট সেখানে ঢুকে পড়ে প্রাসঙ্গিকতা মেনে, কোনও নির্ধারিত স্টেশান নেই উদয়নের, তাই যেন-বা যুক্তিহীন অথচ ইন্দ্রিয়ময় এক ম্যাজিক-রিয়াল জগত যা ক্রমশই ধূসর থেকে ধূসরতর করে তুলছেন তিনি, খসে পড়ছে সমস্ত দেওয়াল, সেখানে মালিকের কুকুর নারীকে পণ্য করতে চায়, সেখানে শরীরের মালিকানার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করে প্রতিটি নারী, প্রেম সেখানে অভিশপ্ত সিসিফাস, জমি সেখানে নারীর মতোই সস্তা পণ্য ‘বাবু’র কাছে..
আসানসোল আর কলকাতার মাঝেই ঘুরেফিরে বেড়ায় এসব গল্প। বারবার ফিরে আসা জলের মোটিফ সম্পর্কে লেখক জানান, নারীগর্ভে জন্মলগ্ন থেকেই জলে পরিপূর্ণ। ভ্রূণের প্রথম কান্নার কারণ সে গর্ভের জল থেকে বেরিয়ে ভূমিষ্ঠ হল। সে জলে অনেক স্বস্তিতে ছিল। জল আমাদের তাই একটা আদি বাসভূমি। প্রাইম মেমরি। মূলত গল্প বলতেই চান উদয়ন। কিন্তু তা আদি বাংলা গদ্যের ধাঁচে যেখানে ‘স্টোরি টেলিং’ মানে ‘বলা’ লিখে ফেলা না। কারণ, তাঁর মতে এই লেখা ব্যাপারটা এসেছে ইংরেজদের হাত ধরে, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের উত্তরাধিকারে। এ সব গল্প পড়ে মনে পড়ে সন্দীপনের কন্যার প্রতি তাঁর সেই উৎসর্গ পত্র, লেখা পড়ে ছিঁড়ে ফেলার নির্দেশ। উদয়নও জানান, এসব লেখার প্রতিক্রিয়ায় তাঁর স্ত্রী যথেষ্ট বিরক্ত, আত্মীয় স্বজন মুখ ফিরিয়েছেন, কেউই এসব সত্যর মুখোমুখি হতে চাননি, পারেননি, কারণ তাতে আমাদের সুখের ‘ভদ্র’ কেল্লা ধসে যেতে পারে..
আমরা আজ আধুনিকতা হারিয়ে একটা রিগ্রেসিভ সমাজ বানিয়েছি। তাই ফিরে গেছিলাম উদয়নে। দেখলাম, তিনিও কল্পনা করেছিলেন এমনই এক ডিস্টোপিয়ার, আজ এ সমাজ যদি ভাঙতে হয়, শেকড়েই আবার ফিরে যেতে হবে, তাতে লোকে মূর্খ বলবে, বলবে সামাজিক নয়, তাতে ছেঁড়া যায়। আমাদের কাজ যা বদলানো, আত্মদীপের আলোয়, অন্তত এই সভ্যতার দুই আদি পুরুষ মার্ক্স আর বুদ্ধ অন্তত তাই মনে করতেন..

অরূপরতন বসু
‘হতে পারে মানুষের মধ্যে আর প্রেম নেই, বা এও হতে পারে প্রেম আছে কি না সে জানে না; অন্তত সে যাকে ‘প্রেম’ বলে দৈনন্দিন কাজ চালায়, তা প্রেম নয়। কিন্তু কি সেই অলীক বস্তু যা ছাড়া প্রায় কোনও বিবাহই হয় না, অথচ যা প্রায় কোনও বিবাহের মধ্যেই নেই, অথচ যা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও মুহূর্তে অন্তত একবারের জন্যে হলেও অনুভব করেছে? এটা ভাবতে গিয়েই আমি মুশকিলে পড়ি। চারপাশে তাকিয়ে দেখি তিন বছর পর কোনও দম্পতিই আর আস্ত নেই, হয় পরস্পরকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে দিচ্ছে, নাহয় পরস্পরের সম্পর্কে আশ্চর্য উদাসীন, নাহয় এমনই অভ্যস্ত যে তাঁদের সম্পর্ক কখন মারা গেছে তা টেরই পায়নি..শারীরিকভাবে কোথাও দেখা না গেলেও, একমাত্র শরীরে যে অনুভূত হয় তাই প্রেম..’
—ব্লিতস্ক্রিগের পর, তুমি? তুমি! অরূপরতন বসু।
অরূপরতনের আখ্যানের জগত আসলে হাজার দুয়ারি, চোরাবালির মত, যার ভেতরে আপনি একবার ঢুকে পড়লে আর বেরতে পারবেন না। হারিয়ে যাবেন। হারাতে হারাতে নানা মানুষ থেকে মানুষ, পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তরিত হতে হতে টের পাবেন, আপনি আসলে সবাই। বা আপনি, কেউ নন। প্রায় প্রতি লেখায় এই প্রয়োগ ব্যবহার করেন অরূপরতন। একে উত্তর-আধুনিকতা, ম্যাজিক রিয়েল বা লেসার রশ্মির সাহায্যে তোলা ত্রিমাত্রিক ছবির হলোগ্রাম পদ্ধতি যাই বলা হোক-তত্ত্বের বাইরে গিয়ে অরূপরতনের এই জগত আমার কাছে বালিঘড়ি মনে হয়, মনে হয় আয়নামহল, যেখানে ঢোকার রাস্তা আমি জানি, কিন্তু বেরনোর রাস্তা জানা নেই..
বিগত দশকের যে হাতেগোনা ক-জন লেখকের লেখা অবশ্যপাঠ্য বলে মনে করি অরূপরতন তাঁদের একজন। তাঁর হলোগ্রাম আজও যে কোনও শর্তে তরুণ লেখকদের টেবিলে থাকা দরকার। শুধু তত্ত্ব নিয়ে জাগলারি নয়, অরূপরতনের টেক্সট একটা সময়ের ধারাভাষ্য, যেখানে শহর আছে যৌবন আছে চালাকি আছে, আছে জন-অরণ্যের ‘বীভৎস মজা’..তাই একটানা পড়তে পড়তে চমকে উঠি কারণ নিজের জীবন বাজি রেখেই ডুয়েল খেলেন লেখক, সে খেলায় কোনও পরচুলা বা মুখোশ নেই, আছে হাসতে হাসতে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলার মায়া, অবলীলায় প্রেমিকাকে সেখানে পরপুরুষের হাতে টাকার জন্য ছেড়ে আসে গরিব প্রেমিক এবং ফিরতে ফিরতে ভাবে একবার যদি অর্থ দিয়ে তাঁর অধিকারের কথা জানাতে পারত তাঁর প্রেয়সীকে, সেখানে ফ্ল্যাট বাড়ি তুলতে গিয়ে মাটির তলা থেকে হঠাৎ সন্ধান মেলে এক বাক্স বন্দুকের তারপর তা নিয়ে চলে মধ্যবিত্ত চাপানোতর, সেখানে শুটিংয়ে গিয়ে চরিত্ররাই হয়ে ওঠে শিল্পী আর শিল্পীরা চরিত্র, তাঁদের জীবন কখনও শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করে কখনও শিল্প জীবনকে-সেভাবেই তাঁদের প্রেম কখন সেল্ফিবন্দী হয়ে যায় সেলুলয়েডে তাঁরা খেয়াল করে না, তাঁদের যৌন মুহূর্তে দেখে দাঁতখোটে আণ্ডাবাচ্চা নিয়ে মধ্যবিত্ত, সেখানে অবলীলায় বিবাহের আগে কেবিনের অন্ধকারে হবু স্ত্রী তাঁর পার্টনারকে জানায়, ‘আমি কিন্তু ভার্জিন না’…
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তাঁর বন্ধু অরূপরতনের লেখালেখি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘শুধু একটা বোমা ফাটিয়ে ভগত সিং আজ সুভাষ-নেহেরু-গান্ধি কার চেয়ে কম যাচ্ছে? ভগত সিংকে কি কেউ ভুলতে পেরেছে?’ সত্যি, হলোগ্রাম পড়লে এ কথারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। বড় অল্প লিখেছিলেন অরূপরতন। সন্দীপনের মতই। কিন্তু সন্দীপনের লেখায় যৌনতা যে উদগ্র ভাবে আসে অরূপরতন তাতে বরং খানিক প্যসিভ, তাঁর হলোগ্রামে নীলগ্রীব, লীলা, ওসমান, তাহমিনা, জুবেদা, শবরী, ফারুকরা কেউই সামাজিক অর্থে সফল না, বরং এ সমাজের নীচুতলারই বাসিন্দা। তাঁদের প্রেমও পরিত্যক্ত। সামাজিক সফলতার কোনওদিন মুখ দেখবেন না তাঁরা, বরং রাস্তায় কুকুরের সংগমে বরাবর ঢিল ছুড়বে সভ্য মানুষ, তাই গল্পের শেষে তাঁরা হয় হারিয়ে যান বা মরে যান বা অন্ধকার ময়দানে মাঝরাতে এক আকাশ তারাদের জ্বলন্ত দেখতে দেখতে ছুটতে থাকেন…গল্পের শেষে তাঁদের কখনওই মিথ্যে মিথ্যে জিতিয়ে দেন না লেখক, আর এখানেই গল্পগুলি আজও সত্যি হয়ে বেজে ওঠে, একটা নন-কনফার্মিস্ট জায়গায় আজও পৌঁছে যায় গল্পগুলি…
মনে রাখতে হবে, অরূপরতন সেই সময়ের লেখক, যেই সত্তর দশক মুক্তি চেয়েছিল, চেয়েছিল আধুনিক ও আন্তর্জাতিক হতে, আর সে মুক্তি আজকের মত ওয়ানাবি বিপ্লব নয়, মানুষের আদিম চিৎকার। হয়তো হাজার হাজার যুবকের লাশের পাহাড়ে তা জিততে পারেনি, কিন্তু তা হেরেও যায়নি তাঁর প্রমাণ অরূপরতনের এই গদ্যশিল্পের আয়োজন। পর্নোগ্রাফির মত অপরাধপ্রবণ, মানুষখুনের মত বীভৎস এসব লেখালেখি অথচ কি আরামের এক খিল্লি ঝুলিয়ে রাখা মাংসের দোকানের রাং-এর মত ভাষা দিয়ে, যেন যুবক যুবতীরা এখানে শুধু প্রেম আর চাকরিই খোঁজে, যেন-বা তারা জানে না প্রশাসনের ভাঁড়েরা আর সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি, সেলিব্রিটি সমাজের ডিলডো-নাগরিক আর পাতিবুর্জোয়া নৈরাজ্য তাদের কোন নরকে অভিশপ্ত করে দিয়েছে…অরূপরতন কখনই বলেন না আগাম বিপদ, হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতে দেখি রাস্তা নেই, টানেলে পড়ে গেছি কারণ ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা ছিল…আগে-পরে গুলিয়ে যায় সময়ের…আমরা বুঝি, আমরা অনেক আগেই মারা গিয়েছি..জীবিতের ছদ্মবেশে মুখের মাস্ক তাই এ জীবনে খুলতে পারব না জেনেও বাঁচার কি ভীষণ বাসনা…
ঋণঃ তাপস ঘোষ, প্রচেতা ঘোষ