আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ‘ভবানী ভবন’। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মুখ্য দফতর। আগে এই বাড়িটার নাম ছিল অ্যান্ডারসন হাউস। ব্রিটিশ আমলে এই বাড়িটা ছিল সেই সময়কার পুলিশের হেডকোয়ার্টার। অ্যান্ডারসন হাউস থেকে নাম বদল করে হলো ‘ভবানী ভবন’ সেটা ১৯৬৯ সাল। তারও একটা ইতিহাস আছে। কেউ জানে, কেউ জানে না। এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে উজ্জ্বলা মজুমদার নামে এক বীরাঙ্গনার নাম। উজ্জ্বলা মজুমদারকে ক’জনে চেনেন? আজ তাঁর গল্প বলি।
১৯১৪ সালে ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের ঢাকা জেলার কুসুমহাটি নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন উজ্জ্বলা মজুমদার। বাবা সুরেশচন্দ্র মজুমদার বিপ্লবীদের সঙ্গে ওতপ্রতো ভাবে যুক্ত। বিপ্লবী কাজ কর্মেও তিনি সিদ্ধহস্ত। সুরেশবাবুর ওপর দায়িত্ব দেওয়া হলো বিপ্লবীদের জন্য কলকাতা থেকে ঢাকায় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে যেতে হবে। সেটা ১৯২৮ সাল। ১৪ বছরের মেয়ে উজ্জ্বলাকে সঙ্গে নিলেন সুরেশবাবু। কেউ যাতে সন্দেহ না করে সেই জন্য মেয়ে উজ্জ্বলার কোমরে গুঁজে দিলেন সেই অস্ত্র। দিব্যি চলগেলেন ঢাকায়। বাবা সুরেশচন্দ্রের শেখানো পাঠে উজ্জ্বলা সেদিন থেকেই বিপ্লবীদের পথে।
অ্যান্ডারসনের লাগামছাড়া অত্যাচার তখন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল গোটা অবিভক্ত বাংলাকে। দেশবাসীকে এই স্বৈরাতন্ত্র থেকে মুক্তির স্বাদ দিতেই গভর্নরকে হত্যার ছক কষেছিলেন ‘বেঙ্গল ভলেন্টিয়ার’ টিমের সদস্যরা। যে দলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন স্বয়ং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। অত্যাচারী গভর্ণরকে চরম শাস্তি দেওয়ার এই গুরুদায়িত্বটা বর্তায় দলের তরুণ ও সাহসী সদস্য ভবানী এবং রবির কাঁধেই। রাজশাহীতেই তৈরি হয় হামলার গোটা ব্লু প্রিন্ট। হত্যার ছক তৈরিই ছিল, এমন সময় খবর মেলে মে মাসে গ্রীষ্মকালীন অবকাশ কাটাতে দার্জিলিং যাবেন গভর্নর সাহেব। এর থেকে মোক্ষম সুযোগ আর নাও মিলতে পারে, তাই সময় নষ্ট না করে দ্রুত রাজশাহী থেকে দার্জিলিং রওনা দেয় দুই তরুণ বিপ্লবী। তাঁদের সাহায্য করতে কলকাতা থেকে দার্জিলিং রওনা হলেন দলের অপর সদস্য মনোরঞ্জন বন্দোপাধ্যায় ও উজ্জ্বলা মজুমদার।
১৯৩৪ সাল। একটি হারমোনিয়াম নিয়ে দার্জিলিং পৌঁছলন উজ্জ্বলা। হারমোনিয়ামে লুকনো দু’টি আগ্নেয়াস্ত্র। স্নো ভিউ হোটেলে উঠলেন মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় ও উজ্জ্বলা। জুবিলি স্যানিটোরিয়ামে আশ্রয় নিলেন ভবানী ভট্টাচার্য ও রবি বন্দ্যোপাধ্যায়। উদ্দেশ্য গভর্নর অ্যান্ডারসানকে হত্যা। দার্জিলিংয়ে ফ্লাওয়ার শো-তে আসছেন অ্যান্ডারসান। কিন্তু পরিকল্পনা সফল হল না। পাহাড়ের গোপন ডেরায় বেশ কিছুদিন গোপনে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকার পর অবশেষে এলো স্বৈরতন্ত্রের বদলা নেওয়ার সেই সুবর্ণ সুযোগ। ৮ মে, ১৯৩৪। লেবংয়ের মাঠে ঘোড়দৌড়। উপস্থিত থাকবে গভর্নর। এবার নিখুঁত পরিকল্পনা। দামী ইউরোপীয় পোশাকে ভবানী ভট্টাচার্য ও রবি বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে রিভলবার। জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন দু’জনে। নির্দেশ মত লেবং ছাড়লেন উজ্জ্বলা ও মনোরঞ্জন। দার্জিলং থেকে ট্রেনে উঠলেন দু’জনে।
ঘোড়াদৌড়ের পালা শেষ। এবার পুরস্কার বিতরণের পালা। লাট সাহেব উঠে দাঁড়ালেন আসন ছেড়ে। সঙ্গে সঙ্গে ভবানী ভট্টাচার্যও উঠে দাঁড়ালেন । দূরত্ব অনেকটা ছিল এবং তাঁর চারপাশে ছিল পুলিশ, গুপ্তচর, সাহেব আর মেমসাহেবের দল। এগোতে গেলেই তারা সন্দেহ করবে। সুতরাং তিনি লক্ষ্য স্থির করলেন ওইখান থেকেই। গর্জে উঠল ভবানীর রিভলভার কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হল। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল চিৎকার চেঁচামিচি। গভর্নরের দেহরক্ষী তখনই পরপর গুলিবর্ষণ করলো ভবানীকে লক্ষ্য করে। ঢলে পড়লেন উনি গুরুতর আহত হয়ে। সঙ্গে সঙ্গে রবির রিভলভার শুরু করল আগুন ঝরাতে। গুলিতে বিদ্ধ হয়ে পড়ে গেলেন গভর্নরের স্টেনো মিস থর্টন এবং এক শ্বেতাঙ্গ সার্জেন্ট। আচমকা রবির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল দেহরক্ষীর দল। ততক্ষণে ওর রিভলবারের গুলিও শেষ। ধরা পড়লো রবি এবং গুরুতর আহত ভবানী। অচৈতন্য ভবানীকে হাসপাতালে পাঠানো হল। হাসপাতালে জ্ঞান ফিরতে ভবানী বলে উঠলেন, ‘ইজ অ্যান্ডারসন স্টিল অ্যালাইভ?’
আর উজ্জ্বলা মজুমদার? সন্ধ্যার মুখে শিলিগুড়িতে পৌঁছল পুলিশ। ট্রেনে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালিয়েও উজ্জ্বলা ও মনোরঞ্জনকে ধরতে পারল না পুলিশ। লুকিয়ে কলকাতা পৌঁছলেন দু’জনে। ভবানীপুরে যুগান্তর দলের কর্মী শোভারানি দত্তের কলকাতার ১১৬ আশুতোষ মুখার্জি রোডে শোভারানি দত্তের বাড়ি। দার্জিলিংয়ের লাটসাহেবকে গুলি করার ষড়যন্ত্রে জড়িত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের এই দুঃসাহসিনী উজ্জ্বলাকে এবং মনোরঞ্জনকে গ্রেপ্তার করে অকথ্য অত্যাচার চালায়। উজ্জ্বলার সঙ্গে শোভারানিকে গ্রেফতার করল পুলিশ।
পরে অবশ্য শোভারানি দেবী ছাড়া পান। তবে স্পেশাল ট্রাইবুনালে উজ্জ্বলার ২০ বছরের জেল হল। মনোরঞ্জন, রবি ও ভবানীর ফাঁসি। হাইকোর্টের আপিলে উজ্জ্বলা মজুমদারের সাজা কমে হয় ১৪ বছরের। ফাঁসির বদলে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড মনোরঞ্জন ও রবির। ভবানী ভট্টাচার্যের ফাঁসির সাজা বহাল থাকে। সাজাপ্রাপ্তদের পাঠানো হল আন্দামানে, আর উজ্জ্বলা মজুমদারকে নিয়ে যাওয়া হল মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে। আদালতের নির্দেশের মাত্র ৯ মাসের মাথায়, ১৯৩৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী জেলে ভবানীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলার বীর সেনানীদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। উজ্জলা মজুমদার সে রকম একটি নাম। বঙ্গীয় রমণী শুধু স্বাধীনতার লড়াইতে নয়, এখন দেশ গড়ার কাজেও সমান দক্ষ। জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিক সময়ে এই স্মরণ – নিবন্ধটির মাধম্যে সেই বীরাঙ্গনার প্রতি আমাদের প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সুপাঠ্য এই রচনা আমাদের উজ্জীবিত করুক এই মন্ত্রে — ভারত আবার বিশ্বসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে।