করোনা ঠেকাতে প্রথমবার লকডাউন ঘোষণার সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন— এই চরম সময়ে যেন কারও চাকরি চলে না যায়। পরবর্তীতে লকডাউনের সময় বাড়ানোর সময়েও তিনি ফের সেই একই কথা বলেন। কেবল তাই নয়, দেশের প্রধানমন্ত্রী এও বলেন, চাকরিদাতাদের এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। কিন্তু বাস্তব ছবিটা কি দাঁড়ায়?
সেন্টার ফর দ্য মনিটারিং অফ ইন্ডিয়ান ইকনমি মোদির বক্তব্যের পরেই জানায়, গত এক মাসে প্রায় ১২ কোটি ভারতীয় চাকরি হারিয়েছেন। এ ভাবে চলতে থাকলে আরও বহু মানুষকে চাকরি খোয়াতে হবে। কারণ; মাত্র দুই সপ্তাহে দেশে চাকরি থেকে ছাঁটাই-এর হার ২৩.৪ শতাংশ। এটা ক্রমশ বাড়বে। অর্থনীতিবিদরা জানায়, কোনও দেশের বেকারত্বের হার যখন ২০ শতাংশের উপরে চলে যায়, তখন অর্থনৈতিক মন্দা স্পষ্ট হয়। অর্থাৎ দেশে অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হতে চলেছে। ছবিটা গত বছর সেপ্টেম্বর মাসের।
ঠিক এক বছর না পেরতেই যে হিসাব মিলছে তাতে দেখা যাচ্ছে কেবলমাত্র জুলাই মাসে কমপক্ষে ৩২ লক্ষ বেতনভোগী চাকরি হারিয়েছেন। অথচ গতমাস থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ খানিকটা হলে কমেছে। ধীরে ধীরে অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্র ছন্দে ফিরছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও জানা যাচ্ছে জুলাই মাসে দেশে চাকুরিজীবীর সংখ্যা ৭.৬৪ কোটি। জুনে যে সংখ্যাটা ছিল ৭.৯৭ কোটি। ব্যাপক হারে ছাঁটাই চলছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। মোট ছাঁটাইয়ের মধ্যে ২৬ লাখ হয়েছে শহরাঞ্চলে।
গত বছর এপ্রিল থেকে আগস্ট এই পাঁচ মাসে দেশের প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মাসিক বেতনভুক্ত চাকরিজীবী কাজ হারিয়েছিলেন। সেই সময় দেশে বেতনভুক্ত চাকরিজীবীর সংখ্যা ছিল ৮ কোটি ৬০ লাখ, পরের মাসে সেটা হয় ৬ কোটি ৫০ লাখ। তার মানে ২.১ কোটি কমে যায়। প্রশ্ন দেশের চাকরির বাজারে এই ধস শুধু করোনার কারণে?
করোনা একটা কারণ, কিন্তু শুধুমাত্র করোনার কারণেই দেশে এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি হয় নি। করোনা শুরুর বেশ কয়েক মাস আগে থেকেই দেশের অর্থনীতি ছিল বেহাল। করোনায় তা নাজেহাল হয়ে পড়ে। জিডিপির আকার চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংকুচিত ছিল। ফলে দেশের বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে একদিকে যেমন কর্ম সংকোচন শুরু হয় পাশাপাশি চলতে থাকে ছাঁটাই। আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে থাকে বেকার আর কাজ হারানো মানুষের সংখ্যা। কিন্তু এই অবস্থার মধ্যেও নরেন্দ্র মোদি মন্ত্রিসভার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী দাবি করেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাঁচ কোটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে শুধু ছোট ও মাঝারি শিল্পেই।
বেহাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে লকডাউনের জেরে অর্থনীতি যে চরম অবস্থায় পড়বে সে তো নতুন কথা নয়। দেশের সরকারেরও তা অজানা ছিল না। কিন্তু সরকার লকডাউন ঘোষণার সময় বিপুল পরিমাণ কর্মীর জীবিকার কথা ভাবেন নি। ভাবেন নি বলেই প্রধানমন্ত্রী, গডকড়ী মন্ত্রীমশায় এবং আরও অনেকেই ওই ধরণের কথা বলেন। করোনাকে শিখণ্ডী করে দেশের একটা বিপুল সংখ্যার মানুষকে কার্যত অনাহারের দিকে ঠেলে দিলেন। মুখে যে চাকরি রক্ষা এবং নতুন চাকরির কথা বললেন তা আসলে মিথ্যাচার।
করোনা-লকডাউন আর তার জন্যে অর্থনীতির খারাপ অবস্থা কি কেবলমাত্র এ দেশেই হয়েছে? চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, ক্যানাডা, ব্রাজিল এসব দেশে কি হয়নি? কিন্তু সেসব দেশের অর্থনীতির হাল এমন বেহাল হয়নি। শধু কি তাই করোনার জেরে অর্থনৈতিক পতনে ভারত প্রথম স্থান অধিকার করেছে। অনেকেই বলেন এ দেশের মতো মোদি-শাহ-নির্মলা সিতারামন ইত্যাদি যে ওই সব দেশে নেই। করোনার প্রকোপে সব থেকে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে আমেরিকায়। কিন্তু সেখানে কতটা অর্থনীতির পতন ঘটেছে? গত বছর এপ্রিল থেকে জুন-এই তিন মাসে আমেরিকার জাতীয় আয় সংকুচিত হয়েছে আগের বছরের তুলনায় ৯.২%। আর বার্ষিক হিসাব ৩২%। কিন্তু ওই বার্ষিক হিসেব যদি আমাদের দেশে লাগাই তাহলে অর্থনীতি সংকোচনের হারটা গিয়ে দাঁড়াবে ৬৭% তে। আর কোনো দেশই এত বড় অর্থনৈতিক সংকটের সম্মুখীন হয়নি। আমাদের চেয়ে ১০-১২ গুন বেশি মাথাপিছু মৃত্যু হার হওয়া সত্বেও ইউরোপ আমেরিকার অর্থনীতি এত গভীর সংকটে পড়লো না কেন?
ওই সমস্ত দেশের সরকার যাতে সাধারণ মানুষ লকডাউনে কাজ না হারায়, কাজ হারালেও যাতে রোজগারবিহীন না হয় তার জন্য টাকা জুগিয়েছে। বড় ব্যবসায়ী থেকে ছোট ছোট ব্যবসায়ী, দোকানদারদের সরকার টাকা দিয়েছে যাতে তাদের সংস্থা থেকে কোনও কর্মী ছাঁটাই না হয়। ওই সব দেশের সরকার ধনী বাদে সাধারণ মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে লক্ষাধিক টাকা দিয়েছে। সেখানে চাহিদায় ঘাটতি হয়নি। লকডাউন শিথিল হতেই মানুষ দোকান বাজার থেকে জিনিসপত্র কিনতে পেরেছে ইচ্ছে অনুযায়ী। আমাদের সরকার প্রদীপ জ্বালাতে বলেছেন, ঘন্টা বাজাতে বলেছেন। আর যে অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তার ৮৫% বড় ব্যবসায়ীদের জন্য, তবে গরিবগুর্বো অনেকের বিনামূল্যে ৫ কিলো চাল জুটেছে। এতে কি অর্থনীতি না খুঁড়িয়ে দৌড়বে? চাহিদা কোথায়? সে কারণে এখনো বহু দোকান বন্ধ। অধিকাংশ ছোট মাঝারি কারখানা একটা শিফটে উৎপাদন চালাচ্ছে। দেশের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি এমন জনবিরোধী নীতি জনসনের ব্রিটেন বা বলসনারোর ব্রাজিলও দেখাতে পারেনি।