দেশে জিডিপি বৃদ্ধির হার সামান্য বেশি অন্যদিকে শেয়ার সূচকও যথেষ্ট উচ্চতা ছুঁয়েছে। কিন্তু তাতে কি ১৪৩ কোটি মানুষের দেশের ১০ শতাংশের কিছু এসে যায়? হ্যাঁ, কর্পোরেট মুনাফা কিংবা কর্পোরেট মালিকদের সম্পদ বেড়েছে হু হু করে কিন্তু আমজনতার? কোনো কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি, বাড়েনি মানুষের আয়। তবু আরএসএস তথা বিজেপির ভাষ্য মোদীর হাতের ছোঁয়ায় দেশের অর্থনীতি তরতর করে বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ ছ্যাকা খাচ্ছেন নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের দাম ক্রমাগত বেড়ে চলায়। সাধারণ মানুষ জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয় সামাল দিতে অক্ষম কারণ, তাদের আয় বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত আয় কমেছে। সুদের হার কমে যাওয়ায় বিপুল সংখ্যক বয়স্ক ও অবসরপ্রাপ্ত মানুষের জীবন সঙ্কটে। এদিকে লোকসভা ভোটের আর বড় জোর ৩০০ দিন বাকি। ভোট বৈতরণী পার হতে গেলে হাতে থেকে যাচ্ছে সেই সাম্প্রদায়িক বিভেদ-বিভাজনের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক অস্ত্র। সেই ভরসায় মোদীরা যে অভিন্ন দেওয়ানিবিধিকে আঁকড়ে ধরবেন সেটাই স্বাভাবিক।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির সোজা মানে হল বহু ধর্ম, বহু আচার-বিচারের মানুষের জন্য একটি আইন — যা বিবাহ থেকে বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে সন্তানের অভিভাবকত্ব, সব ধরণের বিষয়ের আইনি সীমারেখা নির্ধারণ করবে। ব্রিটিশরা উনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ভারতের আইনতন্ত্র বানাতে গিয়ে খেয়াল করেছিল যে, বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার প্রশ্নে ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির নিজস্ব আইনকানুন রয়েছে যেগুলি অস্বীকার করা বিপদের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সংবিধান তৈরির সময়েও দেখা যায় ভারতের মত বিচিত্র এবং জটিল দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া শুধু ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলির উপর নয়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলি এমনকি মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতার উপর আঘাত করা হবে। তা নয়, একইসঙ্গে তা আদিবাসীদের রীতিনীতি ও আইনকানুনকেও আঘাত করবে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এখনও প্রায় ১৫টি পারিবারিক আইন চালু রয়েছে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর হলে বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর স্বাধিকার খর্ব হবে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে শিখদের একাংশেরও আপত্তি রয়েছে। তাই বিজেপি-আরএসএস উঠে পড়ে লেগেছে লোকসভা ভোটের আগেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করতে।
অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে মোদীজী যে পরিবারের উদাহরণ তুলে ধরেছেন তা স্রেফ বুজরুকি। সবাই জানেন, প্রত্যেক পরিবারের নিয়ম বা রীতি যেমন এক নয়, তেমনই সংসারের সব সদস্যের জন্যও নিয়ম একরকম নয়। কারন একজন শিশুকে যে ভাবে দেখা হয় সে ভাবে অন্যদের দেখা হয় না। আবার একজন প্রবীণকে যেভাবে দেখা হয়, ছোটদের চলাফেরায় যে বিধিনিষেধ থাকে তা বড়দের থাকে না। আর সেটা বাড়ি ফেরার সময় থেকে খাওয়া দাওয়া সব বিষয়েই। ছোটদের সন্ধের মধ্যে বাড়ি ফেরার বাধ্যতামূলক নিয়ম থাকলেও তা রোজগেরে সদস্যের ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।খাওয়াদাওয়ার ক্ষেত্রেও শিশুদের জন্য একরকম, বয়স্কদের জন্য আর এক রকম, আবার বাকিদের জন্য আর একরকম। ফলে এক দেশ এক আইন বোঝাতে প্রধানমন্ত্রী যে সংসারের যুক্তি দিয়েছেন তা ছেঁদো।
মোদীজী হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, আদিবাসী, বনবাসী, জনজাতি, পাহাড়বাসী সবাইকে একই পরিবারের সদস্য বানিয়ে অভিন্ন আইন আনতে চাইছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনি ও তাঁর দল মুসলিম এবং অন্য ধর্মের মানুষদের বিরুদ্ধে লাগামহীন বিদ্বেষ সৃষ্টির ইতিহাস রচনা করেছেন। তারা ইতিহাস থেকে মুসলিম যুগকে মুছে ফেলতে যেমন তৎপর, একই সঙ্গে তাদের খাদ্যের অধিকার, ধর্মাচরণের অধিকার, ভারতীয় হিসাবে গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে বসবাসের অধিকারও কেড়ে নিচ্ছেন। ছাড় পাচ্ছেন না খ্রিস্টানরাও। বিজেপি-আরএসএস হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মরীয়া হয়েও হিন্দুসমাজের মধ্যে যে হাজারটা বিভাজন-বৈষম্য রয়েছে সেগুলি দূর করতে একেবারে উৎসাহী নয়। আমেরিকায় গলার শির ফুলিয়ে বলেন, ভারতের শিরায় শিরায় গণতন্ত্রের প্রবাহ চলেছে। কোন গণতন্ত্র? জন্মের ভিত্তিতে যেখানে অধিকার নির্ধারিত হয়? তার মানে গণতন্ত্রে সবার সমান অধিকার নেই। নেই বলেই তথাকথিত নিচু জাতের বহু মানুষ সব হিন্দু মন্দিরে ঢোকার অনুমতি পান না। বহু রাজ্যের নিম্নবর্ণের মানুষ ব্রাহ্মণ এলাকার কুয়ো বা পুকুরে জলপান করতে পারেন না। আসলে লোকসভা নির্বাচনের আগে অভিন্ন দেওয়ানি আইন তৈরির দরকার অভিন্নতার নামে ভিন্নতাকে খুঁচিয়ে হিন্দু ভোটকে একজোট করা।