| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

উত্তরাধিকারহীন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি : শাকুর মজিদ

Reporter
শাকুর মজিদ / ১০৬৬ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

কলকাতায় এসেছি আর ঠাকুরবাড়ি দেখব না — তা তো হতে পারে না। কিন্তু জোড়াসাঁকোর এই ঠাকুরবাড়ি চেনে এমন ট্যাক্সিওয়ালা পাওয়া খুব কষ্ট। কলকাতার কোনো বাঙালিকে যেমন টাঙ্গা চালাতে দেখিনি, তেমনি বাংলায় কথাবলা ট্যাক্সি ড্রাইভারও পাই না। যাকেই বলি যে, রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোয় যাব, সে-ই মাথা চুলকায়। হিন্দির মতো একটা ভাষায় কথা বলে। অবশেষে এক ট্যাক্সিওয়ালা আমাদের ঠিকই এক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বলল, এখান থেকে একটু হেঁটে গেলেই রবীন্দ্রভারতী পাবেন। ওটাই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। কলকাতায় এই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির জন্মের প্রায় কাছাকাছি সময় থেকেই ব্রিটিশদের রাজধানী কলকাতার জন্ম।

পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যশোহর জেলার চেঙ্গুটিয়ার জমিদার দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর আত্মীয় জগন্নাথ কুশারীই এই জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বংশের প্রবীণতম পুরুষ। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে জগন্নাথেরই এক উত্তরপুরুষ পঞ্চানন এবং তার কাকা শুকদেব ভাগ্যান্বেষণে কলকাতা গ্রামের দক্ষিণে গোবিন্দপুর অঞ্চলে জমি কিনে বসতবাড়ি তৈরি করলেন।

গোবিন্দপুরে যে গ্রামে এসে বসত শুরু করেছিলেন, সেটি ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দুদের এলাকা। তারা পেশায় ছিল জেলে সম্প্রদায়ের। যশোহর থেকে আসা কুশারী ব্রাহ্মণকে পেয়ে এই জেলে সম্প্রদায় অত্যন্ত ভক্তি সহকারে তাদের ‘ঠাকুর মশাই’ বলে সম্বোধন করত। ইংরেজের জাহাজ থেকে মালপত্র খালাস করার কাজ পেয়েছিলেন এই ঠাকুর মশাই। বিল মেটানোর জন্য রসিদ কাটতে গিয়ে ইংরেজ এই ‘ঠাকুর’-এর নাম লিখলেন ঞধমড়ৎব। সেই থেকে কুশারী সম্প্রদায়ের উত্তরপুরুষেরা ‘ঠাকুর’ আর ‘টেগোর’ নামেই পরিচিত হতে শুরু করেন।

ইংরেজদের সঙ্গে তখন তাদের যে সম্পর্ক তাতে প্রতিবাদ করে নামের বানান সংশোধন করার মতো ইংরেজি শিক্ষা কিংবা স্পর্ধা তাদের ছিল না। এমনকি পরবর্তী সময়ে ইংরেজদের বন্ধু হওয়া এবং ইংরেজদের অধীন করে রাখা প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও নিজেকে ‘টেগোর’ থেকে ঠাকুরে রূপান্তর করার চেষ্টা আর করলেন না। ফলে বংশপরম্পরায় এই ভুল বানানে তাদের নামটুকু তারা লিখতে থাকেন। এমনকি, আমাদের রবীন্দ্রনাথকেও পরম্পরার অংশ হিসেবে তা-ই করতে হয়েছিল। আমরা যে জোড়াসাঁকোর কথা জানি, তা ৫ ও ৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুর লেনের জোড়াসাঁকো, যে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ঘটনা ঘটেছিল। তিনি জন্মেছেন এখানে, বিয়ে করেছেন এই বাড়িতেই আর মৃত্যুবরণ করেছেনও এখানে।

বাংলাদেশেও কলকাতার শত শত জমিদারের ঘরবাড়ি হয়েছে, দালানকোঠা হয়েছে। সেসবের দিকে আমাদের কোনো আকর্ষণ নেই। এই বাড়ি এই গ্রাম আমাদের কৌতূহলের বিষয় হয়েছে শুধু রবীন্দ্রনাথেরই কারণে। এই বাড়িটি কেমন আছে তাই দেখার জন্য আমরা এসে নামি।

৬ নং দ্বারকানাথ লেনের বিশাল চত্বরটিতে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে প্রায় ক্লান্ত হয়ে নিচতলার একটা বারান্দার সামনে বসে পড়ি। এক সময় ঠাকুরবাড়ির এই আঙিনায় দেবেন ঠাকুর ও তাঁর ভাই-এর পরিজন বসবাস করত। ঠাকুরবাড়িতে নেই ঠাকুরের কোনো উত্তরসূরি। কোথায় তাঁরা?

জোড়াসাঁকোর এই ঠাকুরবাড়িটির যিনি প্রবক্তা, যাঁর নামে জোড়াসাঁকোর এই সড়ক, তাঁর নাম দ্বারকানাথ ঠাকুর। তাঁর নামের আগে ‘প্রিন্স’ নামক একটি শব্দ যুক্ত আছে। যদিও তিনি কোনো রাজপুত্র ছিলেন না, তথাপি ব্রিটিশদের সঙ্গে ওঠাবসা, রাজপুত্রের মতো চালচলন দেখে ইংল্যান্ডে থাকার সময় তাঁকে স্বদেশিদের কেউ কেউ ‘প্রিন্স’ নামে ডাকত। কলকাতায় এসেও তার নামের আগে ‘প্রিন্স’ শব্দটা লেগে যায়, অনেকটা মানুষের মুখে মুখে। সেই থেকেই তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।

ইংরেজদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ম্যাকিনটশ অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বাণিজ্য, ইউনিয়ন ব্যাংকের অংশীদারিত্ব দ্বারকানাথকে এলিট বাঙালিরূপে রূপান্তর করে ইংরেজদের কাছে। ১৮৪০ সালের মধ্যে দ্বারকানাথ তাঁর মূলধনী কারবারের সাফল্যের শিখরে উপনীত হন। তিনি জাহাজ ব্যবসা, রফতানি-বাণিজ্য, বীমা, ব্যাংকিং, কয়লা খনি, নীল চাষ, শহরের গৃহায়ন প্রকল্প এবং জমিদারি তালুকে অর্থ বিনিয়োগ করেন। তাঁর ব্যবসার তদারকি করার জন্য তিনি কয়েকজন ইউরোপীয় ম্যানেজার নিযুক্ত করেন।

কিন্তু হঠাৎ গজিয়ে ওঠা এই উঠতি জমিদারি দ্বারকানাথ খুব বেশি জমজমাট রাখতে পারেননি। তাঁর যে ছবি দেখা যায়, তাতে যথেষ্ট উড়নচণ্ডি জমিদার বলেই মনে হয়। এ ধরনের ভোগবিলাসীদের সম্পদ বেশিদিন থাকে না। উনিশ শতকের চল্লিশের দশকের গোড়ার দিক থেকে তার অধঃপতন শুরু হয়ে যায়। ১৮৪৬ সালে লন্ডনে কিছুকাল রোগভোগের পর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। প্রিন্স দ্বারকানাথের মৃত্যুর পর জমিদারি আসে পুত্র দেবেন্দ্রনাথের কাছে।

রবীন্দ্রনাথের পিতা এবং পিতামহ এ দু’জনের পোট্র্রেট দেখলেই দু’জনের চারিত্রিক গুণাবলির একটা ধারণা পাওয়া যায়। নামের বিচারেও দু’জন বেশ আলাদা। পিতামহের নামের আগে ব্যবহার হয় ‘প্রিন্স’, আর পিতার নামের আগে ‘মহর্ষি’ (মহা+ঋষি)। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের জন্মও এই জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে, ১৮১৭ সালে। তিনি যতটা না তার জমিদারি নিয়ে ছিলেন, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিলেন ধর্মতত্ত্ব নিয়ে গবেষণায়। ঋষি মানসিকতার এই মানুষটি ব্রহ্ম ধর্ম প্রচার করতেন। দার্শনিকও ছিলেন তিনি। ১৮৩৮ সালে পিতামহের মৃত্যুকালে তাঁর মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে পার্থিব বিষয়ের প্রতি তিনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। তিনি দরিদ্র গ্রামবাসীর চৌকিদারি কর মওকুফের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন এবং ভারতের স্বায়ত্তশাসনের দাবি সংবলিত একটি পত্র ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রেরণ করেন। দেবেন্দ্রনাথ বিধবা বিবাহ প্রচলনে উৎসাহী ছিলেন, তবে বাল্য ও বহু বিবাহের বিরোধী ছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও জোড়াসাঁকোর এই বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন ১৯০৫ সালে। তাঁর মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব দিলেন রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথের ওপর।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম হয়েছিল সোমবার ২৫ বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ ভোর রাত ২টা ৩০ মিনিট থেকে ৩টার মধ্যে এই বাড়িতেই। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার ৭ আগস্ট ১৯৪১ ইংরেজি, ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে দুপুর ১২টার কিছু পরে কলকাতার এই বাড়িতেই তিনি ৮০ বছর ৩ মাস বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

রবীন্দ্রনাথের জন্ম-মৃত্যু দিবসে পশ্চিমবঙ্গের টেলিভিশনে হয় কি-না জানি না, তবে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে যে মহোৎসব হয়, তাতে আমি একটা বিষয়ের শূন্যতা খুব বেশি অনুভব করি। নাটক বা গান ছাড়া টকশোগুলোতে রবীন্দ্রনাথের কোনো উত্তরসূরি পাই না বা দেখি না; যেমনটি নজরুলের ক্ষেত্রে পাই। বিষয়টা কী? রবীন্দ্রনাথের পাঁচ সন্তানের কোনোই কি উত্তরাধিকারী নেই? মৃণালিনী দেবী ও রবীন্দ্রনাথের মোট ৫ সন্তান। তিন মেয়ে ও দুই ছেলে।

বড় মেয়ে মাধুরীলতার যখন জন্ম তখন মৃণালিনীর বয়স ১৩ বছর। মাধুরীলতার বয়স যখন ১৫ বছর তখন কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর তৃতীয় পুত্র শরৎচন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। মাধুরীলতা দেবী নিঃসন্তান ছিলেন এবং ৩১ বছর ৬ মাস বয়সে ১৬ মে ১৯১৮ সালে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় সন্তান এবং জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৮ সালের ২৭ নভেম্বর। ২১ বছর ২ মাস বয়সে বিধবা প্রতিমা দেবীকে বিয়ে করেন। তাঁরা নিঃসন্তান ছিলেন। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৪ মে ১৯৫১ থেকে ২২ আগস্ট ১৯৫৩ পর্যন্ত বিশ্বভারতী বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ১৩ জুন ১৯৬১ সালে ৭২ বছর ৬ মাস বয়সে দেরাদুনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তৃতীয় সন্তান রেনুকা দেবী জন্মগ্রহণ করেন ২৩ জানুয়ারি ১৮৯১ সালে। মাত্র ১০ বছর ৬ মাস বয়সে সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে রেনুকা দেবীর বিয়ে হয়। নিঃসন্তান রেনুকা দেবী মারা যান ১৯০৩ সালে।

মীরা দেবী রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে ছোট মেয়ে। ১৩ বছর ৪ মাস বয়সে ৬ জুন ১৯০৭ সালে নগেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের নিতীন্দ্রনাথ (নিতু) নামে একটি পুত্র সন্তান ও নন্দিতা (বুড়ি) নামে একটি কন্যা সন্তান ছিল। মীরা দেবীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় বিয়ের ১৩ বছরের মাথায় ১৯২০ সালে। এর পর তিনি শান্তিনিকেতনেই থাকতেন। ৭৫ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালে শান্তিনিকেতনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে ছোট ছেলে সমীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন ১২ ডিসেম্বর ১৮৯৬ সালে। মাত্র ১০ বছর ১১ মাস বয়সে সমীন্দ্রনাথ মারা যান।

রবীন্দ্রনাথের নাতি-নাতনি কেবল তিনজন। নিতীন্দ্রনাথ ঠাকুর গঙ্গোপাধ্যায় (নিতু), মীরা দেবীর একমাত্র পুত্র সন্তান ও রবীন্দ্রনাথের একমাত্র দৌহিত্র। তিনি ১৯১২ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার সময় যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ২০ বছর বয়সে ৭ আগস্ট ১৯৩২ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর সময় রবীন্দ্রনাথের বয়স ছিল ৭১। নিঃসন্তান নন্দিতা কৃপালানি (বুড়ি), মীরা দেবীর একমাত্র কন্যা ৫১ বছর বয়সে ১৯৬৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীর একমাত্র ও দত্তক কন্যা সন্তান নন্দিনী ঠাকুর। তার কোনো খোঁজ পাওয়া গেল না।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন না। তাঁর প্রথম সন্তান দ্বিজেন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল ১৮৪০ সালে। স্ত্রী সারদা সুন্দরী দেবীর বয়স তখন ১৪। ১৮৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্ম পর্যন্ত এই ২১ বছর সময়ে সারদা সুন্দরীর গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে ১৪টি সন্তান। গড়ে প্রতি দেড় বছরে একজন। সারদা সুন্দরী বেঁচে ছিলেন ১৮৭৫ সাল পর্যন্ত। কিন্তু জীবনের শেষ ১৪ বছরে তিনি আর কোনো সন্তান তাঁর গর্ভে ধারণ করেননি। এই মহীয়সী নারীর কোলজুড়ে যেসব সন্তানের জন্ম হয়েছিল, তাদের অনেকেই অনেক ক্ষেত্রে কলকাতার বাঙালিদের পথিকৃৎ ছিলেন। ১৪ সন্তানের মধ্যে তারকা পর্যায়ের অনেকেই ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, ধীরেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ — এরা কেউই কারও চেয়ে কম নন। শিল্প-সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁদের বিচরণ ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এমন আকাশছোঁয়া খ্যাতির অর্জন ঠাকুর পরিবারের বাদ বাকি তারকাদের উজ্জ্বলতা অনেকখানিই ম্লান করে দিয়েছে। যে যা-ই বলুক, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এখন আর দ্বারকানাথ-দেবেন্দ্র-দ্বিজেন্দ্রর নয়। এটা রবীন্দ্রনাথেরই।

রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভাই সত্যেন্দ্রনাথ-জোতিরিন্দ্রনাথ প্রমুখ শুধু নন; পাশাপাশি মহিলাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বোন স্বর্ণকুমারী; বৌদি জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী; সহধর্মিণী মৃণালিনী, বোনঝি সরলা, ভাইঝি ইন্দিরা-সহ আরও কেউ কেউ ছিলেন আলাদা গুণ ও বৈশিষ্ট্যে কোনো না কোনোভাবে গুণান্বিত।

রবীন্দ্রনাথের দিদি স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক লেখিকা। রবীন্দ্রনাথের অপর বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রথম ভারতীয় আইসিএস অফিসার এবং বাংলার স্ত্রী-স্বাধীনতার পথিকৃৎ। সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যখন বিয়ে হয়, জ্ঞানদানন্দিনীর বয়স তখন ৭। এই জ্ঞানদানন্দিনী পরবর্তী সময়ে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের নিয়ন্ত্রক হন।

এই মহীয়সী নারীর কাছে আজকের কলকাতার আধুনিক বাঙালি ললনাদের ঋণের শেষ নেই। বলা হয়ে থাকে, এই জ্ঞানদানন্দিনীই বাঙালি নারীদের আধুনিক কায়দায় শাড়ি পরাতে শিখিয়েছিলেন। ঠাকুরবাড়ির বৌদের শাড়ি পরার ধরনটি ফ্যাশন হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে, এবং তা শেখান জ্ঞানদানন্দিনী। স্বামীর কর্মস্থল বোম্বাই থাকাকালে নানারকম পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শাড়ি ও জামার নমুনার নানা রকম পরিবর্তন করেন। গুজরাটি মেয়েরা যেভাবে শাড়ি পরে, তার কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে ডান কাঁধের বদলে বাম কাঁধে আঁচল নিয়ে শাড়ি পরার প্রচলিত যে রূপটি আমরা আজকের দিনে বাঙালি হিন্দু-মুসলমান মেয়েদের দেখি, তা জ্ঞানদানন্দিনীরই আবিষ্কার। শাড়ির নিচে সায়া, সেমিজ, জামা ব্লাউজ পরার চলটি জ্ঞানদানন্দিনীই অবিভক্ত বাংলাদেশে প্রবর্তন করেছেন। জ্ঞানদানন্দিনী বিলেত থেকে ফিরে বিকেলে বেড়াতে বেরোনো এবং নিজের ছেলেমেয়েদের জন্মদিন পালনের মধ্য দিয়ে ইউরোপীয় প্রথাটি নিজের পরিবারে প্রথম প্রচলন করেন। সেখান থেকে অখণ্ড বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে জন্মদিন পালন করার আনুষ্ঠানিক প্রথাটি। জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহেই প্রথম রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালিত হয় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৪৯ নং পার্কস্ট্রিটের বাড়িতে। পত্রিকা প্রকাশ, প্রবন্ধ রচনা, রূপকথাকে নাট্যরূপ দেওয়া, অভিনয়_ এসব কাজে জ্ঞানদানন্দিনী পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ অনেক বেশি অনুরক্ত ছিলেন বড় ভাই সত্যেন্দ্রনাথের স্ত্রী এই জ্ঞানদানন্দিনীর প্রতি। এমন কথার কানাঘুষা শোনা যায় নানা রকম লেখায়। তাঁরা জোড়াসাঁকো ছেড়ে পার্কস্ট্রিটে বাড়ি করে চলে যান। পার্কস্ট্রিটের এ বাড়িতে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যখন জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে সময় কাটাতেন তখন জ্যোতির স্ত্রী কাদম্বরীর সময় কাটত প্রতিভাবান তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। ঠাকুরবাড়ির ওই সব বৌকে নিয়ে কত রকমের কথাই না চালু আছে!

কাদম্বরী দেবী জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্ত্রী. রবীন্দ্রনাথের নতুন বৌঠান। রবীন্দ্র-মানস গঠনে এই অসামান্য নারীর অবদান স্মরণীয়। অনেকে মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের কবি হয়ে ওঠার আন্তরিক চেষ্টার মূলে ছিলেন কাদম্বরী। তার প্রধান পরিচয় তিনি অসাধারণ সাহিত্যপ্রেমিক ছিলেন। জোড়াসাঁকোর বাড়িতে নিয়মিত যে নাটক মঞ্চায়ন হতো, তাতে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করে কাদম্বরী খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তিনি অভিনয়ের পাশাপাশি অনুশীলন করেছিলেন গান চর্চার। রবীন্দ্রনাথের বিয়ের কয়েক মাস পরেই কাদম্বরী আত্মহত্যা করেন। তাঁর আত্মহত্যার কারণ সঠিকভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, নিঃসন্তান স্ত্রীর সঙ্গহীন শূন্যতা ভরিয়ে তুলতে স্বামীর যতটা মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন ছিল, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। আরও জানা যায়, রঙ্গমঞ্চের কোনো বিখ্যাত অভিনেত্রীর অন্তরঙ্গ চিঠিপত্র কাদম্বরীর হাতে এলে অভিমানী কাদম্বরী ব্যথিত হন। অপরদিকে একান্নবর্তী বৃহৎ সংসারে বন্ধ্যা নারী ছিলেন উপেক্ষা ও করুণার পাত্রী। সব মিলিয়ে মনে করা হয়, কাদম্বরী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন।

কাদম্বরীর আত্মহত্যা নিয়ে অনেকেই অতিরঞ্জন করে উপন্যাস লিখেছেন। সেগুলো যথেষ্ট বাজারকাটতি হয়েছে। তবে এটাও আমার শোনা কথা, কাদম্বরী মৃত্যুর আগে সত্যি সত্যি একটা সুইসাইড নোট লিখেছিলেন। মৃত্যুর পরপরই মহর্ষির নির্দেশে তার সব আলামত নষ্ট করে দেওয়া হয়। আসল নোটটা হয়তো দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর পড়েছিলেন। তিনিই কেবল বলতে পারবেন, নকল সুইসাইড নোট এখন কতটা রঞ্জিত।

রবীন্দ্রনাথের ভাগিনী সরলা দেবী বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন ১৭ বছর বয়সে। মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সরলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ্মাবতী ‘স্বর্ণপদক’ লাভ করেন।

সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা ইন্দিরা দেবী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে পদ্মাবতী ‘স্বর্ণপদক’ পান। ১৯৫৬ সালে ইন্দিরা দেবী নিযুক্ত হন বিশ্বভারতীর অস্থায়ী উপাচার্য। বাংলা সাহিত্যে বুদ্ধিদীপ্ত লেখক প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ইন্দিরা দেবী বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ২৬ বছর বয়সে। তারা ছিলেন নিঃসন্তান।

দেবেন্দ্রনাথের ভাই গুণেন্দ্রনাথের পুত্র-কন্যারা হলেন — গগনেন্দ্রনাথ, সমরেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, বিনয়িনী দেবী ও সুনয়নী দেবী। তাঁরা জোড়াসাঁকোর ভদ্রাসনের ‘বৈঠকখানা বাড়ি’তে বসবাস করতেন।

১৮৬৫ সালে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর পারিবারিক থিয়েটার হিসেবে জোড়াসাঁকো নাট্যশালায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী নাটকটি মঞ্চস্থ করেন। এ নাটকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম নাট্যাভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথমদিকে পুরুষেরা মহিলা চরিত্রে অভিনয় করলে পরবর্তীকালে ঠাকুরবাড়ির মহিলারা মঞ্চাভিনয়ে এগিয়ে আসেন।

গত শতকের ষাটের দশকের প্রথমদিক পর্যন্ত জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে ঠাকুর পরিবারের অবস্থান ছিল। জীর্ণ সেই বাড়িতে পরিবারের কেউ কেউ বাস করতেন। আর বাকি অংশে ভাড়া ছিল নানা দোকান, দামঘর ইত্যাদি। ১৯৪৭-এর পর রাজ্য সরকার বাড়িটি অধিগ্রহণ করে। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এবং একটি প্রদর্শনশালা। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এখন উত্তর-কলকাতার একটা সাধারণ পুরনো জমিদার বাড়িই নয়, কলকাতার নবজাগরণের এক প্রতীক। কলকাতার সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে তার তেমন বিবর্তন হয়নি। বাড়ির চত্বর এক সময় ছিল দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিজনে ঘেরা। একে একে সবাই চলে গেছেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এখন শুধুই রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির উত্তরাধিকার নিয়ে দাঁড়িয়ে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev