২০২২ সালের বাজেট পেশ হতে চলেছে। ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। অনেকেই ভাবছেন, বাজেটে যা যা থাকা উচিত, তা হয়তো থাকবে না। কেন এমন ভাবনা? তাঁরা বলছেন, সামনেই পাঁচ রাজ্যে ভোট। পাঁচ রাজ্যের মধ্যে রয়েছে এ দেশের সবথেকে বড় রাজ্য উত্তর প্রদেশ। এই রাজ্যের সরকার এখন বিজেপির দখলে। বিজেপি আবার উত্তর প্রদেশে ভালো ভাবে জিততে না পারলে বছর দুয়েক পরে লোকসভা ভোট কঠিন হয়ে যাবে হিন্দুত্ববাদী দলটির কাছে। তাই জিততে মরিয়া বিজেপি বাজেটে এই পাঁচ রাজ্যের ভোটারদের খুশি করার ব্যবস্থা করবে, আশঙ্কাটা এমনই। প্রশ্ন হলো, বরাবরই কি বাজেট পয়লা ফেব্রুয়ারিতে পেশ করা হতো?

স্বাধীন ভারতে বাজেট
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হলেও সে সময়ে না ছিল কোনো স্বাধীন সংবিধান, না ছিল লোকসভা। সে বছরের ২৬ নভেম্বর স্বাধীন ভারতের প্রথম বাজেট পেশ করেছিলেন আর কে সন্মুখম চেট্টি। ১৯৫২ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে লোকসভা গঠিত হলে ব্রিটিশ ভারতের প্রথা মতোই ফেব্রুয়ারির শেষ কাজের দিন বিকেল পাঁচটায় বাজেট পেশ করা হতো। বিশেষ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী বাজেট ব্যতিরেকে এই প্রথা অনুসরণ করা হয়েছে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত।
১৯৯৯ সালে অটল বিহারী বাজপেয়ি-র নেতৃত্বে কেন্দ্রে এনডিএ সরকারের সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী যশবন্ত সিন্হা বিকেল পাঁচটায় বাজেট পেশের সিদ্ধান্ত বদলে দেন। ওই বছর থেকেই বাজেট পেশ হয় সকাল ১১ টায়। ১৯৯৯ সালে বাজেট পেশ করা হয়েছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি।

অরুণ জেইটলি মশাইয়ের নয়া কৌশল
২০১৪ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে বিজেপি তথা তাদের জোট এনডিএ। বছর দুই পরেই ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নোট-বাতিলের ঘোষণায় ভারত জুড়ে দারুণ আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। সেই ঘোষণার অব্যবহিত পরেই, ২০১৭ সালের প্রথম দিকে ছিল পাঁচ রাজ্যের ভোট। পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে ছিল উত্তরপ্রদেশও।
উত্তর প্রদেশে ২০১৭ সালে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল সাত দফায়। প্রথম দফার ভোট ছিল ১১ ফেব্রুয়ারি, সপ্তম দফা ভোট গ্রহণ হয়েছিল ৮ মার্চ। বিজেপি জয়ী হয়েছিল। ২০১৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাব ও গোয়া বিধানসভার ভোট হয়। ৪ ও ৮ মার্চ দু’দফায় মণিপুরে বিধানসভার ভোটগ্রহণ হয়েছিল। ২০১৭ সালে উত্তরাখণ্ডে ভোট গ্রহণ হয়েছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি, এক দফায়।

বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তথা প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বিবেচনা করে দেখলেন, বাজেট যদি আগের প্রথা মতো ফেব্রুয়ারির শেষ কাজের দিনে পেশ করা হয়, তার কোনো ছাপ ওই রাজ্য বিধানসভাগুলির ভোটে পড়বে না। অথচ রাজ্যগুলি জেতা খুব দরকার, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ। এই কারণেই দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে ফেলা হয়। ২০১৬ সালের শেষের দিকে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেইটলি ঘোষণা করে দেন, বাজেট পেশ করার দিনক্ষণ এগিয়ে আনা হবে, ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনেই তা পেশ করা হবে। আরও একটি প্রথা ভেঙে যায় ওই সঙ্গেই। এতদিন আলাদা করে রেল বাজেট পেশ করা হতো। তার ক’দিন পরে পেশ হতো সাধারণ বাজেট। ২০১৭ সাল থেকে রেল বাজেট তুলে দেওয়া হয়। আর পাঁচটা মন্ত্রকের মতোই রেল মন্ত্রকের বাজেটও সাধারণ বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কেবলমাত্র কয়েকটি রাজ্য বিধানসভা ভোটে সুবিধা পাবার জন্য বাজেটের দিন পরিবর্তনে ভালো কিছু হয়নি। বরং অনেকেই মনে করেন, ভোটমুখী রাজ্যগুলোর ভোটারদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বাজেটের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

এবার ডিজিটাল
শেষ করি বহি-খাতা-ট্যাবলেট দিয়ে। স্বাধীনতার পর থেকেই অর্থমন্ত্রীরা চামড়া বা লেদারের স্যুটকেসে বাজেটের কাগজপত্র নিয়ে লোকসভায় আসতেন। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই প্রথা চলে আসছে। বাজেট পেশের দিন দশেক আগে থেকে বাজেট বই ছাপা হয়, সেই ক’টা দিন ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মচারীরা কেউ অফিস থেকে বেরোতে পারেন না। এই ছাপার কাজ শুরুর সময় নর্থ ব্লকে হালুয়া বানানো হয়, সে হালুয়া অর্থমন্ত্রী নিজে কর্মচারীদের হাতে তুলে দেন। অরুণ জেইটলি, পীযূষ গয়াল পর্যন্ত সবাই স্যুটকেসেই বাজেটের কাগজপত্র আনতেন। নির্মলা অর্থমন্ত্রী হয়েই নতুন কিছু করতে উঠেপড়ে লাগেন। ২০১৯ সালে তিনি আমদানি করেন বহি-খাতা তত্ত্ব। স্যুটকেসের বদলে লালা শালুর মতো কাপড়ে মোড়া অবস্থায় সে বছর এসেছিল বাজেট। ২০২০ সালে আবার চমক, এবার কেবলই একটি ডিজিটাল ট্যাবলেট, তাতেই গোটা বাজেট ভরা। আর এবারে? শোনা যাচ্ছে, এবারে না-কি তেমন ছাপাছাপিই হয়নি, সবই না-কি ডিজিটাল। তবে ডিজিটাল বাজেট যেন রাজ্যে রাজ্যে ভোটের তাগিদে হ্যাক না হয়ে যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে বইকি!