সমগ্র বাংলা জুড়ে বিভিন্ন কাপড়ের আড়ং-এ এক সময় সুতা, রেশম, লিনেন বা আরও অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে কাপড় তৈরি হত। আর বাংলার এই বস্ত্র বয়নের একটা উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্পেশালাইজেশন বা বিশেষজ্ঞতা। প্রত্যেকটা আড়ং-এর কাপড়ের বয়নে, তন্তুর ধরনে, তাঁতির কারিগরি দক্ষতায় এই স্পেশালাইজেশন স্পষ্ট ভাবে দেখা যেত। আর এ কারণেই বিভিন্ন আড়ং-এর কাপড়গুলি বিভিন্ন নামে পরিচিত হত। এই নামকরণের ক্ষেত্রে কাপড়ের ধরন যেমন প্রাধান্য পেত তেমনই প্রাধান্য পেত স্থানের নাম। অর্থাৎ শাড়ির বিশেষত্ব বোঝাতে স্থানের নাম দিয়ে সেগুলিকে চিহ্নিত করা হত। একই ধরনের কাপড় বিভিন্ন স্থানে তৈরি হলে তাকে আলাদা নাম দিয়েই চিহ্নিতকরণ করতে হত। স্থান ভেদে কাপড়ের দামেরও তারতম্য হত এই বিশেষত্বের কারণেই।
সেই কোন আদি যুগ থেকেই এই ধারা আমাদের বাংলার তাঁতশিল্পে চলে আসছে। এ রকম ভাবেই ক্রমে ক্রমে শাড়ি-ধুতির চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে স্থানের নাম ব্যবহৃত হতে থাকল। ক্রমে ক্রমে বাংলার বুকে তৈরি হল ফরাসডাঙ্গা, শান্তিপুরী, ঢাকাই, ধনিয়াখালি, বেগমপুরী, পাবনাপাড়, বালুচরি, টাঙ্গাইল- তাঁতবস্ত্রের বিশেষ বিশেষ ঘরানা। এই ঘরানা তৈরি হয়েছিল বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের তাঁতিদের নিজস্ব কারিগরি দক্ষতায়, পারম্পরিক বয়ন কৌশলের জাদুতে।

কিন্তু আজকাল সব যেন তালেগোলে হরিবোল! বিখ্যাত বিখ্যাত বস্ত্র বয়নের কৌশল সব হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে! বাংলার বস্ত্রকূল হারিয়ে ফেলছে তার নিজস্ব পরিচিতি! আজ আর শান্তিপুরী, টাঙ্গাইল, ধনিয়াখালি আলাদা করে চেনা যায় না!
টাঙ্গাইল শাড়ির বৈশিষ্ট্য ছিল সুতা মাড়ি, পাড়ি ও তাঁত পালিশের নিজস্বতা। এই বৈশিষ্ট্যগুলিই তাকে স্বতন্ত্রতা দান করেছিল বাংলার বস্ত্র শিল্পের জগতে। এই কাজে শুধু মাত্র তাঁতি নয়, তাঁতিবউ-ও অর্ধেক কৃতিত্বের অধিকারী। দুইজনেরই হাতের জাদুতে প্রাণ পেত টাঙ্গাইল শাড়ি।

টাঙ্গাইলের তাঁতে কাপড় পালিশ করাকে বলা হয় ‘খিলজল দেওয়া’। প্রায় দেড় থেকে পৌনে দু’হাত মত কাপড়কে ‘এক খিল’ বলা হয়। এক খিল কাপড় বোনার পরে তাঁতি খিল জল দিয়ে থাকেন। প্রথমে শুধু জল দিয়ে কাপড়ের বোনা অংশটুকু ভিজিয়ে নেওয়া হয়। তারপর কোল নরোজকে ঢিলা করে কাপড়টাকে নিচে ঝুলিয়ে দিয়ে দুই হাত দিয়ে কচলানো হয়। এই কচলানোতেই লুকিয়ে আছে টাঙ্গাইল শাড়ির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বা স্বতন্ত্রতা। এর ফলে সানার মধ্যে সুতার যে জোড় থাকে সেটা ভেঙে যায়। এর পর কাপড়টিকে আবার টানটান করে নিয়ে একটি কাঠির সাহায্যে জল ঝেড়ে ফেলা হয়। এই কাঠিটাকে বলা হয় ‘ছাটবাড়ি’। এর পর খই ও চুন মিশ্রিত মন্ড যাকে বলা হয় ‘জরা’, তার সাহায্যে ভালো করে ঘষে ঘষে শাড়ির উপরে মাড় লাগানো হয়। এবার দুই হাতের সাহায্যে সেই মাড়কে কাপড়ে ভালো করে মসৃণ করে মিশিয়ে দেওয়া হয়। মেশানো হয়ে গেলে তাঁতি এ বার কোলনরোজে কাপড়টিকে গুটিয়ে নেন। গুটানোর সময় এক জোড়া পাটকাঠির শলাকা শাড়ির মধ্যে ভরে দেওয়া হয় যাতে পাড়ের সঙ্গে জমিনের দৈর্ঘ্যের অনুপাত ঠিক থাকে। এর পর শাড়িটির বোনা অংশের প্রান্ত ভাগ কম-বেশি হয়ে যায়। হাতের সাহায্যে ডলে ডলে এবং সুচের সাহায্যে সুতাকে ছিঁড়ে এই প্রান্ত ভাগকে সমান করা হয় যাতে আবার কাপড় বোনা শুরু করা যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে ‘ছ্যাও আটকানো’। এর পর টানা নরোজের দিকে কিছু কাজকর্ম সারার পরে আবার তাঁতি কাপড় বুনতে শুরু করেন। একটা বারো হাত কাপড়ে মোটামুটি সাত থেকে আট বার খিলজল দিতে হয়। প্রতিবারে সময় লাগে ২৫ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট।

এই জল দেওয়ার প্রক্রিয়া আজ টাঙ্গাইল শাড়িতে খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর। হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন তাঁতিই এখনও খিলজল দিয়ে কাপড় বোনেন। পরিশ্রম অনুযায়ী মজুরি না পাওয়ার কারণে এই তাঁতিরাও এখন এর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন, আসলে বলতে হয় তাঁতিরা বাধ্য হচ্ছেন। বাজারের চাহিদার নামান্তরে আস্তে আস্তে হারিয়ে যাচ্ছে টাঙ্গাইল শাড়ির স্বতন্ত্রতা। যে ক’জন এখনও বুনছেন, আশঙ্কা ভবিষ্যতে তারাও আর এ কাজ করবেন না! ফলে বলাই যায়, টাঙ্গাইল শাড়ির খিলজল দেওয়ার প্রক্রিয়া বিলুপ্তির পথে..!!
সৌজন্যে : টানাপোড়েন তন্তুবায় মুখপত্র