| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

আরামবাগের প্রাচীন পারিবারিক দুর্গা পুজোর অজানা ইতিহাস, কিংবদন্তি গল্পগাথা : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়

Reporter
মোহন গঙ্গোপাধ্যায় / ১৩৪৮ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর, ২০২২

আরামবাগে একসময় দুর্গা পুজো বলতে পারিবারিক পুজোগুলিকেই বোঝাত। একাধিক গ্রামে ঘুরলে এক বা দুটি মা দুর্গার দেখা মিলত। তাও জমিদার বা বনেদি পরিবারে। এই পারিবারিক প্রাচীন পুজোগুলির ঠাকুরদালানে বসত একচালার মাটির প্রতিমা। সেখানে চিরাচরিত প্রথা মেনে নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করা হত দেবী দশভূজার। আর তা দেখার জন‍্য জড়ো হতেন পরিবারের আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করে গ্রামের লোকজন। সময় বদলেছে। বারোয়ারি দুর্গা পুজোগুলির চোখধাঁধানো চাকচিক‍্যের কাছে এখন অনেকটাই ফিকে হয়ে গিয়েছে ঘরোয়া পুজোর রঙ। তবু এই পারিবারিক পুজোগুলি যে একেবারেই শেষ হয়ে গিয়েছে বলা যায় না। আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট ও পুরশুড়ায় এমন অনেক বনেদি পরিবার এখনো আছে, যাঁরা পুরনো ঐতিহ্য ও আচার-প্রথা মেনেই বছরের পর বছর নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো করে আসছেন। এই প্রাচীন পারিবারিক পুজোগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নানান অজানা ইতিহাস, রয়েছে বহু কিংবদন্তি গল্পগাথা। কোথাও কামানের গর্জন, আবার জলঘরি ধরে দেবীর আবাহন, এও লক্ষ্যনীয় মেয়েকে দেবীরূপে পূজা, এছাড়াও দেখা যায় দেবীর ভোগে চ‍্যাং মাছের ঝোল। যা বংশপরম্পরায় বয়ে নিয়ে চলেছেন এক প্রজন্ম থেকে অন‍্য প্রজন্ম। এসবের আকর্ষণ থেকে বঞ্চিত হতে চান না অসংখ‍্য মানুষ।

পারিবারিক ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে মিত্র বাড়িতে। ৫০০ বছর অতিক্রান্ত। নিয়ম-নিষ্ঠা, আচার-প্রথা সব কিছু মেনে দুর্গাপুজা হচ্ছে এবারও। আনন্দ-উৎসাহে ভাটা পড়েনি। বহুবার বন্যা-দুর্যোগ হয়েছে তবুও কালের নিয়মে পুজো করতে ভোলেনি মিত্ররা। এই বাড়ির পুজোর দিকে তাকিয়ে আশেপাশের গ্রামের আরও পাঁচ-ছ’টা পুজো হয় এদেরই নিয়ম-নীতি মেনে। হুগলির খানাকুলের ছোট্ট গ্রাম সেনহাট। প্রতিষ্ঠাতা নন্দকিশোর মিত্র। হুসেন শাহের আমল। বর্ধমানের জমিদার পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, জমিদারিত্ব পাওয়া, শুরু দুর্গা পূজা। সব কিছুই নন্দকিশোর মিত্রের আমলে। সিংহভাগ জমি না থাকলেও, রুচি, ব্যবহার, সংস্কৃতি পাল্টায়নি এখনও। বাস্তু দেবতা রঘুনাথ জীউ। এছাড়া আছে শিব, কালীর মন্দিরও। প্রায় সব দেবতাই বিরাজ করছেন মিত্র বাড়িতে, বারো মাসে তেরো পার্বণ। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠান। বাইরে থাকলেও পুজোর কটা দিন বাড়িতে আসতে ভোলেন না মিত্রদের অনেকেই। এখনকার পুজোকে সুষ্ঠুভাবে চালাতে তৈরি হয়েছে মিত্র পুজো কমিটি। সভাপতি বিজয় মিত্র, রয়েছেন রামগোপাল সরকার, সম্পাদক – রামমোহন মিত্র, সহ সম্পাদক সমীর কুমার মিত্র। সমীরবাবুই দেখভাল করেন। প্রাচীন পুজোর সঙ্গে এখনকার পুজোর প্রার্থক্য বলতে গিয়ে বাড়ির বয়স্কা বীনাপাণি মিত্র বললেন, সামান্য পরিবর্তন হলেও পুজো আজও সুষ্ঠুভাবে অব্যাহত। ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসছে। প্রথমে মোষ বলি হত। তা পরে বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে ছাগবলি শুরু হয়। সেটা আজও চলে আসছে। তাছাড়া পুজোর মূল আকর্ষণ হল ‘সন্ধিপূজা’। আচার-প্রথার সামান্যতম পরিবর্তন হবে না। এখনও জলঘড়ির সময় ধরে পুজো হয়। প্রাচীনকালের সেই তাঁবু এখনও আছে। তাঁবুর তলায় সূচের মতো ছিদ্র থাকে। ওপরে জলে রেখে দেওয়া হয়। একঘণ্টা পর সেটি ডুবে যায়। এইভাবে সময় ধরে দুর্গার আরাধনা করেন বিশিষ্ট ব্রাহ্মণরা।

শ্রদ্ধা ও ভক্তির একটি শুভক্ষণ হল সন্ধিপুজো। এই সময় মিত্র বাড়িতে আলাদা একটি পরিবেশ তৈরি হয়। তাই কেউ সন্ধিপুজোটা দেখতে ভুল করেন না। নিয়মনীতি মেনে পাঁঠা বলিও হয়। কামানের গর্জন আজ আর শোনা যায় না, তবে কান ফাটানো বাজির শব্দ আশপাশের কয়েকটা গ্রামকে জাগিয়ে দেয়। এই শব্দ শুনে অন্য পুজোগুলোও শুরু হয়। পাঁঠাবলির পাশাপাশি আখ, বাতাবীলেবুও বলি দেওয়া হয়। উল্লেখ্য পাঁঠাবলির পর পাঁঠার মাথাটা ভোরবেলায় পাশের পুকুরে একবুক জলে নেমে পুঁতে দেওয়া হয়।এ দৃশ্য দেখতে নেই। তাহলে নাকি বাড়ির ক্ষতি বা অমঙ্গল হয়। এই প্রথা আজও চলে আসছে। তাছাড়া দশমীর দিন সিঁদুর খেলাকে ঘিরে সাড়া পড়ে যায় মহিলাদের মধ্যে। নতুন কাপড় পরে শুরু হয় খেলা। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন কেউ ভোলে না এই খেলায় আসতে। এছাড়া থাকে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ঠাকুরের বেড়াতে বেরনো। প্রতিবছর রাজহাটি বাজার পর্যন্ত ঠাকুরের বেড়াতে যাওয়া চাই। এটা প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এসময় উপচে পড়ে ভিড়৷ ঠাকুরকে নিয়ে আনন্দ, উন্মাদনা, নৃত্য একাকার হয়ে যায়। সব জাতের মানুষের ঐক্যের মেলবন্ধন ঘটে এসময়। দেখলে মনে হবে স্বর্গ থেকে ধরায় নেমে এসেছেন মা। মা তাঁর ছেলেমেয়েদের নিয়ে আনন্দে আত্মহারা। দশমীর দিনে ভক্তরা মা-কে কিছুতেই ছাড়তে চায় না। এরকমই দৃশ্য সেনহাটের মাটিতে প্রতি বছর ফুটে ওঠে। ফি-বছর বন্যা। তবুও খানাকুলের এই বনেদি বাড়ির পুজোয় ম্লান হয়ে যায়নি উৎসব ও ঐতিহ্য।

বাজারের জিনিসপত্র দাম বাড়তে থাকায় পুজোর বাজেটও আস্তে আস্তে বেড়ে হয়েছে লক্ষাধিক টাকা। দেবোত্তর সম্পত্তি ৭২ বিঘা। সম্পত্তির আয়ের সমস্তই খরচ হয় মিত্র বাড়ির দেবদেবীর পুজোয়। যেটুকু কম পড়ে বা যে বছর আয় কম হয় মিত্রদের প্রত্যেকে তা সিদ্ধ হস্তে শ্রীঠাকুরের সেবায় দান করেন। একথা জানালেন দেবু মিত্র। পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক সমীর বাবু জানিয়েছেন — আজ পুজোয় অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। যেমন আগে মোষবলি হত, এখন হয় না। আগে সানাই বাজত, আজ তা বন্ধ। আগে কেবলমাত্র হ্যাজাক জ্বেলেই পুজো হত। যদিও এখনও হ্যাজাক আছে। তবে বেশিরভাগ বৈদ্যুতিন আলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। বলা যায় মিত্রবাড়ি ঐতিহ্যবাহী পুজোতে প্রতিবেশী তো বটেই দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসেন আশেপাশের গ্রামের মানুষ। এখনও মিষ্টি, নারকোলের সন্দেশ এবং অন্নভোগ খাওয়ানোর ব্যবস্থা হয়ে থাকে।

উল্লেখ্য, অশুভ শক্তির বিনাশ। শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠা। এই সত্যকে উপলব্ধি করে আজও পুজো হচ্ছে আরামবাগের বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়িতে। প্রায় ১৫০ বছর আগে যার স্রষ্টা রবীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। সেদিন ছোট্ট কুঁড়েঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বেলে মা দুর্গাকে আবাহন করেছিলেন তিনি। আজকের রূপ তার অনেকটাই পালটে গিয়েছে। সেদিনের মাটির ঘরের দুর্গা আজ থাকবে মার্বেলের ঘরে। পুজোকে ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার অন্ত নেই। পুরানো ঐতিহ্যকে অটুটু রাখতে এবারেও কোমর বেঁধে নেমেছে বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। আরামবাগ শহরে ২২-২৩টা বারোয়ারি পুজো হলেও একমাত্র পারিবারিক পুজো হয় বন্দ্যোপাধ্যায়দের বাড়িতে। তাই এই পুজোতে প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজন সকলেই ভিড় করেন। অতীতে ফিরে গেলে পুজোর অনেক কাহিনিই জানা যাবে। কথিত, রবীন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়কে স্বপ্নে দুর্গা আদেশ দেন পুজো করতে। মাটির ঘরে কেমন করে মা-কে আনবেন! আর্থিক অবস্থাও মোটে ভালো নয়। দুর্গার আদেশ, কেবলমাত্র চ্যাঙ মাছের ঝোল দিয়ে ভোগ দিলেই চলবে। শুরু এখান থেকেই। রবীন্দ্রবাবু চ্যাঙ মাছের ঝোল এবং পাঁঠাবলি দিয়ে ঠাকুরের কাছে ভোগ নিবেদন করেন। যা আজও চলে আসছে।

প্রসঙ্গত, কাশফুল আর ঝোপজঙ্গল। এরই মাঝে বাড়ি ছিল বন্দ্যোপাধ্যায়দের। প্রতিবার পুজোয় আসতেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন, বি. কে রায়, ননী দে প্রমুখ। সকলে একসঙ্গে পুজোর কটাদিন সদা কাজের মধ্যে থেকেও আনন্দ উপভোগ করতেন। আজ এসব ইতিহাস। কালের প্রেক্ষাপটে ভুলে যাননি অতীতের সেই ঘটনা ও দিনগুলির কথা। তাই পরিবারের সদস্য বিশ্বনাথবাবু সাবলীলভাবে অনেক কথাই বলে ফেললেন। এখনও পাঁঠাবলিপ্রথা চলে আসছে। এবারের বাজেট এক লক্ষ টাকারও বেশি।

প্রসঙ্গত, ইতিহাসের স্মৃতি। কেবলই রোমন্থন। সত্য-মিথ্যা যাচাই পরের কথা। কোনও প্রমাণ নেই। কিন্ত বংশপরম্পরায় শুনে আসা ইতিহাসের কথাই আজও সত্য ধরে বসে আছেন শিশুরঞ্জন রায়। আরামবাগ লাগোয়া গড়বাড়ির রায় বাড়ির পুজো মানেই নিয়ম-নিষ্ঠা-ইতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো। কয়েক শো বছরে ঘটে গিয়েছে অনেক সুখদুঃখের ঘটনা। রায় পরিবারের সেই জৌলুসে অনেকবার উত্থান পতন ঘটেছে কিন্তু একবারও বন্ধ হয়নি পুজো। ইতিহাসের দিকে মুখ ফেরালে দেখা যাবে সুদীর্ঘ কাহিনি। সেই কাহিনি রোমাঞ্চ, মধুর আবার ভক্তি ভাবাবেগের। সব একাকার হয়ে গিয়েছে আজকের দিনে। রাজপুতানার বাসিন্দা ছিলেন রণজিৎ সিংহ। ক্ষত্রিয়। যোদ্ধা মনোভাবাপন্ন হলেও রণজিৎ ছিলেন ধার্মিক ও সাধক। তিনি চলে আসেন জাহানাবাজার-এ। বর্তমান যার নাম আরামবাগ। তখন ছিল গভীর জঙ্গল। বসবাসের অযোগ্য। এরকম পরিবেশের মধ্যেই এখানেই বসবাস শুরু করেন আরামবাগ লাগোয়া গড়বাড়ি গ্রামে।

ইংরেজদের আমলে রণজিৎবাবু রায় উপাধি পান। একটাই কারণে, দক্ষ জমিদারি প্রশাসক। সেসময়ে প্রায় ২০০ একর জমির দেখাশোনা করতেন। জমিদারি প্রথা রদ চালু হবার পরই অনেক জমিই হাতছাড়া হয়েছে রায় পরিবারের। যা নিয়ে এখনও সরকারের সঙ্গে মামলা চলছে। এত কিছুর মধ্যেও রায় পরিবারের দুর্গোৎসব মহা ধুমধামের সঙ্গে আজও চলছে। শুরু করেন রণজিৎবাবু। তিনি কাছাকাছি বিশালাক্ষ্মী মন্দিরে পুজো করতেন এবং সাধকও ছিলেন। পাশেই জঙ্গল থেকে একটি মেয়েকে কুড়িয়ে আনেন, এই মেয়েটিই নাকি দুর্গা। ছদ্মবেশে এসেছিল রায়বাড়িতে। একথা আজও প্রচলিত। পরে একটি দীঘিও খনন করেন। এই দীঘিকে কেন্দ্র করে অনেক ঘটনাই আজও লোকমুখে প্রচলিত। পুজোয় যাতে খুঁত না হয় তা দেখার জন্য পুরোহিত, নাপিত, কুমোর, কামার সকলের উপার্জনের স্থায়ী ব্যবস্থা করা হয়েছে। এজন্য এঁরা সকলেই দেবত্তর সম্পত্তি পেয়েছেন। এবারের পুজো অন্যান্যবারের মতো জাঁকজমকপূর্ণভাবেই হবে। এখন আর পুরানো হ্যাজাক জ্বলবে না। পালকি করে রায়বাবুরাও আসবেন না ঠিকই, তবে আচার-প্রথা সবই আগের মতোই থাকবে। পুরানো রীতি মেনেই পুজোর নৈবেদ্য সাজানো হবে ২৬ মণ ধানের আলো চাল এবং ১৬ মন ধানের সিদ্ধ চাল দিয়ে।

আর এক প্রাচীন পুজো আজও সকলের নজর কাড়ে। এ বছরও বাজবে ঢাক-ঢোল-কাঁসি, মাইক-বাজনা। আসবেন আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী। শুধু থাকবে না কামানের গর্জন, পাঁঠাবলি। আর্থিক অনটনের মধ্যে থাকলেও বসু পরিবার মা দুর্গাকে আনতে চান নিয়মমাফিক আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধায়। উল্লেখ করা যেতে পারে, হুগলির খানাকুলের গোবিন্দপুরের বনেদি বসু পরিবার। আড়াইশো বছর পার হয়ে এসেছে। পুজো শুরু করেছিলেন পূর্বপুরুষরা। তখন ছিল জমিদারি। কিন্তু আজ তা একেবারেই মধ্যবিত্তের পুজো। নেই জমি। নেই জমিদারি। ২৫০ বছর আগে যে পুজো হত আজ আর তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। হারিয়ে গিয়েছে অনেক কিছুই। কেবল প্রতিমার একমেটে রূপটাই আজও চলে আসছে। গোপাল চন্দ্র বসু (পিতা হেমচন্দ্র বসু) ছিলেন জমিদার। জমিদারদের আদবকায়দায় পুজো হত। গ্রামের সমস্ত লোক আসতেন পুজো দেখতে। সকলকে বসিয়ে মুড়ি, মুড়কি-মিষ্টি খাওয়ানো হত। চলত চারদিন ধরে ধূমধামের যজ্ঞ। পুজো চলাকালীন কামানের গর্জন শুনতে পেত আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজন। তা শুনে বোঝা যেত বসুদের বাড়ি পুজো শুরু হয়েছে। সেই কামান আজও আছে। তবে তার অবয়ব টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। পড়ে আছে ভিটেরই পাশে এখানে ওখানে। তার ওপর ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়েছে। গজিয়েছে ঘাস। স্মৃতি আজ অতলে। তবু পুজো হয়। নিয়ম বদলায়নি। বদলেছে মানুষজন। বসু পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের ফণিভূষণ, দিলীপ, সুভাষ, শীতল, অশোক, অজয়, শৈলবাবুরা আছেন। এঁদের নেই জমিদারের বেশভূষণ। নেই কোনও চালচলন। সাদাসিধে জীবনযাপন। একেবারে সাত কর্তার চারজনই মূলত এই পুজোটা চালিয়ে আসছেন। বাকি তিনজনের অবস্থা একেবারেই পড়তির দিকে। তবে তাঁদের অকৃপণ শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা এখনও বেঁচে আছে। সকলের চেষ্টায়, তাই পুজো এখনও চলছে। ফণিভূষণ ও দিলীপবাবু জানালেন জমিদার প্রথা উচ্ছেদ হবার পরই সমস্ত জমি চাষিদের হাতে চলে যায়। ফলে হয়ে যাই একপ্রকার নিঃসহায়। সামান্য জমি বর্তমানে আছে। আর অন্য কোনও আয় নেই। তা থেকেই পূজা-অৰ্চনা হয়।

২৫০ বছরের পুজোয় দু-বার বিঘ্ন ঘটে, পুজো বেশ কয়েক বছর বন্ধ থাকে। এখন পুজোয় পাঁঠাবলির বদলে ছাঁচি কুমড়ো বলি হয়। হবারও কারণ আছে। এক বছর পুজোর সময় ভয়াবহ বন্যা হয়। সমস্ত এলাকা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নবমীর দিন কামার না আসায় বলি বন্ধ হয়ে যায়। সেই থেকে আর বলি হয় না। প্রাচীন পুজোর সেই মন্দির এখনও আছে। যা শ্রীধর জিউ মন্দির নামে পরিচিত। এখন প্রায় নিশ্চিহ্ন। পাশেই আলাদা পিলার দিয়ে মন্দির তৈরি হয়েছে। এই মন্দিরেই পুজো চলে আসছে। মাত্র এক বিঘা জমির আয়। এটা বসু পরিবারের আর্থিক সহায়তায় চলছে। এখন আর প্রতিবেশীদের বসিয়ে মিষ্টিমুখ করানো হয় না। যেটুক প্রসাদ দিতে পারা যায় সেটাই দিয়ে থাকেন বসুর কর্তারা। আশেপাশের গ্রামের কচিকাঁচা ও প্রবীণরা এখনও ছুটে আসেন বসুদের বাড়িতে পুজো দেখতে। পুজোয় চারদিন চলে ধূমধাম, আনন্দ এবং সংগীতানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। বহু কষ্ট করে হলেও আজও প্রতিমাকে নিয়ে আসছেন ফণিভূষণ ও দিলীপবাবুরা। আগামী দিনে যত কষ্টই হোক না মাদুর্গাকে বাড়িতে আনতে চান। সেই সঙ্গে সকলকে আমন্ত্রণ জানাতে কখনও ভুল করেন না।

আর এক জমিদার পরিবারের ১৫০ বছরের পুজো। আচার-অনুষ্ঠান বদলায়নি। বদলেছে মানুষজন। রায়বাড়ির জমিদারদের আদব-কায়দা আজও টিকে আছে। আগের জৌলুস হারিয়েছে অনেকটাই, কিন্তু পুজোয় রীতি বা প্রথা পঞ্জিকা মেনেই চলে আসছে। পুজোর পনেরো দিন আগে থেকে শুরু হয়ে যায় রায় বাড়ির পুজো। চলে প্রত্যেকদিন চণ্ডীপাঠ ও নৈবেদ্যসহকারে বিশিষ্ট ব্রাহ্মণের পুজো। ৪৫০ বিঘা জমি। ১০-১২ টা বড় দিঘি। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ হওয়ার পর বেশিরভাগই চলে গেছে চাষিদের হাতে। ফলে আয়ের দিকটাও কমে এসেছে। তবু এখনও পুজোয় লক্ষ টাকা খরচ করে রায় পরিবার। আগে নহবত, সানাই বাজত। এখন তার পরিবর্তে ঢাক-ঢোল সানাই বাজে। আলোর রোশনাই নেই, নেই প্যান্ডেলের কারুকাজ। দুর্গামন্দিরেই রীতি মেনে পুজো হচ্ছে। ১৫ দিন আগে ব্রাহ্মণরা চলে আসেন। ঘট স্থাপন করেন। শুরু হয়ে যায় দুর্গাপুজো। আগে মোষ বলি হত। এখন বন্ধ হয়ে পাঁঠাবলি শুরু হয়েছে। আরামবাগের মাধবপুর গ্রামের রায়বাড়ির পুজো মানেই প্রতিবেশীদের আনন্দ উদ্দীপনা। চার-পাঁচটি গ্রমের লোক জড়ো হন এই পুজো দেখতে। রায়বাড়ির আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং বাইরে থাকা রায়পরিবারগুলোও আসতে ভুল করে না, সকলে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, মিষ্টিমুখ সবই আজও হয়ে থাকে। তবে কিছুটা ভাটা পড়লেও আন্তরিকতার ভাটা পড়েনি। রায়বাড়ির প্রবীণ ব্যক্তি রমেন রায় এবং হরিমোহন রায়। দু’জনেই জানালেন এখনও লক্ষ টাকা খরচ করা হয় দুর্গাপুজোতে। তাছাড়া সারা বছর ধরেই অনেক দেব — দেবীর পুজো হয়ে থাকে। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের (ধান, আলু, পাট) দাম না থাকায় বাজেট অনেক কাটছাঁট করতে হয়েছে। আগের মতো দেবোত্তর সম্পত্তি থেকে আয় হয় না। ৪৫০ বিঘা সম্পত্তির বেশিরভাগ বেদখল হয়ে যাওয়াতেই এই বিপত্তি এবং পুজোয় কাটছাঁট। আগের জৌলুস না থাকলেও আন্তরিকতার অভাব নেই।

উল্লেখ্য করা যেতে পারে, ঘোষ বাড়ির পুজো নয় বাবুদের বাড়ির পুজো। একথাই প্রচলিত এখনও। বর্তমানে বাবুদের নাম আছে। কিন্তু বাবুগিরি অবস্থা নেই। নেই ৫ জন দারোয়ান, নেই ৬ জন গোমস্তা, ৩৬ জন সেরেস্তাও আজ নেই। এগুলি সবই ছিল ৩০০ বছর আগে। আজ কেবল স্মৃতি। অতীতের কথাগুলি আজও মুখে মুখে চলে আসছে। পুরনো বাড়িগুলি জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এখানেই বাজত জমিদারদের নহবত, সানাই। আজ বাজে কেবল ঢাক কাঁসি আর মাইক। হাতিশালার চিহ্ন নেই। ঘোড়া থাকার জায়গাও নিশ্চিহ্ন। ৩৬ টি মহলের (একটি মহলে থাকত ৫০০ বিঘা জমি) খাজনা আদায় করতেন মুক্তারাম ঘোষ। পদব্রজে নয়। ঘোড়ায় চড়ে। প্রয়োজনে পালকি চড়ে। দশ-বিশটা গ্রামের প্রজারা এখানে জড়ো হত। খাজনা দিত। খাজনার একটা অংশ চলে যেত বর্ধমানের জমিদারবাড়িতে। আজ সবই ইতিহাস। কেবল টিকে আছে পরবর্তী প্রজন্মের কয়েকজন মানুষ। যাঁরা আজ অর্থাভাবে ধুঁকছেন। কিন্তু পুরানো জমিদারি প্রথার সংস্কৃতিগুলোকে এখনও আঁকড়ে ধরে আছেন। বাড়িতে এখনও দুর্গাপুজো হয়। হয় অন্যান্য দেবদেবীর নিত্যসেবাও। বয়স্কা পারুল ঘোষ জানালেন, পারিবারিক ঐতিহ্যকে বজায় রাখতে এবছরও পুজো হচ্ছে। বাজেট অনেক কাটছাট হয়ে এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকায়। তাও জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এখন শুধু নিয়মরক্ষার। জানা গেল, দেনার দায়ে জর্জরিত দেবোত্তর সম্পত্তি তলানিতে এসে ঠিকেছে। ধান, আলু, পাটের দাম নেই। প্রতি বছরই লোকসান।। তাই পুজো করাটাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এবারে পুজো একেবারেই নিয়ম রক্ষার। থাকবে না কোনও আলোর রোশনাই, প্যান্ডেলের চাকচিক্য এবং মন্দিরকে সাজানো। সবই সাদাসিধে। অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে পারুল বললেন, মুক্তারাম ঘোষ এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। মাঝে বেশ কয়েক বছর বন্ধ ছিল। পাঁঠাবলি হয়। প্রতিদিন একটা করে চলে আসছিল আগে। এখন আর তা হয় না। কেবল নবমীর দিন পাঁঠা বলি হয়। জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ হয়ে যাবার পর সমস্ত মহলের সম্পত্তি হাতছাড়া হয়ে যায়। আয়ের পুরোটা অংশ কমে যায়। ভাটা পড়ে তারপর থেকেই। এটা ঘটে দুর্গাপদ ঘোষের আমল থেকে। এবারে পুজো প্রস্তুতির কথা জানাতে গিয়ে পারুলবালা বলেন, ধান, আলু, পাটের দাম একেবারেই কম। বছরের পর বছর লোকসান। যেহেতু চাষের উপরই নির্ভশীল সমস্ত ঘোষবাড়ি, সেখানে চাষের আয় না থাকায় একেবারে দিনের দিন ভেঙে পড়েছে। ঋণের দায়ে জর্জরিত। তাছাড়া বিষয় সম্পত্তি নিয়ে মামলা লেগেই আছে। যার আয়ের সিংহভাগই ঘোষ পরিবারের খরচা হয়ে যাচ্ছে। অভাব অনটনের মধ্য দিয়েই মা-কে আনতে হচ্ছে। তবে আন্তরিকতার ফাঁক থাকবে না। যথারীতি পঞ্জিকা, বংশের প্রথা মেনেই এবছরও পুজো হবে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev