উইট ও স্যাটায়ার, এ দুই আয়ুধ ব্যবহারে যাঁর নৈপুণ্য সর্বজনবিদিত, যাঁর ব্যক্তিত্ব বাঙালিকে হাসিয়েছে, রবীন্দ্র সহচর্যে যাঁর লালন, সেই বিশিষ্ট লেখক, শিক্ষাবিদ ও অধ্যাপক প্রমথনাথ বিশীর আজ জন্মদিন। প্রমথনাথ বিশীর জন্ম ১১ জুন ১৯০১, সাবেক পূর্ববঙ্গের রাজশাহী জেলার জোয়াড়ীতে। বাবার নাম নলিনীনাথ এবং মা সরোজবাসিনী। তিনি ছিলেন শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ের ছাত্র। বালক বয়সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহচর্য লাভ করেন। পদবীর বৈচিত্র্যের জন্য রবীন্দ্রনাথ থেকে সকল শিক্ষকের কাছে তিনি “বিশী” নামেই পরিচিত।
শান্তিনিকেতনে অঙ্কের ক্লাসে পড়াচ্ছেন জগদানন্দ রায়। অমনোযোগী হওয়ায় নয় বছর বয়সি ছাত্র বিশীর কাঁধে পড়লো হাল্কা থাপ্পড়। এ দৃশ্য দেখে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিরকুট লিখে পাঠালেন, “… গাধারে পিটিলে হয় না অশ্ব / অশ্ব পিটিলে হয় সে গাধা।” এহেন চিরকুট দেখে জগদানন্দ জানতে চাইলেন, বিশী কোন শ্রেণীর? ধুরন্ধর ক্ষুদে ছাত্রের জবাব, “আমি অশ্ব”।
তবে অঙ্ক-প্রসঙ্গ বিশীর পিছু ছাড়েনি। অঙ্কের পরীক্ষায় একবার লিখলেন কবিতা, ‘হে হরি, হে দয়াময় / কিছু মার্ক দিয়ো আমায়..’। পরীক্ষক নগেন্দ্রনাথ আইচ খাতা নিয়ে সটান গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। তবে রবীন্দ্রনাথ বিশীর পক্ষ নেওয়ায় জল বেশি দূর গড়াল না।
শান্তিনিকেতন থেকে ম্যাট্রিক পাশ করে তিনি শান্তিনিকেতনেই শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখান থেকেই প্রাইভেটে ইন্টারমিডয়েট পাশ করেন। পিতা রাজনৈতিক কারণে কারারুদ্ধ হলে, পড়াশুনো স্থগিত রেখে জৈষ্ঠ্যপুত্র হিসেবে সংসারের সবই তাঁকে দেখতে হয়। এর মধ্যে এই ভাবেই তিনি রাজশাহী কলেজ থেকে ইংরাজিতে বি. এ. অনার্স পাশ করেন। সংসারিক কাজে পড়াশুনা ব্যাহত হলেও, তারই মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাইভেটে বাংলায় এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন।
প্রমথবাবু বলতেন, তাঁর সাহিত্য কাব্য যা কিছু পাঠ ও শিক্ষা সবই রবীন্দ্র সাহচর্যে। অথচ তাঁর নিজের রচনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রভাব বিস্তর। কাব্য উপন্যাস ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক, রম্যরচনা সর্বত্রই তাঁর লেখনীর অবাধ সঞ্চরণ। কথা সাহিত্যের আড্ডায় প্রমথনাথ বিশী ছিলেন মধ্যমণি। এই আড্ডা শুধুমাত্র ক্ষণিকের বিনোদন নয়, বাঙালির মনন, চিন্তন, শিল্পসাহিত্যের সঙ্গে আত্মিকভাবে জড়িত। সাহিত্য সৃষ্টির এক বড়ো উদ্দীপনা শক্তি এই আড্ডা।
সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, “…আড্ডার ঠিক প্রতিশব্দটি পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষাতে আছে কি? ভাষাবিদ না-হয়েও বলতে পারি, নেই; কারণ আড্ডার মেজাজ নেই অন্য কোনো দেশে, কিংবা মেজাজ থাকলেও যথোচিত পরিবেশ নেই।” সেইসময় বইপাড়ায় দুটি আড্ডা বসতো।একটি বসাতেন এম সি সরকারের কর্ণধার সুধীর সরকার, প্রবীণ সাহিত্যিক হেমেন রায়, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী প্রমুখদের নিয়ে। অপর আড্ডা বসতো ‘মিত্র ও ঘোষ’-এ। প্রমথনাথ বিশী, তারাশঙ্কর, অচিন্ত্য সেনগুপ্ত, গজেন্দ্রকুমার মিত্র, কালিদাস রায়ের মতো অপেক্ষাকৃত নবীন সাহিত্যিকদের নিয়ে। দুই আড্ডারই নামকরণ করলেন প্রমথনাথ বিশী। এম সি সরকারের আড্ডার নাম দিলেন ‘হাউস অব লর্ডস’ আর ‘মিত্র ও ঘোষের আড্ডার নাম রাখা হলো ‘হাউস অফ কমন্স’।
একবার আড্ডায় একবন্ধু কথায় কথায় জিগ্গেস করলেন, “বিশীদা, আপনি কতদিন ছিলেন শান্তিনিকেতনে?” প্রমথনাথ বললেন — সতেরো বছর। বন্ধুর জিজ্ঞাসা — গান সাহিত্যচর্চা সব ওখানেই।
বিশী বললেন — সবই ওখানে, তবে গান শেখা হয়নি। বন্ধু আশ্চর্য হয়ে বললেন — সতেরো বছর রইলেন, গান শিখলেন না!! অতঃপর বন্ধু বললেন — চলি, বাড়ী যাই।
প্রমথনাথ নিরীহ গলায় বললেন, কোথায় বাড়ী?
বন্ধু — দমদমে, আমাদের তিন পুরুষের বাস।
প্রমথবাবু আরো নিরীহ গলায় বললেন — এরোপ্লেন চালাতে জানেন?
বন্ধু আশ্চর্য হয়ে বললেন — এরোপ্লেন চালাবো কেন?
প্রমথবাবু মুচকি হেসে বললেন — সতেরো বছর শান্তিনিকেতন থেকে গান শিখিনি বলে আশ্চর্য হচ্ছিলেন। তা আমি ভাবলাম — আপনি তিন পুরুষ যখন দমদমে আছেন নিশ্চয়ই এরোপ্লেন চালাতে শিখেছেন।
বন্ধুটি তখন বিধ্বস্ত। তাঁর ব্যঙ্গ করার ক্ষমতা এতটাই নিপুণ যে, উদ্দিষ্ট ব্যক্তিরা লেখকের উপর রাগ করবে না গালি দেবেন তা স্থির করতে পারে না। ‘সমুচিত শিক্ষা, এলার্জি, ব্রহ্মার হাসি, গালি ও গল্প, ডাকিনী ইত্যাদি গল্পের মধ্যে দিয়ে প্রমথনাথ বিশীর চাবুক লেখা বাঙালির মর্মস্থলে অনেকবার আছড়ে পড়েছে। ব্যঙ্গ যেখানে তিক্ত নয়, কঠিন নয় বরং নির্মল কৌতুকে স্নিগ্ধ, সেখানে কেবল অনাবিল হাসিই প্রবাহিত হয়। ‘গদাধর পণ্ডিত’-এ গল্পলেখকের ক্রোধ ও ব্যঙ্গ সমাজের উপর বর্ষিত হয়েছে।
“জলের উজ্জ্বল শস্য” গঙ্গার ইলিশ সম্পর্কে বাঙালির দুর্বলতা ভুবনবিদিত। সেই সময়ে শিক্ষকের দুরবস্থাও অজানা নয়। এ দুই কোটির মাঝে সেতুযোজন করার কঠিন কাজ অবলীলাক্রমে করেছেন লেখক ‘গঙ্গার ইলিশ’ গল্পের মধ্যে। গল্পে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের অন্তঃসার শূন্য মর্যাদা রক্ষার প্রাণান্ত প্রয়াস রয়েছে কিন্ত তার অন্তরালে কোন তিক্ততা প্রশ্রয় পায়নি। গল্পকার ডিটেকটিভ গল্প লেখেননি কিন্ত ভূতের গল্প, ভালোবাসার গল্প লিখেছেন।
১৯৬০ সালে কেরী সাহেবের মুন্সী উপন্যাসের জন্য প্রমথনাথ বিশী রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮২) ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত জগত্তারিণী স্বর্ণপদকও (১৯৮৩) লাভ করেছিলেন। প্রমথনাথ বিশী প্রথম জীবনে রিপন কলেজে অধ্যাপনা, পরে সাংবাদিকতা, আবার সাংবাদিকতা ছেড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন, বিভাগীয় প্রধান রবীন্দ্র-অধ্যাপক হিসেবে। সর্বত্রই তিনি তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। পরে তিনি ভারতীয় রাজ্যসভায় সাংসদও হয়েছিলেন।
প্রাণবন্ত এই মানুষটি মৃত্যুর আগেও রসিকতা করতে ছাড়েননি। শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার রামকৃষ্ণ সেবা প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন মাষ্টারমশাই প্রমথনাথ বিশীকে দেখতে। অসুস্থ মানুষটি এক ডাক্তারের নাম করে বললেন, “বুকের ওপর হারমোনিয়াম বাজিয়ে চারশো টাকা নিয়ে চলে গেলেন।” সৃজনশীল লেখক ও মননশীল গবেষক ১০ মে ১৯৮৫ তে ইহলোক ত্যাগ করেন। নশ্বর শরীর নষ্ট হলেও তাঁর সাহিত্যকর্ম তাঁকে বাঁচিয়ে রাখাবে পাঠকদের অমলিন স্মৃতিতে।
তথ্যঋণ : মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্সের কবি স্মরণে, উইকিপিডিয়া, আনন্দবাজার আর্কাইভ।
Excellent
চমৎকার প্রতিবেদন। খুব ভালো লাগল। সমৃদ্ধ হলাম।
খুবই ভালো লাগলো।
অন্তর্নিহিত ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া গেল এই লেখনীতে, নিপুণ ভাষা প্রয়োগে প্রমথ বাবুকে অলংকৃত করা মুগ্ধ করেছে। ধন্য হলাম, সমৃদ্ধ হলাম। অভিনন্দন।
এত সুন্দর সুন্দর মতামত পেয়ে আমি আপ্লুত। ধন্যবাদ জানাই সকলকে।