শীতের কাঁপুনিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্পট নির্বাচন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, তাহলে নিশ্চিন্তে ঘুরে আসুন পাহাড় জঙ্গল নদী প্রান্তরে ঘেরা, ত্রিপুরার শিবতীর্থ ঊনকোটিতে। অনুচ্চ এক পাহাড়ের কোলেই ঊনকোটির অবস্থান। আগরতলা থেকে ১৭৮ কিলোমিটার দূরে এবং কৈলাস শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে রঘুনন্দন পাহাড়ে পর্যটন কেন্দ্রটি অবস্থিত। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তি, শিবরাত্রি ও অশোক ষষ্ঠীতে একটি বিখ্যাত মেলার আয়োজন করা হয় ঊনকোটিতে।
ঊনকোটি নিয়ে রয়েছে নানা গল্পকথা, কত কিংবদন্তি। স্বয়ং বিশ্বকর্মাই নাকি নিজের হাতে পাহাড়ের গা ভরিয়ে তুলেছিলেন দেবাবয়বে। ঊনকোটি শব্দের অর্থ হল এক কোটি থেকে একটি কম। ঊনকোটির মুর্তিগুলি নিয়ে যে একাধিক কাহিনি প্রচলিত আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি মিথ অনুযায়ী, —
মহাদেব দেবী পার্বতীকে সঙ্গে করে কৈলাসে যাচ্ছিলেন। তখন কালু কামার বা কাল্লু কুমহার নামে এক ভক্ত শিল্পী বায়না ধরলেন তাঁদের সঙ্গে যাবেন বলে। মহাদেব শর্ত আরোপ করলেন যে এক রাত্রির মধ্যে যদি তিনি এক কোটি দেবদেবীর মূর্তি তৈরি করতে পারেন তবে তাকে সঙ্গে নেবেন। সারারাত ধরে চেষ্টা করে এক কোটির থেকে একটি কম অর্থাৎ ঊনকোটিটি মূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হলেন। শর্ত পূরণ হলো না ঠিকই কিন্তু দেবদেবী পূর্ন স্থানের নাম হলো ঊনকোটি।

আবার শিব পুরাণে কথিত আছে একটি গল্প যা মহাদেব এবং তাঁর বিখ্যাত ক্রোধের কথা নিয়ে। গল্প অনুসারে, দেবাদিদেব শিব একবার ত্রিপুরার উপর দিয়ে বারানসী যাচ্ছিলেন। শিবের সঙ্গে ছিলেন ৯৯,৯৯,৯৯৯ দেব-দেবী। পথপরিশ্রমে ক্লান্ত দেবতারা সন্ধ্যা নামার সময় রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করেন রঘুনন্দন পাহাড়ে। পরের দিন সূর্য উদয় হওয়ার আগেই বারানসীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কথা ছিল সকলের। কিন্তু পরের দিন মহাদেব ছাড়া কোন দেবতারই নিদ্রা ভঙ্গ হলো না। এই দেখে মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে একাই বারানসীর পথে যাত্রা করলেন। গভীর নিদ্রায় সমাধিস্থ দেবতাদের কাল নিদ্রার ভঙ্গ হলো না এবং তাঁরা অনন্তকালের জন্য পাথর হয়ে গেলেন। এই দেবতাদের সংখ্যা ছিল এক কোটির থেকে একটি কম। সেই থেকে রঘুনন্দন পাহাড় হয়ে গেল শৈবতীর্থ ঊনকোটি।
রাজমালা যা ত্রিপুরার রাজন্যবর্গের ইতিবৃত্ত–এ উল্লেখ আছে ঊনকোটির। পুরাতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা এইসব দেবদেবী মূর্তির ভাস্কর্যের প্রাচীনত্ত্ব মেনে নিয়েছেন। অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে নির্মিত খোদিত বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কারো কারো মতে ঊনকোটি পাল যুগেও স্বীকৃত হিসেবে চিহ্নিত ছিল। সে ধারা এখনো বহমান। তবে ত্রিপুরার সাধারণ মানুষের কাছে আজো এটি শিবতীর্থই।

দলে দলে পুণ্যার্থী মানুষজন এখানে সীতাকুণ্ডের জলধারায় অবগাহন করে। কিছু প্রত্নতাত্ত্বিকের মতে এটি ধ্যানের জন্য একটি বৌদ্ধ স্থানও হতে পারে।
দু-চোখ ভরে যেদিকেই তাকানো যায়, দেখা যায় দেবদেবীর বিগ্রহ, পাহাড় গায়ের ম্যুরাল, ছাড়ানো ভাস্কর্য। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা মূর্তিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জটাধারী শিব এবং ৩০ ফুট উঁচু কালভৈরবের মূর্তি, গঙ্গা একটি মকরের উপর বসে আছে এবং দুর্গা একটি সিংহের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
ঊনকোটির একটি প্রধান দ্রষ্টব্য হল গণেশকুন্ড। কুন্ড সংলগ্ন পাথরের দেওয়ালে দক্ষ হাতে খোদাই করা আছে তিনটি গণেশ মূর্তি। এদের ডান পাশে রয়েছে চতুর্ভুজ বিষ্ণু মূর্তি।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী থেকে গণেশ, রাবণ, রাম, শিবের বাহন নন্দীর মূর্তি এবং অন্যান্য দেবতার মূর্তিগুলি ভাস্কর্যে পরিপূর্ণ। এখানকার প্রতিটি পাথরের কুলুঙ্গিতে ইতিহাস বোনা হয়েছে — রয়েছে রহস্য, পৌরাণিক কাহিনী এবং কিংবদন্তি ভাস্কর্য। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বিশাল সাইজের বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি গুলি ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখতে পাওয়া যাবে তাদের মুখের আদল কিছুটা ত্রিপুরার আদিবাসীদের মত। এমনকি তাদের সাজসজ্জাতেও রয়েছে ট্রাইবালদের ছাপ।
অসাধারণ এই নির্মাণ কার্য যারা করেছিলেন তারা নিঃসন্দেহে গুণী শিল্পী। তাদের অপরূপ শিল্পকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। প্রাচীন ভারতের মধ্যযুগে আমাদের দেশের শিল্পীরা প্রশ্নাতীত দক্ষ ছিলেন এবং তাদের শিল্প দক্ষতা নিয়েও কম আলোচনা গবেষণা হয়নি। ঊনকোটি অনেকাংশেই অনালোকিত অনালোচিতই রয়ে গেছে।

আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া প্রানপন চেষ্টা করে যাচ্ছে এইগুলো রক্ষা করার কিন্তু সময়ের করাল গ্রাসে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে অনেক মূর্তি। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দৌলতে স্থানটি ‘ঐতিহ্য’-এর তকমা পেয়েছে। ইউনেস্কোর কাছে ভারত সরকার প্রস্তাবও পাঠিয়েছে।
চারিপাশের সিঁড়ি করা আছে যাতে অনায়াসে পর্যটকরা স্থানটি ঘুরে দেখতে পারেন। একরকম জংলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ ছেয়ে আছে সারাটা অঞ্চল। পাহাড়ি অঞ্চল বেয়ে এঁকেবেঁকে রাস্তায় চলে গেছে কৈলাশহর সাব ডিভিশনের দিকে। পাহাড়ের কোন, বাঁকে গাড়ি থামিয়ে কয়েক পা এগোলেই আচমকাই চোখের সামনে পড়বে অপূর্ব এই স্থাপত্য শিল্প।

ঊনকোটির আশ্চর্য পাহাড় শিল্প দেখতে বিশেষ করে উৎসবের সময়, প্রতিবছর নিজ রাজ্য এবং ভিন্ন রাজ্য থেকে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। এখন অবধি এখানে প্রবেশের কোনো প্রবেশ মূল্য নেই। তবে সতর্ক নজরদারি রয়েছে পাহাড়জুড়ে।
সবুজ সজীব গাছপালার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রযেছে লোকালয়। দারিদ্র্যের ছাপ মানুষজনের পোশাক আশাকে। গাছশাখার ফাঁক দিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া রোদ আলপনা দিয়েছে পাহাড়ের পথে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে যখন ফিরবেন বাড়িতে, তখন সবার মুখেই থাকবে প্রাপ্তির আনন্দ ঝলমলে।
সুন্দর একটি স্থানের উল্লেখ করেছেন বেরিয়ে আসার জন্য। খুবই মনোরম পরিবেশ পাওয়া যাবে।
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ????
Very interesting
থ্যাংক ইউ ❤️
অসাধারণ একটি জায়গা আপনার লেখায় পেলাম,,, যাবার ইচ্ছে রইলো।
খুব সুন্দর স্থান যেখানে মূর্তি ছুঁয়ে দেখা যায়। থ্যাংক ইউ ????
চমৎকার লেখা। জানলাম অনেক অজানা তথ্য।
অনেক ধন্যবাদ ????????