ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়ে মর্মাহত এবং পাশ করিয়ে দেওয়ার দাবীতে উত্তাল ছাত্রীমহলের সামনে এক সাংবাদিক ‘আমব্রেলা’ বানান জানতে চাইলেন এবং ছাত্রীরা কেউই সঠিক উত্তর দিতে পারল না। ব্যাস। ঠিক এই মুহূর্ত থেকে social media তে এই বিষয় নিয়ে নব্য মহাভারত রচনা শুরু। viral হওয়া video টি কে অবলম্বন করে কত youtuber কত উপার্জন করতে পারল সে প্রসঙ্গে না হয় অন্যত্র আলোচনা হোক। কিন্তু বিগত বেশ কিছু বছর ধরে একটি গ্রামীণ বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি পড়ানোর চেষ্টা (পড়ুন অনেকাংশে ব্যর্থ) করার দরুণ কিছু তো অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই কতগুলো জরুরী কথা কলমের ডগায় আসতে চাইল।
সাংবাদিক হঠাৎ পরীক্ষকের ভূমিকাতে অবতীর্ণ হলেন। ওই ছাত্রীরা তো council এর নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছেন এবং অকৃতকার্য হয়েছেন। সাংবাদিককে কি council দায়িত্ব দিয়েছেন নূতন প্রশ্নপত্র তৈরী করে ছাত্রীদের মান যাচাই করতে? তারা পাশ করার যোগ্য না অযোগ্য তা যাচাই করার অধিকার ঐ সাংবাদিকের আছে? ঐ ছাত্রীরা কি তাকে উত্তর দিতে কোন ভাবে বাধ্য? ছাত্রীরা তো ইচ্ছে করে ভুল উত্তর দিতে পারত। তাদের উচিত ছিল একেবারেই উত্তর না দেওয়া। কারণ তারা তো ওখানে পরীক্ষা দিতে আসেনি। যাই হোক,অপরিণত মনস্ক ছাত্রীরা উত্তর দিল, তাও আবার ভুল উত্তর। আর একটি, শুধুমাত্র একটি,ইংরেজি বানান না পারার দরুণ ওই অপরিণতমনস্ক ছাত্রীরা জনতার কাঠগড়ায় উঠে পড়ল এবং বর্তমান প্রজন্মের ভাষায় চরম ‘খিল্লি’র শিকার হল। এখন প্রশ্ন হল যে বা যারা নির্বিবাদে এই মেয়ে গুলিকে বিদ্রূপ করে চলেছেন, তারা সকলেই ইংরেজি ভাষায় বেশ দক্ষ তো?ওই সাংবাদিককে যদি কঠিনতর একটি বানান করতে দেওয়া হয় এবং তিনি যদি ভুল উত্তর দেন তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি ইংরেজি জানেন না! আসল সমস্যাটাকে আড়াল করে দিয়ে এই যে মশকরার নব্য ‘বং’ সংস্কৃতি লেবু কচলে কচলে তেতো করে ফেলছে তাতে কার কি উপকার হচ্ছে?আসল সমস্যা যার শিকড় অনেক, অনেক গভীরে তার উপরে কোন আলোকপাত তো হচ্ছে না।অবক্ষয় কোন পর্যায়ে গেলে একজন ছাত্র বা ছাত্রী পাশ করানোর দাবীতে পথ অবরোধ করে!অথচ সে তো পরিস্থিতির শিকার ছাড়া কিছু নয়।
সে ছোট থেকে ‘no detention policy ‘তে পাশ করে করে এই পর্যন্ত এসেছে। অর্থাৎ সে কোন দিন নিজের চেষ্টায় পাশ করেনি, তাকে পাশ করানো হয়েছে। তা আজ হঠাৎ কি দুর্ঘটনা ঘটে গেলো যে তাকে ফেল করিয়ে দেওয়া হল। সকলে সমস্বরে চিৎকার করে বলে ফেল ফেল, তুমি ফেল। সে কি করে এটা মেনে নেবে। অপরিণত মগজে সে কি করে খুঁজে পাবে তার দোষ যখন সে দেখছে চারদিকে on line পরীক্ষায় বাড়িতে বসে টুকে লিখে দুর্দান্ত result, তখন সেই একই দাবী সে জানালেই অপরাধ হয়ে গেল!

দোষ যে তার নয় সেটা বোঝাটা কিছু কঠিন নয়। আমরা শুধু চোখে ঠুলি পরে আছি।আর তাছাড়া সাধারণ একটা ইংরেজি বানান না বলতে পারা টাও এমন কোন অভূতপূর্ব ঘটনা নয়, যা বাংলার ইতিহাসে পলাশীর যুদ্ধের পর এই প্রথম ঘটেছে। দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজি পড়ুয়াদের অনেকেরই অবস্থা মোটের উপর এইরকমই থাকে। বিশেষত যারা প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া তারা বেশির ভাগই দ্বিতীয় ভাষায় দুর্বল।এবং এতে কোন অস্বাভাবিকতাও নেই। কারণ ইংরেজির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ নাম মাত্র। একটা নতুন ভাষাকে আয়ত্ত করতে গেলে সেই ভাষার সঙ্গে যতটা পরিচিতি দরকার, যতটা সময় ও ধৈর্য্য ব্যয় করলে সেই ভাষায় দখল আনা সম্ভব তার সিকিভাগ সময় ও সুযোগও তারা পায় না। স্কুলের স্বল্প সময়ের পরিসরে দ্বিতীয় ভাষার জন্যে নির্দিষ্ট ক্লাসে syllabus অনুযায়ী যেটুকু ইংরেজি চর্চার সুযোগ তারা পায় তা একটি নতুন ভাষা কে আয়ত্ত করার জন্যে একেবারেই যথেষ্ট নয়। ফলে পিছিয়ে পরা ছাত্রদল পিছিয়েই থাকে আর দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজির প্রতি ভয় আর অনীহা বাড়তেই থাকে। এই একই কথা দ্বিতীয় ভাষা বাংলার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয় কি? আমরা তো হামেশাই দেখি যাদের প্রথম ভাষা ইংরেজি তাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও স্কুলে এটি দ্বিতীয় ভাষা হওয়ার কারণে তাদের বাংলায় জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত।এই কারণেই কোন কোন অভিভাবক আবার গর্বিত যে তাদের সন্তান বাংলায় কাঁচা। বাংলা না পারলে তা গর্বের আর ইংরেজি না জানলে তা লজ্জ্বার! ‘Colonial Legacy’র রাজকীয় স্বাদের মৌতাতে আমরা এখনও এতই বুঁদ হয়ে রয়েছি যে ভুলতে পারছি না একই সমস্যা যে কোন দ্বিতীয় ভাষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ভাষার নিয়মিত ব্যবহার যথেষ্ট পরিমাণে না হলে কোন ভাষা শেখা প্রায় অসম্ভব। আজকে ওই viral হওয়া video র ছাত্রী-টির ভুল বানান হিমশৈলের চূড়া মাত্র।
বহু বছর ধরে পরীক্ষার খাতায় আমরা এইসব বানান দেখে অভ্যস্ত। অনেক পরিশ্রমী ছাত্রদের দেখেছি উচ্চমাধ্যমিক ভূগোল বা দর্শনে full marks পেতে। অথচ ইংরেজিতে কোনমতে পাশ করতে। অর্থাৎ ইংরেজি ভীতি সে কাটিয়ে উঠতে পারেনি। যে বিষয় বা ভাষার সঙ্গে অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্যে যোগাযোগ হয়, সেই ভাষা আয়ত্ত করা সত্যি কঠিন। কিন্তু পাশ করবার তাড়নায় বইপত্র কিছুটা নাড়াচাড়া করলেই objective প্রশ্ন গুলির সাহায্যে পরীক্ষা বৈতরণী পার হওয়া যায়। আর তাছাড়া অযথা ‘conservatism’ ত্যাগ করে বর্তমানে অনেক উদার ভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয় বলে ছোটখাটো ভুল উপেক্ষা করে নম্বর দেওয়া হয়। তাই ইদানীংকালে ইংরেজিতে ফেল করার প্রবণতা বেশ কমে এসেছিল। তার মানে এই নয় যে হঠাৎ করে একটা প্রজন্ম ইংরেজিতে খুব দক্ষ হয়ে উঠেছে। পাঠ্য বই এর সঙ্গে একটু সুসম্পর্ক রাখলেই ইংরেজির ভয় জয় করা যায়।
কিন্তু এ বছর সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। দুই বছর প্রায় টানা স্কুল বন্ধ, অতিমারির দাপটে বেশ কিছু পরীক্ষা বাতিল হয়েছে বা on line এ হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অপরিণতমনস্ক ছাত্র ছাত্রীরা ভেবেই নিয়েছে হয় on line পরীক্ষা হবে অথবা হবেই না। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে তারা বই এর সঙ্গে সম্পর্ক একেবারেই চুকিয়ে দিয়ে স্কুল থেকে পাওয়া tab ইত্যাদি gadget নিয়ে বিবিধ বিনোদন মূলক কাজে মেতে ছিল।এখন হঠাৎ করে যদি বিধি বাম হয়ে অফ লাইন পরীক্ষার খাঁড়া তাদের উপর নেমে আসে তারা তো ত্রাহি ত্রাহি রব করবেই। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা নতুন করে স্থাপন করা গেলেও বিদেশি ভাষা তথা দ্বিতীয় ভাষা থেকে গেলো অস্পৃশ্য, “অস্বাদিত মধু যেমন, যুঁথি অনাঘ্রাতা”।এই কারণেই এ বছর আবার ইংরেজিতে ফেল এর বাড় বাড়ন্ত। বইয়ের থেকে এরা এতটাই দূরে ছিল যে বই খুলে দিলেও এরা উত্তর খুঁজে লিখতে পারত না।উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় ভাষার একজন পরীক্ষক হিসেবে দেখলাম উত্তরপত্রে পাতার পর পাতা সাদা। ‘multiple choice’-এর উত্তর exam hall থেকে ‘collection’ করে লেখাটা বহু পুরোনো দস্তুর। এবার বোধ হয় কোনও কোনও hall এ এমন কেউ ছিল না যার কাছ থেকে কিছু সঠিক উত্তর সংগ্রহ করা যায়।
দ্বিতীয় ভাষা তথা ইংরেজি যেটা কি না আবার এদেশের কাজের ভাষা আবার তার সঙ্গে সঙ্গে তথাকথিত উচ্চ বর্গের ভাষাও বটে, সেই ভাষায় শুদ্ধভাবে ভাব প্রকাশ করার ক্ষমতা প্রান্তিক পিছিয়ে পরা ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। এদিকে স্বাধীনতার এত বছর পরেও ইংরেজিতে দক্ষতাকেই শিক্ষিত হবার একমাত্র মাপকাঠি বলে ধরা হয়। সত্যি সেলুকাস! … কেউ অঙ্কে বা ইতিহাসে যথেষ্ট জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও শুদ্ধ ইংরেজি বলতে বা লিখতে না পারলে লোকের হাসির খোরাক হয়। তাই জাতে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টায় social media তে ভুল ইংরেজিতে কমেন্ট এর ছড়াছড়ি। ভুল ইংরেজি লিখবে তবু শুদ্ধ মাতৃভাষা লিখবে না , রাজ ভাষার এমনই মাহাত্ম্য। কে তাদের বলে দেবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে — হয়নি, হয়নি, তুমি ফেল! একটি মেয়ে ইংরেজিতে ফেল করেও পাশ করতে চেয়ে এবং একটি ভুল বানান বলে যাদের বিদ্রূপের শিকার হল social media জুড়ে ‘খিল্লি’ ওড়ানো সেই জনতা জনার্দনের ইংরেজি পরীক্ষা কে নেবে? পাশ করিয়ে দেওয়ার জন্যে মেয়েটির এই অন্যায় আবদার কে আমি কোনভাবেই সমর্থন করছি না।আমি শুধু বলছি একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যাবে মেয়েটির এই অন্যায় আবদারের উৎস কোথায়। ‘এ তোমার, এ আমার পাপ’ নয় কি? এই পিছিয়ে পরা ছাত্রছাত্রী যারা বাড়িতে পড়ার কোন পরিবেশই পায় না তারা দেখছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ফেল করেও চাকরি পাওয়া যায়, অনলাইন এ পরীক্ষার দাবীতে তাদের দাদাদিদিরা আন্দোলন করে। তাহলে এই সমাজ থেকে তারা কতটা সুস্থ মানসিকতা অর্জন করবে বলে আশা করা যায়? তারা তো পরিশ্রম করে কিছু অর্জন করার অর্থটাই আজ ভুলতে বসেছে। … এ এক অদ্ভুত আঁধার, যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা। আর তারাই social media নামক রঙ্গমঞ্চে স্বঘোষিত কুশীলব, ‘judgemental’ দাদা দিদি। অগভীর চিন্তাভাবনা দ্বারা চালিত, হুজুগে মাতাল এই বিপুল জনরাশি কাউকে আঘাত করার আগে বিন্দুমাত্র ভাবে না। যে কোন মূল্যে নিজে সুবিধাজনক জায়গায় থাকতে চায়, তাতে অন্যকে দলে, পিষে, মাড়িয়ে যেতেও দুবার ভাবে না। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই অগভীর আত্মঘাতী মানসিকতার পরিচয় পেলে দুঃখের শেষ থাকে না।জানি না দ্বিতীয় ভাষা ইংরেজী, কাজের ভাষা ইংরেজী সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কোনদিন সুষম ও স্বাভাবিক হবে কি না। ভবিষ্যত প্রজন্ম ইংরেজিকে status symbol হিসেবে না দেখে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম বা কাজের ভাষা হিসেবে দেখতে শিখুক ও পূর্বসুরীদের লালিত colonial hangover কাটিয়ে স্বাধীন শিক্ষিত মননের অধিকারী হোক, এই কামনাই করি।
লেখিকা নিবাধই উচ্চ বিদ্যালয়-এর শিক্ষিকা
একদম ঠিক কথা। English না জানা টা খুব বিশাল অপরাধ নয়, আর আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা fail প্রথা তুলে দিয়েছে বলেই আজকে এই রকম দিনের সম্মুখীন আমাদের বর্তমান প্রজন্ম। সর্বোপরি যারা ওই মেয়েটিকে নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন তারা English এ কতটা পারদর্শী তার বিচার কে করবে?
চরম বাস্তবতা ম্যাডাম,, এই ‘বং’ সংস্কৃতিই চলছে চলবে,,