বিশিষ্ট চলচিত্রকর ল্যাডলি মুখোপাধ্যায় শান্তিনিকেতনে থাকেন। তাঁর ফেস বুকের দেওয়ালে লিখেছেন — ‘ক্ষতি হয়ে গেল বিস্তর। গতকাল থেকে নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত। আজও তার বিরাম নেই। কদিন আগে ধান কাটা হয়েছিল। কিন্তু তা ছিল ক্ষেতেই জড়ো করা। চাষের প্রথা মতো সেই ধান কদিন মাঠে রেখে তারপর তোলা হয়। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। এই অবিরাম অকাল বৃষ্টি সব নষ্ট করে দিলো। ধান চাষ ছাড়াও আখড়ার বেশ কিছুটা জমিতে আলু দিয়েছিলাম। তাও গেল। তা নয় আমার সামান্য চাষ। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে ছোট থেকে বড় সমস্ত চাষিদেরই মাথায় হাত। সামনের সারা বছরটা কি খাবে, কি বেচবে তা ভগাই জানে! বাজারে এর যে মারাত্মক প্রভাব পড়বে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। এর মধ্যে ফেসবুকে বৃষ্টি নিয়ে টিপ্পনি পড়তে বেশ লাগছে!’
মিগজাউমের প্রভাব এ রাজ্যেও। দক্ষিণ বঙ্গের অধিকাংশ জেলায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিতে ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ধান, আলু ও সবজি চাষে। চিন্তায় চাষিরা।
প্রসঙ্গত, অন্ধপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুতে তাণ্ডব চালিয়ে গভীর নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে ঘূর্ণিঝড় মিগজাউম।এর প্রভাবে ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিতে ক্ষতির সম্মুখীন চাষিরা। রবি মরশুমে আমন ধান উঠতে শুরু করেছে। পাকা ধানে অকাল বর্ষণ মই দিয়েছে । সেই সঙ্গে শীতের অর্থকরী ফসল আলু বসানোর কাজও চাষিরা শুরু করেছে। নিচু জমিতে জল জমায় বসানো আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এছাড়া সবজি নষ্ট হতে পারে। চিন্তায় চাষিদের মাথায় হাত। অধিকাংশ চাষি ধারদেনা করে রবি মরশুমে চাষ করছেন। অকাল বর্ষণে ক্ষতির সম্মুখীন চাষিরা।
উল্লেখ্য, এ রাজ্যের দক্ষিণ ২৪ পরগনা, ঝাড়গ্ৰাম, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া ও নদীয়া জেলা গত দু-দিন ধরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ফলে চাষিদের চরম ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাকা আমন ধান ও খড় যেমন নষ্ট হবে, সেইসঙ্গে নিচু জমিতে বসানো আলু পচে যেতে পারে। এছাড়া এসময় অতিরিক্ত বৃষ্টির ঠাণ্ডা জল সহ্য করতে পারবে না শাকসবজি। এগুলোতে পচন ধরবে। পালং, নটে, মূলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন ও লঙ্কা ইত্যাদি চাষে অসময়ের বৃষ্টি ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা চাষিদের। ব্যাঙ্ক ও মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ করে অধিকাংশ চাষি রবি মরশুমে চাষ শুরু করেছেন ।এখন কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
আরামবাগ মহকুমা কৃষি আধিকারিক বিকাশ দে বলেন, রবি মরশুমে আমন ও আলুর পাশাপাশি সবজির কিছু ক্ষতি হতে পারে। তবে বৃষ্টির জল নিচু জমিতে যাতে না দাঁড়িয়ে থাকে তা চাষিদের দেখতে বলা হয়েছে।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সব ব্লকে আলুর জমি জলের তলায় চলে যাওয়ায় চাষ সম্পূর্ণ ভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। চাষের জন্য তৈরি জমিতে জল জমে যাওয়ায় এখন আলু লাগানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পরবে। চড়া দামে চাষের উপকরণ কিনে চাষ নষ্ট হওয়ার কারণে চাষিরা পথে বসেছে। গত বছর আলুর দাম পরে যাওয়ায় বিঘা প্রতি চাষে ২০-২৫ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছিল। এ বছরের বিপর্যয় চাষিকে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছে। গড়বেতা-১,২,৩, চন্দ্রকোনা-১, চন্দ্রকোনা-২, শালবনি, কেশপুর, মেদিনীপুর সদর ব্লক সহ অন্যান্য ব্লকের।
এই অকাল বৃষ্টিতে ডাল শস্য, কলা, পান, আলু বিভিন্ন চাষে ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন চাষিরা। বিশেষ করে এখন জমিতে মুসুর তোলার সময় হয়ে গিয়েছে। মুসুর চাষে খুব ক্ষতি হয়ে যাবে। অন্য ডাল শস্যেরও প্রচুর ক্ষতি হবে। এই অকাল বৃষ্টিতে শুধু আলু চাষ নয়, পান-সহ ডাল শস্যের প্রচুর ক্ষতি হয়ে যাবে। এই বৃষ্টিতে বিঘের পর বিঘে কলা গাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। যা বৃষ্টি হয়েছে তাতে পান চাষেও লাভ করা যাবে না। এলাকায় প্রচুর পানের বরজ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ব্লকের সহ কৃষি অধিকর্তা বলেন, অসময়ে বৃষ্টি হলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। তাতে কৃষকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমরা চাষিদের কৃষি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বলেছি। এই বৃষ্টির পরে কোনও জমিতে কি করতে হবে চাষিরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তা বলে দেওয়া হবে।
এদিকে অকাল বর্ষণে প্রচুর সবজি নষ্ট হবে। এজন্য সবজির দাম পরতে পারে বলে চাষিরা জানাচ্ছেন।