| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘আনইউজড্ ডায়রীর পাতা’

Reporter
মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য / ১০৮৮ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৩

“এই পিউদি, আমার জন্যে একটা ছেলে দেখ না গো, বিয়ে করব।” রাইয়ের কথায় চমকে তাকায় পিউ।

“কি গো, দেখবে না?” বলেই পিউর গলা জড়িয়ে ধরে রাই।

হঠাৎ এমন আব্দারের কি জবাব দেবে বুঝতে না পেরে পিউ মিষ্টি করে হাসে। ওর গালে একটা চুমু খেয়ে চঞ্চল প্রজাপতির মতো রাই চলে যায় একটু দূরের টেবিলে বসা নীলাদ্রির কাছে।

পিউ এই দলে নতুন। আজ নিয়ে দ্বিতীয়বার দেখা হল সবার সাথে।

মলয় মুখার্জ্জী সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়তে চেয়ে সমমনস্ক কিছু মানুষকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন ‘জীবনধারা’ নামের দল। স্বল্প পরিচয়েও পিউ বুঝতে পেরেছে যে এখানে যাঁরা আছেন তাঁরা সবাই নিজ নিজ গুণে অনন‍্যসাধারণ। অনেকের মধ্যেই স্নিগ্ধ রূপে চোখ টানে পারমিতা বসু। যাঁর কথাকলি নাচ মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়। আছে নীলাদ্রি রায়; ওর ভরাট গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত মনকে ভরিয়ে তোলে। আছে রাই বর্মণ। হাসিমজায় দলকে চনমনে রাখতে ওর জুড়ি মেলা ভার।

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের কোলে বেড়ে ওঠা রাই পাহাড়ী নদীর মতোই উচ্ছল, আর একটু খাপছাড়াও বটে। কলকাতার একটা নামী কলেজের ইংরেজী সাহিত্যের অধ‍্যাপিকা রাইয়ের সাথে থ্রি-কোয়ার্টারস্ প‍্যান্টের ওপর নাভি বের করা শর্ট কুর্তি পরিহিতা নাকের মাঝখানে নোলক ঝোলানো ‘জীবনধারা’র রাইকে ঠিক যেন মেলানো যায় না।

কিন্তু প্রথমদিনের আসরে ওর একাঙ্ক নাটক আর খোলা গলার গান সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।

“এই নীলাদ্রি প্রেম করবি আমার সঙ্গে?” পারমিতার পাশে দাঁড়িয়ে নীলাদ্রিকে কথা ছুঁড়ে দেয় ও।

ওকে আলগা চাঁটি মেরে পারমিতা বলে, “তোর কি লজ্জাশরম বলে কিচ্ছুটি নেই রাই? তুই কি জানিস না, ও বিবাহিত?”

“তাতে কি?” রাইয়ের সপাটে উত্তর “আমি তো ওকে বিয়ে করতে চাইছি না, শুধু দু-একমাস না হয় আমার সঙ্গে প্রেম করল, একটু ফুচকা খেল, দুটো ভালোবাসার কথা বলল।” বলেই নীলাদ্রির দিকে ঘুরে তাকায়। বলে, “কি রে নীলাদ্রি, রাজী তো?”

পিউর এসব দুঃসাহসী কথার উত্তর না দিয়ে নীলাদ্রি মুচকি হেসে মুখটা নামিয়ে নেয় টেবিলের দিকে।

পিউ হইহই করে ওঠে, “এইরে, নীলাদ্রি লজ্জা পেয়ে ব্লাশ করছে!” তারপর সবার থেকে একটু দূরে সরে গিয়ে প‍্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করে ধরিয়ে হাওয়ায় ধোঁয়ার রিং ছুঁড়তে থাকে। পারমিতা কটমটিয়ে তাকায় ওর দিকে। রাই হেসে ফেলে। ঠোঁটে সিগারেট ঝুলিয়ে কান ধরে ওঠবোস করতে করতে বলে, “সরি পারমিতাদি, কিন্তু মগজে ধোঁয়া না দিলে বুদ্ধি খোলে না যে! আর তোমরা তো আমার জন্য একটা হ‍্যাণ্ডু-বরও খুঁজে দিচ্ছ না; যার কাছ থেকে একটু বুদ্ধি ধার করতে পারি।”

সিগারেট ফেলে পারমিতার পাশে এসে বসে রাই। পারমিতা ওকে বোঝাতে থাকে, “দেখ্ রাই, তুই যেটাকে মজা বলে মনে করছিস সেটা কিন্তু অন‍্যকে দুঃখও দিতে পারে।”

“মানে?” রাই জিজ্ঞাসা করে।

—”তুই তো আগের মিটিংয়ে নীলাদ্রির বউকে দেখেছিস। যথেষ্ট ডিগনিফায়েড এবং রিজার্ভড্ মহিলা। তুই কি চাস যে তোর জন্য ওদের মধ্যে ঝামেলা হোক!”

—”অতশত বুঝি না পারমিতাদি। শুধু এটুকু বুঝেছি যে উনি গোমড়াথেরিয়াম। হাসলে ট‍্যাক্স দিতে হয়। আর কারুর দাম্পত্যে কাঠি আমি কখনোই করব না।” হো হো করে হেসে ওঠে রাই। চিৎকার করে বলে, “নীলাদ্রি, তুই ক‍্যানসেল। তোর বউকে বলে দিস আমার জন্য তোদের ডিভোর্স হবে না।”

এমন সস্তা ইয়ার্কি বড়ই বিরক্ত লাগে নীলাদ্রির। মুখ ঘুরিয়ে নেয় ও।

পিউ অনেকক্ষণ ধরে রাইয়ের কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এবার জিজ্ঞাসা করে, “রাই, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”

রাই ঘেঁষে আসে পিউর কাছে। বলে, “পিউদি, আমি একদম একা গো। আমার আগে পিছে কেউ নেই। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছি, বাবা আবার বিয়ে করে নতুন সংসার নিয়ে ব‍্যস্ত। সেইজন্যই আমি সবাইকে আপন ভেবে বড় আঁকড়ে ধরি গো।”

রাইয়ের কথাগুলো পিউকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিল। সস্নেহে রাইয়ের মাথায়, পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “ভেতরের ভালোবাসার টলটলে মনটাকে বড় যত্নে রাখিস রে, এভাবে না বুঝেসুঝে ভালোবাসার বন্ধ ডালা খুলতে নেই।”

মাথা নীচু করে রাই। বলে, “আমি যে ভালোবাসার বড়ই কাঙাল গো। তাইতো এমন আদেখলেপনা আমার!”

“কিন্তু তুই যেদিকে হাত বাড়াবি সেদিকটা কেমন সেটা তো আগে যাচাই করে নিবি!” পিউ বোঝায় রাইকে।

—”মানে?”

“তুই হয়তো মজা করছিস নীলাদ্রির সাথে, কিন্তু তুই কি জানিস ওর ভেতরের সুখদুঃখের কথা?”

রাই অবাক চোখে পিউর দিকে তাকায়। পিউ সকলের কান বাঁচিয়ে বলে, “নীলাদ্রি আমার পাশের বাড়ির ছেলে, তাই জানি যে ওর বউ কনসিভ করলেও জাইগোট ধরে রাখার ক্ষমতা নেই, তাই এখন ওরা হন‍্যে হয়ে গর্ভ খুঁজছে সারোগেসির জন্য। এবার তুই-ই বল্, তোর মতন এমন সুন্দরী সপ্রতিভ মেয়ে যদি বারবার ওর সামনে প্রেম নিবেদন করে তাহলে সেটা কি ওর মানসিক স্বাস্থ‍্যের জন্য ঠিক?

রাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “ঠিকই বলেছ পিউদি, ওদের দাম্পত্য জীবন সুন্দর রাখতেই হবে।”

“দ‍্যাটস্ গ্ৰেট।” পিউ রাইয়ের পিঠ চাপড়ে দেয়।

***

প্রায় মাসখানেক ধরে জীবনধারার হোয়াটসঅ্যাপ গ্ৰুপে রাইয়ের পাত্তা নেই। দিনকয়েক আগে আসন্ন বসন্ত উৎসবের অনুষ্ঠানসূচী ঠিক করার জন্য মলয় মুখার্জি মিটিং ডেকেছিলেন। সেখানেও রাই অনুপস্থিত। পারমিতা আর পিউ বেশ কয়েকবার ফোন করেও ওকে পায়নি। ফোন সুইচড্ অফ্। নীলাদ্রি অবশ্য বলেছে, “তোমরা রাইকে নিয়ে বৃথাই চিন্তা করছ। দেখ, ও হয়তো কারুর ঘাড়ে চেপে সুইজারল্যাণ্ডে এখন হনিমুন পর্ব সারছে।” তবুও হাসিখুশি মেয়েটার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে সবাই চিন্তিত।

***

রাইয়ের কথা

কয়েকদিন ধরে কাশি আর জ্বর। ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট পেলাম। কোভিড পজিটিভ। করোণা আমাকে নিরিবিলিতে নিজের মুখোমুখি বসার সুযোগ করে দিল। ল‍্যাব থেকে রিপোর্টটা নিয়ে আসার সময়ই একটা নতুন সিমকার্ড কিনে এনেছিলাম। এখন থেকে কয়েকটা দিন সময় আমার ইচ্ছেতে চলবে। ফোন থেকে আগের সিমকার্ড বের করে নতুন সিমকার্ড লাগিয়ে নিয়েছি। আমার প্রয়োজন আর ইচ্ছেতেই বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। আজ আমি নিজের ইচ্ছেতেই একলা শুধুমাত্র আমার। মাকে তো ভালো করে মনেও পড়ে না, একটা আবছায়া হাসিমুখ মনের মধ্যে উদয় হয়েই চকিতে মিলিয়ে যায়। তবুও আজ মায়ের কথা বড়ই মনে পড়ছে।

সেই কোন্ ছোটবেলা থেকে বাড়িছাড়া; হোস্টেলে বড়ো হওয়া, তারপর চাকরি, নিজের মতো করে নিজের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেওয়া। মা মারা যাওয়ার পর পরিবার, বাড়ি এসব কিভাবে যেন আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। তবে হ‍্যাঁ, আমার বেশকিছু ঋণ আছে, আমার জন্মদাতার কাছে। ঠিকই, আমার জন্মদাতা, বাবা নন; যিনি সময়মতো টাকা জুগিয়েছেন হোস্টেলের, বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়েছেন। হ‍্যাঁ, তিনি বাবা নন, কখনও ভালোবেসে কাছে টানেননি। হোস্টেলের ছুটিতে আমাকে বাড়িতে না নিয়ে এসে মামাবাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁর কাছে আমার আমার ঋণ অপরিসীম। আমি রোজগার করা শুরু করার পর থেকে প্রতি মাসে তাঁর এ্যাকাউন্টে কিছু টাকা পাঠিয়ে দিই, এভাবে আর্থিক ঋণ হয়তো একদিন মিটে যাবে, কিন্তু জন্মঋণ, তা কি শোধ করা সম্ভব!

নানান এলোমেলো চিন্তা আর হোম ডেলিভারীর ভরসায় দিন পনেরোর মধ্যেই বেশ সুস্থ হয় উঠেছি। তারপর থেকে টুকটাক শপিং করে আর গান শুনে, বই পড়ে দিব‍্যি সময় কেটে যাচ্ছে। কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছিলাম একমাস। ছুটিও শেষের মুখে। আরও একটু বেহিসেবী জীবন কাটাতে আরও পনেরোদিন ছুটি বাড়িয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমার ইচ্ছের বহর শুনে বোধহয় অলক্ষ্যে নিয়তি হেসেছিল। নিজের ছন্দে ফিরতে আজ ফোনে আগের সিমকার্ড লাগিয়েছি। সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোন বেজে উঠল। হাতে নিয়ে দেখি আমার জন্মদাতা ফোন করেছেন। মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। মনে পড়ল, আমার জন্মদাতা শেষ ফোন করেছিলেন প্রায় বছর দুয়েক আগে, আমি চাকরি পাওয়ার পর। বলেছিলেন, “এবার আমার মুক্তি।” সেদিন ফোন রেখে অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছিলাম। চোখের জলে তাঁকে মন থেকে মুছে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম।

***

অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাই ফোনটা ধরে। ফোনের ওপার থেকে অপরিচিত কন্ঠ বলে, “রাই, তোমার বাবা কোভিড আক্রান্ত। হাসপাতালে ভর্তি আছেন। রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা খুবই কমে যাওয়ায় ডাক্তার প্লাজমাথেরাপির কথা বলেছেন। একমাত্র করোণা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষই পারে প্লাজমাথেরাপিতে সাহায্য করতে। তোমার জানা এমন কোনো মানুষ যদি সাহায্য করতে চান তাহলে জানিও।” হঠাৎ এমন ফোনে রাই খানিকটা অবাক হয়। কন্ঠস্বর অপরিচিত হলেও যেহেতু ফোনটা ওর বাবার নম্বর থেকে এসেছে তাই নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে কঠিন স্বরে বলে, “সাহায‍্যপ্রার্থীকে রাই কখনো ফেরায় না, দেখি কি করতে পারি!” ফোন কেটে দেয় ও।

সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ও। জানতে পারে যে প্লাজমা ডোনেট করলে করোণা থেকে সুস্থ হওয়ার পর ওর শরীরে তৈরী হওয়া এ্যান্টবডি করোণা আক্রান্তকে সুস্থ হতে সাহায্য করবে। তৎকাল টিকিট কেটে রাতেই চেপে বসে ট্রেনে। পরদিন সকালে সোজা উত্তরবঙ্গ হাসপাতালে। সেখানে ডাক্তারের সাথে কথা বলে সমস্ত ফর্মালিটিজ পূরণ করে প্লাজমা ডোনেট করে। কয়েকটাদিন হাসপাতালের কাছাকাছি হোটেলেই থাকে। ফোনে ডাক্তারের থেকে খবরাখবর নিলেও বাবার মুখোমুখি হয় না ও। যখন শোনে যে ওর বাবা জীবনের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠেছেন তখনই ও কলকাতায় ফিরে আসে। মনে মনে বলে, “জন্মঋণ চ‍্যাপ্টার ক্লোজড্।

এতদিন পর গতানুগতিক জীবনে ফিরে আজ ভারি হালকা লাগছে। নিজেকে আরও বেশি করে ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে রাইয়ের। আর এই জীবনের ভালোবাসার সাথে জড়িয়ে রয়েছে “জীবনধারা” দলের সব সদস্য। রাই ফোন করে পিউকে। এতদিন পর রাইয়ের ফোন পেয়ে পিউ উত্তেজিত, “কি রে মুখপুড়ি, এমন করে আমাদের ভোগাতে হয়! কোনও খবর না দিয়ে কোথায় উধাও হয়েছিলি?”

রাই কলকল করে ওঠে, “তোমাদের জ্বালাতে না পারলে যে সগ্গে গিয়েও শান্তি পাব না পিউদি। শুধু কয়েকটাদিন সময় নিয়েছিলাম গো নিজেকে একটু চেনার জন্য; আবার তো ফিরেই এলাম তোমাদের কাছে। যাক্ সেসব কথা। আমার নীলিদ্রির কি খবর বলো।”

“আবার ফচকেমি শুরু করলি?” কপট ধমক দেয় পিউ।

“রাগ কোরো না পিউদি” রাই বলে, “আসলে ওদের সমস্যার কোনও সমাধান হল কিনা সেটাই জানতে চাইছিলাম। ওরা কি সারোগেট মাদার পেয়েছে?”

“সঠিক জানিনা রে রাই, নীলাদ্রির বউ নিজে থেকে যতটুকু বলে সেটুকুই শুনি; আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করতে ভয় হয় রে, সবসময় সতর্ক থাকি যাতে আমার কথায় ও কোনোভাবে কষ্ট না পায়। তবে কথা শুনে মনে হয় এখনও তেমনভাবে কিছু পায়নি। সেসব কথা থাক, সামনেই তো গ্ৰুপের বসন্ত উৎসব। কি করবি কিছু ঠিক করেছিস?”

“পিউদি, এসব নিয়ে পরে আলোচনা করব। এখন রাখছি।” ফোন কেটে দেয় রাই।

***

রাইয়ের মর্ণিং কলেজ। কলেজ ছুটির পর বেরোনোর আগে আজ ও কতগুলো ফোন করল। বিকেলের টিউশন ক্লাসগুলো ক‍্যানসেল করল।

অফিসে কাজের মাঝে নীলাদ্রি বারবার ইনকামিং ফোনকলগুলো কেটে দিচ্ছে। পাশের টেবিল থেকে শ‍্যামল চেঁচিয়ে উঠল, “কি ভায়া, এই নিয়ে তো সাতবার হল! ফোন কেটে দিলেই কি পার পাবে? এটাই তো সাতপাকে বাঁধা জীবনের অমোঘ সত‍্য হে।”

“না ভাই, বউয়ের ফোন নয়, উটকো ফোন, বড্ডো জ্বালায়।” বলতে বলতেই নীলাদ্রির হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ ঢুকলো, “প্রেম নয়, জরুরী দরকার। একটা ফোন কর।”

রাইয়ের এহেন মেসেজে একটু ধাঁধায় পড়ে নীলাদ্রি। যে মেয়েটা দেখা হলেই লেগপুল্ করতে ব‍্যস্ত হয়ে পড়ে, তার জরুরী দরকার? নানান দোনামোনার মধ্যেই রাইকে ফোনটা করে ফেলে ও।

ফোনটা রিসিভ করেই রাইয়ের চিরাচরিত উচ্ছ্বসিত গলা, “ওফঃ শেষপর্যন্ত পাত্তা দিলি তাহলে! আজ একবার দেখা করতে পারবি?”

“আজ তো আমাদের গ্ৰুপ মিট্ নেই” নিরাসক্ত গলা নীলাদ্রির।

“আরে মাথামোটা, গ্ৰুপের কথা হলে তো সেখানেই লিখতাম। আজ তুই একা আমার সঙ্গে দেখা করবি।”

নীলাদ্রি শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলে, “আমার সময় হবে না রে।”

নীলাদ্রির কথায় রাইয়ের মেজাজ চিরবিরিয়ে ওঠে; বলে, “দেখ্ নীলাদ্রি, অতো ভাও খাস না, প্রেম করতে ডাকিনি তোকে। বিশেষ দরকার আছে বলেই দেখা করতে বলছি। যদি না আসিস তাহলে আজ সন্ধ‍্যেয় তোর বাড়িতে চলে যাব। আর আমাকে তো তুই জানিস, তোর ঠিকানা জোগাড় করতে আমার অসুবিধে হবে না।”

“কেলো করেছে” নীলাদ্রি মনে মনে ভাবে। বাড়িতে গেলেই তো বউয়ের হাজারো প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে, তার চেয়ে বাইরের ঝঞ্ঝাট বাইরে মিটিয়ে ফেলাই ভালো। মুখে বলে, “জানি তো তুই কি চীজ্! বল্ কখন কোথায় যেতে হবে।”

—”এখন বেরোতে পারবি?”

“এক্ষুণি তো হবে না রে, তবে আফটার লাঞ্চব্রেক হতে পারে।”

“ঠিক আছে, তিনটের সময় তোর অফিসের পাশে মুঘলি-আজম রেস্টুরেন্টে তোর জন্য অপেক্ষা করব। চলে আসিস।” ফোন কেটে দেয় রাই।

***

“কি রে, দশমিনিট ধরে তো কোল্ডকফির স্ট্রটা নাড়াচাড়া করেই চলেছিস, এভাবে হঠাৎ ডাকলি কেন সেটা তো বল্।” নীলাদ্রি অধৈর্য্য হয়। বলে, “যদি খেতে না ভালো লাগে তাহলে খাস্ না, কিন্তু…”।

রাই স্থির চোখে নীলাদ্রিকে দেখে। নীলাদ্রি মনে মনে শিউরে ওঠে, এই রাই তো ওর অচেনা।

রাই ধীর স্বরে বলে, “আজ কোনও পাগলামি করব বলে তোকে ডাকিনি, বরং একটা জিনিস তোকে ধার দেব বলে ডেকেছি। অবশ্য তুই যদি নিস।”

“এসব কি হেঁয়ালি করছিস? আমার তো কোনোকিছু ধার নেওয়ার প্রয়োজন নেই।” নীলাদ্রি খানিকটা উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

রাই শান্ত স্বরে বলে, “আছে নীলাদ্রি। আমি তোর সমস্যার সবটা জানি রে। তুই বন্ধু হিসেবে আমাকে বিশ্বাস করতে পারিস। দেখ্ নীলাদ্রি, আমি এক্সট্রোভার্ট টাইপের মেয়ে, ফ্লার্ট করতে ভালোবাসি; আর তোর মতো হ‍্যাণ্ডু দেখলে তো মজা করতে ভালোই লাগে; কিন্তু কখনোই কারুর ব‍্যক্তিজীবনকে বিপর্যস্ত করে নয়। আমি জীবনে অনেককিছু পেলেও মা-বাবাকে একসাথে নিয়ে পরিপূর্ণ সংসারের স্বাদ কোনোদিন পাইনি। তাই যখন শুনলাম গর্ভ ভাড়া নেওয়ার জন্য সারোগেট মাদার খুঁজছিস, তখনই ঠিক করলাম ভাড়া নয়, বন্ধু হিসেবে তোদের সংসার পূর্ণ করতে আমি আমার গর্ভ তোদের ধার দেব। নিবি তো?” উত্তরের আশায় নীলাদ্রির দিকে তাকিয়ে থাকে রাই।

নীলাদ্রির মুখে কথা জোগায় না। রাইয়ের হাতদুটো চেপে ধরে ও।

ওর অবস্থা দেখে হো হো করে হেসে ওঠে রাই। বলে, “প্রেম করতে বললে তো ব্লাশ করিস আর এখন ভেবলে গেলি! তুই একেবারেই যাচ্ছেতাই।”

নীলাদ্রি কোনোরকমে বলে, “এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত নিস্ না রাই। তোর ভবিষ্যৎ আছে।”

“আরে নীলাদ্রি, আমার জীবন তো আনইউজড্ ডায়রীর পাতা। অতীত নেই, ভবিষ্যৎ অজানা; আছে শুধু এক ছন্নছাড়া বর্তমান। ওসব নিয়ে বেফালতু চিন্তা করিস না। এবার তো তোর বউয়ের সাথে কথা বলতে হবে। চল্।” উঠে দাঁড়িয়ে নীলাদ্রির চুলগুলো হাত দিয়ে ঘেঁটে দেয় ও।

নীলাদ্রি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। সেই সস্তা-টাইপের মেয়েটা এই মুহূর্তে যেন ঐশ্বর্যময়ী রাজভিখারিণী।।

আপনার মতামত লিখুন :

8 responses to “মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘আনইউজড্ ডায়রীর পাতা’”

  1. অরুন্ধতী বসু says:

    মৌসুমী , গল্পটা পড়ে খুব ভালো লাগলো । সত্যি কোনো মানুষের মধ্যে কতখানি মানবিকতা আছে তা পরিস্থিতি বুঝিয়ে দেয় ।

  2. Sumitra Chatterjee says:

    Asadharon laglo vai vlo thakis ????????

  3. Kakoli Chatterjee says:

    Liked the story… truly touched. ..A book should not be judged by it’s cover only…

  4. Bandana Banerjee says:

    Khub valo laglo golpo ta pore. Mon chuye galo. Erokom sundor lekha aroo porte chaai.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev