যোগীগড়ের মসনদ দখল নিয়ে ইতিমধ্যেই দামামা বেজে গিয়েছে। ২০২২ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে শুরু হয়েছে চূড়ান্ত কাউন্টডাউন। গোবলয়ের রাজনীতি ঘিরে এখন তপ্ত লখনউয়ের অট্টালিকা থেকে কানপুরের চায়ের দোকান। হাইভোল্টেজ এই নির্বাচনে একদিকে পারদ তুঙ্গে রেখেছেন বিজেপির যোগী শিবির, অন্যদিকে অখিলেশ, মায়াবতী, প্রিয়াঙ্কাসহ একাধিক বিরোধী শিবিরের নেতানেত্রীরা। সবারভিতরেই এই মুহূর্তে একটাই প্রশ্ন, ২০২২ সালে কে দখল করবে উত্তরপ্রদেশের তখত?
উত্তরপ্রদেশে এবারের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে কি বিজেপি ফের একবার সরকার গড়বে। নাকি উত্তরপ্রদেশের তখত এবার সমাজবাদী পার্টির অখিলেশের কাছে ফিরে আসবে। বিজেপি-সপাকে ঘিরে উত্তরপ্রদেশের ভোট ময়দানে বওয়া ‘কাঁটে কি টক্কর’ হাওয়ায় চাপে পড়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।
ভোটের বাজার শুরু হতেই উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ ক্রমশ বদলে যেতে শুরু করেছে। ভাঙন শুরু হয়েছে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের শিবিরে। যোগী সরকার দলিত এবং অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য কিছুই করছে না, এমন অভিযোগ তুলে প্রথমে বেড়িয়ে যান স্বামী প্রসাদ মৌর্য। মৌর্য ইস্তফা দেওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই বান্দার তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে পদ্ম শিবিরের সদস্যপদ ছাড়েন তিন্দওয়ারি বিধানসভার বিধায়ক বৃজেশ কুমার প্রজাপতি এবং বিলাহুরের বিধায়ক ভাগবতী সাগর। তারপর বিধুনার বিধায়ক বিনয় শাক্য ও তিলহার শাহজানপুরের বিধায়ক রোশন লাল ভার্মা একাধিক নেতাদের নিয়ে দলত্যাগ করেন। এরপর দারা সিং চৌহানও মন্ত্রিত্ব থেকে ইস্তফা দেন।
উদেশের সর্ববৃহত রাজ্য উত্তরপ্রদেশে সাত দফার ৪০৩ আসনের এই নির্বাচনে যদি বিজেপি জিততে পারে তাহলে সে রাজ্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে যোগী আদিত্যনাথ একটি রেকর্ড গড়বেন। কারণ এর আগে পাঁচবছরের মেয়াদ পূরণ করে কোনও মুখ্যমন্ত্রী এই রাজ্যের মসনদে ফিরে আসেন নি। বিজেপি কিছুদিন আগে পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশে সেই রেকর্ড গড়ার জন্য ঘুঁটি সাজাচ্ছিল। কিন্তু এখন গেরুয়া শিবিরের সেই অঙ্ক মেলাতে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে যোগী রাজ্যের বিধায়ক ও মন্ত্রীদের দলত্যাগ। বিজেপির ধর্মীয় লাইনকে স্মনে রেখে যোগীও উত্তরপ্রদেশের ভোটারদের ৮০ বনাম ২০ শতাংশে বিভাজন করে নির্বাচনে বাজি মাত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু গেরুয়া শিবির ছেড়ে দলিত নেতারা সমাজবাদী পার্টিতে যোগ দিয়ে সেই হিসাব অনেকটাই ভেস্তে দিয়েছে। যদিও পদ্ম থেকে পাপড়ি খসায় নতুন এক অঙ্কের সম্ভাবনাও রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ভোটে বিজেপি উত্তরপ্রদেশের চিরকালীন জাতপাতের অঙ্ক থেকে সরে এসে হিন্দুদের একাট্টা করে লড়েছিল। তার আগে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক ছিল উচ্চবর্ণ ও ব্রাহ্মণরা। কিন্তু সেবার বিজেপি দলিতদেরকেও নিজেদের পক্ষে আনতে সক্ষম হয়েছিল, এমনকি অখিলেশের যাদবের জাট ভোটব্যাঙ্কেও থাবা বসাতে সমর্থ হয়েছিল। কিন্তু হালে এই দলিত মন্ত্রী-বিধায়করা দল ছাড়ায় উত্তরপ্রদেশে বিজেপির জাতপাত নিয়ে অঙ্ক বেশ কিছুটা ঘেঁটে গেল। যদিও উত্তরপ্রদেশের ভোটের প্রেক্ষিতে এই সম্প্রদায় শতাংশে সামান্য কিন্তু তাহলেও দলত্যাগী বিধাযকরা পূর্ব উত্তরপ্রদেশে বিজেপি গড়ে ফাটল ধরাতে পারে।
উত্তরপ্রদেশে যোগীমন্ত্রিসভা ও পদ্ম শিবিড় ছেড়ে যাওয়া বিধায়করা ইতিমধ্যে সাইকেল শিবিরে ভিড়েছেন। সমাজবাদী পার্টি স্বামী প্রসাদ মৌর্য, দারা সিং চৌহান, ধরম সিং সাইনির হাত ধরে বিজেপির ওবিসি ভোট ব্যাঙ্কে থাবা বসাতে চাইছে। দলিত-অনগ্রসর শ্রেণির ভোটব্যাঙ্কের ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে যোগী আদিত্যনাথ মকর সংক্রান্তির দিন এক তফসিলি বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজ করে দলিত দরদী ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করলেও গোরক্ষপুরে যোগী আদিত্যনাথকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নির্বাচনে লড়াইয়ের ঘোষণা করছেন ভীম আর্মির নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ। তিনি উত্তরপ্রদেশে দলিত নেতা হিসেবে বেশ জনপ্রিয়।
চিরকালই গোরক্ষপুর বিজেপির গড় হিসেবে পরিচিত। বিগত কয়েক দশক ধরে বিজেপি এই আসনটি জিতে এসেছে। যোগী গোরক্ষপুরেরই পাঁচবারের সাংসদ। তিনি গোরক্ষনাথ মঠেরও প্রধান। সেখানে চন্দ্রশেখরের চ্যালেঞ্জকে দলিতরা সমর্থন করে বিজেপির বিরুদ্ধে ভোট দিতেই পারে। উল্লেখ্য, আজদ নিজে অখিলেশের সঙ্গে জোট গড়তে ইচ্ছুক থাকলেও পরবর্তীতে আসন সমঝোতা না হওয়ায় জোটের আলোচনা ভেস্তে যায়।
এদিকে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভুয়ো প্রচার করে বিপাকে পড়েছে বিজেপি। নারী নির্যাতন, করোনা কালে যোগীর ভূমিকা- এমন আরও বহু বিষয় নিয়ে ইতিমধ্যেই চাপে আছেন মুখ্যমন্ত্রী। এরপর যোগী সরকারের ওপর নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে মেডিক্যাল কমিশন অফ ইন্ডিয়া। যোগী দাবি করেছেন উত্তরপ্রদেশে তিনি ৩২ টি মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করেছেন। মেডিক্যাল কমিশন অফ ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, এই তথ্য মিথ্যা।আরটিআয়ের উত্তর অনুযায়ী ২০১৭ সালে যখন যোগী উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসে তখন সেখানে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ছিল ৪৫। ৩১ জুলাই ২০২১ পর্যন্ত উত্তরপ্রদেশে মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা ৫৪। যার অর্থ যোগী সরকার গত পাঁচ বছরে মাত্র নয়টি মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করেছে।
যোগী সরকার সংবাদপত্রে পৃষ্ঠাজুড়ে বিজ্ঞাপন দিয়ে তাঁর উন্নয়নের যে চিত্র তুলে ধরেছে, তা অত্যন্ত মিথ্যা। মানুষ ভুলে যায়নি যে বিআরডি মেডিক্যাল কলেজে (গোরখপুর) শত শত শিশু মারা গিয়েছিলেন অক্সিজেনের অভাবের কারণে। ফলত; ভোটের আগে নিজের রাজ্যে যোগী পড়েছেন মহা চাপে।
আদ্যন্ত বিশ্লেষণধর্মী রাজনৈতিক প্রতিবেদন।