কিছুদিন আগে উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে রুখতে মমতা ম্যাজিকেই আস্থা রাখার কথা জানিয়েছিলেন সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির প্রেসিডেন্ট ওম প্রকাশ রাজভড়। বিজেপি-যোগী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বিজেপি বিরোধী নেতার ওই ডাকে মমতা সাড়া দিয়ে সে রাজ্যে লড়াই করতে অগ্রসর হবেন কিনা সে প্রশ্নের উত্তরদেবে সময়। তবে একুশের বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে পরাস্ত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃণমূলের ফের ক্ষমতায় আসা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃতীয়বারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়া যে দেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই।
প্রসঙ্গত, বাংলায় একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ‘খেলা হবে’ স্লোগানকে হাতিয়ার করে মোদী বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছিল মমতা ও তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে পাল্টা খেলায় নেমে হুঁশিয়ারিও দিতে ছাড়েনি বিজেপি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই খেলায় হেরে মোদী-শাহের বিজয়রথ থেমে যায় বাংলায়। মমতা তথা তৃণমূলের সেই লড়াই আজ প্রায় গোটা দেশেই মোদি বিরোধি যুদ্ধকে পথ দেখাচ্ছে। বাংলায় ‘খেলা হবে’ স্লোগানের বিপুল সাফল্যের পর এবার উত্তরপ্রদেশও অনুপ্রাণিত সেই স্লোগানে। বাংলার আদলে তাদের ভোজপুরি ভাষায় পড়ল সমাজবাদী পার্টির ‘খেলা হই’ পোস্টার। বাংলায় বিজেপিকে ধূলিস্যাৎ করতে তৃণমূল আওয়াজ তুলেছিল ‘খেলা হবে’। এবার সেই আওয়াজ ধার করেই কোমর বেঁধে নামতে নেমেছে সমাজবাদী পার্টি। বাংলা থেকে ধার করে ‘অব ইউপি মে খেলা হই’ স্লোগানকে হাতিয়ার করেছে তারা।
২০২২-এ উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন। সে রাজ্যে ইতিমধ্যেই বেজে গিয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের দামামা। নির্বাচনী ঘুঁটি সাজাতে ময়দানে নেমে পড়েছে শাসক বিরোধী সবপক্ষই। কয়েক মাস আগেই পঞ্চায়েত নির্বাচন হয়েছে উত্তরপ্রদেশে। সেই নির্বাচনে সপা বিজেপিকে পেছনে ফেলে এক নম্বর দল হয়েছে। তার পরেই আগামী বছরের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের জন্য ব্যাপক ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছে তারা। অখিলেশ জানিয়েছেন, যোগী আদিত্যনাথের সরকারকে চ্যালেঞ্জে ফেলতে প্রস্তুত তাঁর দল। জানা গিয়েছে বাংলা ‘খেলা হবে’ থেকে ‘খেলা হই’ স্লোগানটি লিখেছেন সমাজবাদী পার্টির নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক আব্দুল সামাদ আনসারি। এমনকী রাজ্যে সমস্ত সপা নেতা যাতে এই স্লোগান ব্যবহার করেন সেই অনুরোধ তিনি করেছেন অখিলেশ যাদবের কাছে।
বোঝাই যাচ্ছে তৃণমূলের স্লোগান থেকে ভোজপুরি ভাষবায় অনুদিত স্লোগান বানানো হয়েছে দলীয় কর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করতে। এই প্রসঙ্গেই সপার এক নেতা বলেন, তারা এই স্লোগান লেখা হোর্ডিং কানপুর শহরে ছড়িয়ে দিয়েছেন। কারণ খেলাটা শুরু হবে সেখান থেকেই। বাংলায় মমতা ও তৃণমূল যে স্লোগান ব্যবহার করে ফল পেয়েছে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনেও তারা একই ফল পাবেন। ২০২২-এর উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে কানপুর হোর্ডিং-এ ছেয়ে গিয়েছে- ‘আব ইউপি মে খেলা হোই’ অর্থাৎ এবার ইউপি–তে খেলা হবে। সেই হোর্ডিং-এ সপা সুপ্রিমো অখিলেশ যাদবের ছবি আর সপা–র প্রতীক সাইকেল। এছাড়াও আর দুই স্থানীয় নেতা অভিষেক গুপ্তা এবং ডা. ইমরানের ছবি দেওয়া হোর্ডিং গোটা কানপুর জুড়ে।
বাংলায় খেলা হয়ে গিয়েছে, সেই খেলা কিভাবে জিততে হয় দেখিয়ে দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার খেলা উত্তরপ্রদেশে। সেই বিধানসভা নির্বাচন জাতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে সবসময় গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকাও পালন করে। মোদির বিরুদ্ধে সেই লড়াইয়ের অন্যতম মুখ সমাজবাদি পার্টির অখিলেশ যাদব। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে মোদির বিরুদ্ধে লড়াই জিততে সমাজবাদি পার্টিও মমতার লড়াইকে স্মরণ করছে। শুধু মমতার স্লোগানকে হাতিয়ার নয়, ২০২২-এ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে রুখতে মমতার একক লড়াইকেও তাঁরা মর্যাদা দিচ্ছে। জোটসঙ্গী ছাড়াও যে বিধানসভা ভোটে লড়ে জয় ছিনিয়ে আনা যায়তা প্রমাণ করে দিয়েছেন মমতা। অখিলেশ যাদবও মমতার পথের পথিক হয়েছেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকারে অখিলেশ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে কংগ্রেস এবং মায়াবতীর বসপার সঙ্গে জোটে যোগে যাবে না তাঁর দল। তাঁর বক্তব্য, বিজেপিবিরোধী মানুষের কাছে কংগ্রেস এবং বসপার গ্রহণযোগ্যতা এক্কেবারে তলানিতে। তাই এই দুই দলকে সঙ্গে নিলে সমাজবাদী পার্টিরও আখেরে ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
প্রসঙ্গত, একুশের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় ‘খেলা হবে’-র পাশাপাশি আরও বহু স্লোগান, গান তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেসব ছাপিয়ে গিয়েছে ‘খেলা হবে’। প্রভাবে ও জনপ্রিয়তায় এই স্লোগানের ধারেকাছে আসতে পারেনি সেগুলি। পাশাপাশি একথাও বলা যায় তৃণমূল নেত্রী যখন মঞ্চ থেকে সেই স্লোগান তুলে সারা বাংলায় ছড়িয়ে দেন তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে থাকে অন্য রাজ্যেও। শুধু কি স্লোগান, স্লোগান ছাপিয়ে তাঁর লড়াইয়ের মেথড; যা আজ মোদি বিরোধী লড়াইয়ে সবাইকেই পথ দেখাচ্ছে। যে কারণে বিজেপিকে উচ্ছেদ করতে মমতাকে পাশে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার স্লোগানের আদলেই আওয়াজ উঠেছে।
কংগ্রেস কোনো ব্যাপারই না উত্তরপ্রদেশে। কিছুটা নির্ভর করছে মায়াবতীর ওপর। ওরা বেশি ভোট কাটলেই মুশকিল। আর ওরা যদি সবাই বিজেপির বিরুদ্ধে এক হতো তবে এখনই বলা যায় যে বিজেপি একশোভাগ হারতো। দেখা যাক কী হয়। এখনও সময় আছে। তবে বিজেপি হটুক এটা মনেপ্রাণে চাই।