রাজনৈতিক পালাবদলের পূর্বাভাসের মধ্যেই উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচনের পাঁচ দফা মিলিয়ে প্রায় দুশোর বেশি আসনে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। চতুর্থ দফায় নজরে ছিল উন্নাও-লখনউ-লখিমপুর খেরি। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলির মধ্যে ছিল পিলভিট, সীতাপুর, হারদোই, রায়বরেলি, বান্দা এবং ফতেপুর। রবিবার পঞ্চম পর্বে ভোট হয় ১২ জেলার মোট ৬১ কেন্দ্রে, ৬৯২ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করেন ২ কোটি ২৪ লক্ষ ভোটার। রবিবারের ভোট পর্ব ধর্মীয়, রাজনৈতিক দিক থেকে ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভোট হয় একদিকে রাম মন্দির আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু অযোধ্যায় অন্যদিকে একসময় কংগ্রেসের দুর্গ বলে পরিচিত আমেঠি এবং রায়বেরেলিতে। এছাড়াও পঞ্চম পর্বে উত্তর প্রদেশের সুলতানপুর, চিত্রকূট, প্রতাপগড়, কৌশাম্বি, প্রয়াগরাজ, বারাবাঙ্কি, বাহরাইচ, শ্রাবস্তি এবং গোন্ডা জেলায় ভোটগ্রহণ হয়।
রবিবার পঞ্চম দফায় একধিক হেভিওয়েট প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হয়। হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন রাজ্যের বিদায়ী উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য। তিনি ভোট প্রার্থী ছিলেন কৌশাম্বি জেলার সিরাথু বিধানসভা আসনে। অন্যদিকে, এলাহাবাদ পশ্চিম থেকে সিদ্ধার্থ নাথ সিং, রাজেন্দ্র সিং ওরফে মতি সিং পট্টি (প্রতাপগড়) থেকে। এলাহাবাদ দক্ষিণ কেন্দ্র থেকে নন্দ গোপাল গুপ্তা নদী। রমাপতি শাস্ত্রী মানকাপুর (গোন্ডা) থেকে। এদের পাশে কংগ্রেসের বিধায়ক দলের নেতা আরাধনা মিশ্র মোনা ছিলেন প্রতাপগড়ের রামপুর খাস আসনে। পঞ্চম পর্বে ভোট পড়েছে ৫৯.২ শতাংশ।
এদিন আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে ছিলেন, বিজেপি নেত্রী উমা ভারতী, দলের মহিলা মোর্চা’র রাজ্য সভাপতি প্রেমলতা কাটিয়ার, সমাজবাদী পার্টির সভাপতি মুলায়ম সিং যাদবের ভাই তথা রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শিবপাল সিং যাদব, মায়াবতী ক্যাবিনেটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জয়বীর সিং। একদা বিজেপি এবং সমাজবাদী পার্টির শক্ত দুর্গ হিসেবে পরিচিত মধ্য-দোয়াব ও বুন্দেলখণ্ডের এই জেলাগুলিতে গত লোকসভা নির্বাচনে যথেষ্ট ভাল ফল করেছিল কংগ্রেস। পরবর্তীকালে মুলায়ম-পুত্র অখিলেশ যাদবের ছেড়ে দেওয়া ফিরোজাবাদ লোকসভা আসনের উপনির্বাচনে তাঁর স্ত্রী ডিম্পল যাদবকে হারিয়ে দেন কংগ্রেস প্রার্থী রাজ বব্বর।
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশে এবারের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে অযোধ্যা এবং রামমন্দিরের প্রসঙ্গ বার বার উঠে এসেছে। পঞ্চম দফায় ছিল সেই অযোধ্যা। উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল কোন দিকে যাবে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তা বুঝতে পঞ্চম দফার ভোটকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। কারণ এদিন যেমন ১২টি জেলার ৬১টি কেন্দ্রের ভোটে ৬৯২ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হবে একই সঙ্গে অযোধ্যা-সহ অমেঠী, রায়বরেলী, সুলতানপুর, চিত্রকূট, বাহরাইচ, বরাবাঙ্কি, প্রতাপগড় এবং প্রয়াগরাজ এবং গোন্ডার মতো উল্লেখযোগ্য কেন্দ্রগুলিতে হেভিওয়েট নেতাদেরও ভাগ্য নির্ধারণ হবে। রাজ্যের উপ মুখ্যমন্ত্রী কেশবপ্রসাদ মৌর্য-র আত্মবিশ্বাস রাজ্যে ফের বিজেপি ৩০০-র বেশি আসন নিয়ে ক্ষমতায় ফিরবে। তিনি দাবি করছেন বিজেপি শুরু থেকেই সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি এবং কংগ্রেসের থেকে ভোটের দৌড়ে এগিয়ে রয়েছে। স্বভাবতই ভোটবাক্সে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। উত্তরপ্রদেশে মানুষের সার্বিক সমর্থনে ফের পদ্ম ফুটবে।
উল্লেখ্য, নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তায় ভর করে ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে গেরুয়া ঝড় উঠেছিল, সেই ঝড়ে বিরোধীরা একরকম উড়েই গেছিল। কিন্তু উত্তরপ্রদেশের মানুষ গত পাঁচ বছরে যোগী আদিত্যনাথের সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। এর সপক্ষে একাধিক ঘটনা রয়েছে, তার মধ্যে উন্নাও, হাথরস, ভুয়ো এনকাউন্টার, কোভিড অব্যবস্থা, কৃষকহত্যার মতো ঘটনা মানুষের মনে আজও রয়ে গিয়েছে।
এই অবস্থায় রবিবার উত্তরপ্রদেশের পঞ্চম দফায় প্রায় ৫৪.৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। ভোটের হার সবথেকে বেশি চিত্রকূট, অযোধ্যা, শ্রাবস্তীতে। ২০১২ পর্যন্ত সমাজবাদী পার্টির আধিপত্য ছিল তরাই, বুন্দেলখণ্ড, অবধ ও মধ্যাঞ্চলের এই জেলাগুলিতে। তখন তিন ভাগের দু’ভাগ আসনই জিতেছিল এসপি। তবে ২০১৭ সালে খেলা ঘুরে যায় বিজেপি যাদব ছাড়াও অন্যান্য ওবিসি ভোট টেনে নেওয়াতে। মোটকথা বিজেপি ও তার শরিকরা এই ৬১টি আসনের মধ্যে ৪৫টি আসনেই জিতেছিল।
রাজনীতিকদের ধারণা রবিবার এই ১১টি জেলায় যখন ভোট চলছিল সেই সময় মোদী বস্তি, দেওরিয়া, বারাণসীতে প্রচারে সমাজবাদী পার্টিকেই নিশানা করেন। সেই সঙ্গে রামায়ণের রামের সঙ্গে নিষাদ, শবরদের সম্পর্ক তুলে ধরে অন্যান্য সম্প্রদায়ের ভোট টানার চেষ্টা চালান।
উত্তর প্রদেশের ফলাফল ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনের আগে সেমিফাইনাল। ২০১২ সালের উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপি খারাপ ফল করেছিল। কিন্তু ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনে ফল হয়েছিল কার্যত তার উলটো। এবারও উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে লড়াই মূলত দুটি দলের মধ্যে— বিজেপি এবং এসপি। কংগ্রেস এবং বহুজন সমাজপার্টি তৃতীয় ও চতুর্থস্থানের জন্য লড়াই করছে। এবারও উত্তর প্রদেশে মেরুকরণ আগের নির্বাচনগুলির থেকে আলাদা কিছু হবে না। বিশেষঙ্গদের মত অনুযায়ী ৫০ শতাংশ হিন্দু মেরুকরণের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। কিন্তু বাকিরা হবেন না।
কেবল ১২টি জেলার ৬১টি কেন্দ্রের ভোটে ৬৯২ প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ নয়, উত্তর প্রদেশের ফলাফল ২০২৪-এর সাধারণ নির্বাচনের আগে
সেমিফাইনাল। তাই গটা দেশ তাকিয়ে আছে এই সেমি ফাইনালের ফলাফলের দিকে। উত্তরপ্রদেশে মানুষের সার্বিক সমর্থনে ফের পদ্ম ফোটা মানে
তার প্রভাব পড়বে ফাইনালে।