উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের সপ্তম তথা শেষ দফাও সম্পন্ন হল। এই পর্বে ৯টি জেলায় ৫৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৬১৩ জন প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ হল। এই দফার আসনগুলির মধ্যে ২০১৭ সালে বিজেপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা মিলে পেয়েছিল ৩৬টি আসন। সপা ১১টি ও বসপা ৬টি আসন দখল করেছিল। এদিন ভাগ্য পরীক্ষা হয় এ রাজ্যের ৩ মন্ত্রীর। তবে সব ছাপিয়ে সকলের নজর রয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীতে। ২০১৭ সালে মোদী ঢেউতে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোট বারাণসীর আটটি বিধানসভা আসনই জিতেছিল। সপ্তম দফায় বারাণসী ছাড়াও আজমগড়, জৌনপুর, গাজিপুর, চান্দৌলি, মির্জাপুর, ভাদোহি এবং সোনভদ্র জেলা ও নকশাল অধ্যুষিত বেশকিছু এলাকা।
মোদী জানেন লখনউ দখলে থাকলে তবেই দিল্লিতে ক্ষমতা বহাল থাকবে। তাই গত চার মাস ধরে মোদী উত্তরপ্রদেশে প্রচার চালিয়েছেন। প্রবাদ আছে, ‘দিল্লির রাস্তা লখনউ হয়ে যায়’। ঘটনা প্রায় তাই। রাজ্য হিসাবে উত্তরপ্রদেশের এমনই মহিমা যে এই রাজ্য এই দেশকে একাধিক প্রধানমন্ত্রী উপহার দিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ছাড়াও দেশের একাধিক শীর্ষ স্থানীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী উত্তরপ্রদেশ থেকে সংসদ সদস্য। প্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী একসময় ছিলেন লখনউ লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ, অন্যদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ছিলেন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। দিল্লি কার দখলে যাবে সে কথা বলে দেয় উত্তরপ্রদেশ, কারণ উত্তরপ্রদেশেই রয়েছে ৮০টি লোকসভা আসন। ২০১৪ ও ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির বিপুল জয়ের পিছনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল এই ৮০টি আসন। তাই নরেন্দ্র মোদী গত চার মাস ধরে যোগীর পাশে থেকেছেন।
এদিনের চূড়ান্ত পর্বের আসনগুলি বিজেপি এবং এসপি দুপক্ষের জন্যই ছিল শক্ত ঘাঁটি। গত কয়েক মাস ধরে দু-পক্ষই একে অপরকে টপকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। সেকারনে ধরেই নেওয়া যায় যে এদিনের লড়াই ছিল সেয়ানে সেয়ানে। ফাইনাল পর্বে বিজেপি সব থেকে বেশি জোড় দিয়েছিল আজমগড়ের দিকে কারণ, এটি এসপি’র ঘাঁটি বলেই পরিচিত। গত বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি উত্তরপ্রদেশে ৩২৫টি আসন জিতেছিল ঠিকই কিন্তু ২০১৭ সালে তারা এই আজমগড়ের ১০টি আসনেই হেরে গিয়েছিল। তাই এবার বিজেপি প্রচারে সমস্ত শীর্ষ নেতারা এখানে মিছিল করেন। অন্যদিকে এসপি বারাণসী জেলায় বিশেষ নজর দিয়েছিল। কারণ এখানে ২০১৭ সালে ৮টি আসনই এনডিএ দখল করেছিল। এবার এখানে অখিলেশ যাদব প্রচারের জন্য প্রচার করে গিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বারাণসীতে স্বয়ং মোদী দু-দিনের প্রচারে বিজেপির জন্য অক্সিজেন জুগিয়েছেন।
উত্তরপ্রদেশে শেষপর্বের ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজেই প্রচারে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। তিনি কেবল কাশীতেই প্রায় ৬টি নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন। তাছাড়াও তাঁকে দেখা গিয়েছে গাজিপুর, সোনভদ্র, চান্দৌলি, জৌনপুর, মির্জাপুরে ভোট প্রচারে। এছাড়া তিনি মতবিনিময় করেছেন হাজার হাজার বুথ স্তরের কর্মীদের সাথে এবং রোড শো করেছেন বারাণসীতে। বুঝতে অসুবিধা হয় না বারাণসী বিজেপির কাছে কতখানি প্রেস্টিজ ফাইট। প্রসঙ্গত গত নির্বাচনে বিজেপি এই লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত আটটি আসনেই জিতেছিল। তবে এবার সমাজবাদী পার্টি ও কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর এই সংসদীয় আসনে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছে।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন মানে ফাইনাল। তার আগে উত্তরপ্রদেশের এই বিধানসভা নির্বাচন কার্যত সেমিফাইনাল, তাই সেই লক্ষ্য নিয়েই পদ্ম শিবির এগনোর চেষ্টা করেছে। মোদী-শাহ-নাড্ডারা আশাবাদী এবারও গোবলয়ের সবচেয়ে বড় রাজ্যে তাঁদেরই কর্তৃত্ব থাকবে। তাই গেরুয়া দলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই উত্তরপ্রদেশ জুড়ে প্রচারে ঝড় তুলতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ মনে করেন করোনা কালের অভাব অভিযোগ, রাজ্যজুড়ে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার পরও মানুষ এবারও তাঁর পাশে থাকবেন। অন্যদিকে বিরোদীদের দাবি, এবারের বিধানসভা নির্বাচনের লড়াইটা পদ্ম শিবিরের জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। বিরোধীদের মতানুসারে বিজেপি রীতি অনুযায়ী এবারও জাতপাতের রাজনীতি করেই ভোট টানার কৌশল চালাচ্ছে, কিন্তু এবার সেই পথটাই তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরতে চলেছে। যদিও বিজেপি বিরোধীদের এই দাবিকে মোটেও আমল দিচ্ছেন না। বরং তারা দাবি করছেন, এবারও উত্তর প্রদেশে যোগী-রাজ ফিরছে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে। বলা যায় এবারের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন যতোটা যোগীর, ঠিক ততোটাই মোদীর।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচন মানে ফাইনাল। তার আগে উত্তরপ্রদেশের এই বিধানসভা নির্বাচন কার্যত সেমিফাইনাল।