আলোকবর্ষ উপন্যাসটি অমৃত পত্রিকার নববর্ষ সংখ্যায় ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়। তখন নাম ছিল ভয়। উনিশো একাশি সালে বই হওয়ার সময় নাম বদলে করে দিই আলোকবর্ষ। পাহাড়ের মতো মানুষ লেখার পর আবার লিখতে বলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বলতেন কচুগাছে তলোয়ার চালাতে চালাতে একজন সৈনিক তলোয়ার চালাতে শেখে, মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ করতে শেখে, তেমনি লিখতে লিখতে লেখক লিখতে শেখে । একদিনে হয় না। আমি এবার আর না করিনি।
১৯৭৮-এর বন্যা, অতিবৃষ্টির পর ১৯৭৯ সাল গেল প্রায় নির্জলা। বৃষ্টিহীন। আগের বছর বন্যায় ফসল গেল, এই বছর অনাবৃষ্টিতে ফসল গেল। আমি তখন হলদি নদীর ধারে বালুঘাটা নামে এক গঞ্জের অফিসে। হলদিয়া বন্দর গামী হাইওয়ের ব্রজলাল চকে থাকতাম কয়েকবন্ধু মেস করে। তখন জীবনকে চিনতে শিখেছি অনেক। নির্মমতা বুঝেছি। এখন বুঝি এসব হলো জীবন বয়ে যাওয়ার নানা বাঁক, নানা অদলবদল, আপনি আসে আপনি যায়। ক’দিনের নিদ্রাহীন রাত আবার গভীর নিদ্রায় কাটে। সব অপমান ধুলোবালির মতো গা থেকে ঝরে যায়। সাহিত্যের ভিতরে জীবনের সব মুক্তি। এই উপন্যাস অনেকটাই ব্যক্তিগত। আবার অনেকটাই নির্মাণ। কাহিনি নিজের মতো করে তৈরি করা। সাহিত্যের সত্য আর জীবনের সত্য তো এক হয় না। লেখার সময় নির্মোহ হয়ে লিখতে হয়। বালুঘাটার একদিকে হলদিয়া বন্দর অন্যদিকে তাম্রলিপ্ত বন্দর, তমলূক। একটি বন্দর মরে গিয়েছিল, আর একটি বন্দর গড়ে উঠছে। আবার হুগলী নদী ও সাগর মোহনায় চর জাগছে শুনেছি। ঘোড়ামারা চর, আগুনমারি চর। সেই সময় অনেক ভয়ের কথা শুনেছিলাম। গোটা দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে ভূমিকম্পের এক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতি বিরূপ হয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাবে সব। চরগুলি নির্মীয়মাণ বন্দরের কাল অবসানের ইঙ্গিত কি? যেমন হয়েছিল তাম্রলিপ্ত? স্বামী স্ত্রী এবং মা-এই নিয়ে সংসার। স্বামী পুরুষটির বয়ানে রচিত এই আখ্যান। এই তিনজন ব্যতীত আর একটি চরিত্র আছে নীলাম্বর বুড়ো। থাকে হেথাহোথা, যত্রতত্র। হলদিয়া বন্দর নির্মাণের জমি অধিগ্রহণের সময় তার কিছু জমি গিয়েছিল। তার ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছিল অনেক। সেই টাকা তার আছে। ধারে খাটায়। লোকটি কায়ক্লেশে সংসার চালায়। তার স্ত্রী সন্তান ধারণ করেছে। সে চায়নি সন্তান আসুক। কিন্তু স্ত্রী চায় না নষ্ট করতে। তার মা কিছুই মনে রাখতে পারেন না। তাঁর আগ্রাসী খিদে। নীলাম্বর বলে ভূমিকম্প আসছে। তার চিহ্ন প্রকৃতিতে। মাটির তলার জীব, গর্তের সাপ ব্যাঙ বেরিয়ে আসছে বাইরে। এই ব্যক্তির এক অতীত ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাস অতি নির্মম।
স্বপ্ন দেখা এবং স্বপ্ন ভঙ্গের এক অতীতের গল্প সে শোনায়। দুটি কাহিনি চলে সমান্তরালে। সেই অনতিঅতীত ছিল রাজনৈতিকতা এবং প্রেমের সমাধির কাহিনি। সেই কাহিনির প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমি। যা ঘটেছিল তার একটি আভাসমাত্র রয়েছে এই উপন্যাসে। প্রেম এবং প্রেমহীনতা, রাজনৈতিক গোঁড়ামি, ঈর্ষা ইত্যাদি নিয়েই এই কাহিনি। দেখেছিলাম মানুষের কুৎসিত রূপ। অনেকটা ঘোরের ভিতরে লেখা। আমার বাল্যকালে আমি একটি ভ্রুণ কবর দিয়েছিলাম এক বর্ষার দুপুরে কচু বনের ভিতর মস্ত কচু পাতার ছায়ায়। সে আমার ভাই হতো। বাল্যকালের সেই স্মৃতি এই উপন্যাসে চলে এসেছে। কীভাবে এসেছে তা পাঠেই ধরা যাবে। মনে পড়ে দুপুরে, বিকেলে হলদি নদীর ধারে বসে থাকতাম। ভাটার সময় কত দূরে চলে যেত জল। মনে পড়ত ক’বছর আগের কথা। এই উপন্যাস সম্পূর্ণই ব্যক্তিগত, কিন্তু অনেকটাই নির্মাণ। যা ঘটে জীবনে তা লেখায় আসে না সব। বরং সামান্যই আসে।
লেখক নিজের অভিজ্ঞতা কতটা বর্জন করতে পারবেন, তার উপরেই নির্মাণ দাঁড়িয়ে থাকে। তখন এক নৈরাশ্য এসেছিল জীবনে। সেই নৈরাশ্যকে অতিক্রম করতে এই লেখা। প্রকৃতি মানুষ, রাজনীতির তত্ব জীবনের সঙ্গে মেলাতে যাওয়া এসবের সাক্ষী ছিলাম। তা থেকেই এই লেখা। উপন্যাস লেখার কৌশল এখানেই যেন শিখলাম।
উপন্যাস সমগ্র সম্পাদনা করেছেন: শ্রাবন্তী মজুমদার। প্রকাশ করছেন : দেজ পাবলিশিং, প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা।