১৯৭৮-এর প্রলয়ঙ্করী বন্যার কথা মনে পড়ে। তখন আমি ছোট এক নদীর তীরে এক গঞ্জে। নামটি থাক। উপন্যাসে নদীর নাম বদলে কংসাবতী করে দিয়েছি। গঞ্জের নাম কলাবনি। ১৯৭৮-এ আমি নদীর মানুষ উপন্যাস লিখি। সেই উপন্যাস পছন্দ হওয়ায় অমৃত সম্পাদক বড় লেখক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় এক সান্ধ্য আড্ডায় আচমকা আমাকে বললেন ধারাবাহিক উপন্যাস লিখবি অমৃতয়। সামনের মাস থেকে বেরোবে, কাজের জায়গায় ফিরে গিয়ে লিখতে আরম্ভ কর। আমি প্রথমেই না করলাম। পারব না। ভয় করছে। আমার দুই বন্ধু, সমীর আর তুষার খুব ধমকেছিল আমাকে। সম্পাদক বলছেন, ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিস। যা তোর রাজবাড়ি আর রাজকন্যা নিয়ে লেখ। সেই যে রাজার ছেলে গরু নিয়ে বেরোয় তা নিয়ে লেখ। সেই যে রাজকন্যা একা একা ঘুরে বেড়ায় রুখু চুল আর ময়লা শাড়ি পরে, তার কথা লেখ। লেখ দুই রানির কথা। লেখ। তোকে যে পিঠে করে নদী পার করাল, তার কথা লেখ। পারবি লিখতে ?
সে এক ছোটনদী। ঝাড়গ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে জন্মেছে। ১৯৭৭ এর ডিসেম্বরে সেই গঞ্জে বদলি হলাম। অফিস নদীর ধারে রাজবাড়িতে। সকালে একটা বাস আসত ঝাড়গ্রাম থেকে, সেই বাসই দিনে দুবার যাওয়া আসা করত মনে হয়। ঝরঝরে বাস। তাপ্পি মারা টায়ার। শীতের বেলা ছোট। জাতীয় মহাসড়ক গেছে বোম্বাই অবধি। বোম্বে রোড। তখন তাইই বলা হত। সেই সড়ক পথে অনেকটা গিয়ে আচমকা বাস বাম দিকে ঘুরে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের লাল মোরাম ঢালা রাস্তায়। দু’পাশে ঘনগভীর শালবন। জানালা দিয়ে দেখছি শিয়াল পার হয়ে গেল রাস্তা। বেজি। শজারু। বাস চলছে গুড়গুড় করতে করতে। তারপর সেই আশ্চর্য পথ শেষ হত নদীর ধারে। হাফ প্যাণ্ট আর হাফ শার্ট পরা আধবুড়ো এক মধ্যবয়সী কন্ডাকটরের কথা খুব মনে পড়ে। তিনি সব প্যাসেঞ্জারকে নামে চিনতেন। ভাড়া ফাঁকি দেওয়ার উপায় ছিল না কারো। কে কোথা থেকে উঠেছে আর যাবে কোথায় সব জানা ছিল তাঁর। এ নিয়ে বাসে খুব বচসা লাগত। সে হলো পরের কথা। আমি নতুন অফিসে যোগদান করতে যাচ্ছি। ছোট এক নদীর ধারে বাস দিনের মতো যাত্রা শেষ করল। যাত্রীরা নদী পেরিয়ে যাচ্ছে। আমার সঙ্গে সুটকেস, হোল্ড অল, ব্যাগ। নদীতে হাঁটুরও উপর ডোবা জল। এসব নিয়ে পার হব কী করে? সন্ধ্যা হয়ে এল। বিনবিনিয়ে শীত নামছে। হিম। ঐ দেখা যাচ্ছে রাজবাড়ির চুড়ো। তখন সেই কন্ডাকটর বাস রেখে বাড়ি ফিরবেন নদীর ওপারে, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন যাব কোথায়, কে আমি? তিনি সব শুনে কজনকে ডেকে বললেন, অতিথ, রাজবাড়ির অফিসার, দিয়ে আয়। একজন আমার সুটকেস হোল্ড অল মাথায় নিল, আর একজন আমাকে পিঠে করে নদীর জল পার করালেন। তাঁরাও নদীর ওপারে যাবেন। একজনের পিঠে নদী পার হয়ে আমি রাজবাড়িতে পৌঁছলাম। প্রহরাজ রাজার বাড়ি। তাঁরা ওড়িশার মানুষ ছিলেন। ভাগ্য অন্বেষণে এদেশে এসেছিলেন ব্রাহ্মণ। ঝাড়গ্রামের রাজার আতিথ্য নিয়েছিলেন। কিংবদন্তী এই যে তাঁর ভিতরে ঈশ্বর সেবার আকুতি দেখে এক প্রহর ঘোড়া ছুটিয়ে যতটা জমি অতিক্রম করতে পেরেছিলেন ততটা জমি দেবোত্তর হিশেবে উপহার পেয়েছিলেন মল্ল রাজার কাছ থেকে। তাঁদের উপাস্য দেবতা ছিলেন শিশু গোপাল। গোপাল এবং রাধাকৃষ্ণের মন্দির ছিল রাজবাড়িতে। মন্দিরে শিশু গোপালের পায়ের ছাপ ছিল সিমেন্টের মেঝেতে। বড় রানি মা আমাকে দেখিয়েছিলেন। আমার তখন দেখার সময়, জানার সময়, রাজ পরিবারের ইতিহাস শুনছি। রাস পূর্ণিমায় রাজার ঘরে নেমতন্ন খেয়েছি। কিন্তু উপন্যাস লেখার সময়ে বাস্তবতা বদলে যেতে থাকে। প্রথম বামফ্রন্ট তখন সদ্য ক্ষমতায় আসীন। সেই সময় অপারেশন বর্গা এবং খাসজমি সরকারের অনুকূলে ভেস্টিং এই নিয়ে গ্রামাঞ্চলে আলোড়ন পড়ে গিয়েছিল। কাজ করতে করতে জমির অধিকার, দখল এবং হস্তান্তরের অনেক ইতিহাস আমার সামনে পরিষ্কার হয়ে যেতে থাকে। কোনও এক গ্রামে জরিপে গিয়ে এক কুষ্ঠ আক্রান্ত অবস্থাপন্ন চাষী এবং তাঁর অবিবাহিত সুন্দরী কন্যার মুখোমুখি হয়ে দেখেছিলাম যুবতী অত্যন্ত ক্ষিপ্ত তাদের জমি চাষীরা দখল করে নিয়েছে বলে। আমাকে প্রায় আদেশ করছিল সব ভাগচাষির নাম কেটে দিতে। উপন্যাসে এই বাবা আর মেয়েকে আমি রাজবাড়িতে প্রতিস্থাপন করি। উপন্যাস যে নির্মাণ করতে হয়, নিজে নিজে শিখলাম। এক জায়গায় দেখা মানুষ অন্য পটভূমিতে আনাই যায়। উপন্যাসে নদীর নাম, জনপদের নাম আমি বদলে দিয়েছিলাম। না দিয়ে লিখতে পারতাম না। এখনো স্মরণ করি সেই গঞ্জের মানুষ আর রাজবাড়ির রাজকন্যাকে। তাঁর কথা লিখিনি, কিন্তু তিনিই যেন এসেছিলেন নির্মাণে। প্রহরাজ রাজবাড়ি, সেই নদী, আমার সেই নদী পার হওয়ার অভিজ্ঞতা এসেছিল পাহাড়ের মতো মানুষ উপন্যাসে। কিন্তু লজ্জিত হয়েছিলাম অন্যের পিঠে পার হওয়ার কথা লিখতে। তবে ব্যক্তিগত এক হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা এই উপন্যাসে ছায়া ফেলেছিল। সেই অভিজ্ঞতা ওখানকার নয়, অন্য এক শহরের ছিল।
উপন্যাস সমগ্র সম্পাদনা করেছেন: শ্রাবন্তী মজুমদার। প্রকাশ করছেন : দেজ পাবলিশিং, প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা।