নদীর ধারের পবনচন্দ্র
এই উপন্যাসের পটভূমি অখণ্ড মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমার সাঁকরাইল থানা এলাকা। কুলটিকরি ঐ অঞ্চলের এক সমৃদ্ধ গঞ্জ। সেই ১৯৭৭ সালে এখানে থেকেই আমি গাঁওবুড়ো গল্প এবং প্রথম উপন্যাস নদীর মানুষ লিখেছিলাম। তারপর কুলটিকরি থেকে নানা জায়গা ঘুরে ১৯৮১-র জুন মাসে কলকাতায় ফিরি, সাত বছর বাদে, ১৯৭৩-এর নভেম্বর থেকে ১৯৮১-র জুন। শিলাদিত্য পত্রিকা সেই সময় বেরোত। প্রথম সম্পাদক ছিলেন সুধীর চক্রবর্তী, তিনি আমার একটি নভেলেট ছেপেছিলেন, বিভ্রম। এরপর আসেন বিমল কর। এই উপন্যাস বিমল কর শিলাদিত্য পত্রিকায় ছেপেছিলেন ‘স্রোতস্বিনী’ নামে। তখন আমি কলকাতায়। চাকরি করি মনে হয় বারাসত পেরিয়ে গোলাবাড়ি অঞ্চলে। কিন্তু উপন্যাসটি লিখেছিলাম সেই ছেড়ে আসা সুবর্ণরেখা নদী আর তার তীরভূমির পটভূমিতে। মনে হয় এক স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা আমার কাছে এসেছিলেন, স্বামীর হেফাজতে থাকা তাঁর সম্পত্তি উদ্ধারের আর্জি নিয়ে। সেই আর্জির কথা মনে ছিল। আসলে কবে কোন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলাম, তা স্মৃতির ভিতরে লুকিয়ে থাকে। আচমকা অমনই এক ঘটনার সাযুজ্য খুঁজে পাই গোলাবাড়িতে। স্বামী পরিত্যক্তা নারী এবং জমির অধিকার। গ্রাম সমাজে জমি নিয়েই বাঁচে মানুষ। জমিই সম্মান, জমিই জীবিকা। স্থাবর সম্পত্তির মূল্য গ্রাম-শহর সর্বত্রই সমান। উপন্যাস লিখতে বসে মনে পড়তে লাগল বালিভাসা সুবর্ণরেখা নদী, ভয়ানক গ্রীষ্ম, নির্দয় প্রকৃতি। আসলে যে কাহিনি লিখতে বসলাম তার সঙ্গে তখন প্রকৃতি জুড়ে যায়। সমাজ পরিবারের নির্দয় ভূমিকার ভিতরেও কোথাও একটা আশ্বাস থাকে। স্বামী ত্যাগ করেছে অথবা অত্যাচার করছে, তখন তার হাত ধরেছে খর রৌদ্রের ভিতরে ছায়া প্রদানকারী গাছের মতো এক মানুষ। এটি গল্পের বিষয় হয়েছে একবার (আগুনের দিন), উপন্যাসে এই। জমিজমা নিয়ে লিখতে ভালো লাগে। কত রকম সমস্যা না জমি নিয়ে হয়। তা সমাধান করতে হতো। সুতরাং যা লিখব তার ভিতরে সেই সময় জমি জড়িয়ে যায়। ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত যে প্রক্কৃতি আর মানুষের ভিতরে থেকেছি, তা ভুলতে পারিনি এখনো। তারপরে সেই অভিজ্ঞতা আরো বিস্তৃত হয়েছে। তখন অবস্থাপন্ন ভূদ্বামীদের বাড়ি দুবেলা ভাত, সকালে মুড়ি এই চুক্তি আর বছরে পাঁচ-সাতশো টাকা মাইনেতে বাগাল নিযুক্ত হতো। এখন কী হয় জানি না। এখন পেটের ভাতের অভাব হয় না। তখন ছিল অনাহার। সেই বাগাল পবনচন্দ্রই এই উপন্যাসের মূল চরিত্র। নদীও এক চরিত্র। লেখাটি বিমল করের পছন্দ হয়েছিল। পরে পুস্তকাকারে প্রকাশের সময় এর নাম হয় কালবৈশাখ। তারপর আর এক প্রকাশক যখন প্রকাশ করেন হয়ে যায় নদীর ধারের পবনচন্দ্র।
ভি আই পি রোড
ভি আই পি রোড উপন্যাস ১৯৮৫ সালে লিখেছিলাম। তখনও যেন উপন্যাস রচনার প্রারম্ভিক পর্ব চলছে। এই উপন্যাসটি ১৯৮৬ সালে শারদীয় আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ভি আই পি রোড বিমান বন্দর থেকে উল্টোডাঙা অবধি এসেছিল। তারপর ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাই পাসে যুক্ত হয়েছে। এই নামে আমি একটি গল্পও লিখেছিলাম ১৯৮৪ সাল নাগাদ। সেই গল্প রাস্তা হওয়ার আগের বৃত্তান্ত। রাস্তার জন্য বহু প্রাচীন জনপদের মানুষের উচ্ছেদের কাহিনি। এই উপন্যাস ভি আই পি রোড হওয়ার পরের কাহিনি। আসলে একটি রাস্তা এক অঞ্চলের অর্থনীতিকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। কলকাতার উপকন্ঠের এই রাস্তা উন্নয়নের নামে মানুষের হাতে অনুপার্জিত অর্থের জোগান দিয়েছে অনেক। তার ফলে সমাজের চেহারা বদলে যেতে শুরু করে। ভি আই পি রোড হওয়ার পর তা হয়েছিল। সেই ১৯৮৫ সাল নাগাদ দেখেছি এদিকের সমস্ত ধানজমি বাস্তুজমিতে পরিণত হতে। এবং সেই জমি প্লটিং করে বিক্রি করছে দালাল। এমন এক দালালের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তার বিরাট প্রজেক্ট। একেবারে টাউনশিপ নির্মাণ করছে। ভি আই পি রোডের ধারে শুধু নয়, অনেকটা ভিতরের মৌজাতেও হানা দিয়েছিল তারা। উদ্বাস্তু কলোনি এলাকায় পৌঁছে গিয়েছিল। ১৯৮১-র পর এই চার বছর আমি উপন্যাস লিখিনি। নতুন জায়গা খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম। নতুন বিষয়। তখন জমি সংগ্রহ করে প্রমোটিং- শুরু হয়েছে এই শহরের লাগোয়া অঞ্চলে। ভি আই পি রোড সেই প্রমোটিং-এর কাহিনিও নিশ্চয়। আর তথাকথিত এই উন্নয়ন কাম জমির ফাটকাবাজির সাথী থাকে থানা পুলিশ, সরকারি অফিস, সব। সেই অশুভ আঁতাতের মুখোমুখি হয়েছি যেভাবে তার ছায়া আছে এই উপন্যাসে। উপন্যাসের অনেক চরিত্রই দেখা। তারপর তা লিখতে গিয়ে বদলে গেছে, কেন না বর্জন করতে হয়েছে অনেক। নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছি। ভি আই পি রোড লেখার পর আমার উপন্যাস রচনার একটি পর্ব যেন থেমেছিল। এখন দেখি ভি আই পি রোডের দুপাশ বহুতল হর্ম্যশ্রেণীতে ভরা। পুবের দিকে নিউটাউন, নতুন আর এক নগর গড়ে তুলেছে সরকার। সল্টলেক সিটির সঙ্গে তা জুড়ে দিয়েছে। আমার মনে পড়ে সেই ব্যক্তির কথা, নাম ছিল দেবকন্ঠ না কী যেন, সে এমনি চেয়েছিল। কিন্তু সবটাই নিজের উপার্জনের জন্য। তার একটা জমিদারি হয়ে গিয়েছিল যেন এই অঞ্চল। সে যেন জমি বিলি করছিল। লোককে মিথ্যে কথা বলে, মিথ্যে ম্যাপ দেখিয়ে অনেক দামে জমি বেচে দিচ্ছিল। কিন্তু সেই জমির মূল মালিক ঠকে যাচ্ছিল। ফোকটের টাকায় সে একটা বহুতল নির্মাণ করেছিল নিজের জন্য। স্বামী স্ত্রী দুজন কিন্তু বাড়ি উপরে উঠেই যাচ্ছে। আমার এক আত্মীয় এক বাড়িতে থাকতেন ভাড়া। সে বাড়ির অনেক দরজা। বেরতে হলে অনেক তালায় চাবি লাগাতে হতো। চাবির পর চাবি। চাবির তাড়া ব্যাগে নিয়ে বেরতেন তিনি। এই অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছিল এই উপন্যাস রচনার সময়।
উপন্যাস সমগ্র সম্পাদনা করেছেন: শ্রাবন্তী মজুমদার। প্রকাশ করছেন : দেজ পাবলিশিং, প্রচ্ছদ : দেবাশিস সাহা।