দ্রুত হাতে রান্নাঘরের কাজ সারছে দিমিত্রি। সবটুকু করে না গেলে অফিস থেকে ফিরে আর কিছু করতে ইচ্ছে করে না। এত খাটনি সারাদিন যায়, তারপর বাসে করে ফেরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এক একদিন বাই চান্স বসার জায়গা মেলে। যেদিন মেলে সেদিন বসেই ঘুমিয়ে পড়ে সে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্নও দেখে। হ্যাঁ, ওই চলন্ত বাসে। হঠাৎ করে ব্রেক কষলে স্বপ্নটা চুরমার হয়ে যায়। চোখ রগড়ে সে সোজা হয়ে বসে। আড়চোখে একবার পাশে বসা সহযাত্রীর দিকে তাকিয়ে নেয়। সে কি দিমিত্রির ঘুমিয়ে পড়া মুখ দেখেছে? কেউ কারোর ঘুমন্ত মুখ দেখুক এটা দিমিত্রি একেবারেই বরদাস্ত করতে পারে না।
মা সেই যে বাথরুমে ঢুকেছে আর বেরোনোর নাম নেই। দুদিন হল মায়ের ওষুধটা ফুরিয়েছে, আনা হয়নি। অফিস থেকে ফিরতে এত রাত হয়ে যাচ্ছে যে আর ইচ্ছে করেনি আবার উল্টো দিকে হেঁটে গিয়ে ওষুধের দোকানে খানিক দাঁড়িয়ে থাকতে। আর অনেকদিন মা বেশ ভাল আছে। ডা. ব্যানার্জি তো বলেছিলেন যে আস্তে আস্তে মা সেরে উঠবেন। গ্যাস ওভেন নিপুণ হাতে মুছে নিয়ে “বাবু!!” ডাকে চমকে তাকিয়ে দেখে মা বাথরুম থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। সারা মাথা গায়ে জল ঝুঁঝিয়ে পড়ছে। আর মায়ের গায়ে এক টুকরো কাপড় নেই।
দিমিত্রির মাথাটা একটু টলে যায়। সামলে নিয়ে সে দৌড়ে গিয়ে একটা হাউস কোট মায়ের গায়ে জড়িয়ে ধরে এনে সোফায় বসিয়ে চুল মুছিয়ে দেয়। মায়ের অসুখ তার মানে আবার রিল্যাপ্স করেছে। অর্থাৎ, মায়ের খাবার গুছিয়ে রেখে গেলে মা খুলেও দেখবে না। নিজেকে নিজের জুতো মারতে ইচ্ছা করছে দিমিত্রির। কেন যে ওভার কনফিডেন্ট হয়ে সে ওষুধটা আনল না।
একদিকে নিজে খেতে খেতে, মায়ের মুখে জোর করে ভাতের ডেলা গুঁজে দিতে দিতেই ক্লায়েন্টের সঙ্গে ফোনে কথা সারতে হচ্ছে। আজ আবার গিয়েই একটা মিটিং আছে। যতো চাপ তাকে চাপানো যায় সেই চেষ্টা করে যান ত্রিবেদীজি। মুখে হাসি লেগে থাকে, কিন্তু এমন তিলে খচ্চর লোক যে হয়, সেটা একে না দেখলে জানা যেত না। শ্রেয়াংশ যেহেতু বাঙালি নয়, তাই শ্রেয়াংশকে অত চাপ দেয়না। আর বাঙালিদের ওপর যে ওর কি রাগ কে জানে!
ডা. ব্যানার্জি বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে বললেন, “দ্যাখো দিমিত্রি, উদিতা পুরোপুরি সুস্থ কোনদিনই হবেন না। আমি তোমাকে এটা কখনই বলিনি। তুমি ভুল একটা ধারণা করে ভেবে নিলে যে তোমার মা ভাল আছেন মানে সুস্থ হয়ে গেছেন? এই রোগে আক্রান্ত মানুষ পুরো সেরে যায় না। ওষুধ এবং ভাল পরিবেশ তাকে ভাল রাখে। যদি ওষুধ কেনার জন্য আর্থিক চাপে থাকো, আমি তো দিতে চাই তোমাদের সাহায্য। কিন্তু তুমি নেবে না। ওষুধ এখনই আবার স্টার্ট করে দাও, ঠিক হয়ে যাবেন উদিতা।” দিমিত্রি ডাক্তারের সব কথা গুম হয়ে শুনে উঠে পড়ে। মাথাটা অল্প ধরেছে। কি মনে হতে বেরিয়ে আসার সময় একটু দাঁড়িয়ে দিমিত্রি বলে, “আপনি একবার সময় করে দেখে আসতে পারেন তো, মা কথা বললে খুশি থাকে।” ডা. ব্যানার্জি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “তুমি চাইলে নিশ্চয়ই যাবো।” বেরিয়ে আসে দিমিত্রি। মাথাটা একটু হলেও ফাঁকা লাগছে।
দিমিত্রি। নামটা যে শোনে সেই জিজ্ঞেস করে কি মানে? কি অর্থ? যাঁরা জানেন তাঁরা বলেন, “বাহ্, কি সুন্দর নাম, গ্রীক দেবতার আশীর্বাদ তুমি। কে রেখেছেন এমন নাম?” কি করে বলবে দিমিত্রি যে এটা তার বাবার দেওয়া নাম। বিবস্বান রায়। ডা. বিবস্বান রায়। ভাষা সাহিত্যে যাঁর অবদান সারা পৃথিবীর মানুষ জানে, স্বীকার করে। সেই বিবস্বান তার বাবা। এই নামটা যদি ও ঘষে তুলে ফেলতে পারত। বিবস্বানের নিজের শিক্ষা নিজের অধিকার বোধের পরিচয়ের নাম দিমিত্রি। তিনি যে পণ্ডিত, তাঁর পুত্রের নাম কি সাধারণ হতে পারে? তাই দিমিত্রির নামকরণ। বাল্যকালের কিছু সময় ছাড়া যে সৌভাগ্যের ছবিও দেখতে ভয় পায়। সবসময় দুর্ভাগ্য যার পদে পদে অনুসরণ করে, সে দিমিত্রি। আর বিবস্বান তিনি, যিনি দিমিত্রির জীবন অন্ধকারের আবরণে ঢেকে দিয়ে গেছেন। গেছেন উদিতার জীবন তছনছ করে।
আজ অফিস থেকে একটু সময় বের করে পত্রালির অফিসে গেছিল দিমিত্রি। নিজের পান্ডুলিপি আগেই পাঠিয়েছে মেইল করে। কিন্তু সম্পাদকের তরফ থেকে হ্যাঁ না কোন উত্তর নেই। এত কষ্টের লেখা রোদের দেখা পাবে না? পাঠকের মতামত পাবে না! অনেক পত্রিকার অফিস আছে কলেজে স্ট্রিট অঞ্চলে, যারা লেখকের টাকায় লেখকের বই ছাপে। কিন্তু দিমিত্রির লেখা সেই গোত্রের মধ্যে পড়ে না, কারণ প্রতিটি অধ্যায় লেখার পরে দিমিত্রির মা পুরো পড়ে দেখেছেন, বলে দিয়েছেন, কোথায় কোথায় একটু আধটু সংস্কারের প্রয়োজন। দিমিত্রি সেইভাবে আবার কেটেছে, আবার লিখেছে। এটা দিমিত্রির সাধনার ফল।
অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে ময়ূখ হালদার দিমিত্রির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ছাপানো হবে। এবারের পুজোর আগেই ছাপাবো। তবে এ বই পাঠক কতোটা পাবে এখনই বুঝতে পারছি না। আর এত জটিল করে লেখেন কেন বলুন তো? এখন হাল্কাচালের লেখা, ভূত প্রেত, দত্যিদানো, তন্ত্রমন্ত্রের যুগ। যতো বীভৎস রসের যোগান দিতে পারবেন তত বিক্রি বাড়বে। তা নয়, একটা গুরু গম্ভীর উপন্যাস নামিয়েছেন। কটা পাঠক পাবেন জানি না।” ময়ূখের কথা শেষ হবার আগেই দিমিত্রি উঠে নমস্কার জানিয়ে বলে, “ঠিক আছে, ছাপতে হবে না আপনাকে।”
“আরে মশাই! বসুন। বসুন। এত রেগে যান কেন? আমি একবারও বলেছি যে ছাপাবো না? বলছি, অর্ধেক টাকা যদি আপনি বিয়ার করেন তাহলে ভাল হয়। বুঝতে পারছি না তো, বইটা পাবলিক খাবে কিনা?” আবার দিমিত্রি উঠে দাঁড়ায়। লেখা খাবে! আর সেটা বলছেন একজন সম্পাদক? এরাই আবার অনুষ্ঠানে গিয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। এবার দিমিত্রি উঠে দাঁড়াতে ময়ূখ ওর হাত সজোরে ধরে আবার বসালেন।
“আচ্ছা মাথা গরম তো আপনার! বলছি তো ছাপাবো।”
সাত বছর পর্যন্ত সুখের সময়, সৌভাগ্যের সময়। গ্রীক দেবী ডিমিটারের উপহার দিমিত্রি। গোটা বাড়িতে যেন সারাদিন উৎসব। একটা অন্ধকারের দিন নেই, শুধু আলো, শুধু আলো। ভাষাবিদ বিবস্বান আজ এই দেশের ইউনিভার্সিটি কাল অমুক দেশের সামিট এই নিয়ে ব্যস্ত। উদিতা নিজের অফিস, নাচ নিয়ে খুশির পেয়ালায় অমৃত আস্বাদনে বুঁদ। কিন্তু পেয়ালায় অমৃতের জায়গায় একটু একটু করে গরল জমছিল। টের পাওয়া যায় নি। গেল, যখন বিবস্বান দিমিত্রির জন্মদিনের দিন তিন বছরের জন্য টোরেন্টো চলে গেলেন। এয়ার পোর্টে উদিতা আর দিমিত্রিকে কত আদর করে প্লেনে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে দিমিত্রি বাড়ি ফিরেছিল। বাবার জন্যে।
শান্তিদির শরীর খারাপ। তাই দুদিন আসছে না। দিমিত্রি সেই ছোট থেকেই অনেক কিছু সামলে বড় হয়েছে তো, তাই নিপুণ ভাবে সংসারের সব কাজ পারে। ওর কাজ দেখতে দেখতে উদিতা হাসলেন অনেক দিন পর। উদিতা ওষুধ খেয়ে আবার সুস্থ। দিমিত্রি অফিস থেকে এসে দু-কাপ কফি নিয়ে মায়ের পাশে বসল।
“কে বলবে তুই ছেলে দিমি! তুই না থাকলে আমার কি হত বাবু?” দিমিত্রি মাকে জড়িয়ে ধরল। কিছু বলল না। ওর স্পর্শ উদিতাকে সব বলে দেবে। এই ভাবেই তো এতগুলো বছর ওরা কাটালো অন্ধকার সুড়ঙ্গে। শুধু সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তে একটা আলোর রেখা দিমিত্রি দেখতে পেত সেই ছোট থেকেই। শান্তিদি কাল থেকে এসে গেলে অনেকটা মুক্তি।
“মা আমার উপন্যাসটা বেরোবে এবার।” দিমিত্রি কফিতে চুমুক দিয়ে বলে। উদিতার মুখ আনন্দে, উত্তেজনায় ঝকমক করে। মুখে বলেন, “অবশেষে!” দিমিত্রি হেসে বলে “অবশেষে”। উদিতা নিজের মাথা ছেলের কাঁধে রাখেন।
ডা. ব্যানার্জি নিজে থেকেই এসেছেন। দিমিত্রি আর না করেনি। মনটা অকারণ আনন্দে রয়েছে। শান্তিদিকে কফির জন্যে চেঁচিয়ে বলে দিমিত্রি অকারণ বলে, “কাকু এসেছেন, কফির সঙ্গে কিছু ভেজে দিও শান্তিদি।” পরাশর ব্যানার্জি অবাক হলেন না, হাসলেন শুধু। এ পরিবর্তন একদিন আসবে তিনি এটাই চেয়ে এসেছেন এতদিন। বিবস্বান টোরেন্টোতে যে আবার বিয়ে করেছে ক্যাথলিনকে, সেটা তো প্রথমে উনিই জানতেন। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারছিলেন না। উদিতার মতো মেয়েকে যে এভাবে কেউ ছেড়ে যেতে পারে ভাবতে পারা যায় না। খবরটা তিনিই দিয়েছিলেন প্রথম। তারপর সাক্ষী থেকেছেন উদিতার আস্তে আস্তে মানসিক পরিবর্তনের, ছোট্ট দিমিত্রির হঠাৎই বড় হয়ে যাওয়া, রাগী হয়ে ওঠার।
ঘরে বসে আর একটা লেখা নিয়ে ভাবছিল দিমিত্রি। হঠাৎ মনে হল ওর নিজের ছকভাঙা জীবনটাকে নিয়ে লিখলে কেমন হয়? যার বাবা এত নামী একজন মানুষ, যিনি ভারতে বছরে এক দু-বার তো আসেনই সেমিনারে বক্তব্য রাখতে। ইনভাইট করে আনা হয় ওনাকে। সঙ্গে আসেন ওঁর তৃতীয় স্ত্রী লিজা। দিমিত্রির কাছাকাছি বয়েস হবে। ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে গেল মায়ের অসুস্থ হয়ে পড়ার প্রথম দিনের কথা।
উদিতা নিজেকে কতোটা উন্নত কতোটা আধুনিক প্রমাণ করার জন্য গেছিলেন এরকম একটা সেমিনারে। ক্যাথলিনকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ ছিল নিশ্চয়ই। তারপর বড় বড় বাংলা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দিতে দিতে তিনি যে আধুনিক নন সেটা প্রকাশ পেতে থাকে তাঁর সব ভুলে যাওয়ায়। আস্তে আস্তে এই ভুলে যাওয়া এমন রূপ ধারণ করে যে উদিতা চান করে গায়ে কিছু না দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকেন, অফিসে দিনের পর দিন কামাই হতে থাকে। সেসময় থেকেই দিমিত্রির বড় হয়ে ওঠার গল্পের শুরু।
পরাশর ব্যানার্জি আজকাল প্রায়ই আসেন। দিমিত্রির প্রথম উপন্যাস হট কেকের মতো উড়ে গেছে। পত্রালির সম্পাদক ময়ূখ নিজেও কেমন অবাক হয়ে গেছেন বইয়ের বিক্রি দেখে। দ্বিতীয় উপন্যাসে হাত দিয়েছে দিমিত্রি। সেই ছোট থেকে বাবার দেওয়া টাকা সে ফেরাতে শিখেছিল। কিন্তু এখন তার দ্বিতীয় উপন্যাস প্রকাশের দিন সে বিবস্বান রায়কে চেয়ে নেবে। নিজের অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের আলোর রেখা সে বিবস্বানের হাত দিয়ে উন্মোচন করতে চায় নিজের জন্মদিনের দিন। এখানে কোন ফাঁকি সে রাখবে না।
পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত