উপন্যাসের সংলাপ তথা কথোপথন / উপন্যাসের ভাষা।
৪। Reality বা বাস্তবতা
বাস্তবতা উপন্যাসের জরুরি উপাদান। এই বাস্তবতার অভাবেই ধর্মীয় অলৌকিক বা রূপকথার কাহিনি থেকে আধুনিক জীবনে উপন্যাসের আবেদন সক্রিয় হয়ে ওঠে। রক্তমাংসের সজীব মানুষের জীবনের পূর্ণতাবোধই উপন্যাসের বুনিয়াদ। সেখানে একদিকে যেমন তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রত্যাশিত, তেমনই তার সম্ভাব্যতাও অপরিহার্য। কোনোভাবেই তা বিশ্বাসের অভাবকে প্রকট করে তোলে না। সেক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় বিশ্বাসযোগ্যতাই তার বিশেষত্বকে অপরিহার্য করে তোলে। অন্যদিকে মানুষের বাস্তব জীবনই উপন্যাসে উঠে আসে। তার ভাবনালোকের আলোয় তা পরিস্ফুট হয়। বলা হয়, ‘Every thought is a part of personal consciousness’। ব্যক্তিগত চেতনার আলোতে দেখা বস্তুবিশ্বের বিশ্বস্ত ছবিই উপন্যাসে কথা বলে। অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় দশকে উপন্যাসের সূচনা থেকে সেই বস্তুবিশ্বের বিশ্বস্ত ছবি তুলে ধরার কথা উঠে এসেছে। ‘Follow nature or Portray the world as you see it’-ই সেখানে প্রাধান্য লাভ করে। সেখানে জীবনকে যেভাবে দেখাচ্ছে সেভাবেই চিত্রিত করা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এজন্য প্রথম ঔপন্যাসিক ডানিয়েল ডিফো উপন্যাসকে ‘Natural Realism’-এ আন্তরিক করার কথা বলেছেন। আবার একই ভাবে অষ্টাদশ শতকের স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক রিচার্ডসন উপন্যাসকে ‘A faithful and chaste copy of real life and manners’ বলেছেন। সেকালের ফিল্ডিং ও স্মোলেটের উপন্যাসেও বাস্তবানুগ চিত্রাঙ্কন লক্ষণীয়। অন্যদিকে বিশ শতকের প্রভাবশালী ঔপন্যাসিক ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘Phase of Fiction’ প্রবন্ধে ডিফো-র উপন্যাসকে ‘Truth teller’ জাতীয় উপন্যাস বলেছেন। অষ্টাদশ শতকে উপন্যাসের বাস্তবতার এই বিশ্বস্ত প্রকৃতিই তাকে ইতিহাসে সামিল করেছিল। এজন্য উপন্যাসের সমালোচনায় ইতিহাস আলোচনার পরিসর উঠে আসত। অন্যদিকে উপন্যাসের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় জীবন। জীবনাগ্রহই তার বুনিয়াদী চেতনা। সেদিক থেকে অস্টাদশ শতকের বস্তুবিশ্বের বিশ্বাসবৃত্তিকে আকৃষ্ট করে উপন্যাস লেখার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। সেদিক থেকে সীমাবদ্ধ বস্তুবিশ্ব থেকে সেই বাস্তবতা মনের কাল্পনিক জগতও উনিশ শতকে আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে মনের কাল্পনিক অভিসারের প্রকৃতিতে উপন্যাস আবার নভেল ও রোমান্সের মধ্যে বিভাজন লক্ষণীয়। লাগামহীন কল্পনা বা কল্পনার আতিশয্যে রোমান্সের পরিসর সবুজ হয়ে ওঠে। সেখানে ইতিহাসের ঘোড়াও কল্পনার ডানায় পক্ষীরাজ ঘোড়ায় পরিণত হয়। অন্যদিকে নভেলের কল্পনার পায়ে বেড়ি। অর্থাৎ তার কল্পনার পা মাটিতে থাকে। নভেল হচ্ছে বাঁধা গরু মানে তা সীমাবদ্ধ পরিসরে ঘুরে ফিরে এবং কল্পনা করে। রোমান্স সেখানে ছাড়া গরু। ইচ্ছে মতো ঘুরে বেড়ায়। অন্যদিকে বাস্তবতার চেতনা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সেখানে Realism থেকে Naturalism-এ স্বাভাবিকতা লাভ করে। একদিক থেকে যখন বস্তু বিশ্ব থেকে কল্পবিশ্বের অভিমুখ উনিশ শতকে সচলতা লাভ করে, অন্যদিকে তাই সময়ান্তরে তাই আবার মননবিশ্বের দিকে যাত্রা করে। বিশ শতকের উপন্যাসে মননবিশ্বের বাস্তবতা প্রকট হয়ে ওঠে। অন্যদিকে বলা হয়, সভ্যতার অন্তরের অসঙ্গতি থেকে ঔপন্যাসিকের চরিত্রাঙ্কনে অন্তর্মুখিতা এসেছে। এই In wardness আমরা ফরাসি ঔপন্যাসিক ফ্লবেয়ার ও রাশিয়ান ঔপন্যাসিক দস্টয়ভস্কির ও আমেরিকার ঔপন্যাসিক হেনরি জেমসের মধ্যে লক্ষ করি। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাসে কল্পবিশ্ব ‘Poetic Fantasy’ প্রকৃতিতে উঠে এসেছে। পূর্বে স্কটের উপন্যাসেও কল্পবিশ্বের পরিচয় পাওয়া যায়। আরেক ধরনের বাস্তবতার পরিচয় পাওয়া যায়। যাকে বলা হয় ‘Formal Realism’। বিষয়ের অতীতে বা স্বরূপে পৌঁছানোর প্রয়াস থাকে তাতে। টমাস হার্ডি, জেমস জয়েস, এইহ্ ডি লরেন্স প্রমুখের উপন্যাসে তা বর্তমান। সেখানে কাব্য ও গদ্যের অন্তর্বতী ব্যবধান কমিয়ে আনার প্রয়াস সেখানে লক্ষ করা যায়। সেদিক থেকে জীবনাগ্রহের আধারে বাস্তবতার নানা রূপ উঠে আসার মধ্যেই তার বহুমাত্রিক কৌতূহলীই স্মরণ করিয়ে দেয়।
৫। Psychological Conflict বা মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব
উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে রক্তমাংসের মানুষের সজীব প্রকৃতি বেরিয়ে আসে। তা যেমন ব্যক্তিমানসের একাধিক সত্তার পরিচয়ের মধ্যে নৈতিক উত্তরণ ও অধঃপতন নিবিড় হয়ে ওঠে, তেমনই তাতে মানসিক সংঘাতের প্রকৃতিও সহজবোধ্য মনে হয়। উপন্যাসের পূর্বে নাটকের মধ্য তা স্পষ্টতা লাভ করে। পাপ-পুণ্য, ভালো-মন্দ, দোষগুণ প্রভৃতি মনের পরস্পর বিপরীতমুখী দ্বৈরথ সেখানে সক্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে মানসিক যন্ত্রণা, কোনো বিশেষ বিষয়ে টেনশন, বা নিষ্ক্রিয়াবোধে দুশ্চিন্তা তাতে নানাভাবে প্রকাশিত হয়। বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুইভাবেই মনস্তাত্বিক দুই ভাবেই মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্ব হয়ে থাকে। Protagonist চরিত্রের সঙ্গে Antagonist চরিত্রের সংঘাতে যেভাবে বাহ্যিক দ্বন্দ্ব সরবতা লাভ করে, ব্যক্তিমানসের মধ্য সেভাবে হয় না। সেখানে নীরবে বা অনুচ্চগ্রামে ব্যক্তিমানসে নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্বের বহুমাত্রিক প্রকাশে তার মন ও মননের পরিচয় উঠে আসে। শেকসপিয়্রের ‘Hamlet’ নাটকে হ্যামলেট তাঁর পিতৃহন্তাকারী কাকা Claudiusকে হত্যা করার পূর্বে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বে ভুগেছেন। তার সেই বহুচর্চিত মানসিক দ্বন্দ্ব আপনাতেই সজীবতা লাভ করে : ‘To be, or not to be, that is the question:/ whether ‘tis nobler in the mind to suffer / The sling and arrow of outrageous fortune / or to take arms against to sea trouble,……’। উপন্যাসের ক্ষেত্রে মানসিক দ্বন্দ্বের বিস্তার আরও সুগভীর ও সুদূরপ্রসারী। আধুনিক জটিল জীবনের প্রতিফলনে তার প্রভাব ও প্রকাশ ক্রমশ উৎকর্ষমুখর। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবে ইঙ্গিতে-ভঙ্গিতে, সংকেত ও কল্পনায় তার বহুরৈখিক ও বহুমাত্রিক উপস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও সেবিষয়ে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ‘ঔপন্যাসিক অন্তর্বিষয়ের প্রকটনে যত্নবান হইবেন।’ অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘চোখের বালি’র ভূমিকায় প্রসঙ্গক্রমে বলেছেন, ‘নামতে হল মনের সংসারের সেই কারখানাঘরে যেখানে আগুনের জ্বালানি হাতুড়ির পিটুনি থেকে দৃঢ় ধাতুর মূর্তি জেগে উঠতে থাকে।’ প্রথম থেকেই উপন্যাসের মধ্যে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের পরিচয় উঠে এলেও ফরাসি ঔপন্যাসিক স্তাঁধাল (১৭৮৬-১৮৪২) রচিত (১৮৩০) ‘Le Rouge et le’ বা ইংরেজিতে ‘Scarlet and Black’ উপন্যাসের মধ্যে প্রথম মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
৬। Philosophy of Writer বা লেখকের জীবনদর্শন
উপন্যাস নিছক বিনোদনসর্বস্ব শিল্পরূপ নয়। এর মধ্যে যেমন কোনো বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি প্রদানের সদিচ্ছা প্রদানের প্রয়াস বর্তমান, তেমনই তাতে লেখকের জীবনদর্শনও অবিচ্ছিন্নভাবে জুড়ে থাকে। জীবনের কত রূপ, কত রং, কত প্রকৃতি। শুধু তাই নয়, তার পরতে পরতে বৈচিত্রময় হাতছানির পরশ। সেই বিচিত্র সম্ভাবনাময় জীবনের সত্যের প্রকাশেও বহুমাত্রিক পরিচয় বর্তমান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দর্শনের সঙ্গে জীবনের সংযোগ ক্রমশ নিবিড়তা লাভ করে। দর্শন হয়ে ওঠে জীবনের সত্যকে জানা, ‘The Philosophy is to know the reality of life’। সেদিক থেকে ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শন উপন্যাসের অপরিহার্য উপাদান হয়ে ওঠে। সেখানে জীবনের সত্যের নানা সম্ভাবনাময় মূর্তি উপন্যাসের মধ্যে প্রতিমা হয়ে ওঠে। অবশ্য তা বিশ্বাস বা সম্ভাবনাকে ব্যাহত করে নয়, তাকে বিশ্বস্ত রেখেই তার সার্থকতা। একই জীবনের কত বিকল্প পরিণতি বা সম্ভাবনা বর্তমান। লেখক সেই সম্ভাবনাকে নানা ভাবে নানা রূপে লক্ষ্যে উপনীত হয়ে থাকেন। সেখানে বাস্তব ও কল্পনার মাধ্যমে রচিত উপন্যাসে লেখকের জীবনদর্শন সাধারণভাবে প্রচ্ছন্ন থাকে। অবশ্য স্বীয় উদ্দেশ্যকেই যখন জীবনদর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়ে উপন্যাসে তা উপজীব্য হয়ে ওঠে, তখন তা আপনাতেই প্রকট হয়ে পড়ে। ফরাসি ঔপন্যাসিক জাঁ পল সাত্র, আলবেয়ার কাম্যু প্রমুখের উপন্যাসের পরিচয় বর্তমান। অন্যদিকে কাম্যুর ‘The Myth of Sisyphus’ (১৯৪২) প্রবন্ধে ‘Absurd’ পরিভাষায় যে উদ্দেশ্যবিযুক্ত প্রকৃতি বর্তমান, তার মধ্যেও জীবনদর্শনের পরিচয় রয়েছে। সেদিক থেকে Absurd Novel-এর মধ্যে জীবনের বিচ্ছিন্ন প্রকৃতির মধ্যে ঔপন্যাসিকের জীবনদর্শন উঠে আসে। সেখানে জীবনের সার্বিক শোচনা ও পরাজয়কে মানুষের অস্তিত্বে ও আবেগে নিবিড় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে একই ভাবে Anti-Novel-এর মধ্যেও সেই জীবনদর্শন নানাভাবে বিস্তৃতি লাভ করে।
উপন্যাসের ঘরবাড়িই তার sweet home, জীবনাগ্রহী পাঠকের মননের আশ্রয়। স্বাভাবিক ভাবেই তার প্রকাশ যতটা না দৃশ্যমান, তার চেয়ে অনেকবেশি অদৃশ্য সত্তায়। সেই সত্তায় আধুনিক থেকে উত্তর-আধুনিক ঔপন্যাসিকের অভিযাত্রা আজও আজও সমান সচল। এজন্য শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের পরিচয়ে তার ঘরবাড়ির স্বতন্ত্র পরিচয়ও উৎকর্ষমুখর আভিজাত্য লাভ করে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।